ফসল রক্ষায় কৃষকের বন্ধু কাকতাড়ুয়া

কৃষি প্রতিবেদক ॥ ফসল রক্ষায় কৃষকের বন্ধু কাকতাড়ুয়া গ্রাম বাংলার ফসলের ক্ষেতের অতি পরিচিত দৃশ্য এই কাকতাড়ুয়া। লম্বা খাড়া দন্ডায়মান একটি খুটি এবং দুই বা তিন ফুট উপরে আড়াআড়ি অরেকটি খুটি বেঁধে তাতে ছন বা খড় পেচিয়ে মোটাসোটা করা হয়। তারপর আড়াআড়ি বাঁধানো অংশের সামান্য উপরে ছন বা খড়কুটো দিয়ে ডিম্বাকৃতি বা মাথার মতো বস্তু বানানো হয়। এরপর বাড়ি থেকে ব্যবহৃত পরিত্যাক্ত ছেড়া জামা বা পাঞ্জাবি পরিয়ে দেয়া হয় এটিকে। ডিম্বাকৃতির অংশটিকে ঢেকে দেয়া হয় মাটির হাড়ি দিয়ে। সেই হাড়িতে চোখ-নাক-মুখ এঁকে দেয়া হয় চুন বা চক দিয়ে। ফলে এক অদ্ভূত অভিনব সৌন্দর্য সৃষ্টি হয়। যা দেখে ভয় পাওয়ার মতো একটা ব্যাপার ঘটে। এই কাকতাড়ুয়াকে ফসলি জমির মাঝখানে দন্ডায়মান পুতে রাখা হয়। অনেকের বিশ্বাস কাকতাড়ুয়া বাড়ন্ত ফসলের দিকে পথচারির কুদৃষ্টি থেকে রক্ষা করে। কাকতাড়ুয়া ব্যবহারের সুফল পেয়ে কৃষকরাও খুশি। খুশি বলেই যুগে যুগে কৃষকের সৃজিত এই অভিনব পদ্ধতির প্রচলন একালেও চোখে পড়ে গ্রাম বাংলায়। রাতের বেলায় ইদুর যখন ক্ষেতের শষ্য কেটে গর্তে ঢোকাতে যায় তখন এই কাকতাড়ুয়া দেখে তারা ভয় পায়। তারা ভাবে মানুষ বা কিছু একটা তাদেরকে পাহারা দিচ্ছে। দিনের বেলায় পাখিরা এই অদ্ভূত জিনিসটি দেখতে পেয়ে সেই জমিতে আর নামতে সাহস পায়না। এমন বিশ্বাস থেকে গ্রামের কৃষকদের মাঝে ব্যাপকভাবে কাকতাড়ুয়ার ব্যবহার শুরু হয় সেই প্রাচীনকাল থেকে। গ্রাম বাংলায় কৃষক ক্ষেতের ফসলকে পাখি আর ইদুরের হাত থেকে রক্ষা করার কৌশল হিসেবে এমন অদ্ভূত ও অভিনব পদ্ধতির আবিষ্কার করেন যার নাম কাকতাড়ুয়া। গ্রামীণ জীবনে দেখা গেছে কৃষকের ফসল নস্ট করে পাখি আর ইদুর। পাখিরা দিনের বেলায় ক্ষয়ক্ষতি করলেও রাতের ফসল চোরের নাম ইদুর। কষ্টের ফসলকে এদের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য উত্তম পদ্ধতি হিসেবে এই কাকতাড়ুয়ার প্রচলন শুরু হয়। মানুষ আকৃতির এই কাকতাড়ুয়া তৈরি করা হয় মূলত বাঁশ, মোটা কাঠি আর ছন বা খর-কুটো দিয়ে। দুই পাশে সোজা দুই হাত মাথা আর এক পায়ে দন্ডায়মান মনুষ্যাকৃতির এই অদ্ভত জিনিসটি একপর্যায়ে কৃষকদের মাঝে জনপ্রিয় হয়ে উঠে। ক্রমেই গ্রাম বাংলায় প্রকৃতির মায়াঘেরা গ্রামীণ জীবনের মূর্ত এক প্রতীকের নাম কাকতাড়ুয়া। দূর থেকে দেখতে ঢোলাঢালা জোব্বা পরা, মুখে চুনকালি মাখা আর মাথায় কালো পাতিলের টুপি পরা কাকতাড়ুয়া এক পায়ে এক ঠাঁয়ে দাঁড়িয়ে আছে। না ভূত, না মানুষ-দেখতে কিম্বাকৃতির অদ্ভূত অবয়ব। যা দেখে ভয় পায় পাখি ও ফসলি জমির শক্র ইঁদুর। বাতাসে এর একটু আধটু নড়াচড়া দেখলেই পাখিরা পালায়। রাতে তা দেখে ভয়ে গর্তে ঢুকে ইঁদুরের দল। এই হলো কাকতাড়–য়া। নাম কাকতাড়–য়া হলেও এটি শুধুমাত্র কাক তাড়ানোর জন্য ব্যবহৃত হয়না। ফসলী জমিতে ঝাপিয়ে পড়া পাখিদের তাড়াতে ব্যবহৃত এই অদ্ভুত বস্তুটির নামকরণ হয় কাকতাড়ুয়া। কালের প্রবাহে ফসল রক্ষার এই সনাতনি পদ্ধতিটি গ্রাম বাংলার বিমূর্ত প্রতীক হয়ে উঠে আসে গল্প, কবিতা, নাটক, সিনেমায়। এরপর কাকতাড়–য়া আধুনিক সমাজে পৌছে যায় শিল্পীর চিত্রকর্মে বইয়ের প্রচ্ছদে প্রচ্ছদে। তবে কাকতাড়–য়া নিয়ে বিছু মিথ প্রচলিত আছে। যেমন যে পথ দিয়ে দিনের বেলা হেটে যেতে কিছু দেখেননি, রাতের আঁধারে বাড়ির ফেরার সময় যদি দেখেন সেখানে কিছু একটা দাঁড়িয়ে আছে। হাত নাড়াচাড়া করে ডাকছে- ব্যাপারটা তবে কেমন হতে পারে বুঝতেই পারছেন। এমন অনেক কাহিনি শুনা গেছে যে, কাকতাড়–য়া দেখে জায়গায় ফিট খেয়েছেন কেউ কেউ। কেউবা ভয়ে দৌড়ে বাড়ি গেছেন। পরে অবশ্য দিনে আলোয় সবার ভুল ভেঙ্গেছে। যাহোক, গ্রামবাংলার প্রাচীন ঐতিহ্য হিসেবে কাকতাড়–য়া হাজার বছর বেচে থাকুক আমাদের ঐতিহ্যের স্মারক হয়ে।

আরো খবর...