দেশে ৬০ ভাগ আমিষের চাহিদা পূরণ হয় মৎস্য খাত থেকে

কৃষি প্রতিবেদক ॥ ষোলো কোটি জনসংখ্যার এই দেশে ