পরীক্ষা সংস্কারে চাই প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগ

॥ কাজী ফারুক আহমেদ ॥

৯ জুলাই এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর থেকে এর বিভিন্ন দিক যেমন- পাসের হার, জিপিএ, কোন শাখায় খারাপ, কোথায় গাফিলতি, তা নিয়ে দৈনিক সংবাদপত্রগুলো বিভিন্ন জনের মতপ্রকাশ অব্যাহত রেখেছে। এর মধ্যে পরীক্ষার্থী, উচ্চমাধ্যমিকে পাঠদানকারী শিক্ষক, উচ্চশিক্ষা স্তরে পাঠদানকারী শিক্ষক, পরীক্ষার্থীর অভিভাবক, শিক্ষা বোর্ড ও শিক্ষা এনজিও প্রতিনিধি সবাই আছেন।

এবারের পাসের হার ও জিপিএ-৫ : দেশের ১০টি শিক্ষা বোর্ডে গড়ে পাসের হার ৬৬.৬৪। তবে কম পাসের হার কয় বছরের মধ্যে সবচেয়ে কত কম, তা নিয়ে মতভিন্নতা রয়েছে। কারও কারও মতে, ১১ বছরের মধ্যে সবচেয়ে নিম্নগামী এবারের ফল। কেউ কেউ মনে করেন, তা ৯ বছরের মধ্যে সবচেয়ে নিম্নগামী। ৭ বছরের মধ্যে ফল সবচেয়ে নিম্নগামী বলার লোকও আছেন।

অন্যদিকে কারও কারও মতে, এবার এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলে বিপর্যয় হয়েছে। আবার কেউ কেউ তা পরিস্থিতির বিবেচনায় স্বাভাবিক মনে করেন। কারও কারও চিন্তা- উত্তীর্ণ পরীক্ষার্থীদের এক-তৃতীয়াংশ পছন্দের প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে পারবে না। এবারের পরীক্ষায় ফলের দিক থেকে শহরের স্কুলের তুলনায় গ্রাম এলাকার ছাত্ররা অনেকটা পিছিয়ে রয়েছে। শুধু ঢাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা জিপিএ-৫ পাওয়া ছাত্রদের মধ্যে ৪০ শতাংশ।

অন্যদিকে দেশের বিভিন্ন সরকারি কলেজে পাসের হার ৫০ শতাংশের নিচে। এর মধ্যে একটি সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ সরকারি কলেজ। অর্ধেকেরও কম শিক্ষার্থী এ বছর এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি থেকে। পাসের হার শতকরা ৪৫.২৫ ভাগ। জিপিএ-৫ পেয়েছে মাত্র দু’জন। জামালপুর জেলার ৮ সরকারি কলেজে এইচএসসি পরীক্ষার ফলও এরকমই। ৮ কলেজ থেকে এবার এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল মোট ৫ হাজার ৩২১ পরীক্ষার্থী। উত্তীর্ণ হয়েছে ২ হাজার ৫৭৫ জন, অকৃতকার্য হয়েছে ২ হাজার ৫৮৬ জন। এ কলেজগুলো বেসরকারি এবং এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠান হলে এরই মধ্যে শিক্ষকদের এমপিও নিয়ে হয়তো কথা উঠত।

কিন্তু সরকারি কলেজে এ ধরনের ফলাফলের দায় কার ওপর বর্তাবে? এতে কি শিক্ষকদের বেতনভাতা-পদোন্নতি প্রাপ্তিতে কোনো ব্যাঘাত হবে? প্রসঙ্গক্রমে এমপিওবঞ্চিত শিক্ষকদের একটি কলেজের পরীক্ষার্থীরা কীভাবে শতভাগ পাস করেছে, তা নিয়ে একটি জাতীয় দৈনিকে ‘শিক্ষকরা বেতন না পেলেও এইচএসসিতে শতভাগ পাস’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদ অনেকের দৃষ্টি কেড়েছে। পনেরো বছর আগে প্রতিষ্ঠিত কলেজটির শিক্ষক-কর্মচারীদের এমপিও নেই। তারপরও শিক্ষকদের নিরলস চেষ্টায় সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে চলেছে যশোরের চৌগাছা উপজেলার জিডিবি আদর্শ কলেজ।

এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় কলেজটির মানবিক ও বাণিজ্য বিভাগের ৮৫ পরীক্ষার্থীর সবাই পাস করেছে। এর মধ্যে মানবিক বিভাগের তিনজন পরীক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে। যশোর শিক্ষা বোর্ডের শতভাগ পাস করা ছয়টি কলেজের মধ্যে এটি একটি। এর আগে ২০১৬ ও ২০১০ সালে শতভাগ পাসের কৃতিত্ব দেখায় কলেজটির শিক্ষার্থীরা। ২০১৫ সালে ৯৮ শতাংশ, ২০১৭ সালে ৯৩ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করে।

এছাড়া অন্যান্য বছরের ফলে কলেজটি ৮০ শতাংশের ওপরে পাস করেছে। এবার জিপিএ-৫ প্রাপ্ত দুই শিক্ষার্থী শারমিন খাতুন ও হৃদয় হোসেন বলেন, আমাদের শিক্ষকদের আন্তরিক প্রচেষ্টায়ই আমরা জিপিএ-৫ পেয়েছি। আমরা এসএসসিতে জিপিএ-৫ না পেলেও স্যারদের আন্তরিকতা আর অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলেই কৃতজ্ঞ। তারা আমাদের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে লেখাপড়া করার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছেন। এ ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হতে পারেনি কেন, এ প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

পরীক্ষার ফল নিয়ে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের কয়েকজন পরীক্ষার্থী, একজন অভিভাবক মা ও একটি বেসরকারি কলেজের অধ্যক্ষের মতামত আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। খারাপ ফলের জন্য প্রশ্নপত্রে ১২টি ভুল এবং কঠিন প্রশ্নকে দুষছেন পরীক্ষার্থীরা। উল্লেখ্য, বরিশালে এবার এইচএসসির ফল গতবারের তুলনায় ভালো হলেও জিপিএ-৫ কমেছে। পরীক্ষার্থীরা এটিকে ফল বিপর্যয় বলছে। আবার অভিভাবকরাও ক্ষুব্ধ।

অভিভাবক আরজু বেগম মনে করেন, ফলে ধস নামার দায় শিক্ষার্থী কিংবা শিক্ষকদের নয়। যারা প্রশ্নপত্র করেছেন, তারাই এজন্য দায়ী। শহরের ইসলামিয়া কলেজের অধ্যক্ষ মহসিন-উল ইসলামের মতে, ‘শিক্ষা বোর্ডের মনিটরিং ব্যবস্থা আরও ভালো হলে ফলও ভালো হতো। তার মতে, কোচিংমুখী শিক্ষা ব্যবস্থার জন্যই দিন দিন পড়ালেখার মান খারাপ হচ্ছে আর শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় খারাপ ফল করছে। এজন্য স্কুল-কলেজগুলোর অভ্যন্তরে এবং বাইরে কোচিং বাণিজ্য বন্ধ করতে হবে। তাহলে ক্লাসে পাঠ নেয়ায় শিক্ষার্থীরা মনোযোগী হবে।’

উল্লেখ্য, ১৯৯৮ সালে ইউএনডিপির এক জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেকেলে এবং অনুপযোগী শিখন পদ্ধতি, বিশেষত শ্রেণীকক্ষে শিক্ষা গ্রহণ প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণের অবকাশ থাকে না। এ পরিপ্রেক্ষিতে ইউএনডিপি, শুধু বহিঃপরীক্ষার ওপর নির্ভর না করে শিক্ষার্থীদের প্রতিষ্ঠানভিত্তিক মূল্যায়নে উৎসাহিত করা প্রয়োজন বলে সুপারিশ করে।

