বাণিজ্যিক চাষাবাদে বড় হচ্ছে ফুলের বাজার

কৃষি প্রতিবেদক ॥ ফুল হচ্ছে উচ্চ মূল্যমান একটি কৃষিপণ্য। শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, বন্ধুত্ব ও মননশীলতার প্রতীক এই ফুলকে ঘিরে জেগে উঠছে কৃষি অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনা। উপহার, সংবর্ধনা, বিয়ে, গায়ে হলুদ, পূজা-পার্বণ এমনকি সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আনুষ্ঠানিকতায় ফুলের ব্যবহার এখন জনপ্রিয় হচ্ছে। আধুনিক সমাজে ফুলের বহুমুখী ব্যবহারের কারণে শুধু  শৌখিনতায় নয়- ফুল এখন বিরাট অর্থকরী ফসল।  বাংলাদেশে মানুষের আয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশে ফুলের চাহিদাও বাড়ছে। উৎসবপ্রিয় বাঙালির জীবনে বিভিন্ন ধরনের উৎসব সারা বছর লেগেই থাকে। এসব উৎসবের আনুষ্ঠানিকতায় ফুলের গুরুত্ব বেড়েছে। ভালোবাসা দিবস, পহেলা ফাল্গুন, একুশে ফেব্র“য়ারি, বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস, পহেলা বৈশাখে দেশব্যাপী ব্যাপক আয়োজনের পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক ও পারিবারিক অনুষ্ঠান যেন ফুল ছাড়া চলেই না। আধুনিকমনস্ক মানুষের রুচির পরিবর্তনে এখন ঘরেও মানুষ তাজা ফুল রাখতে পছন্দ করে। সময়ের চাহিদার আলোকে দেশের অর্থনীতিতেও ফুলের অবদান ক্রমাগতভাবে বেড়েই চলেছে। কিন্তু বাংলাদেশে ফুলের বাণিজ্যিক প্রসার  খুব বেশি দিনের নয়। নব্বইয়ের দশকের আগে  দেশের ফুলের চাহিদার প্রায় পুরোটাই ছিল আমদানিনির্ভর। বর্তমানে দেশে উৎপাদিত ফুল দিয়েই চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ মেটানো হচ্ছে। মাত্র দুই দশকের পথচলায় ফুল বাণিজ্য অভানীয় সাফল্য দেখিয়েছে। জানা গেছে, ১৯৮২-৮৩ অর্থ বছর থেকে দেশে ফুল অর্থকরী ফসল হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এরপর থেকে বাড়ছে ফুলের বাণিজ্য। বাড়ছে কর্মসংস্থান। দেশের গন্ডি বিদেশেও রফতানি হচ্ছে বাংলাদেশের ফুল। আয় হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রা।  দেখা দিয়েছে নতুন সম্ভাবনা। কৃষিভিত্তিক পণ্য হিসেবে ফুলের চাহিদা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। সারা পৃথিবীতে ফুলের বাজার প্রতি বছর ১০ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে   দেশে সার্বিকভাবে ফুলের বাজার মূল্য প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা। একসময় শুধু যশোরে ফুলের চাষ হতো। জানা গেছে, বাংলাদেশে বর্তমানে ২০টি জেলায় কমবেশি ১২ হাজার হেক্টর জমিতে ফুল চাষ হচ্ছে। গত চার দশকে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় বাণিজ্যিকভাবে ফুল উৎপাদিত হচ্ছে। বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি ফুল চাষ হয় যশোর ও ঝিনাইদহ  জেলায়। এসব এলাকার মধ্যে রয়েছে ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, সাভার, গাজীপুর, সাভার, ময়মনসিংহ, রংপুর, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার,  মেহেরপুর, রাঙামাটি, টাঙ্গাইল, নারায়ণগঞ্জ, বগুড়া, মানিকগঞ্জ ও নাটোর। তবে বাণিজ্যিকভাবে বেশি চাষ হয় গোলাপ, রজনীগন্ধা, গাঁদা, গ্লাডিওলাস ও জারবেরা ফুল। ফুল ব্যবসায়ীদের হিসাবে দেখা গেছে, ফুল চাষ, পরিবহন ও বিক্রি মিলিয়ে ফুল ব্যবসার সঙ্গে প্রায় ২০ লাখ মানুষ জড়িত। জানা গেছে, বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে ফুল চাষ শুরু হয় আশির দশকে। ১৯৯১ সালে সরকার ফুলকে রফতানিযোগ্য পণ্যের তালিকাভুক্ত করে। বিভিন্ন জেলায় কমবেশি ২০ হাজারের খুচরা ফুল ব্যবসায়ী রয়েছেন। আর ঢাকায় আছে ৫০০শর অধিক ফুল বিক্রেতা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা অধিকাংশ ফুলই ঢাকার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বিক্রি হয়। ঢাকার শাহবাগ ও আগারগাঁওয়ে রয়েছে পাইকারি ফুলের বাজার। খুচরা বিক্রেতারা এসব জায়গা থেকে ফুল কিনে শহরে ছড়িয়ে পড়েন। ফুলের ব্যাপক চাহিদা ও বিরাট সুযোগ থাকার পরেও ফুল বিক্রির জন্য ঢাকায় কোনো