বাংলাদেশে মাছ উত্পাদনে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে

কৃষি প্রতিবেদক ॥ মৎস্য উৎপাদনে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে বাংলাদেশে। জানা গেছে, ২০২২ সাল নাগাদ বিশ্বে যে চারটি দেশ মাছ চাষে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, তার শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশের নাম। বাংলাদেশের পরিবেশ মিঠা পানির মাছ চাষের জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান। দেশের জনগণ নিজেদের প্রয়োজনে মাছ চাষের প্রচলিত ধারণা থেকে সরে এসেছেন। নিজেদের পুকুরের মাছ খাওয়ার পাশাপাশি বাজার থেকে মাছ কেনার প্রবণতা বেড়েছে ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্স ইনস্টিটিউটের (আইএফপিআরআই) সর্বশেষ সমীক্ষা অনুযায়ী উৎপাদিত মাছের ৭৫ শতাংশই এখন বাণিজ্যিকভাবে বাজারজাত করছেন মাছ চাষীরা। বাংলাদেশ সরকার ভিশন ২০২১-এ দেশের মাছের উৎপাদন ৪৫.০ লাখ টন নির্ধারণ করা হয়েছে যা বর্তমান উৎপাদনের চেয়ে ১০ লাখ টন বেশি। মিঠা পানির মাছ উৎপাদনের বিপুল সম্ভাবনার পাশাপাশি সামুদ্রিক মাছ আহরণের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। সমুদ্রে মাছ আহরণের দিক থেকে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান এখন ২৫তম। বঙ্গোপসাগরে ৩৬ প্রজাতির চিংড়ি ছাড়াও প্রায় ৫০০ প্রজাতির অর্থকরী মাছ রয়েছে। ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রজয়ে এক লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার এলাকায় মাছ ধরার আইনগত অধিকার পেয়েছে বাংলাদেশ। ফলে বঙ্গোপসাগর থেকে মৎস্য আহরণ পর্যায়ক্রমে বাড়বে। এক হিসাবে দেখা গেছে, প্রতিবছর অব্যবস্থাপনা ও অবহেলায় উৎপাদিত মাছের একটা বড় অংশ, প্রাায় ১০ লাখ টন নষ্ট বা অপচয় হয়ে যায়। এটা রোধ করতে পারলে মাছ উৎপাদনে দেশ স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন সম্ভব হবে।
মাছ উৎপাদনে সাফল্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। দেশে প্রাণিজ আমিষের প্রায় ৬০ শতাংশ যোগান দেয় মাছ। ২০১৫ ও ২০১৭ সালে বিশ্বে পঞ্চম থেকে চতুর্থ স্থান অর্জন করে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ২০১৮ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশের অভ্যন্তরীণ বদ্ধ জলাশয়ে মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ তৃতীয়। বাংলাদেশের আগের দুটি অবস্থানে রয়েছে চীন ও ভারত। দেশে মোট কৃষিজ আয়ের ২৩ দশমিক ৮১ শতাংশ আসে মৎস্য খাত থেকে। জিডিপিতে মৎস্য খাতের অবদান এখন তিন দশমিক ৫৭ শতাংশ। কৃষিজ জিডিপিতে এই খাতের অবদান ২৫ দশমিক ৩০ শতাংশ। দেশের মোট জনগোষ্ঠীর ১১ শতাংশের বেশি ১ দশমিক ৮২ কোটি মানুষ মৎস্য আহরণে স¤পৃক্ত। যার মধ্যে প্রায় ১৫ দশমিক ৫ লাখ নারী।
অর্থনৈতিক উন্নয়নে মৎস্য সেক্টরের অবদান অসামান্য। ‘স্বয়ংসম্পূর্ণ মাছে দেশ, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্য ও স্লোগানে সরকারী-বেসরকারীভাবে দেশব্যাপী ২২-২৮ জুলাই ‘জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ-২০১৮’ উদযাপিত হয়েছে। সম্প্রতি মৎস্য অধিদফতরের সেমিনার হলে সংবাদ সম্মেলনে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র এক বিবৃতিতে বলেছেন, উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ায় দেশের মানুষ গড়ে ৬২ দশমিক ৫৮ গ্রাম মৎস্য গ্রহণ করছেন। জাটকা নিধন ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ায় ২০১৭-১৮ সালে প্রায় পাঁচ লাখ টন ইলিশ উৎপাদিত হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ২০১৭-১৮ সালে প্রায় ৬৯ হাজার টন মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রফতানি করে প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়েছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান সরকারের যথাযথ উদ্যোগে ২০১৬-১৭ অর্থবছর ৬৮ হাজার ৩০৫ টন মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রফতানির মাধ্যমে আয় হয়েছে ৪ হাজার ২৮৭ কোটি টাকা। এর আগে, ২০০৮-০৯ অর্থবছর দেশে মাছ উৎপাদন হয়েছিল ২৭ লাখ ৪১ হাজার টন। সরকারের উন্নয়নমুখী বহুবিধ উদ্যোগ ও সেবার পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৫-১৬ অর্থবছর মাছ উৎপাদন ৩৮ লাখ ৭৮ হাজার টনে উন্নীত হয়েছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তা বেড়ে হয়েছে ৪০ লাখ ৫০ হাজার টন। আগামী ২০১৮-১৯ অর্থবছরের মধ্যেই বাংলাদেশ মাছ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে পারবে বলে প্রত্যাশা সরকারের।
লেখক ঃ এসএম মুকুল

আরো খবর...