বাংলাদেশে জৈব জ্বালানি এখন সময়ের দাবি

কৃষি প্রতিবেদক ॥ দিন যাচ্ছে আর জ্বালানির চাহিদা বাড়ছে। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের তথ্য মতে, ২০১২-১৩ অথর্বছরে পরিশোধিত ও অপরিশোধিত মিলিয়ে মোট জ্বালানি তেল আমদানি হয়েছিল ৪১ লাখ ২৯ হাজার ২৬২ টন, আর ২০১৬-১৭ অথর্বছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫২ লাখ ৫৯ হাজার ৩৯৮ টনে। জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক চাহিদা বেড়ে যাওয়ার বড় কারণ হচ্ছে ব্যাপকভাবে মোটর যানের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া। বিআরটিএর তথ্য মতে, গত বছরের অক্টোবর পর্যন্ত দেশে মোটরযানের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩২ লাখ ১৭ হাজার ৭৯২টি। যা ২০১৪ সালে ছিল ১৪ লাখ ৯৮ হাজার ২৪৪টি। রাজধানী ঢাকা গত অক্টোবর মাসে মোটরযানের সংখ্যা দাঁড়ায় ১১ লাখ ৭৩ হাজার ৬৭৪টি, যা ২০১০ সালে ছিল ৫ লাখ ৯৩ হাজার ৭৭টি। জ¦ালানি তেলের চাপ কমাতে সিএনজির ব্যবহার শুরু হয়েছে। তবে দেশে গ্যাসের পরিমাণ দ্রুত কমে যাচ্ছে। জ্বালানি তেল ও গ্যাসে বিকল্প হতে পারে বায়োগ্যাস বা বায়োফুয়েল। কিন্তু সম্ভাবনা থাকা সত্বেও এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেই বললেই চলে। গত ২০১০ সালে একটা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল চিনি কলগুলোতে উৎপাদিত চিটাগুড় থেকে বায়োফুয়েল উৎপাদন করা হবে মোটরযান চালানোর জন্য। বছরে ৬০ লাখ টন বায়োফুয়েল উৎপাদনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে এই প্রকল্প বা উদ্যোগ থেমে যায়। ২০০৬ সালে চিনিশিল্প করপোরেশনের বিজ্ঞানীরা বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সঙ্গে যৌথ গবেষণা শুরু করেন। তারা চিটাগুড় থেকে মোটরগাড়ি চালানো যায় এমন পাওয়ার ইথানল উৎপাদনে সফল হন। পরে পেট্রোলের সঙ্গে শতকরা ১০ ভাগ পাওয়ার ইথানল মিশিয়ে গবেষণার সফলতা সম্পর্কে পুরোপুরি নিশ্চিত হন গষেকরা। এ সাফল্যের ভিত্তিতে চিনি ও খাদ্য শিল্প সংস্থা ২০০৭ সালে পাওয়ার ইথানল তৈরির জন্য দশর্না চিনিকলে (কেরু অ্যান্ড কোম্পানি) একটি প্ল্যান্ট স্থাপনের প্রকল্প গ্রহণ করে। পরে তা চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা, কার্বন নিঃসরণ কমানো ও খনিজ তেলের ওপর নিভর্রতা কমাতে বিশ্বে এখন বিকল্প জ্বালানি হিসেবে পাওয়ার ইথানলের সঙ্গে পেট্রোল মিশিয়ে গাড়ি চালানো জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। তবে সেক্ষেত্রে তারা সরাসরি সবুজ শস্য ব্যবহার করলেও বাংলাদেশ এই প্রথম কোনো উপজাত থেকে ইথানল তৈরি করছে বলে চিনি ও খাদ্য শিল্পসংস্থা সূত্রে জানা গেছে। বাংলাদেশ চিনিশিল্প করপোরেশনের মালিকানাধীন দর্শনা চিনিকলের (কেরু অ্যান্ড কোম্পানি) ডিস্টিলারিতে অ্যালকোহল তৈরির জন্য একটি প্ল্যান্ট বসানো হয়। দেশের চিনিকলগুলোতে প্রতিবছর চিনির উপজাত হিসেবে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টন চিটাগুড় পাওয়া যায়। এর বিশ্বের উন্নয়নশীল বিভিন্ন দেশের সঙ্গে তাল রেখে বাংলাদেশের চিনি শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে চিনিকলগুলোতে চিনি ও গুড়ের পাশাপাশি জৈবজ্বালানি বা ইথানল উৎপাদনের কোনো বিকল্প দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা। তারা মনে করেন, দেশে যে হারে আখের চাষ দিন দিন কমে যাচ্ছে, তাতে এ শিল্পকে ধরে রাখতে হলে চিনিকলে ইথানল তৈরি