নির্বাচন কতটুকু অবাধ হবে

॥ বিভুরঞ্জন সরকার ॥

নির্বাচনের আর মাত্র দুই সপ্তাহ বাকি। নির্বাচনী প্রচার আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে ১০ ডিসেম্বর। শুরুটা খুব ভালো হয়েছে বলা যাচ্ছে না। নোয়াখালী এবং ফরিদপুরে প্রতিপক্ষের হামলায় আওয়ামী লীগের দুজন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামের গাড়িবহরে হামলা হয়েছে ঠাকুগাঁওয়ে। নোয়াখালীতে মওদুদ আহমদের নির্বাচনী সভা পন্ড করে দেয়া হয়েছে। এ রকম ঘটনা না কমে বরং বাড়ছে। উৎসবমুখর পরিবেশ দেশের কোথাও কোথাও আছে। অনেক জায়গায় নেই।  বিএনপি প্রার্থীরা সেভাবে মাঠে নামতে পারছেন না। কোনো কোনো এলাকায় আওয়ামী লীগের বাধার কারণে, কোথাও বাধা দিচ্ছে পুলিশ। গ্রেপ্তার-হামলা-বাধা ভাঙচুরের কারণে বিএনপি এবং তার মিত্ররা ঘরে বসে আছে। নির্বাচনী মাঠ পুরো আওয়ামী লীগের দখলে। এবার নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হচ্ছে। বাধা-প্রতিবন্ধকতার মুখেও শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে থাকার ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি। কিন্তু নির্বাচন কতটুকু অবাধ ও সুষ্ঠু হবে সে প্রশ্ন অনেকের মধ্যেই দেখা দিচ্ছে। হামলা-মামলার ঘটনা অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি সংঘাতময় হয়ে ওঠার আশঙ্কাই বেশি। আর ভোটের দিনের আগেই যদি পরিস্থিতি অশান্ত হয়ে ওঠে তাহলে ভোটাররা ভোট কেন্দ্রে না-ও যেতে পারেন। ভোটার উপস্থিতি কম হলে নানা ধরনের অনিয়মের সুযোগ তৈরি হবে। সেই জন্যই পরিস্থিতির যেন আরো অবনতি না ঘটে সেদিকে নির্বাচন কমিশনের সতর্ক হওয়া উচিত। যারা পানি ঘোলা করতে চাইছে তাদের কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা দরকার। বিএনপি এবং তার সঙ্গী ২০ দলীয় জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতারা মিডিয়ার সামনে বড় বড় কথা বলছেন। তাদের পক্ষে গণজোয়ার তৈরি হওয়ার দাবি করছেন। সরকারের সময় শেষ বলে মুখরোচক বক্তৃতা করছেন। কিন্তু সবাই সমানভাবে উদ্যোগী হয়ে মাঠে নামছেন না। রাজধানী ঢাকাতে বিএনপি প্রার্থীদের খুঁজে পাওয়া যায় না। রাজধানীতে নৌকার পক্ষে স্লোগান শোনা গেলেও ধানের শীষের পক্ষে কোনো তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না। ঢাকার পনেরো আসনে প্রার্থী মনোনয়নেও বিএনপি খুব দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছে বলে মনে হয় না। ঢাকায় বেশ কজন প্রার্থী আছেন যাদের সাধারণ মানুষের মধ্যে তেমন পরিচিতি নেই। তারপরও আশার কথা এটাই যে বিএনপি নির্বাচনে আছে। নির্বাচন কতটুকু অবাধ ও সুষ্ঠু হবে সেটা অনেকাংশে নির্ভর করে নির্বাচন কমিশনের ওপর। কিন্তু কমিশনের ওপর অনেকেরই আস্থা নেই। কমিশনের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক আছে। তবে রিটার্নিং অফিসার কর্তৃক প্রার্থিতা বাতিল হওয়া অনেক বিএনপি প্রার্থী কমিশনে আপিল করে প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন। সে জন্য বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল কমিশনকে ধন্যবাদও জানিয়েছেন। এই ধন্যবাদ আবার ফিরিয়ে নেয়ার পরিস্থিতি তৈরি হবে কি না তা নির্ভর করবে কমিশনের ওপরই। হামলা-আক্রমণের ঘটনায় কমিশনের ভূমিকায় বিএনপির সন্তুষ্ট হওয়ার কারণ দেখা যায় না। নির্বাচন নিয়ে মানুষের মন থেকে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দূর করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। সরকারের উচিত কমিশনকে সর্বোতভাবে সহযোগিতা করা। নির্বাচনের ফলাফল অনেকটা পূর্বনির্ধারিত বলে মনে করা হচ্ছে। অর্থাৎ আওয়ামী লীগই আবার বিজয়ী হবে, শেখ হাসিনাই প্রধানমন্ত্রী হবেন- এটা অনেকেই বিশ্বাস করেন। বিএনপিও সম্ভবত এটাই মনে করে। এবারের নির্বাচনে তাদের লক্ষ্য জয়লাভ নয়, তাদের লক্ষ্য অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা এবং নির্বাচনকে যতভাবে পারা যায় বিতর্কিত করা। একটি বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে শেখ হাসিনা টানা তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হলে তার বিরুদ্ধ আন্দোলন করা সহজ হবে মনে করেই বিএনপি অগ্রসর হচ্ছে। তবে