সব পরীক্ষা প্রশ্নব্যাংকের প্রশ্নে : শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ৩ বছরের প্রচেষ্টায় পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, গাইড-বই ব্যবসা বন্ধ ও শিক্ষার্থীদের কোচিংনির্ভরতা কমাতে যশোর শিক্ষা বোর্ডে প্রশ্নব্যাংক তৈরি হয়েছে। জানা গেছে, বোর্ডের আওতাধীন স্কুলের ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত সব পরীক্ষা হবে এ প্রশ্নব্যাংকের প্রশ্ন দিয়েই। আর বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকদের পাশাপাশি এ প্রশ্ন তৈরি করবেন শিক্ষার্থীরাও।

বোর্ড কর্তৃপক্ষ বলছে, এ পদক্ষেপ সফল হলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় দেশের সব বোর্ডে চালু করবে এ পদ্ধতি। অতীতে বি. চৌধুরী শিক্ষামন্ত্রী থাকাকালে প্রশ্নব্যাংক চালু নিয়ে অনেক সমালোচনা হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা যশোর শিক্ষা বোর্ডের সাম্প্রতিক উদ্যোগ অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েছে বলে আশা করা যেতে পারে। এমনিতে শিক্ষাবর্ষ শুরুর পর প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরে এভাবে একের পর এক নতুন নতুন পরিকল্পনার চাপে আছে শিক্ষার্থীরা। এই তিন স্তরে শিক্ষার্থী প্রায় ৪ কোটি ২০ লাখ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে পরীক্ষা ও শিক্ষাপদ্ধতি নিয়ে ইতিবাচক পরিবর্তনের পক্ষে সবাই। কিন্তু এসব সিদ্ধান্ত নির্বাহী আদেশে হলে নানা ধরনের জটিলতা ও দ্বিধাদ্বন্দ্ব সৃষ্টি হতে পারে বলে অনেকে আশঙ্কা করেন।

গত এক দশকে শিক্ষা ব্যবস্থায় বেশকিছু নতুন সিদ্ধান্ত এসেছে। কখনও পরীক্ষা, কখনও বিষয়ের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। মুখস্থ বিদ্যার বদলে শিক্ষার্থীরা বুঝে পড়বে ও শিখবে, এমন উদ্দেশ্য নিয়ে ২০০৮ সালে শিক্ষা ব্যবস্থায় সৃজনশীল পদ্ধতি চালু করা হয়। প্রথমে মাধ্যমিক স্তরে এ পদ্ধতিতে প্রশ্নপত্র করা হয়। কিন্তু সরকারি ও বেসরকারি একাধিক গবেষণা ও জরিপে জানা যাচ্ছে, এখনও প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের প্রায় অর্ধেক শিক্ষক সৃজনশীল পদ্ধতি ভালো করে বোঝেন না এবং এ পদ্ধতিতে প্রশ্নও করতে পারেন না। ফলে শিক্ষার্থীরা শ্রেণীকক্ষে যথাযথ শিক্ষা না পেয়ে নোট-গাইড বা অনুশীলন বই এবং কোচিং-প্রাইভেটের ওপর নির্ভরশীল হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩ শিক্ষকের অভিমত : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের সাবেক পরিচালক ড. ছিদ্দিকুর রহমানের মতে, এবারের এইচএসসির ফল বাস্তবসম্মত। তিনি বলেন, ‘এবারের এইচএসসির ফলের মাধ্যমে আমরা বাস্তবের কাছাকাছি রয়েছি বলে মনে করা যায়। পাসের হার কিংবা জিপিএ-৫ বাড়লে তা নিয়ে উচ্ছ্বাস করে লাভ নেই, যদি না বাস্তবে তার ফল দেখা যায়। আবার এবারের মতো ফলকে ‘খারাপ’ বা ‘নিম্নমুখী’ বলে বুক চাপড়ানোরও কিছু নেই। তবে আমরা ইতিবাচক ও ভালো লক্ষণ দেখছি।

