নির্বাচনী ইশতেহারের মূলে থাকতে হবে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ

॥ ড. আতিউর রহমান ॥

দারিদ্র্য ও অতিদারিদ্র্যের হার প্রতি বছর কমছে। অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করে জাতিসংঘের এসডিজি লক্ষ্যসমূহ যথাসময়ে পূরণে বর্তমান সরকার যথেষ্ট পারদর্শিতা দেখাচ্ছে। অন্যান্য রাজনৈতিক দলও নিশ্চয় এর পক্ষে অঙ্গীকার করতে পারে। তবে আসন্ন নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোর নেতার কাছে আমাদের প্রত্যাশা তারা যেন তাদের ইশতেহারের মূল ভাবনায় ‘বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ ও উন্নত বাংলাদেশ’কে সবচেয়ে বেশি বিবেচনায় রাখে।

আগামী ৩০ ডিসেম্বর একাদশতম জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনের প্রাক্কালে চলছে নানা আয়োজন। রাজনৈতিক দলগুলো এখন চূড়ান্ত মনোনয়ন নিয়ে ব্যস্ত। এর মধ্যে চলছে ইশতেহার তৈরির কাজ। আনুষ্ঠানিকভাবে দলগুলো স্ব-স্ব ইশতেহার ঘোষণা করবে। ইতোমধ্যে  ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ অনানুষ্ঠানিকভাবে বলেছে তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে কী কী থাকবে এবং নতুন কী কী যুক্ত হতে যাচ্ছে। তরুণ প্রজন্মকে আকর্ষণ করার মতো ইশতেহার তৈরির নির্দেশনা দিয়েছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। ঐক্যফ্রন্টও বলেছে তাদের ইশতেহারে কী কী থাকবে। জাতীয় পার্টি, জাসদ, সিপিবিসহ অন্য দলগুলোও ইশতেহারের কাজ করছে।

নিঃসন্দেহে উন্নয়নই এবারের নির্বাচনে প্রধান ইস্যু হতে যাচ্ছে। ক্ষমতাসীনরা বলছেন সারাদেশে অবকাঠামো খাতে ব্যাপক উন্নয়ন ঘটেছে। সামাজিক উন্নয়ন ঘটিয়ে সাধারণ মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে বিরাট ভূমিকা তারা রেখেছেন। বিরোধীরা বলছেন তা সত্ত্বেও সুশাসনের ঘাটতি হয়েছে। উভয়পক্ষই বলছেন বৈষম্যও বেড়েছে। এমনি এক পরিপ্রেক্ষিতে বছর শেষে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই নির্বাচনের আগ দিয়ে সব দল/ফ্রন্ট তাদের সাধ্যমতো প্রতিশ্রুতির বহর সাজিয়ে জনগণের সামনে তাদের ইশতেহার নিয়ে উপস্থিত হবে। এসব ইশতেহারে অনেকাংশেই প্রায় একই ধরনের জনমুখী প্রতিশ্র“তি দেয়া হবে। বিশেষ করে সুশাসন, গণতন্ত্রায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন, দারিদ্র্য নিরসন, বৈষম্য দূরীকরণ, সবুজ অর্থনীতির বিকাশ, তরুণ প্রজন্মের জন্য গুণমানের শিক্ষা, দক্ষতা, উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ সৃষ্টিসহ নানা ধরনের অঙ্গীকার। তবে আওয়ামী লীগ যেহেতু এক দশক ধরে একটানা দেশ পরিচালনা করেছে তাই তাদের ইশতেহারে দৃশ্যমান উন্নয়ন অভিযাত্রার কথা বেশি করেই থাকবে। থাকাটাই স্বাভাবিক।

