নয়া কৃষিনীতি ও ন্যানো প্রযুক্তি

॥ ড. জাহাঙ্গীর আলম ॥

নয়া কৃষিনীতির খসড়ায় অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। গত সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে এ অনুমোদন দেওয়া হয়। এটি জাতীয় কৃষিনীতির তৃতীয় সংস্করণ। এর আগে ১৯৯৯ সালে প্রথমে প্রণীত হয় জাতীয় কৃষিনীতি। এর পর তা পরিমার্জন ও পরিবর্ধন করে ২০১৩ সালে প্রণয়ন করা হয় এর দ্বিতীয় সংস্করণ। সেটাকে আরও হালনাগাদ করে অগ্রসরমান কৃষি প্রযুক্তি ধারণের সুযোগ সৃষ্টি করে প্রণয়ন করা হয় কৃষিনীতির তৃতীয় সংস্করণ। গত মার্চ মাসের ১১ তারিখ বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এক সভায় বিস্তারিত আলোচনা হয় নয়া খসড়াটির ওপর। সেই আলোচনার ভিত্তিতে এটি পরিমার্জন করা হয়। এতে ২২টি অধ্যায় এবং ১০৬টি অনুচ্ছেদ ও উপ-অনুচ্ছেদ রয়েছে। এর উপসংহারে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলা ও উচ্চ কৃষি প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে দিক-নির্দেশনামূলক দলিল হিসেবে বর্তমান কৃষিনীতির রূপরেখা নির্ধারণ করা হয়েছে।

জাতীয় কৃষিনীতির মূল লক্ষ্য হচ্ছে কৃষিজ উত্পাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা অর্জন এবং লাভজনক, পরিবেশ বান্ধব ও টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জন করা। তা ছাড়া কৃষি গবেষণা, শিক্ষার সম্প্রসারণ  ও আধুনিকীকরণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানের দক্ষ মানব সম্পদ গড়ে তোলা, উত্তম কৃষি উত্পাদন ব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে নিরাপদ ফসল উত্পাদন নিশ্চিত করা, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ উত্সাহিত করে কায়িক শ্রম হ্রাস ও সাশ্রয়ী কৃষি ব্যবস্থার প্রচলন করা এবং কৃষি পণ্যের দক্ষ ও কার্যকর বিপণন ব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে কৃষকের ন্যায্য মূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করা ইত্যাদি। এ সকল উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য কৃষি গবেষণা, সম্প্রসারণ, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে ব্যাপক উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা হয়েছে। এছাড়া কৃষি উপকরণ সহজলভ্য করা, পানি সেচের দক্ষতা বৃদ্ধি করা, উন্নত কৃষি যন্ত্রপাতির সম্প্রসারিত ব্যবহার উত্সাহিত করা, প্রাকৃতিক সম্পদের বিজ্ঞান ভিত্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করা, দক্ষ কৃষি বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তোলা, সমবায় ভিত্তিক উত্পাদন ও বিপণনে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা এবং কৃষিখাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

নয়া কৃষিনীতিতে উপকূলীয় কৃষি, হাওর ও জলাভূমির ব্যবস্থাপনা, পাহাড়ি কৃষি, হাইড্রোপনিক কৃষি, সংরক্ষণমূলক কৃষি ব্যবস্থা, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ সেবা প্রদান, উদ্ভাবনী সম্প্রসারণ প্রযুক্তি, প্রযুক্তি ব¬ক স্থাপন, বছরব্যাপী ফল উত্পাদনসহ আরও বেশকিছু বিষয় বিস্তারিতভাবে সংযোজন করা হয়েছে। তা ছাড়া জীব প্রযুক্তি গবেষণা, জলবায়ু পরিবর্তন ও খাত সহিষ্ণু জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। কৃষিতে গুরুত্বপূর্ণ অণুজীব শনাক্তকরণ,  বৈশিষ্ট্যায়ন ও উন্নত প্রকরণ নির্বাচনের কাজে গবেষণাসহ অণুজীবের কার্যকারিতা বৃদ্ধি সম্পর্কিত গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনার অভিপ্রায় ব্যক্ত করা হয়েছে। তা ছাড়া কৃষি ভিত্তিক অণুজীব গবেষণা শিল্প স্থাপনে সংশ্লি¬ষ্ট সকলকে উত্সাহিত করা হয়েছে।

কৃষি উন্নয়নে ন্যানো প্রযুক্তির ব্যবহার এবারের কৃষিনীতির একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন। এটি কৃষি উন্নয়নের বিশেষ করে ফসলের উত্পাদন বৃদ্ধির খুবই অভিনব বৈজ্ঞানিক কৌশল। তবে এ প্রযুক্তিটি বাংলাদেশে এখনো তেমন পরিচিত নয়। সারা পৃথিবীব্যাপী এর ব্যবহারও খুবই সীমিত। এ প্রযুক্তির উদ্ভব বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ্বে। ১৯৫৯ সালে পদার্থ বিজ্ঞানী রিচার্ড ফিওয়াইম্যান এ সম্পর্কে প্রথমে আলোকপাত করেন। ১৯৭৪ সালে নরিও টানিংসুচি এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেন। বিংশ শতাব্দীর আশির দশকে এ প্রযুক্তি বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করে। অতঃপর ২০০০ সালে এটি বিজ্ঞানী, রাজনীতিবিদ এবং ব্যবসায়ীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