কেন্দ্রীয় বাজার  নেই। যদিও  কেন্দ্রীয়ভাবে ফুলবাজার নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছেন ফুল বিক্রেতারা। আশার খবর হলো, এরই প্রেক্ষিতে রাজধানীর গাবতলীতে প্রায় দেড় একর জমির ওপর দুইতলা ভবন নির্মাণের মধ্য দিয়ে ফুলচাষিদের জন্য স্থায়ী বাজার  তৈরি হচ্ছে। ভবনটি হবে সম্পূর্ণ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন। এই প্রকল্পের মাধ্যমে অবকাঠামো, সংরক্ষণ ও পরিবহন সুবিধার মাধ্যমে ফুল বিপণনে সহায়তা প্রদান প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে। ২০২২ সালের জুন প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে। বাংলাদেশে ফুলের সম্ভাবনাময় বাজার রয়েছে। বিশ্ববাজারে অনেক জাতের ফুল আছে। কিন্তু দেশে ফুলের বেশি একটা জাত নেই। দেশে প্রতিনিয়ত ফুলের চাহিদা বৃদ্ধির কারণে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে বিদেশ থেকে ফুল এনে চাহিদা মেটাতে হয়। এই অবস্থা কাটাতে দেশে বিদেশি ফুল চাষে আগ্রহ বাড়ানো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফুলচাষিরা বিদেশি ফুলচাষে অধিক লাভ পাওয়ায় আগ্রহী হয়ে উঠছেন। ধারণা করা হচ্ছে এই উদ্যোগ পুরোমাত্রায় বাস্তবায়িত হলে সারা বছর বিদেশি প্রজাতির বিভিন্ন জাতের ফুল চাষ করে দেশের চাহিদা মেটানোর রফতানি করেও প্রচুর  বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব হবে। বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটির মতে, রজনীগন্ধা, গোলাপ, গাঁদা, চন্দ্রমল্লিকার মতো ফুল চাষে দেশের কৃষকরা অনেক আগে থেকেই সিদ্ধহস্ত। এখন তাদের জমিতে ফুটছে জাবেরা, গ্লাডিওলাসের মতো আমদানি-বিকল্প ফুল। এমনকি অর্কিডও আবাদ হচ্ছে  দেশে। তাই এখন আর মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড থেকে ফুল আমদানি করতে হচ্ছে না। কৃষকদের মাধ্যমে বিদেশি ফুল চাষ প্রসারে এগিয়ে এসেছে দেশের শীর্ষ বীজ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান মেটাল অ্যাগ্রো লিমিটেড। জাপান থেকে সরাসরি বীজ এনে তা কৃষকদের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ শুরু করেছে তারা। পঞ্চগড়সহ পার্শ্ববর্তী কয়েকটি জেলায় দীর্ঘদিন ধরে শীত মৌসুম চলে। এই শীতকে কাজে লাগিয়ে বছরের বেশি সময় ধরে এই অঞ্চলে শীতকালীন ফুল চাষ করা সম্ভব। বিশেষ করে শীতপ্রধান দেশ থেকে উন্নত প্রজাতির ফুলের বীজ এনে দেশে তা প্রসার ঘটালে উত্তরাঞ্চলে ফুল চাষে বিপ্লব ঘটাতে পারে। ফুল চাষের সম্ভাবনাকে কাজে লাগোনোর জন্য এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদি নীতি সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশে উৎপাদিত ফুল বিদেশে রফতানির জন্য প্যাকেজিং ব্যবস্থার উন্নয়ন, হিমাগার স্থাপন, ফুলের নতুন নতুন জাত উৎপাদনের ওপর গুরুত্বারোপ করতে হবে।  সেই সঙ্গে সম্ভাবনাময় ফুলশিল্পকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য এর সঙ্গে জড়িত কৃষক ও উদ্যোক্তাদের স্বল্প হারে ঋণ সুবিধা প্রদান, আধুনিক প্রযুক্তি প্রাপ্তি ও ব্যবহারের প্রশিক্ষণ, উন্নত ও নতুন নতুন জাতের বীজ সরবরাহ করা, ওয়্যারহাউজ ও  কোল্ডস্টোরেজ নির্মাণ এবং সর্বোপরি অবকাঠামো উন্নয়ন জরুরি। ফুলচাষিদের অভিযোগ- প্রশিক্ষণের অভাব, মানসম্মত বীজের স্বল্পতা, উন্নত পরিবহন ব্যবস্থার অভাব প্রভৃতি কারণে ফুলশিল্পে আশানুরূপ উন্নতি করা যাচ্ছে না। দেখা গেছে, পরিবহন ব্যবস্থার অভাবের কারণে অনেক সময় ফুল পচে বড় ধরনের ক্ষতি সম্মুখীন হতে হয়। এসব সমস্যার সমাধান করা  গেলে ফুলের উৎপাদন ও রফতানি বাড়ানো সম্ভব হবে। ফুল রফতানিকারকদের মতে, এ পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে নানা সমস্যা রয়েছে। ফুল দু-একদিন তাজা থাকে, তারপর নষ্ট হয়ে যায়। এ অসুবিধা দূর করার জন্য ফ্রিজার ভ্যানের প্রয়োজন। তাহলেই এ খাতে রফতানি বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়ে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব।

লেখক ঃ এস এম মুকুল, উন্নয়ন গবেষক।

আরো খবর...