আমরা সবাই একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধের ফসল বাংলাদেশের নাগরিক। আমরা বাংলাদেশের জনগণ, ১৯৭১-এর মার্চ মাসের ২৬ তারিখে স্বাধীনতা ঘোষণা করে ‘জাতীয় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রামের’ মাধ্যমে স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত করেছি। স্বাধীনতার এই ঘোষণা দিয়েছিলেন আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সন্নাস, মাঝি, সমশের গাজী, সন্দ্বীপ, কৃষক-তন্তুবায়, গারো, চাকমা, নীল চাষি, লবণ চাষি ও রেশম চাষিদের, রংপুর, বরিশাল ও ময়মনসিংহের বিদ্রোহ, সাঁওতাল বিদ্রোহ, সিরাজগঞ্জ কৃষক বিদ্রোহ, তেভাগা আন্দোলন এবং পরবর্তী সময়ে ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলন, সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, ছেষট্টির ছয়-দফা আন্দোলন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাবিরোধী আন্দোলন, ঊনসত্তরের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের সশস্ত্র প্রতিরোধ ও যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ঐতিহাসিক ওই সব সাহসিক বিদ্রোহের মতোই কৃষক, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের ব্যাপক অংশগ্রহণে সম্পন্ন হয় আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তি শব্দটি বারবার উচ্চারণ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু একাত্তরের ৭ মার্চ এবং অসহযোগের দিনগুলোতে। আর সে কারণেই বাহাত্তরের সংবিধানের মূল প্রস্তাবনায় উল্লেখ ছিল যে, ‘আমরা অঙ্গীকার করিতেছি যে, সব মহান আদর্শ আমাদের বীর জনগণকে জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের আত্মনিয়োগ ও বীর শহীদদিগকে প্রাণোৎসর্গ করিতে উদ্বুদ্ধ করিয়াছিল- জাতীয়বাদ সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার সেই সব আদর্শ এই সংবিধানের মূলনীতি হইবে।’ সংবিধানের এই মূলনীতির আলোকেই অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের কৌশলের প্রতিফলন সব দলের ইশতেহারে ঘটবে বলে সেই প্রত্যাশা করছি। একই সঙ্গে সাম্যভিত্তিক সমাজ ও অর্থনীতির বিকাশে সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে বর্ণিত ‘রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি’সমূহ (অনুচ্ছেদ ৯-২৫) মাথায় রেখে মুক্তিযোদ্ধা জনগণের আকাঙ্খা মতো আগামীর বাংলাদেশ পরিচালনার অঙ্গীকার দলসমূহ নিশ্চয় করবে। এই মূলনীতিতেই শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসন, খাদ্য নিরাপত্তাসহ জনগণের মৌলিক মানবাধিকারসমূহ পরিচালনের নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে। আশা করি সব নির্বাচনী ইশতেহারে মুক্তিযুদ্ধের এই স্পিরিটের প্রতিফলন ঘটবে।

স্বাধীন বাংলাদেশের সুবর্ণজয়ন্তী (২০২১) ও জাতির পিতার জন্মের শতবার্ষিকী (২০২০) উদযাপন করতে চাই জাঁকজমকের সঙ্গে। এই দুটো ‘মাইলস্টোন’ই নির্ধারণ করবে আমরা মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশের পক্ষে রয়েছি কিনা। তাই আসন্ন নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলসমূহ জাতির পিতার জন্মবার্ষিকী ও তাঁর সৃষ্ট বাংলাদেশের পঞ্চাশ বছর- এই দুটো উৎসব উদযাপনের মাধ্যমে জাতীয় মৌল আকাক্সক্ষার সঙ্গে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে যুক্ত করার এই সুযোগ নিশ্চয় হাতছাড়া করবে না। দেশপ্রেমিক রাজনীতিকরা অবশ্যি এই সুযোগ লুফে নেবেন বলে আমরা প্রত্যাশা করতেই পারি।

