পোল্ট্রি খাতকে আগামী বাজেটে করমুক্ত ঘোষণার দাবি

কৃষি প্রতিবেদক ॥ প্রাণিজ আমিষের চাহিদা নিশ্চিত করতে পোল্ট্রি শিল্পখাতকে আগামী বাজেটে করমুক্ত ঘোষণার দাবি জানানো হয়েছে। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার কারণে লোকসানের মুখে প্রতিনিয়ত মুরগির খামার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। চরম ঝুঁকির মুখে রয়েছে পোল্ট্রি শিল্পখাত। অথচ টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে স্বাস্থ্যবান মেধাবী জাতি প্রয়োজন। পারিবারিক পুষ্টির চাহিদা পূরণে রূপকল্প-২১ সালের মধ্যে প্রতিদিন ৪ কোটি ৫ লাখ ডিম উৎপাদন করতে হবে। কিন্তু পোল্ট্রি ফিডসহ কাঁচামাল আমদানিতে অতিরিক্ত করারোপের কারণে পুঁজি হারিয়ে উদ্যোক্তারা ব্যবসা গুটিয়ে ফেলতে বাধ্য হচ্ছেন।
গত শনিবার রাজধানীর একটি হোটেলে ‘পোল্ট্রি শিল্পের সহযোগিতায় গণমাধ্যমের ভূমিকা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে উদ্যোক্তারা এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ কেন্দ্রীয় কাউন্সিল বিপিআইসিসি ও বিশ্ব পোল্ট্রি সাইন্স এ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ ব্র্যাঞ্চ যৌথভাবে এ গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে। সাবেক প্রধান তথ্য কমিশনার অধ্যাপক গোলাম রহমানের সঞ্চালনায় আলোচনায় অংশ নেন বিশ্ব পোল্ট্রি সাইন্স এ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ ব্র্যাঞ্চের সভাপতি শামসুল আরেফীন খালেদ, বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের (বিপিআইসিসি) সভাপতি মসিউর রহমান। এছাড়া বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার সিনিয়র সাংবাদিকরা আলোচনায় নিজেদের মতামত তুলে ধরেন। মসিউর রহমান বলেন পোল্ট্রি শিল্পখাতের ৭০-৯০ হাজার বাণিজ্যিক খামারে বর্তমান ৩৫ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ রয়েছে। জিডিপিতে প্রাণীসম্পদ খাতের অবদান প্রায় ২ দশমিক ৫ শতাংশ, এর মধ্যে ১ দশমিক ৬ শতাংশ অবদান পোল্ট্রি শিল্পের। অথচ পোল্ট্রি সংশ্লিষ্ট সব ধরনের কাঁচামাল আমদানিতে উচ্চহারে শুল্কারোপ করা হয়েছে। আগামী বাজেটে এ খাতে সম্পূর্ণরুপে করমুক্ত করতে হবে। তিনি বলেন, দেশে মৎস্য সম্পদের জন্য আলাদা দফতর থাকলেও পোল্ট্রি শিল্পের জন্য এ রকম কোন অধিদফতর নেই। এত বড় শিল্পখাতের জন্য এখন পৃথক মন্ত্রণালয় কিংবা অধিদফতর করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তিনি বলেন, দেশে পোল্ট্রি ফিডের কাঁচামালের ঘাটতি রয়েছে। দেশে এত ভুট্টা উৎপাদন হয়, অথচ বছরে পোল্ট্রিফিড তৈরির জন্য ৬০ হাজার মেট্রিক টন ভুট্টা আনা হয় ব্রাজিল থেকে। ভুট্টার পাশাপাশি সয়াবিন, ভ্যাকসিনসহ অন্যান্য সব জিনিস আমদানি করা হচ্ছে। এসব জিনিস আমদানি করা হচ্ছে কিন্তু বন্দর ব্যবস্থাপনা কি, সেটাও একটি বড় প্রশ্ন। বন্দরে সেবা পাওয়া যায় না। আর এ রকম হচ্ছে এ খাতের কোন অভিভাবক নেই বলে। তিনি বলেন, পোল্ট্রি শিল্পখাতে বর্তমান সাতটি এ্যাসোসিয়েশন রয়েছে। সাতটি প্রতিষ্ঠান সাত ধরনের বিষয় নিয়ে কাজ করছে। কিন্তু সবার লক্ষ্য পোল্ট্রি শিল্পের উন্নয়ন ও বিকাশ। নিজেদের মতো দূরত্ব ঘুচিয়ে এ শিল্পের উদ্যোক্তারা এখন মিলেমিশে কাজ করছেন। মসিউর রহমান আরও বলেন, ২০২১ সাল নাগাদ এ খাতে ৫৫ থেকে ৬০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে। তিনি বলেন, ২০১৪ সালে দেশে বার্ষিক ডিম উৎপাদন ছিল ৬৩৯ কোটি, ২০১৫ সালে ৭১২ কোটি এবং ২০১৬ সালে ডিম উৎপাদন ছিল ৮২১ কোটি। ২০২১ সাল নাগাদ বার্ষিক ডিমের চাহিদা দাঁড়াবে প্রায় ১ হাজার ৪৮০ কোটি। তিনি বলেন, আমদানি নির্ভরতা কাটিয়ে সমৃদ্ধ হয়ে উঠছে দেশের পোল্ট্রি শিল্প। এই খাতে