করাই সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে কৃষক ও চিনিশিল্প বেঁচে থাকবে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, বিশ্বে জৈব জ্বালানি হিসেবে মূলত ইথানল ব্যবহার করা হয়। আর আখের রস বা মোলাসেস (চিটাগুড়) থেকে প্রথমে ইথানল তৈরি করা হয়। এই ইথানল গ্যাসোলিন (পেট্রোল, অকটেন, ডিজেল) এর সঙ্গে ২০-২৫ হারে মিশ্রিত করে অথবা পুরোটাই সরাসরি ইঞ্জিনচালিত যানবাহনে ব্যবহার করা যায়। এক্ষেত্রে ইঞ্জিনের সামান্য কিছু পরিবর্তন প্রয়োজন হয়। তারা বলেন, গ্যাসোলিনের (পেট্রোল, অকটেন, ডিজেল) পরিবর্তে জ্বালানি হিসেবে ইথানল ব্যবহার করলে ৯০ শতাংশ কাবর্ন ডাই-অক্সাইড (গ্রিন হাউস গ্যাস) নিঃসরণ কম হয়। এটি ব্যবহারে ইঞ্জিনের শব্দ কম হয় এবং ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং বায়ুদূষণ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ জন্যই, আধুনিক বিশ্বে ইথানলকে টেকসই জৈব জ্বালানির অর্থনৈতিক ভিত্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে। তারা বলেন, আখ উৎপাদনে শীর্ষ দেশ ব্রাজিল তার মোট উৎপাদনের ৫৬ শতাংশ আখ জৈব জ্বালানি (ইথানল) উৎপাদনে ব্যবহার করে এবং প্রতিটি ইঞ্জিনচালিত গাড়িতে বাধ্যতামূলকভাবে ২০-২৫ শতাংশ ইথানলমিশ্রিত গ্যাসোলিন ব্যবহার করছে ব্রাজিলিয়ানরা। জ্বালানি নিরাপত্তার কথা ভেবে ভারত ২০০৯ সালে জৈবজ্বালানি নীতিমালা প্রণয়ন করেছে, যে নীতিমালায় চলতি ২০১৭ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ ইথানলমিশ্রিত জ্বালানি ব্যবহারকে বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছে। চীনেও ২০২০ সালের মধ্যে ১৫ শতাংশ ইথানল মিশ্রিত গ্যাসোলিন বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। শুধু চীন ও ভারত নয় যেসব দেশে আখ উৎপাদিত হয় যেমন পাকিসস্তান, তুরস্ক, মেক্সিকো, থাইল্যান্ডসহ প্রায় সব দেশই এ পথে হাঁটছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, বাংলাদেশে এখন আখ উৎপাদন করে চাষির পাশাপাশি চিনিকলগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে দেশেরও বিরাট লোকসান হচ্ছে। তাই এদেশে আখ উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত লাখ লাখ চাষি ও চিনিকলকে অপমৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে রেখে অন্যান্য দেশের মতো লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হলে জৈব জ্বালানি তৈরির বিকল্প নেই। কারণ এক টন আখ থেকে চিনি (রিকভারি ৭.৫০ শতাংশ হলে) পাওয়া যায় ৭৫ কেজি। যার বতর্মান বাজারমূল্য ৩০০০ টাকা। আর ওই আখ থেকে প্রায় ৮৫ লিটার জৈব জ্বালানি (ইথানল) পাওয়া যায়, যার বাজার মূল্য ৮৫০০ টাকা। তাই জৈব জ্বালানি উৎপাদন কৃষকের সমৃদ্ধি বাড়াবে। যেহেতু বায়োফুয়েল উৎপাদনের মূল উপাদান খাদ্যশস্য, তাই এর উৎপাদন বৃদ্ধির পরিকল্পনা খাদ্যমূল্যে স্বাভাবিকভাবেই খারাপ প্রভাব ফেলবে। খারাপ পরিণতির কথা জেনেও মাকির্ন কংগ্রেস ২০০৫ সালে শুধু তাদের প্রয়োজনে বায়োফুয়েল উৎপাদন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। সে পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২২ সাল নাগাদ ১৩ হাজার ৬০০ কোটি লিটার বায়োফুয়েল উৎপাদন করবে বলে লক্ষ্যমাত্রা স্থির করেছে। বাংলাদেশে জৈব জ্বালানি এখন সময়ের দাবি। এমতাবস্থায় চিটাগুড় থেকে বায়োফুলে উৎপাদনের বিষয়টি ভেবে দেখা দরকার।
লেখক ঃ কৃষিবিদ এম আব্দুল মোমিন

আরো খবর...