স্বাভাবিকভাবে উত্তরপত্র মূল্যায়নের দিকনির্দেশনা তারই অন্যতম।’ শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন মনে করেন, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে খাতা মূল্যায়ন পদ্ধতি মেধা মূল্যায়নভিত্তিক নয়। ‘ফল যাই হোক না কেন, সেই ফলে শিক্ষার্থীদের শিখন ফল হয়তো কিছুটা প্রতিফলিত হয়েছে। কিন্তু শিক্ষার ফল প্রতিফলিত হয়নি। ছাত্রছাত্রীরা শিক্ষিত হল কি না, জ্ঞান অর্জন করল কি না, সেটি নির্ধারিত হয়নি।’

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ড. মীজানুর রহমান মনে করেন, ‘দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা বিপর্যয়ের কারণ হচ্ছে শিক্ষকের স্বল্পতা এবং নিবেদিত শিক্ষকের অভাব। …আমাদের দেশে ভালো ছাত্রের কোনো অভাব নেই। কিন্তু ভালো শিক্ষকের বড়ই অভাব। …শিক্ষার্থী ফেল করছে। ফেল করাতে বাচ্চাদের কোনো দোষ নেই, এটা অভিভাবকের দোষ। অভিভাবকরা মনে করেন, জিপিএ-৫ বা পরীক্ষায় পাস এগুলোই জীবনের চূড়ান্ত পর্যায়। রেজাল্টভিত্তিক মনোভাব থেকে অভিভাবকদের বেরিয়ে আসতে হবে। তা না হলে কিন্তু আত্মহত্যার পরিমাণ দিন দিন বাড়তে থাকবে।’

এশিয়ার ১২ দেশের পরীক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে ইউনেস্কো : কম্বোডিয়া, চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, জাপান, লাওস, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের পরীক্ষা ব্যবস্থার পর্যালোচনা করে ২০১৭ সালে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। দেশগুলোর অবস্থায় বিভিন্নতা সত্ত্বেও অভিন্ন সমালোচনার বহু বিষয় ওই প্রতিবেদনে তুলে ধরে প্রচলিত ব্যবস্থার উন্নয়নে যে ৫টি পরামর্শ দেয়া হয় তা হল- ১. মূল্যায়ন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ ২. পরীক্ষার চাপ কমানো ৩. বহুধারার, বিভিন্নমুখী, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থী/পরীক্ষার্থীর জন্য অনুকূল ব্যবস্থা চালু ৪. বৃহত্তর পরিধিতে শিক্ষাক্রম মূল্যায়ন ৫. গুণগত মান ও জনআস্থা নিশ্চিতকরণ। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ও তার মূল্যায়ন, পরীক্ষা পদ্ধতি ইউনেস্কো পরিচালিত উপরিউক্ত গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত না হলেও আমাদের পরীক্ষা ব্যবস্থায় কাঙ্খিত সংস্কার আনার ক্ষেত্রে তা যে কাজে আসবে, তাতে সন্দেহ নেই।

শিক্ষাবান্ধব শেখ হাসিনার পরামর্শ : এবারের এইচএসসি পরীক্ষার ফল আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণের সময় পাবলিক পরীক্ষার সময় কমিয়ে পড়াশোনার সময় সাশ্রয় করার পরামর্শ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা যখন পরীক্ষা দিয়েছি, তখন তো আমাদের দুই বেলা করে পরীক্ষা দিতে হতো। সকালে এক পেপার, বিকালে এক পেপার। আমাদের তো দম ফেলার সময়ই থাকত না, সাত দিনে পরীক্ষা শেষ। …১০টা সাবজেক্ট, মাঝখানে দুই দিন ছুটি ধরে আমাদের পরীক্ষা শেষ হয়ে যেত।’

