পল্লী উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনে বাজেট

॥ ড. মিহির কুমার রায় ॥

২০১৮-১৯ অর্থবছরের এ যাবকালের দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাজেট পেশ করেন। ‘সমৃদ্ধ আগামীর পথযাত্রার বাংলাদেশ’- এই শিরোনামে প্রস্তাবিত বাজেটের মূল বৈশিষ্ট্যগুলোর অন্যতম হলো মূল্য সংযোজন করের (ভ্যাট) পরিধি কমিয়ে এনে এর হার সমান রাখা, কর্পোরেট কর কমিয়ে আনা, সামাজিক সুরক্ষার খাত বৃদ্ধি, বেসরকারি চাকরিজীবীদের পেনশন, মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বিজয় দিবস ভাতা, শিক্ষা ও অবকাঠামো খাতে অধিক বরাদ্দ, কৃষি ও পল্লী উন্নয়ন খাতে সর্বাধিক বরাদ্দ, বিনিয়োগ-কর্মসংস্থানে কম গুরুত্ব পাওয়া, সামাজিক সুরক্ষা খাতের পরিধি বৃদ্ধি ইত্যাদি। প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা, আয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৩৯ হাজার ২৮০ কোটি টাকা ও ঘাটতি দেখানো হয়েছে ১ লাখ ২৫ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা। অনুন্নয়ন-উন্নয়ন মিলে কেবল কৃষি খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৭ হাজার ২৫৯ কোটি টাকা যা মূল বাজেটের ৫.৮ শতাংশ এবং গত বছরের বাজেটের চেয়ে শতাংশ হারে ১.৩ কম যা নিয়ে অনেক কৃষি অর্থনীতিবিদ আপত্তি করেছেন বিশেষত পুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থে। গ্রামীণ অর্থনীতির একটি বড় অংশ দখল করে আছে কৃষি খাত যেখানে দেশের মোট জনসংখ্যার ৫৬ শতাংশ তাদের জীবন-জীবিকার জন্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল। তাই এই খাতের উন্নয়নের সঙ্গে দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচন জড়িত যা বাজেট বক্তৃতায় বিশেষভাবে স্থান পেয়েছে। কারণ দেশে আবাদযোগ্য জমি ক্রমাগতভাবে হ্রাস পাওয়ার পরও সরকারের কৃষিবান্ধব নীতি কৌশল ও কর্মসূচি গ্রহণের ফলে কৃষি খাতের উৎপাদন বেড়েছে, কৃষি ভর্তুকি, সার বীজ সেচ সুবিধা, খামার যান্ত্রিকীকরণ, শস্য বহুমুখীকরণ ও বিপণন অব্যাহত রাখার ঘোষণা এসেছে। এরই মধ্যে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে নগদ অর্থ সহায়তা সরাসরি কৃষকের কাছে পৌঁছানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে এবং কৃষি উপকরণ সহায়তা কার্ডধারী কৃষকের তালিকা হালনাগাদ করা হচ্ছে।
কৃষি খাতের টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে বর্তমানে দেশে পরিবেশবান্ধব জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওনোর উপযোগী কার্যক্রমের ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে বর্তমান সরকার, গবেষণার মাধ্যমে উপযুক্ত প্রযুক্তি ও ফসলের জাত উদ্ভাবন এবং হস্তান্তর কাজ চলছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ এলাকার খরা লবণাক্ত তাপ সহিষ্ণু ধান গমের জাত উদ্ভাবনসহ সম্প্রসারণ করা হচ্ছে, অর্থকরী ফসল পাটের বিভিন্ন প্রতিকূলতা সহিষ্ণু জাত উদ্ভাবন, বহুমুখী পাটপণ্য উদ্ভাবনের মাধ্যমে গবেষণা কার্যক্রমে গতিশীলতা এসেছে, মৎস্য খাতের দেশ অনেক এগিয়েছে ইত্যাদি। এবারকার প্রস্তাবিত বাজেটে কৃষি সহায়ক যে পদক্ষেপগুলোর ঘোষণা এসেছে তার মধ্যে রয়েছে- প্রথমত, আমদানি কর চালের দাম বাড়াতে রেয়াতি সুবিধা প্রত্যাহার অর্থাৎ সব ধরনের চাল আমদানিতে শতকরা ২৫ শুল্ক ও সম্পূরক শিল্প শতকরা ৩ ভাগ প্রজোয্য হবে; দ্বিতীয়ত, কৃষি উপকরণ আমদানিতে শুল্ক কর প্রত্যাহার করা হবে; তৃতীয়ত, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত গম, ভুট্টা, আলু ও কাসাভা থেকে উৎপাদিত স্টাচের শুল্কহার যৌক্তিকীকরণ করে আমদানি শুল্ক শতকরা ১৫ ভাগ এবং রেগুলেটরি ডিউটি শতকরা ১০ ভাগ হারে নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে; চতুর্থত, পোল্ট্রি ও মৎস্য ডেইরি ইত্যাদির কৃষির অন্যতম উপখাত দেশের মানুষের আমিষের প্রধান উৎস্যগুলো টেকসই উন্নয়ন ও বিকাশের নিমিত্তে ওই খাতগুলোতে খাদ্যসামগ্রী নানা বিধি উপকরণ আমদানিতে কর ও শুল্ক ক্রমাগত হারে কর ও শুল্ক অব্যাহতি দিয়ে আসছে।