ন্যানো প্রযুক্তি হচ্ছে পদার্থের পারমাণবিক নিয়ন্ত্রণ। বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের লক্ষ্যে এটি হচ্ছে পদার্থের ক্ষুদ্রতম ব্যবহার। কোনো পদার্থকে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতম পর্যায়ে রূপান্তরের পর তা নিয়ন্ত্রণের কৌশল হলো ন্যানো প্রযুক্তি। এক ন্যানো অণু পদার্থের এক বিলিয়নের একাংশ মাত্র। ন্যানো প্রযুক্তি পদার্থ বিজ্ঞান, রসায়ন ও জীব বিজ্ঞানকে সমন্বয় করে এক অমিত সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে মানুষের কল্যাণে। এর ব্যবহার হচ্ছে ওষুধ তৈরির কাজে, রোগ শনাক্তকরণে, শিল্প সামগ্রী উত্পাদনে, রণ সামগ্রী উদ্ভাবনে ও কৃষি উপকরণ তৈরির ক্ষেত্রে। বিশেষ করে শিল্প ও রণ সামগ্রী তৈরিতে ন্যানো প্রযুক্তির গুরুত্ব বিবেচনা করে ২০১২ সাল থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ৩.৭ বিলিয়ন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ১.২ বিলিয়ন এবং জাপান ৭৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ করেছে। বর্তমানে পার্শ্ববর্তী দেশে ভারতেও এর গবেষণা কাজ এগিয়ে চলছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ন্যানো প্রযুক্তিকে শিল্প ক্ষেত্রে টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জনের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করছে।

কৃষিতে ন্যানো প্রযুক্তির ব্যবহার চলছে মূলত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক উত্পাদনের জন্য। তা ছাড়া মাটির গুণাগুণ বৃদ্ধি, পানি পরিশোধন, কৌলিতত্ত্ব, প্রজনন ও শনাক্তকরণের ক্ষেত্রে ন্যানো প্রযুক্তি বেশ সহায়ক। এ নিয়ে গবেষণা শুরু হতে পারে বাংলাদেশেও। এ বিষয়ে ইতোমধ্যেই ব্যাপক গবেষণা চলছে ভারতে। আমাদের নয়া কৃষিনীতিতে এর সূচনার বীজ রোপণ করা হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে ফসলের রোগ নির্ণয়, জাতভিত্তিক পুষ্টিচাহিদা নির্ণয় ও পুষ্টি আহরণ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে ন্যানো প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। কৃষিতে ভারী ধাতুর উপস্থিতি শনাক্তকরণ ও শোধনসহ ন্যানো প্রযুক্তির সার ও বালাইনাশক উদ্ভাবনে এ প্রযুক্তিটি ব্যবহার করা হবে। এর আগে বাংলাদেশে ধানসহ বিভিন্ন ফসলে জীব প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়েছে অত্যন্ত সফলভাবে। ভিটামিন সমৃদ্ধ ধান, বিটি বেগুন, লবণাক্ততা ও জলমগ্নতা সহিষ্ণু বিভিন্ন শস্য এবং খরা সহিষ্ণু শস্যের জাত উদ্ভাবনে বেশ পারদর্শিতা দেখাতে সক্ষম হয়েছে এদেশের কৃষি বিজ্ঞানীরা। স্বাধীনতার পর গত ৪৭ বছরে ধানের উত্পাদন বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৪ গুণ।

এবারের জাতীয় কৃষিনীতিতে উত্পাদনের কারিগরি ও প্রযুক্তিগত দিকগুলো ভালোভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু এর আর্থ-সামাজিক দিকগুলো তেমন গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়নি। উদাহরণস্বরূপ কৃষি ভর্তুকির কথা বলা যায়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কৃষি নীতিতে একটি বড় অধ্যায় হলো ভর্তুকি। বর্তমানে ইইউ বাজেটের ৩৯ শতাংশ অর্থ খরচ করা হয় কৃষি ভর্তুকি খাতে। এর ২৮ শতাংশ সরাসরি কৃষি উত্পাদন কাজে নিয়োজিত করা হয়। বাকি ১১ শতাংশ ব্যয় হয় পল্লী উন্নয়নের জন্য। এ ভর্তুকির অধিকাংশ অর্থ কৃষকদের প্রদান করা হয় নগদ সহায়তা হিসেবে। আমাদের জাতীয় কৃষিনীতিতে ভর্তুকি প্রদানের কথা বরাবরই উল্লেখ করা হয়। কিন্তু তার পরিমাণ বা হার নির্ধারণ করা হয় না। এর ফলে কৃষি ভর্তুকির ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত হয় কৃষক। উদাহরণস্বরূপ ২০১১-১২ অর্থ বছরে আমাদের মূল বাজেটের প্রায় ৭ শতাংশ অর্থ খরচ করা  হয়েছিল কৃষি ভর্তুকি খাতে। এবার তা নেমে এসেছে ২ শতাংশে। অপরদিকে একসময় মূল বাজেটের ১০ শতাংশেরও বেশি অর্থ ব্যয় করা হতো বৃহত্তর কৃষিখাতে। বর্তমানে তা নেমে এসেছে ৫.৭ শতাংশে। ফলে কৃষিখাতে বিনিয়োগ হ্রাস পাচ্ছে। সেই সঙ্গে হ্রাস পাচ্ছে কৃষি উত্পাদনের প্রবৃদ্ধির হার। এ ক্রমহ্রাসমান প্রক্রিয়াটি ফসল কৃষিখাতের বেলায় খুবই স্পষ্ট।

কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা জাতীয় কৃষিনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য। কিন্তু এ সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে কিছুই বলা হয়নি। আমাদের কৃষি বিপণন ব্যবস্থায় প্রধান সমস্যা হলো মধ্যস্বত্বভোগীর প্রাধান্য। ফলে বিপণন খরচ ও মুনাফা বেশি। খামার প্রান্তে কৃষি পণ্যের দাম কম। কৃষকের এ দুর্ভোগ চিরায়ত। এ সম্পর্কে ইতিবাচক কাজ করার জন্য কৃষি বিপণন অধিদপ্তর নামে একটি বিভাগ আছে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে। তবে এ সংস্থাটির কার্যক্রম বাড়াতে হবে। কৃষকদের উত্পাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম দেওয়ার জন্য সরকারিভাবে ধান-চাল ও গম সংগ্রহের ব্যবস্থা নেওয়া হয় উত্পাদন মৌসুমে। এ কাজটি করে খাদ্য মন্ত্রণালয়। কিন্তু তাদের এ কার্যক্রমের প্রভাব বাজারে খুবই কম। উদাহরণস্বরূপ এবার বোরো ধান সংগ্রহের জন্য মূল্য নির্ধারণ করা হয় ৯৬০ টাকা প্রতি মণ। গ্রামাঞ্চলে কৃষকের খামার প্রান্তে তা বিক্রি হয়েছে ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকায়। এ ক্ষেত্রে সমস্যা হলো দুটো। প্রথমত কৃষকের নিকট থেকে সরাসরিভাবে ধান-চাল সংগ্রহ করছে না সরকার। খাদ্য বিভাগ তাই চাতালের মালিক ও ব্যবসায়ীদের নিকট জিম্মি থাকে। দ্বিতীয়ত ধান-চাল সংগ্রহের মাত্রা খুবই কম। মোট উত্পাদনের মাত্র ৩-৪ শতাংশ ক্রয় করা হয় সরকারিভাবে। তাই গ্রামাঞ্চলের বাজারগুলোতে এর প্রভাব পরিলক্ষিত হয় না। অপরদিকে বাজারে যখন খাদ্যশস্যের দাম বেড়ে যায় তখন সরকারি সংগ্রহ থেকে অপ্রতুল মাত্রায় হস্তক্ষেপ করে ভোক্তাদের জন্য পণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা যায় না। এ সকল বিষয়ে পরিষ্কারভাবে দিক-নির্দেশনা থাকা  দরকার জাতীয় কৃষিনীতিতে।

বর্তমানে বাংলাদেশে যে কৃষিনীতি প্রণীত হচ্ছে তা মূলত উত্পাদন বৃদ্ধির বিস্তারিত কারিগরি পথ নকশা। কৃষি নীতির মূল  উপাদান কৃষি ভর্তুকি, বিনিয়োগ ও কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য প্রদান সম্পর্কে প্রয়োজনীয় দিক- নির্দেশনা এতে নেই। তবে বিভিন্ন সময়ে সংকট দেখা দিলে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমে তার সমাধান খুঁজে নিতে কোনো অসুবিধা হবে না। বর্তমান সরকার কৃষি-বান্ধব সরকার। কৃষি ক্ষেত্রে অদ্যাবধি যে সকল অর্জন দেশবাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে তা সম্ভব হয়েছে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই। জাতীয় কৃষিনীতি প্রণয়ন ও তা পরপর দুবার হালনাগাদ করণের কাজটিও সম্পন্ন হয়েছে এই সরকারের আমলেই। বর্তমান কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী এ জন্য ধন্যবাদার্হ। কৃষিতে স্বয়ম্ভর হওয়ার জন্য দরকার ক্রমবর্ধমান হারে বিনিয়োগ। এটি নিশ্চিত করা সম্ভব না হলে ঈপ্সিত লক্ষ্য অর্জন হবে সুদূর পরাহত। এর জন্য সরকারি খাতকে খুবই কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে কৃষি মন্ত্রণালয়কেই। জাতীয় কৃষিনীতি তার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবৃতি। আমরা এর সাফল্য কামনা করি।

লেখক ঃ কৃষি অর্থনীতিবিদ

আরো খবর...