নীরব বিপ্লব হয়েছে। আশির দশকে এই খাতে বিনিয়োগ ছিল প্রায় ১৫শ’ কোটি টাকা। বর্তমানে ৩০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। শামসুল আরেফীন বলেন, এ খাতের উন্নয়নে মিডিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। মিডিয়ার কারণে দেশের পোল্ট্রি শিল্পখাত বিষয়ে দেশের মানুষের পাশাপাশি বহির্বিশ্বের লোকজন জানতে পারছেন। কিন্তু এ খাতের আগামীর ভিশন জাতির সামনে তুলে ধরতে আরও ব্যাপক প্রচারণা ও জনসচেতনতার প্রয়োজন। এই কাজগুলো ভালমতো করতে হলে এ খাতের সঙ্গে মিডিয়ারও সম্পৃক্ত হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। তিনি বলেন, সবাই ভাল খাবার চায়। খাবার সবার প্রয়োজন। সেখানে কিভাবে ভাল ও জীবানুমুক্ত ডিম ও পোল্ট্রি মাংস নিশ্চিত করা যায় সেটা আগে করতে হবে। তিনি বলেন, পোল্ট্রি শিল্পখাত উন্নয়নে ২০২১, ২০২৪ এবং ২০৩০ সাল সামনে রেখে একটি রোডম্যাপ তৈরি করা হচ্ছে। গোলাম রহমান বলেন, পোল্ট্রি শিল্পখাতের আজকের এ অবস্থানে আসার পেছনে বেসরকারীখাতের অবদানই সবচেয়ে বেশি। তাদের এই প্রচেষ্টাকে আরও বেগবান করতে মিডিয়ার সঙ্গে একটি সমন্বয় থাকা উচিত। আশা করছি, এ খাতের উদ্যোক্তারা এ বিষয়টির দিকে লক্ষ্য রাখবেন। এদিকে, সংগঠন দুটির পক্ষ থেকে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়েছে-বর্তমানে এ শিল্পে বিনিয়োগের পরিমাণ ৩৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। পোল্ট্রি উদ্যোক্তা ও খামারিদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও ত্যাগ এবং সরকারের আন্তরিক সহযোগিতার কারণেই এ অসাধ্য অর্জন সম্ভব হয়েছে। মাত্র তিন যুগের ব্যবধানে সম্পূর্ণ আমদানি-নির্ভর খাতটি এখন অনেকটাই আত্মনির্ভরশীল। বর্তমানে পোল্ট্রি মাংস, ডিম, একদিন বয়সী বাচ্চা এবং ফিডের শতভাগ চাহিদা মেটাচ্ছে বাংলাদেশের পোল্ট্রি শিল্প। সাধারণ গরিব ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষের জন্য কম দামে প্রাণিজ আমিষের যোগান দিচ্ছে এ শিল্প। শিশুর পেশীগঠন ও মেধার বিকাশ, শ্রমজীবী মানুষের শক্তির যোগান দেয়া, সর্বোপরি স্বাস্থ্যবান জাতি গঠনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পোল্ট্রি শিল্প উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। নতুন প্রজন্মের রুচি ও চাহিদার কথা বিবেচনায় নিয়ে এখন দেশেই উৎপাদিত হচ্ছে চিকেন নাগেট, সসেজ, ড্রামস্টিক, বার্গার, সামোসা, মিটবলসহ বিভিন্ন ধরনের মজাদার প্যাকেটজাত খাবার-যা কিছুকাল আগেও বিদেশ থেকে আমদানি করতে হত। বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল (বিপিআইসিসি) এর মতে-২০২১ সালের চাহিদা মেটাতে হলে বছরে প্রায় ১৫০০ কোটি ডিম (প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪ কোটি ১১ লাখ ডিম), ২০ লাখ মেট্রিক টন (দিনে ৫.৫ হাজার মেট্রিক টন) মুরগির মাংস, ৮৫ কোটি ৮০ লাখ (সপ্তাহে ১ কোটি ৬৫ লাখ) একদিন বয়সী মুরগির বাচ্চা এবং বছরে ৬৫-৭০ লাখ মেট্রিক টন ফিড (মাসে ৫ লাখ ৪০ হাজার থেকে ৫ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টন ফিড) উৎপাদন করতে হবে। সার্বিক বিচারে পোল্ট্রি শিল্পে মোট বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে প্রায় হবে ৫৫-৬০ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ বর্তমান বিনিয়োগের সঙ্গে যুক্ত হবে আরও প্রায় ২০-২৫ হাজার কোটি টাকা। কারণ এ ডিম ও মাংস ইন্ডাস্ট্রি ছাড়াও, ব্রিডিং ও হ্যাচারি ইন্ডাস্ট্রি, ফিড ইন্ডাস্ট্রি, লিংকেজ ইন্ডাস্ট্রি, ওষুধ, কাঁচামাল এবং সার্ভিস ইন্ডাস্ট্রি জড়িত। কাজেই এ শিল্পের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে বিশাল এক কর্মযজ্ঞ ঘটতে থাকবে।

আরো খবর...