নর ও নারী রহস্য

নাজীর আহমদ

“আমরা হলাম জান্নাত থেকে বিতাড়িত আদমের জাত। তাই জান্নাতে পুনঃ প্রবেশের মন্ত্র শিখে নাও এবার।” আল্লাহ আদম (আঃ) কে মাটি দিয়ে সৃষ্টি করে তাতে নিজ আত্মা ফুকে দেন। এরপর ফেরেস্তাদের বলেন “তোমরা আদমকে সেজদা কর তখন ইবলিস ছাড়া সবাই সেজদা করলো। সে বললো, আমি কি তাকে সেজদা করবো যাকে আপনি কাদা মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন? আল্লাহ বললেন; তুমি এখান থেকে বের হয়ে যাও নিশ্চয় তুমি বিতাড়িত এবং তোমার উপর আমার লানত স্থায়ী হবে কর্মফল দিবস পর্যন্ত (আল কোরআন)
এরপর আদমের বাম পার্শ্বের বাঁকা হাড় থেকে হাওয়াকে সৃষ্টি করেন। আল্লাহ বলেনঃ হে মানব জাতি! তোমরা তোমাদের রবকে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করে তা তার সঙ্গীনি সৃষ্টি করেন এবং তাদের দুজন থেকে বহু নর ও নারী ছড়িয়ে দেন। (আল কোরআন: ৪ঃ১)
এরপর আল্লাহ বলেন: হে আদম! তুমি এবং তোমার সঙ্গীনি জান্নাতে বসবাস কর এবং যা ইচ্ছা হয় খাও, কিন্তু ঐ বৃক্ষের নিকটবর্তী যেয়োনা, তাহলে তোমরা অন্যায়কারিদের দলভুক্ত হবে। কিন্তু শয়তান (ইবলিশ) তাদের কুমন্ত্রনা দিল, তারা তাদের সীমা লঙ্ঘন করলো। ঐ বৃক্ষের ফল খেল। এতে তাদের লজ্জাস্থান তাদের সামনে প্রকাশিত হল। আল্লাহ বললেন তোমরা এখান থেকে বের হয়ে যাও। তোমরা পরস্পর পরস্পরের শত্র“। তোমাদের জন্য দুনিয়া এখন স্থান। (সূরা আ’রফ)
আরও বলেছেনঃ “গোশত্ পচে দুর্গন্ধময় হয়, এর সূচনা বনি ইসরাঈল হতে। আর কোন নারী নিজ স্বামীকে প্রভাবাম্বিত কওে তাকে ক্ষতিকর কার্য্যে লিপ্ত করে এর সূচনা মা হাওয়ার ঘটনা হতে”। (বুখারী, মুসলিম, আহমদ শরীফ)
রাসূল (সাঃ) বলেছেনঃ “নারীদের ব্যাপারে তোমরা আমার সদুপদেশ গ্রহন কর। কেননা নারীদেরকে পাঁজরের হাড় হতে সৃষ্টি করা হয়েছে। আর পাঁজরের উপরের অংশটুকুই সর্বাধিক বাঁকা। যদি তুমি তা সোজা করতে যাও তাহলে ভেঙ্গে ফেলবে এবং আপন অবস্থায় ছেড়ে দিলে তা বাকাই থাকবে। অতএব নারীদের ব্যাপারে তোমরা আমার সদুপদেশ গ্রহন কর। (বুখারী শরীফ)
গোস্ত পোচে দুর্গন্ধ হয়, এর সূচনা বনিইসরাঈল হতে। (বুখারী, মুসলিম, আহ্মদ শরীফ)
রাসূল (সাঃ) বলেছেনঃ স্ত্রীলোকদের মধ্যে মঙ্গল নেই এবং তাদের দিক থেকে ধৈর্য ধারন করাও সম্ভব নয়। সৎ ব্যক্তিদের উপর তারা প্রভাব বিস্তার করে এবং অসৎ ব্যক্তিরা তাদের উপর প্রভাব বিস্তার করে। আরও বলেছেন তোমরা দুনিয়া ও স্ত্রীলোককে ভয় কর। কারন, শয়তান সর্বক্ষন তোমাদেরকে জব্দ করার জন্য সুযোগ খুঁজছে। এবং পরহেজগারদের মধ্যে তার শিকার ধরবার জন্য স্ত্রীলোক অপেক্ষা অন্যকোন মজবুত ফাঁদ নেই।