সংবিধানের মূলনীতির আলোকে অন্তর্ভুক্তিমূলক যে উন্নয়নের আকাঙ্খা গত এক দশক ধরে আমাদের দীর্ঘমেয়াদি ও মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনায়, বার্ষিক বাজেটে, ষান্মাষিক মুদ্রানীতি প্রতিফলিত হতে দেখেছি তার ধারাবাহিকতা নিশ্চয় কাম্য। সে জন্য চাই গতিময় অর্থনীতি এবং সামাজিক পাটাতনের নিচের দিকের মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য আরো সুস্পষ্ট নীতি অঙ্গীকার। আর এসব অঙ্গীকার পূরণ করতে হলে চাই বাড়ন্ত এবং স্থিতিশীল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। রাষ্ট্র এই প্রবৃদ্ধির জন্য নিজে যেমন বড় বড় প্রকল্পে বিনিয়োগ করবে, তেমনি আবার ব্যক্তি খাতকেও উপযুক্ত ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ সৃষ্টি করতে সাহায্য করবে। সে জন্য যেসব মেগা-প্রকল্প ইতোমধ্যে গ্রহণ করা হয়েছে সেগুলোর সময়মতো সফল বাস্তবায়ন অপরিহার্য। নিঃসন্দেহে বিগত বছরগুলোতে বেশকিছু মেগাপ্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে (যেমন- পদ্মা সেতু, চারলেনের সড়ক, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, ফ্লাইওভার, রেল, পায়রা বন্দর, কক্সবাজার বিমানবন্দর, কর্ণফুলী টানেল, রূপপুর আণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, মাতারবাড়ি বিদ্যুৎ প্রকল্প, মেট্রোরেল, একশটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ইত্যাদি)। এসব একল্প যথাসময়ে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে বাংলাদেশের চেহারাই বদলে যাবে। পুরো দেশের অর্থনীতি এক অভিনব রূপ গ্রহণ করবে। তাই প্রত্যেকটি দলের কাছেই আমাদের প্রত্যাশা থাকবে এসব বড় বড় প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে যেন কোনো রকম বাধা না পড়ে। কেননা এসবের বাস্তবায়নের সঙ্গে এ দেশের অর্থনীতি ও সমাজে ব্যাপক রূপান্তর ঘটবে। এইচবিসি তার ২০১৮ সালের ‘বিশ্ব প্রতিবেদনে’ বলেছে যে ২০৩০ সাল নাগাদ বাংলাদেশ পৃথিবীর ২৬তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ হবে। তখন আমাদের অর্থনীতির আকার হবে ৭০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। গড়ে ৭.১% প্রবৃদ্ধির হার হিসেবে নিয়ে অর্থনীতির এই আকার প্রক্ষেপণ করা হয়েছে। আমরা তো স্বপ্ন দেখছি আমাদের প্রবৃদ্ধির হার এর চেয়ে ঢের বেশি হবে। তাই দলগুলো যেন এসব প্রকল্পের ধারাবাহিকতার প্রতিশ্র“তি দেয় তার প্রত্যাশা করছি।

দুই. সবুজ অর্থনীতি : এ কথা তো অস্বীকার করার উপায় নেই যে সারা বিশ্বই আজ জলবায়ু পরিবর্তনের সংকট মোকাবেলায় একাট্টা। বিশেষ করে ২০১৫ সালের শেষ দিকে প্যারিস জলবায়ু চুক্তির পর বিশ্বজুড়েই এই নৈতিক সমঝোতা অর্জিত হয়েছে। তাই আমাদেরও নিম্ন কার্বন তথা সবুজ অর্থনীতি অর্জনের অঙ্গীকার করার প্রয়োজন রয়েছে। আশা করছি, দলগুলো তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে সবুজ অর্থনীতির পক্ষে জোরালো অবস্থান নেবে। সে জন্য যে ধরনের দূরদর্শিতা, জীবন থেকে শেখা ও জলবায়ুর আঘাত সহিষ্ণু সব কর্মকান্ডকে নতুন করে সাজানো, সরকার, সমাজ ও ব্যক্তি খাতের মধ্যে প্রয়োজনীয় কোয়ালিশন, সম্পদের পুনঃবণ্টন, শিল্পায়নে উপকরণ দক্ষ পদ্ধতি গ্রহণ, সবুজ অর্থায়ন, সমাজ ও সংস্কৃতির নয়া ভাবনার উৎসারণসহ নানামাত্রিক পথ-নকশা চিহ্নিত করার মতো সৎসাহস নিশ্চয় দলগুলো তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে প্রদর্শন করবে। সে জন্য আমরা কয়েকটি বিষয়ে দলগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারি :

১. আগামী দিনের সব পরিকল্পনা, বাজেট, বিনিয়োগ, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার যেন আমরা দীর্ঘমেয়াদি ব-দ্বীপ-২১০০ পরিকল্পনার আলোকে করতে পারি সেই অঙ্গীকার কাম্য। এভাবে কৌশলগত পরিকল্পনা ও বাজেট করতে পারলে জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জসমূহের উৎসগুলোকে মোকাবেলা করতে পারব এবং জলবায়ু-সহায়ক বিনিয়োগ ও ভোগ নিশ্চিত করতে পারব। জনজীবনে এর ব্যাপক ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

২. সবুজ অর্থনীতির জন্য যে সবুজ বিনিয়োগ চাই এর উৎস হতে হবে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোক্তারা। তাদের অর্থায়নের জন্য বাজেটে যেমন বরাদ্দ ও নীতি প্রণোদনা থাকতে হবে, তেমনি আর্থিক খাতকেও সবুজ মানসিকতার অধিকারী হতে হবে। রাজস্বনীতিকে এমনভাবে সাজাতে হবে যাতে করে উদ্যোক্তারা সবুজ উদ্যোগে উৎসাহী হন। কার্বন ট্যাক্স চালু করে আমরা সনাতনী উৎপাদনকে নিরুৎসাহিত করতে পারি। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় আমরা যদি যারা সোলার প্যানেল থেকে বিদ্যুৎ সংগ্রহ করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করবে তারা ওই গ্রিড থেকে প্রাপ্ত বিদ্যুতের দেয় দামের চেয়ে অন্তত ২৫% বেশি পাবে। এমন প্রণোদনা পেলে প্রত্যেক বাড়ির ছাদে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই বিদ্যুতের প্যানেল উঠে যাবে। সরকারকে সে জন্য নেট-মনিটারিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে। এ রকম প্রণোদনা বর্জ্য সংগ্রহে, সোলার মিনি গ্রিড স্থাপন, বায়োগ্যাস উৎপাদন, ভার্মিসার উৎপাদনসহ নানা সবুজ উদ্যোগেই দেয়া যেতে পারে। জাতীয়ভাবে আমাদের পরিকল্পনা গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে যে আমরা ধীরে ধীরে কয়লা, ডিজেল, গ্যাস থেকে সনাতনী জ্বালানি উৎপাদন থেকে সবে এসে সবুজ জ্বালানি উৎপাদনে মনোনিবেশ করব। সে জন্য আমাদের জাতীয় ‘রোডম্যাপ’ তৈরি করতে হবে। সুইডেন, ডেনমার্ক, জার্মানির মতো দেশ ২০৩০ সাল নাগাদ অর্ধেক জ্বালানি সবুজ করবে। ভারতও অনুরূপ পরিকল্পনা করছে। আমরা কেন পারব না?

৩. সবুজ উদ্যোক্তাদের জন্যে সাশ্রয়ী মূল্যে অর্থায়নের জন্য এরই মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক বেশ কিছু সুদূরপ্রসারী নীতি গ্রহণ করেছে এবং ব্যাংকগুলোকে উৎসাহিত করছে। ব্যাংকগুলো এখন পরিবেশ ও সামাজিক ঝুঁকি দেখেই অর্থায়ন করে। সবুজ উদ্যোক্তা তৈরির জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক সবুজ পুনঃঅর্থায়নের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। পঞ্চাশটির মতো সবুজ পণ্য ও সেবা তৈরির জন্য এ অর্থ ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে দেয়া হচ্ছে। সবুজ ইট তৈরির জন্য এডিবির সহায়তায় আলাদা সবুজ তহবিল তৈরি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বস্ত্র ও চামড়া খাতের সবুজায়নের জন্য দুশ মিলিয়ন ডলারের আরেকটি তহবিল সৃষ্টি করেছে। রাজনৈতিক দলগুলো তাই সহজেই সবুজ বিনিয়োগের অঙ্গীকার তাদের ইশতেহারে করতে পারে। এ ছাড়াও ইডকল, পিকেএসএফ নানা ধরনের সবুজ অর্থায়নের সৃজনশীল উদ্যোগ হাতে নিয়েছে। এসব সুযোগ গ্রহণের অঙ্গীকারও দলগুলো করতে পারে।