এ সব খাতে প্রদত্ত প্রণোদনা অব্যাহতি রাখার পাশাপাশি পোল্ট্রি ফিডের প্রয়োজনীয়তা উপকরণ সয়াবিন ওয়েল কেক ফ্লাওয়ারের শুল্ক হ্রাসের শতকরা শূন্য ভাগ এবং রেগুলেটরি ডিউটি শতকরা ৫ ভাগ প্রস্তাব করা হয়েছে, পঞ্চমত, তামাক জাতীয় সব পণ্য উৎপাদন ও বিক্রয়ের ওপর উচ্চ হার শুল্ক আরোপিত হয়েছে, ষষ্ঠত, তামাক প্রক্রিয়াজাত পূর্ব রপ্তানি উৎসাহিত করতে তামাকজাত দ্রব্য পণ্যের ওপর আরোপিত শতকরা ২৫ ভাগ রপ্তানি শুল্ক প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে, সপ্তমত, স্থানীয় খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ বিভিন্ন শিল্প যেমন মধু, চুইংগাম ও সুপার কনফেকশনারি চকলেট, বাদাম সিরিয়াল ইত্যাদির প্রতিরক্ষার স্বার্থে এ সব খাদ্য উপকরণ আমদানিতে হ্রাসকৃত শুক্লহার অব্যাহত রেখে খুরচা সামগ্রী সরাসরি বিক্রয়ের জন্য আমদানি শুল্ক হার শতকরা ২৫ ভাগ বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে, সপ্তমত, সামুদ্রিক মৎস্য আহরণপূর্বক রপ্তানির মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রা আহরণ করা হয় তাই এ কাজে ব্যবহার্য বিশেষায়িত ফিশিং নেট আমদানিতে শুল্ক প্রণোদনা প্রদানের প্রস্তাব করা হয়েছে। এখন আসা যাক সরসরি পল্লী উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচন খাতে। বর্তমান সরকারের শেষ বাজেট গ্রামীণ উন্নয়নের দিকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে তেমনি জনকল্যাণে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে সর্বোচ্চ রবাদ্দ দেয়া হয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগকে যা এডিপির ১৪.৬ শতাংশ বা টাকার অঙ্কে ২৫ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা। এই বিভাগের আওতায় রয়েছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশলী অধিদপ্তর যার মাধ্যমে পল্লী অঞ্চলে গ্রামীণ রাস্তাঘাট কালভার্ট ব্রিজ নির্মাণ মেরামত ইত্যাদি তৈরি। অপরদিকে পল্লী এলাকায় দারিদ্র্য বিমোচন কৌশল গুণগত পরিবর্তন আনার প্রস্তাব করা হয়েছে যেমন ক্ষুদ্র ঋণের স্থলে ক্ষুদ্র সঞ্চয়কে উৎসাহিত করতে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে একটি বাড়ি একটি খামার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে যা দারিদ্র্য দূরীকরণের একটি স্থায়ী প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে পল্লী এলাকার দারিদ্র্য জনগোষ্ঠীর জন্য স্থায়ী অর্থয়ন, বিনিয়োগ ও আয়ের সংস্থান হচ্ছে। সরকার আশা করছে এই কার্যক্রমের মাধ্যমে ২০২১ সালের মধ্যে ৬০ লাখ পরিবারকে ৩ কোটি দরিদ্র মানুষ স্থায়ীভাবে দারিদ্র্যমুক্ত হবে। দেশের গ্রামাঞ্চলে পৌর এলাকাগুলোতে রাস্তা কালভার্ট ব্রিজ, গ্রোথ সেন্টার, সাইক্লোন সেল্টার, বিল উন্নয়ন, নিরাপদ পানির উৎস, ড্রেন নির্মাণ, পয়ঃনিষ্কশন সুবিধা সম্প্রসারণ মাধ্যমে গ্রামীণ জনপদে কর্মচাঞ্চল্য ধরে রাখা হচ্ছে। আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট গ্রামাঞ্চলে সড়ক কালভার্টে ৩৫.২ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩৬.৯ শতাংশ উন্নতি করা হবে। প্রস্তাবিত বাজেটে কৃষি ও পল্লী উন্নয়ন খাতে সরকারের সর্বোচ বরাদ্দকে সাধুবাদ জানাই। কিন্তু প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে বাজেট আসে বাজেট যায় কিন্তু গ্রামাঞ্চলে বসবসকারী অগণিত গ্রামীণ পরিবার কৃষক অকৃষক তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন আশানুরূপ হয় না যদিও আগের তুলনায় পল্লী অঞ্চলের রূপান্তর হয়েছে সমাজ কাঠামোতে, অবকাঠমোতে ও মানুষের মূল্যবোধ তথা নৈতিকতায়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় কৃষি ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ায় মূল কারণ কৃষক তার পণ্যের ন্যায্য মূল্য না পাওয়া যেমন গত মৌসুমে তিন দফায় বন্যায় হাওর অঞ্চলসহ সারাদেশে বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১০ লাখ টন এবং এই বছরে বাম্পার ফলন