রাসূল (সাঃ) এর বেশীরভাগ সহধর্মীনিগণ আমীর ও রয়ীসের ঘরে প্রতিপালিত, কেহ ছিলেন গোত্রপতির কন্যা। মা আয়েশা ও হাফসা (রাঃ) ছিলেন সম্মানিত ব্যক্তি আবু বকর ও ওমর (রাঃ) এর কন্যা। এনারা রাসূল (সাঃ) এর ঘরে এসে রুহানী শান্তি ও রাসূলের আন্তরিক ব্যবহার পেতে থাকেন ঠিকই, কিন্তু সর্বদা অভাব অনটন তাদের ঘিরে রাখতো। তারা যেহেতু মানুষ ও নারী তাই চাইলেন তাদের অবস্থার উন্নতি হউক। তাই একবার সকল স্ত্রী এক হয়ে প্রশ্ন তোলেন আমাদের অবস্থা এই কঠিন দারিদ্র ও নিঃস্বতার মধ্যে কেমন করে কাটতে পারে বলুন । সকলের প্রতি আপনার লক্ষ্য আছে, কিন্তু নিজের ঘরের প্রতি কোন লক্ষ্য নেই। আপনি আমাদের প্রয়োজন অনুযায়ী কিছু মাল সামালের ব্যাবস্থা করুন। এর ফলে রাসূল (সাঃ) মানসিক অশান্তিতে পরেন। কারন তার সরল জীবনযাপন বাধা প্রাপ্ত হতে যাচ্ছিল। একদিন হযরত ওমর ও আবুবকর (রাঃ) রাসূলের ঘরে গিয়ে দেখেন রাসূলের স্ত্রীগন রাসূলকে ঘিরে আছেন। রাসূল (সাঃ) বিষন্ন মনে বসে আছেন। ওমর ব্যাপার বুঝে বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! খারেজার কন্যা যদি আমার নিকট বেশি খরচ দাবি করে আমি তাকে জোরে চড় মেরে মাটিতে ফেলে দিবো। সুনে মৃদু হেসে রাসূল (সাঃ) বললেন দেখ, এরা সবাই একত্রিত হয়ে আমার কাছে খরচ দাবি করছে। শুনে আবু বকর উঠে তার মেয়েকে থাপ্পড় মারলেন ওমর ও তার মেয়েকে চড় মারলেন এবং উভয়েই বললেন, তোমরা কী এমন কিছু দাবি করছো যা রাসূলের নেই, উনারা বললেন আল্ল¬াহর শপথ আমরা আর কখোনো এমন দাবি করবোনা। এ ঘটনার পর রাসূলের স্ত্রীগন অন্য একটা বিষয়ে একত্রিত হলেন। তাহলো, রাসূল (সাঃ) আছরের নামায বাদ স্ত্রীদের কুশলাদি জানার জন্য তাদের ঘরে যেতেন। কয়েকদিন যায়নাব (রাঃ) এর ঘরে একটু বেশি সময় থাকেন। এতে অন্যন্য স্ত্রীগন ঈর্ষানি¦ত হন। মা আয়েশা (রাঃ) জিজ্ঞাসা করে জানতে পারেন, যায়নাবের ঘরে কোথা থেকে মধু এসেছে। গেলে যায়নাব তা দেন খাবার জন্য। মধু মিষ্টি ওনার প্রিয়। হিংসা ও ভালোবাসার ক্ষেত্রে পরশ্রী কাতরতায় আয়েশা ও হাফসা (রাঃ) এক হলেন এবং অন্য স্ত্রীদের দলে নিলেন। সিদ্ধান্ত হলো যায়নাবের ঘর থেকে যখন উনাদের ঘরে যাবেন তখন আমরা বলবো ইয়া রাসূলুুুল্লাহ আপনার মুখথেকে মাগাফিরের গন্ধ আসছে আপনি কি মাগাফির পান করেছেন? মাগাফির একধরনের গাছের ফলের রস। খেতে মিষ্টি কিন্তু দুর্গন্ধ। রাসূল দুর্গন্ধ ঘৃনা করতেন। উনারা সিদ্ধান্ত অনুযায়ি এ কথা বললে রাসূল বলেন। নাতো আমি মধু পান করেছি। তবুও সবাই একই কথা বলেন। এতে দুঃখ পেয়ে রাসূল বলেন মধু আমার জন্য হারাম। এতে আয়াত নাযিল হয়- হারাম না করতে।