৪. বিগত কয়েক বছরে পাট শিল্পের বড় ধরনের উজ্জীবনের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে ‘বায়ো-ডিগ্রেডেবল’ প্যাকেজিং বস্তু ছাড়া তারা কোনো রপ্তানি পণ্য গ্রহণ করবে না। আমাদের বিপুল পরিমাণের বস্ত্র রপ্তানির জন্য এমন প্যাকেজিং পণ্য তৈরি করা সম্ভব পাট থেকে। এরই মধ্যে বাংলাদেশ সরকার ‘সোনালি ব্যাগ’ নামের সবুজ ব্যাগ তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। ব্যক্তি খাতও এমন সবুজ পলিব্যাগ উৎপাদনে উৎসাহ দেখাচ্ছে। এসব ব্যাগ রপ্তানি করেও আমরা বিপুল বিদেশি মুদ্রা অর্জন করতে পারব। তাই আমাদের দলগুলো সহজেই অঙ্গীকার করতে পারে যে পাটের সোনালি দিন ফিরিয়ে আনতে এই সবুজ উদ্যোগগুলো তারা পর্যাপ্ত নীতি সমর্থন দেবে।

৫. আমরা পুরো দেশটাকেই নগরে পরিণত করতে চাই। সে জন্য বড় বড় শহরকে যেমন সবুজ নগরী করতে চাই, তেমনি গ্রামগুলোতেও সবুজ নগরের সুবিধাগুলো দিতে চাই। তাই স্মার্ট নগর ও স্মার্ট গ্রাম নির্মাণের অঙ্গীকার নিশ্চয় আমাদের দলগুলো করতে পারে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এরই মধ্যে বলেছেন যে আমাদের গ্রামগুলোকেও পরিকল্পিত নগর হিসেবে গড়ে তোলা হবে। অন্য রাজনীতিকরাও এমন অঙ্গীকার নিশ্চয় করতে পারেন। তবে তা হতে হবে নিম্ন-কার্বন নগরায়ন। আমাদের ঢাকা শহরে যানজট লেগেই আছে। এক্ষুনি কার্বন-নির্গমন রোধকল্পে এবং নাগরিক যাতায়াত স্বস্তিদায়ক করতে পাতাল রেল নির্মাণের অঙ্গীকার দলগুলোর ইশতেহারে প্রতিফলন ঘটানোর আহ্বান জানাচ্ছি।

৬. একশটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ার যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে তার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে যেন সবুজায়ন দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয় সেই প্রত্যাশাই করছি। বিশেষ করে অবকাঠামো, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি দক্ষতা, শ্রমিকদের স্বাস্থ্য, আবাসন, মজুরি, নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সবুজায়ন ও সামাজিক দায়িত্ববোধের প্রতিফলন দেখতে চাই। কয়েকটি ব্যক্তি খাতের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে ইতোমধ্যে সবুজ প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা চালু করা হয়েছে। আশা করি সব দল সব অর্থনৈতিক অঞ্চলেই এই সবুজায়নের ধারা চালু করার অঙ্গীকার করবে। সবুজ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়তে পারলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ ব্যাপক হারে বাড়বে।