হওয়ায় পরও শুল্কবিহীন চাল ভারত থেকে আমদানি করার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১ কোটি বোরো চাষি। উল্লেখ্য, গত ১ বছরে ৩৭ লাখ টন চাল আমদানি হয়েছে এবং ৪৫ লাখ টন আমদানি প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। যদিও চাল আমাদানির ওপর বর্তমান বাজেটে ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে। এখন বাজেট কাঠামোতে এমন ঘোষণা আসতে পারে না কৃষক তার পণ্য নিয়ে আর কোনো সময় বিপাকে পড়বে না কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না? এটি কেবল শস্যভিত্তিক কৃষির ক্ষেত্রে দেখা যায় যা মৎস্য কিংবা পোল্ট্রির কিংবা ডেইরির ক্ষেত্রে দেখা যা না।
কৃষি উন্নয়ের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন ঘটাতে হলে কৃষকের স্বার্থকে সর্বাগ্রে গুরুত্ব দিতে হবে। এখন আসা যাক পল্লী উন্নয়ন দারিদ্র্য বিমোচনকে কীভাবে ত্বরান্বিত করছে। পল্লী উন্নয়ন একটি ব্যাপক বিষয় যা যেখানে জীবন মান উন্নয়নের সবকিছু উপাদান থাকবে কিন্তু বর্তমানে যে উন্নয়নটুকু দেখা যাচ্ছে তাতে মনে হয় গ্রাম বলতে কিছুই থাকবে না, বিশেষত সুষ্ঠু যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ, গ্যাস প্রাপ্তি তার সঙ্গে যোগ হয়েছে পুঁজি। বিশেষত সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক কর্তৃক মূলধন জোগান, ক্ষুদ্র ঋণের উপস্থিতি, গরিব মানুষের রেমিটেন্স অর্থ এতে দারিদ্র্যের হার দৃশ্যত কমেছে বিগত বছরের তুলনায় এবং দারিদ্র্য নিরসন একটি সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে ধনী-গরিবের বৈষম্য বেড়েছে, গ্রামীণ সমাজের সনাতন কৃষ্টিগুলোতে বিলুপ্ত হয়েছে গেছে, সমবায় প্রতিষ্ঠান একেবারেই ভেঙে পড়েছে, যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবারে রূপান্তির হয়ে গেছে যা এক অন্য রকম সমাজ ব্যবস্থা যার সঙ্গে বাঙালি সংস্কৃতির কোনো সম্পর্ক নেই।
এখন আসা যাক উন্নয়নের গ্রোতে যা সাধারণ প্রক্রিয়ায় ঘটে থাকে বা ঘটছে তার সঙ্গে বাজেটের প্রভাব কি? অবশ্য কারণ আছে এর মাধ্যমে অর্থ বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকান্ডে বিশেষত দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচিতে প্রবাহিত হয় বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। বর্তমানে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ এবং স্থানীয় সরকার বিভাগ পল্লী উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, গবেষণা প্রকল্প প্রণয়ন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি কাজে নিয়োজিত থাকে। কিন্তু বর্তমানে সরকারি কাঠামো থেকে তাদের কার্যক্রম নিয়ে খোদ সরকারের মধ্যে নানা প্রশ্ন জন্ম নিয়েছে। ষাটের দশকের পাকিস্তান একাডেমি ফর রুরাল ডেভেলপমেন্ট (পার্ড) পূর্ব পাকিস্তানের অংশে কুমিল্লায় প্রতিষ্ঠান লাভ করেছিল উপমহাদেশের প্রখ্যাত সমাজ বিজ্ঞানী আইসিএস কর্মকর্তা ড. আকতার হামিদ খানের নেতৃত্বে যিনি ছিলেন জন্মসূত্রে ভারতের আগ্রা জেলার মিরাটের অধিবাসী। তারই প্রয়োগিক গবেষণার ফসল দুস্তর বিশিষ্ট সমবায়, পল্লী পূর্ত কর্মসূচি, থানা সেচ কর্মসূচি ও থানা প্রশিক্ষণ উন্নয়ন কর্মসূচি তখনকার সময়ে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে কুমিল্লা মডেল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে যা বিশ্বস্বীকৃত। পরবর্তীতে এই চারটি প্রায়োগিক গবেষণার ফসল হিসেবে চারটি প্রতিষ্ঠানের জন্ম নেয় যা পল্লী উন্নয়নের পিলার হিসেবে কাজ করেছিল। সময়ের আবর্তে সেই প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের স্বকীয়তা ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে এবং দ্বিস্তরবিশিষ্ট সমবায় কিংবা থানা প্রশিক্ষণ ও উন্নয়ন কেন্দ্রের বাস্তবে কোনো প্রকার অস্তিত্ব পাওয়া দুষ্কর। যদিও সরকারি দপ্তর হিসেবে বাজেটের আওতায় টিকে আছে।
লেখক ঃ অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও ডিন, সিটি ইউনিভার্সিটি।

আরো খবর...