হযরত ওমরের মেয়ে হিসাবে হযরত হাফসার মাঝেও কিছুটা কঠরতা বিদ্যমান ছিলো। তিনি কখনো কখনো রাসূলের সাথে কথা কাটাকাটি করতেন। এ প্রসঙ্গে বুখারি শরিফে বিভিন্ন ঘটনার উল্লে¬খ আছে। যেমনঃ একসময় হযরত ওমর (রাঃ) রাসূলুল্লাহর (সাঃ) এর ঘরে উপস্থিত ছিলেন তখন হফসা (রাঃ) রাসূলুল্ল¬াহর (সাঃ) এর সাথে কথা কাটাকাটি শুরু করলেন। ওমরের তা সহ্য হলো না। তিনি তৎক্ষনাৎ হাফসাকে প্রহার করতে উদ্যত হলে রাসূলুল্ল¬াহ (সাঃ) উভয়ের মাঝখানে এসে দাঁড়ালেন। এতে ওমর লজ্জিত হলেন বটে কিন্তু তার রাগের উপশম হলো না। তিনি মেয়েকে লক্ষ করে বললেন, সাবধান! এমন অন্যায় কাজ যেন আর কখোনো না হয়। ওমর চলে যাওয়ার পর রাসূলুল্ল¬াহ (সাঃ) বললেন হাফসা দেখলে তো আজ তোমাকে কেমন করে বাঁচিয়ে দিলাম। এরপর থেকেই হাফার উগ্রভাব অনেকাংশে কমে যায়। (দ্রঃ মহানবী- ড.ওসমান গনি)
বিভিন্ন কারনে রাসূলুল্ল¬াহ (সাঃ) এর একান্ত ইচ্ছা ছিল মসজিদে গিয়ে নামায পড়াবার। কিন্তু অসুখ বেড়ে যাওয়ায় তিনি আবুবকর (রাঃ) কে ইমামতি করতে বলেন। হযরত আয়েশা (রাঃ) এর ইচ্ছা ছিলো রাসূলুল¬াহ (সাঃ) পড়াবেন। কারন নামায পড়ানটা ও এক ধরনের সুস্থতার লক্ষন। তাই বললেন ইয়া রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আবু বকর নরম লোক। তার কন্ঠস্বর ও সুউচ্চ নয়। তিনি তিলাওয়াতের সময় কান্নাকাটি করেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) পুনরাই নামাজ পড়ানোর কথা বলেন। হযরত আয়েশা ও পুনরায় একই কথা বলেন। এবার মহানবী (সাঃ) উচু কন্ঠে বলেনঃ নিশ্চয় তোমরাই সেই নারী জাতি যারা ইউসুফকে ফুসলানোর চেষ্টা করেছিলে। আবু বকরকে বলো তিনি যেনো ইমামতি করেন। (দ্রঃ মহানবীর জীবন চরিত; ড.হায়কল)
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর ভালবাসা; উদারতা ও সহিষ্ণতা উনার স্ত্রীদের এতোটা সাহসী করে দেয়। আর এসব নিয়ে নিজ সময় নষ্ট করার মতো মণ ছিলনা। কারন সবসময় ইসলাম ও অধ্যাতিকতা নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। এর মধ্যে স্ত্রী মারিয়ার গর্ভে পুত্র সন্তান ইব্রাহিম জন্মনিলে উনার স্ত্রীদের মধ্যে হিংসা চরমরুপ নেয়। রাসূল কোন স্ত্রীকে বেশি ভালবাসলে অন্যরা তা সহ্য করতেন না। কিন্তু এবার রাসূলকে কঠোর হতে হয়। তিনি বললেন তিনি একমাস তাদের থেকে আলাদা থাকবেন এতে সংশোধন না হলে তাদের পাওনা মিটিয়ে দিয়ে তাদের বিদায় করে দিবেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) মসজিদে নববীর কাছে একটি আলাদা ঘরে একমাস থাকেন। এতে সাহাবাগন বিশেষ করে আবু বকর ও ওমর খুব চিন্তিত হয়ে পড়েন এবং কষ্ট পান। এ বিষয়ে উনাদের সতর্ক করে আয়াত নাযিল হয়। উনার স্ত্রীরাও নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে লজ্জিত ও অনুতপ্ত হন। উনারা তওবা করেন এবং ক্ষমা চান। এত রাসূলের পারিবারিক অশান্তির সমাপ্তি ঘটে।

আরো খবর...