৭. আমাদের উদ্যোক্তাদের সমাজ উন্নয়ন ও পরিবেশের সংরক্ষণে তাদের লাভের একটা অংশ স্বেচ্ছায় বিনিয়োগ করা উচিত। কিন্তু শুধু ব্যাংকিং খাত ছাড়া অন্য খাতের উদ্যোক্তারা সেভাবে এখনো পর্যন্ত এগিয়ে আসছে না। বাংলাদেশ ব্যাংক সিএসআর নীতিমালা জারি করায় সেটা সম্ভব হয়েছে। অন্যান্য খাতের উদ্যোক্তাদের সেভাবে সিএসআর নীতিমালার আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। সে জন্য সরকারের পক্ষ থেকেই আইন করে উদ্যোক্তাদের লাভের একটা অংশ হয় নিজেদের ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে অথবা অন্য কোনো বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অথবা সরকারি সুনির্দিষ্ট সামাজিক দায়িত্বশীল তহবিলে জমা করতে নির্দেশ দেয়া যেতে পারে।

আমাদের তরুণরাই এ দেশের ভবিষ্যৎ। বিশেষ করে শিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির জন্য আমাদের উপযুক্ত নীতি সমর্থনের খুবই প্রয়োজন। যেসব শিক্ষিত তরুণ-তরুণী আমাদের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নামমাত্র সার্টিফিকেট নিয়ে প্রতি বছর বের হচ্ছে তাদের সবাইকে কর্মসংস্থান দেয়া প্রায় অসম্ভব। সরকারি চাকরির সুযোগ সীমিত। ব্যক্তি খাতে যে ধরনের দক্ষ জনশক্তির দরকার সেরকম শিক্ষিত কর্মীর সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। বিদেশ থেকে ব্যবস্থাপক, প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদকে আমদানি করতে হচ্ছে। তাই আমাদের উচ্চ শিক্ষালয়ে এমন গুণমানের শিক্ষা কার্যক্রম চালু করতে হবে যাতে করে ওই দক্ষতা অর্জন করা ছাত্রছাত্রীদের পক্ষে সম্ভব হয়। এ জন্য শিল্পের সঙ্গে উচ্চশিক্ষালয়ের সংযোগ গভীরতর করার প্রয়োজন রয়েছে। তা ছাড়া আমরা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে যেসব ছাত্রছাত্রীকে পাস করাচ্ছি তাদের মধ্য থেকে ৫ শতাংশও যদি উদ্যোক্তা তৈরির প্রশিক্ষণ পায় এবং তাদের উপযুক্ত অর্থায়নের ব্যবস্থা করতে পারতাম তাহলে এই নতুন উদ্যোক্তারাই শিক্ষিত কর্মীদের নিয়োজনের ব্যবস্থা করতে পারত। সে জন্য কালবিলম্ব না করে প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোক্তা তৈরির জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উদ্ভাবনী কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ সরকার ও ব্যক্তি খাতকে নিতে হবে।

একই সঙ্গে যেসব ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের বাড়তি প্রশিক্ষণ ও অর্থায়নের প্রয়োজন রয়েছে তাদের জন্য জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা ফাউন্ডেশন গড়ার অঙ্গীকারও তারা ইশতেহারে যুক্ত করতে পারে। আর পারে ‘এসএমই ক্রেডিট গ্যারান্টিস্কিম’ প্রণয়নের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে থোক বাজেট বরাদ্দ  দেয়ার অঙ্গীকারও দলগুলো করতে পারে।

‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ আজ আর স্লোগান নয়। ইউনিয়ন পর্যায়ে কয়েক হাজার ডিজিটাল কেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে। মোবাইল ও এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের আওতায় লাখ লাখ এজেন্ট তথা ডিজিটাল উদ্যোক্তা এরই মধ্যে তৈরি হয়েছে। প্রশাসনও ডিজিটাল হয়েছে অনেকাংশে। নগর অর্থনীতিতে ই-কমার্স, এফ-কমার্স ব্যাপক হারে বাড়ছে। নারী উদ্যোক্তারা এর সুযোগ নিচ্ছেন। তাই সম্প্রতি বাংলাদেশে নারীর ব্যাপক ক্ষমতায়ন ঘটেছে। নগর অর্থনীতির উবারিকরণ ঘটিয়ে ‘উবার’, ‘পাঠাও’, ‘সহজ’ এরই মতো অসংখ্য ডিজিটাল উদ্যোক্তা আমাদের পরিবহন ব্যবস্থায় বিপ্লব এনেছে। এক লাখেরও বেশি তরুণ এখন ‘উবার মটোর’ অংশীদার। পড়ালেখা ফাঁকে ফাঁকে তারা আয় রোজগার করছে। কর্মজীবীরাও কাজ শেষে কিছুক্ষণ পরিবহন সেবা দিয়ে তাদের আয় রোজগার বাড়াচ্ছে। ‘পাঠাও’তেও বিপুলসংখ্যক কর্মসংস্থান ঘটেছে। এই শহরে মানুষ তা দ্রুতই কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারছেন। মেয়েরাও এখন ‘রাইড শেয়ার’ করছে। প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি বিকাশের এই ধারাকে প্রয়োজনীয় নীতি সমর্থন দেয়ার অঙ্গীকার নিশ্চয় আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ইশতেহারে দিতে পারে। তরুণ প্রজন্ম এরকম অঙ্গীকারকে স্বাগত জানাবে। এই তিনটি ইস্যু আমাদের জাতীয় চেতনার প্রাণভোমরা। মুক্তিযুদ্ধে বিশ্বাসী দলগুলোর কাছে এমন প্রত্যাশা খুবই প্রাসঙ্গিক। নারীর ক্ষমতায়ন, কৃষকের পণ্যের ন্যায্যমূল্য, সহজে ব্যবসা-বাণিজ্য করার সুযোগ, উগ্রপন্থী সহিংসতা প্রতিরোধ এবং দুর্নীতি নির্মূল করার মতো জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুসমূহ নির্বাচনী ইশতেহারে যুক্ত হয় সেই আশায় রয়েছি।

প্রাথমিক শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্যানিটেশন, সামাজিক সুরক্ষা, গার্মেন্টস শিল্পের বিকাশ, কৃষির উন্নয়ন, পুষ্টি উন্নয়নের ইতিবাচক প্রভাবে আমাদের মানব উন্নয়নসূচক উন্নত হচ্ছে। আমাদের জীবনের আয়ু (৭৩ বছর) ভারতসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর গড়ের চেয়ে অন্তত ৪ বছর বেশি। শিশুমৃত্যু ও মাতৃমৃত্যু উল্লেখযোগ্য হারে কমছে। ফলে দারিদ্র্য ও অতিদারিদ্র্যের হার প্রতি বছর কমছে। অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করে জাতিসংঘের এসডিজি লক্ষ্যসমূহ যথাসময়ে পূরণে বর্তমান সরকার যথেষ্ট পারদর্শিতা দেখাচ্ছে। অন্যান্য রাজনৈতিক দলও নিশ্চয় এর পক্ষে অঙ্গীকার করতে পারে। এরই অংশ হিসেবে চরের দুঃখী মানুষগুলোর জীবনের মানোন্নয়নের জন্য একটি চর ফাউন্ডেশন গড়ার অঙ্গীকার আশা করছি তাদের ইশতেহারে। এমন একটি প্রতিষ্ঠানের অভাবে বছরে বছরে বাজেটে টাকা বরাদ্দ দেয়া সত্ত্বেও তা খরচ করা যাচ্ছে না। বঞ্চিত অন্যান্য জনগোষ্ঠীর জন্যও অনুরূপ অঙ্গীকার করা সম্ভব।

তবে আসন্ন নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোর নেতার কাছে আমাদের প্রত্যাশা তারা যেন তাদের ইশতেহারের মূল ভাবনায় ‘বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ ও উন্নত বাংলাদেশ’কে সবচেয়ে বেশি বিবেচনায় রাখে।

লেখক ঃ বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর এবং বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ।

 

আরো খবর...