ফসলের ফলন বৃদ্ধি ব্যয় হ্রাস এবং পরিবেশ রক্ষায় সারের সুষম ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে

কৃষি প্রতিবেদক ॥ রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার বাড়ায় পরিবেশ আজ হুমকীর সম্মুখীন। অপরিকল্পিত মাত্রায় রাসায়নিক সার ব্যবহার হওয়ায় ফসলের ফলনে যেমন বিঘœ সৃষ্টি হচ্ছে তেমনি উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফসলের ফলন বৃদ্ধি ও ব্যয় হ্রাস করতে এবং পরিবেশ রক্ষায় সুষম সার ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। কৃষককে উৎসাহিত করতে হবে মাটি পরীক্ষার মাধ্যমে পরিকল্পিত মাত্রায় রাসায়নিক সার ব্যবহার করতে। মাটিতে সুষম সার ব্যবহারে ফসলের ফলন বাড়ে এবং ব্যয় কমে। সুষম সার আসলে আলাদা কোন সার নয়। কৃষক তার ক্ষেতে প্রতি নিয়ত যে সব সার ব্যবহার করে থাকে তার মাত্রানুযায়ী ব্যবহারই হচ্ছে সুষম সার। অর্থাৎ মাটির চাহিদানুযায়ী প্রয়োজনীয় সার সঠিক মাত্রায় ব্যবহার করাকেই সুষম সার বলে। জমিতে কোন একটি সার অতিরিক্ত ব্যবহার করা হলে অন্যান্য সার চাহিদা বৃদ্ধি পায়। আবার কোন একটি সার অপরিকল্পিত মাত্রায় ব্যবহার হলে মাটির অন্যান্য প্রধান খাদ্য অপ্রধান খাদ্য এবং অনুখাদ্য কার্যকারিতা হারায়। জমিতে সুষম মাত্রায় সার ব্যবহার না হলে যে সব ক্ষতি হয় তা বিশ্লেষন করলেই এর গুরুত্ব সহজে উপলব্ধি করা যায়। ধরা যায় এক বিঘা জমিতে ইউরিয়া সার চাহিদা ২০ কেজি। এখন ওই জমিতে ৩০ কেজি সার ব্যবহার করা হলে টিএসপি এবং এমওপি সারের চাহিদা আনুপাতিক হারে বৃদ্ধি পায়। সাধারণত কৃষক তার ক্ষেতে ফসলের অতি সবুজ রঙ ধরে রাখতে এবং গাছের বৃদ্ধি ধরে রাখতে অতিমাত্রায় ইউরিয়া ব্যবহার করে থাকে এবং অজ্ঞতা বশত অপর সার আনুপাতিক হারে কম ব্যবহার করে থাকে। সুষম মাত্রায় সার ব্যবহার করা না হলে সারের অপচয় হয়। অসম মাত্রায় সার ব্যবহার করা হলে ফসলের গাছের বৃদ্ধি বিঘিœত হয়। মাটির (গঠন ভেঙ্গে যায়। মাটির স্বাস্থ্যহানি ঘটে। পরিবেশ বিঘিœত হয়। অতিরিক্ত ইউরিয়া ব্যবহার করা হলে ফসলের গাছের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি হয়, ফসলের জীবনকাল বেড়ে যায় এবং পরবর্তি মৌসুমের ফসল চাষ নাবি হয়ে যায়। ধান ফসলে সর্বাধিক সার ব্যবহার হয়। এজন্য ধান ফসলের সুষম সার ব্যবস্থাপনা জানা সব কৃষকের অতি জরুরী। রাসায়নিক সার ব্যবহারের আগে অবশ্যই ক্ষেতে বিঘাপ্রতি এক টন হারে জৈব সার ব্যবহার করতে হবে। এখন প্রশ্ন থাকতে পারে জৈব সার কি। জৈব সার বলতে আমাদের কৃষক কেবল গোর সারকেই বুঝে থাকে।
তবে পঁচা গোবর সার, আবর্জনা গোবর মিশ্রিত সার, আবর্জনা পঁচা, কুইক কম্পোষ্ট, দীর্ঘ মেয়াদি কম্পোষ্ট, মুরগীর বিষ্ঠা পঁচা, বায়োস্ল্যারী এবং কেঁচো কম্পোষ্ট সবই জৈব সারের অন্তর্ভূক্ত। আবার ক্ষেতে ধৈঞ্চা চাষ করে মাটির সাথে মিশিয়ে দিলেও মাটির প্রয়োজনীয় জৈব সারের ঘাটতি পূরণ হয়। বিভিন্ন ধরণের জৈব সার বছরে অন্ত একবার বিগা প্রতি অন্তত এক টন হারে ব্যবহার বাঞ্চনিয়। তবে বায়োস্ল্যারী এবং কেঁচো কম্পোষ্ট বিঘা প্রতি এক টনের কম ব্যবহার করলেও চলে।