বিএনপির সবাই একমত একপথ হয়ে চলছেন মনে করারও কোনো কারণ নেই। বিএনপিতে নির্বাচনে অংশ না নেয়ার পক্ষে শক্তিশালী মতো আছে। পরাজিত হওয়ার জন্য নির্বাচনে গিয়ে নির্বাচনকে বৈধতা দেয়া ঠিক না বলে বিএনপির যারা মনে করেন, তারা এখন নানাভাবে চেষ্টা করবেন নির্বাচন ভুল করতে। এই ব্যাপারটিকেও বিবেচনায় রাখতে হবে। বিএনপিকে স্বাভাবিক প্রচার-প্রচারণায় অংশ নিতে না দিলে দলের ভেতরের নির্বাচনবিরোধী অংশ তার সুযোগ নিতে পারে। কাজেই নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করার দায়িত্ব নিতে হবে অবশ্যই নির্বাচন কমিশনকে। সব বিবেচনাতেই আগামী নির্বাচনে সুবিধাজনক অবস্থায় আছে আওয়ামী লীগ। বিভিন্ন জনমত জরিপেও দেখা যাচ্ছে, আওয়ামী লীগই এগিয়ে আছে। আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় আসছে এ নিয়ে সন্দেহ কেবল বিএনপির সমর্থক-প্রচারকদের মধ্যে। অন্য কারো তেমন সংশয় আছে বলে মনে হয় না। সে জন্যই আওয়ামী লীগের উচিত হবে নির্বাচনকে অবাধ ও সুষ্ঠু করার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনকে সহযোগিতা করা। বিএনপিকে মাঠছাড়া করে যেনতেন উপায়ে জয় ছিনিয়ে আনার কোনো প্রয়োজন নেই। মানুষের বিবেচনাবোধের ওপর আস্থা রাখতে হবে। শক্তি প্রয়োগ করে বিএনপিকে বাধা দিতে গেলে তাতে বরং বিএনপির প্রতি মানুষের সহানুভূতি তৈরি হবে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ভোটারদের বাড়ি বাড়ি যেতে হবে। একদিকে সরকারের সাফল্যের কথা যেমন তুলে ধরতে হবে, অন্যদিকে তেমনি দলের কারো আচার-আচরণের কারণে মানুষ কষ্ট পেয়ে থাকলে, রুষ্ট হলে তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে। মানুষকে জয় করতে হবে বিনয় ও শিষ্টাচারের মাধ্যমে, ভয় দেখিয়ে নয়। বিএনপিকে কেন ভোট দেয়া উচিত নয় তা তথ্য ও যুক্তি দিয়ে বুঝিয়ে বলতে হবে। বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় এলে দেশের অবস্থা কেমন হয় তা তাদের বিগত শাসনামলের বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরেই ব্যাখ্যা করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ বিরোধিতাকারী দল জামায়াতে ইসলামীকে এবার বিএনপি দলীয় প্রতীক দিয়ে নির্বাচন করার বৈধতা দিয়েছে। বিএনপি একদিকে দাবি করে তারা মুক্তিযোদ্ধার দল, অন্যদিকে জামায়াতের জন্য তাদের অপরিসীম দরদ। বিএনপি গণতন্ত্রের কথা বলে কিন্তু ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনাও ঘটায়। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাসহ দলের নেতাদের হত্যার এমন জঘন্য পরিকল্পনাকারী হিসেবে বিএনপিকে যতটা প্রশ্ন ও ঘৃণার মুখে পড়া উচিত ছিল তা তারা পরেনি। বিএনপি দুর্নীতির বিরুদ্ধ বলে। কিন্তু তাদের শাসনামলে সংঘটিত দুর্নীতির ব্যাপারে মুখ খোলে না। বিদ্যুৎ না দিয়ে খাম্বা বাণিজ্য করেছে। হাওয়া ভবনের লুটপাটের কাহিনী সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে। বইও বেরিয়েছে। আওয়ামী লীগের কর্মীদের চোখ-কান খোলা রাখতে হবে। সতর্ক থাকতে হবে। নির্বাচনকে বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ করার লক্ষ্য নিয়েই বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। তারা নানা ধরনের উসকানিমূলক কথা বলবে, অসত্য প্রচারণা চালিয়ে উত্তেজনা ছড়াতে চাইলেও তাদের ফাঁদে পা দেয়া চলবে না। প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদা নির্বাচন নিয়ে তৃতীয় কোনো শক্তির ষড়যন্ত্র আছে কিনা তা খতিয়ে দেখার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ২০১৪ সালের নির্বাচনের অবস্থা ভুলে গেলে চলবে না। তখন ভয়ঙ্কর অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। তখন মাঠে সব বাহিনী ছিল। সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি ছিল। তবু শত শত মানুষ নিহত হয়েছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভস্মীভূত হয়েছে। সেই ঘটনা আলোকে এবারের নির্বাচন প্রস্তুতি রূপরেখা ও কৌশল অবলম্বল করা প্রয়োজন। নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর পরস্পর মুখোমুখি অবস্থান মানুষকে আশাবাদী করে না।

বিভুরঞ্জন সরকার : সাংবাদিক ও লেখক।

 

 

 

আরো খবর...