আজকের বাস্তবতায় পরীক্ষার সময় কী করে কমানো যায়, তা খুঁজে দেখার তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, ‘পরীক্ষার সময় আরেকটু কমিয়ে আনার ব্যবস্থা যদি করতে পারেন, তাহলে দেখবেন, ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করবে, পরীক্ষাটাও তাড়াতাড়ি হবে, আর এখানে ওই যে নানা ধরনের কথা প্রচার, অপপ্রচার, তার হাত থেকেও মুক্তি পাওয়া যাবে।’ উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘নিজের পায়ে দাঁড়ানোর আত্মবিশ্বাস থাকতে হবে। যারা অকৃতকার্য হয়েছে তাদের মনোবল হারালে চলবে না। পরবর্তী পরীক্ষার জন্য ভালোভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে। এখন থেকে মনোযোগ দিয়ে পড়লে কৃতকার্য হবে। নিজের ইচ্ছায় পড়াতে হবে।’ অভিভাবকদের শেখ হাসিনা পরামর্শ দেন- ‘ছেলেমেয়েদের বকাঝকা করবেন না। কেন খারাপ করল, তা খুঁজে বের করুন।’

পরীক্ষা সংস্কার অপরিহার্য : এ প্রেক্ষাপটে শিক্ষার্থীর অর্জিত জ্ঞানের মূল্যায়নে আমাদের দেশে যে পরীক্ষা ব্যবস্থা প্রচলিত আছে, তা কতটা কার্যকর, নিরূপণের সময় এসেছে। সমস্যাটিকে খন্ডিত ও বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে সামগ্রিক বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা দরকার। দেশে-বিদেশের উদাহরণ, ব্রিটিশ আমল থেকে আজ পর্যন্ত বিভিন্ন শিক্ষা কমিশনের প্রতিবেদন, সব স্তর ও পর্যায় বিশেষ করে তৃণমূলের শিক্ষক ও অভিভাবকদের অভিজ্ঞতার পর্যালোচনার ভিত্তিতে প্রচলিত পাবলিক পরীক্ষার আদৌ উপযোগিতা আছে কি না বা কতটুকু আছে, তা যাচাই করে একটি যুগোপযোগী জাতীয় পরীক্ষানীতি প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া জরুরি। একই সঙ্গে দেশ-বিদেশের পরীক্ষা সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ, পরীক্ষাবিষয়ক গবেষণা পরিচালনা ও কর্মসূচি গ্রহণ, অভ্যন্তরীণ ও পাবলিক উভয় পরীক্ষার দায়িত্ব পালনকারী শিক্ষক-কর্মচারীদের পর্যায় ও পালাক্রমিক প্রশিক্ষণ প্রদানের কেন্দ্র স্থাপন করা জরুরি। সেই সঙ্গে বোর্ডভিত্তিক না করে জেলা ও উপজেলা ভিত্তিতে আঞ্চলিকভাবে এসএসসি ও এইচএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষাগুলো অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা যায় কি না, ভেবে দেখা যেতে পারে।

বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা হিসেবে এসএসসি ও এইচএসসির মতো দুটি বড় পাবলিক পরীক্ষা সংস্কার ও যদ্দূর সম্ভব ক্রটিমুক্তভাবে গ্রহণ করা যেমন অপরিহার্য, একইভাবে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের নিয়োগ পরীক্ষা, এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি পরীক্ষাও এর সঙ্গে যুক্ত করা আবশ্যক। কেউ কেউ পরীক্ষার ফল স্বাভাবিক বললেও প্রচলিত মূল্যায়ন ব্যবস্থা শিক্ষার্থীর অর্জিত জ্ঞান অথবা মেধা নির্ধারক বলা চলে না। বর্তমান পরীক্ষা ব্যবস্থা ভীতিরও কারণ। এরই মধ্যে এবারের এইচএসসি পরীক্ষার ফলের কারণে ৩ পরীক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে, শিক্ষার্থীর কাম্য বিকাশের অনুকূল পরীক্ষা সংস্কারে সব স্টেকহোল্ডারের যুক্তিসঙ্গত মতামত ও পরামর্শ ধারণ ও সমন্বয় করে সাহসী ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে উদ্যোগ গ্রহণে বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুকন্যাই সবচেয়ে উপযুক্ত মানুষ।

লেখক ঃ জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ প্রণয়ন কমিটির সদস্য

আরো খবর...