মাটিতে জৈব সারের গুরুত্ব অবর্ণনীয়। জৈব সার মাটির গঠন সুদৃঢ় করে। মাটির পানি ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। মাটিতে রাসায়নিক সারের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং রাসায়নিক সারের চাহিদা হ্রাস করে। মাটিতে এক টন হারে যে কোন ধরণের জৈব সার ব্যবহার করা হলে রাসায়নিক সারের ব্যবহার ৩০ শতাংশ হ্রাস পায় এবং কাঙ্খিত ফলন নিশ্চিত করে। সব ধরনের ধানের খাদ্য চাহিদা এক নয়। ধানের খাদ্য চাহিদা এর জীবনকাল এবং ফলনের উপর নির্ভর করে। আমাদের দেশে তিন মৌসুমে ধান উৎপাদন হয়। আউশ, আমন এবং বোরো। এ তিন প্রকার ধানের আবার পৃথক জাত রয়েছে। ভিন্ন ভিন্ন জাতের ধানের খাদ্য চাহিদাও ভিন্ন রকম। রোপা আউশ ধানের জাত বিআর-২৬, ব্রি-২৭ ও ৪৮ এর খাদ্য ব্যবস্থা, জৈব সার এক টন, ইউরিয়া ১৮ কেজি, টিএসপি ৮ কেজি, এমওপি ১০ কেজি, জিপসাম ৬ কেজি এবং জিংক সালফেট (দস্তা) ১ কেজি। রোপা আমন ধানের জাত ব্রি ধান ৪৯, ৫১, ৫২, ৫৩, ৫৪। খাদ্য চাহিদা-জৈব সার ১ টন, ইউরিয়া ২৪ কেজি, টিএসপি ১০ কেজি, এমওপি ১০ কেজি, জিপসাম ৮ কেজি এবং দস্তা ১ কেজি। রোপা আমনের জাত ব্রি ধান ৩৩, ৩৪, ৩৭, ৩৮, ৩৯ এর খাদ্য চাহিদা জৈব সার ১ টন, ইউরিয়া ১৮-২১ কেজি, টিএসপি ৮ কেজি, এমওপি ৮ কেজি জিপসাম ৬ কেজি এবং দস্তা ১ কেজি। নাবি রোপা আমন ধানের জাত বিআর ২৩ এবং ব্রি ৪৬ এর খাদ্য চাহিদা জৈব সার ১ টন, ইউরিয়া ১৮ কেজি, টিএসপি ৮ কেজি, এমওপি ৮ কেজি, জিপসাম, ৬ কেজি এবং দস্তা ১ কেজি। বোরো ধানের জাত ব্রি ২৮, ৩৬, ৪৫, ৪৭ ও ৫০। খাদ্য চাহিদা জৈব সার ১ টন, ইউরিয়া ৩০ কেজি, টিএসপি ১৫ কেজি এমওপি ১৫ কেজি জিপসাম ১০ কেজি এবং দস্তা ১ কেজি। বোরো ধানের জাত ব্রি ২৯ জৈব সার ১ টন, ইউরিয়া ৪০ কেজি, টিএসপি ১৮ কেজি, এমওপি ১৮ কেজি, জিপসাম ১০ কেজি এবং দস্তা দেড় কেজি।
সার কেবল প্রয়োগ করলেই হবে না। এক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি মেনে চলতে হবে। জমি চাষ দেবার অন্তত ১০-১৫ দিন আগে জমিতে সবটুকু জৈব সার ছিটিয়ে পরে সেচ দিয়ে জমি চাষ করতে হবে। জমিতে চারা রোপণের পর প্রথম কুশি বের হলে প্রথম কিস্তিতে ইউরিয়ার অনুমোদিত মাত্রার অর্ধেকের কিছু কম সার প্রয়োগ করতে হবে। সর্বচ্চ কুশি অবস্থায় অর্থাৎ ধানের গোছা মোটা হলে বাকি ইউরিয়া ২ ভাগ করে অর্ধেক প্রয়োগ করতে হবে এবং ধান কাইচ থোড় অবস্থায় অবশিষ্ট সার প্রয়োগ করতে হবে। অনুমোদিত মাত্রার সব টুকু টিএসপি সার জমি শেষ চাষের সময় মাটিতে প্রয়োগ করতে হবে। অনুমোদিত মাত্রার এমওপি সার জমি শেষ চাষের সময় ৩ ভাগের ২ ভাগ প্রয়োগ করতে হবে এবং বাকি সার ২য় কিস্তির ইউরিয়ার সাথে প্রয়োগ করতে হবে। তবে জমিতে সার প্রয়োগের আগে মাটি পরীক্ষা করে নেয়া উচিৎ। সারের সুষম ব্যবস্থাপনা মেনে চাষবাদ করলে ফসলের ফলন বৃদ্ধি পাবে এবং ব্যয় হ্রাস পাবে একই সাথে পরিবেশ সংরক্ষণে সহায়ক হবে। (তথ্যসুত্রঃ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, মৃত্তিকা গবেষনা ইনষ্টিটিউট, আইপিআই এবং বিএফএ)।

আরো খবর...