পুষ্টিকর প্রিন্সেস মাশরুম উৎপাদিত হচ্ছে বাংলাদেশে

কৃষি প্রতিবেদক ॥ প্রিন্সেস মাশরুম নামটা আনকোরা নতুন। মাশরুমটি দেখতে হালকা বাদামি, প্রথমে বাদামি বোতামের মতো মনে হলেও পরিণত অবস্থায় এটি অর্ধ বৃত্তাকার এবং ছত্রাকার আকৃতি ধারণ করে। ছত্রাকার অংশটিকে পাইলিয়াস বলে যা বাদামি বর্ণের আইশ দ্বারা আবৃত থাকে। সুস্বাদু ও ঔষধি গুণসম্পন্ন মাশরুমটি সারাবিশ্বে সমাদৃত মূল্যবান মাশরুম। ঔষধি গুণসম্পন্ন মাশরুমটির উৎপাদন একটু কষ্টকর হওয়ায় বিশ্ববাজারে এটি অত্যন্ত উচ্চমূল্যে বিক্রি হয়। মাশরুমটি চাষের জন্য একটি নির্দিষ্ট আবহাওয়া দরকার হয় এবং অক্টোবর থেকে এপ্রিল এটি জন্মানো সম্ভব। রাতে নিম্ন তাপমাত্রা এবং দিনে অপেক্ষাকৃত বেশি তাপমাত্রা এই মাশরুম উৎপাদনে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। এটি উৎপাদনের জন্য মানসম্মত কম্পোস্ট উৎপাদনের প্রয়োজন পড়ে। মাশরুমটি চাষের জন্য ধান বা গমের খড়ে এক হাজার  কেজি কম্পোস্ট তৈরি করতে হয়।

বাণিজ্যিকভাবে মাশরুমটি উৎপাদনে বিশাল স্থাপনা, মূল্যবান যন্ত্রপাতি, প্রশিক্ষিত জনশক্তি ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রয়োজন হয়। অল্প পরিসরে মাশরুম চাষিরা ৩০০ কেজি কম্পোস্ট তৈরি করে মাশরুমটি উৎপাদন করে। অল্প পরিসরে এই আয়োজনটি ও কম ব্যয় বহুল বা শ্রমনির্ভর কাজ নয়। এ ছাড়া বসতবাড়ির আশপাশে এই কম্পোস্ট তৈরি করা যায় না, কেননা এতে অ্যামোনিয়া গ্যাসের তীব্র গন্ধের জন্য আপনাকে প্রতিবেশী দ্বারা অভিযুক্ত হতে হবে। তাই আমাদের দেশের সাধারণ চাষিদের জন্য সহজ উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের নিমিত্তে নিবিড়ভাবে কাজ করে যাচ্ছেন মাশরুম গবেষক এবং উদ্যোক্তা ড. মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন। প্রিন্সেস মাশরুম উৎপাদনের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে কিছু কৃষি উপকরণ ব্যবহার করে  কোনো প্রকার কম্পোস্ট তৈরি না করে এই বাটন মাশরুম উৎপাদনের কাজটি চলছিল।

তিন বছর ধরে গবেষণা করে তিনি এই মাশরুমের আশাব্যঞ্জক ফলন লাভ করেন। অপরিণত অবস্থায়ই এটির চাহিদা বেশি। পরিণত অবস্থায় এটি ছত্রাকার। তবে এই অবস্থায়ও এটিকে ব্যাঙের ছাতা বলে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা যাবে না। কেননা পরিণত অবস্থায়ও এটি পৃথিবীব্যাপী বাজারজাত হয়। প্রিন্সেস মাশরুম মোটামুটি ক্যালরিমুক্ত এবং দেহ গঠনের জন্য উপযোগী উন্নতমানের প্রোটিন, ভিটামিন-বি, ভিটামিন-ডি, পামিটরেনিক এসিড, লিনোলিক এসিড এবং আরগোস্টেরল সমন্বয়ের এক বিশুদ্ধ অর্গানিক পণ্য। এতে প্রচুর মিনারেল, ফসফরাস, পটাশিয়াম, সেলেনিয়াম এবং অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট রয়েছে।

মাশরুমটির বিটা-ডি গ্লুকান টিউমার এবং ক্যান্সার প্রতিরোধে কাজ করে।  কেমোথেরাপি গ্রহণের সময় এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হ্রাসে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। এ ছাড়া মাশরুমটি ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা কমানো, হেপাটাইটিস রোগের প্রতিষেধক হিসেবে ভূমিকা রাখে। এজন্য প্রাকৃতিক রোগ প্রতিরোধী উপকরণ হিসেবে খাদ্য তালিকায় সারাবিশ্বে এটি মূল্যবান মাশরুম হিসেবে বিবেচ্য। ব্রাজিল, জাপান, চীন, তাইওয়ান, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম এবং ইন্দোনেশিয়ায় এটি বাণিজ্যিকভাবে চাষ হয়।

মাশরুম গবেষক এবং উৎপাদক ড. তাকাতোসি ফোরোমুটো ১৯৬০ সালে সাও পাওলো নামক ব্রাজিলের একটি রাজ্যে এটির সর্বপ্রথম কৃত্তিম উৎপাদনে সফল হন। তিনি ব্যাপক পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য ১৯৬৫ সালে মাশরুমটিকে জাপানে পাঠান। জাপান পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর মাশরুমটির নাম দেন হাইমেতাতসুতাকে, যার অর্থ প্রিন্সেস মাশরুম। গবেষক আনোয়ার জানান, মাশরুমটিকে বিভিন্ন দেশ বিভিন্ন নামে  চেনে। ব্রাজিলিয়ান মাশরুম বলে এর ব্যাপক পরিচিতি আছে। এ ছাড়া আঞ্চলিকভাবে ব্রাজিলে এটিকে বলা হয় কগমেলু ডে ডেউস -যার অর্থ স্রস্টার মাশরুম। পৃথিবীর অনেক  দেশে এটি রয়েল সান এগারিক্স বলে পরিচিত। কেউবা শুধু ঔষধি মাশরুম নামে চেনে। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী মাশরুমটি কাঁচা-শুকনা, পাউডার এবং ক্যাপসুল আকারে সমান জনপ্রিয়। মাশরুমটি আমাদের দেশে লম্বা সময় ধরে চাষের সম্ভাবনা রয়েছে। মাশরুমটি উৎপাদনে আরও গবেষণার প্রয়োজন আছে।

 

আরো খবর...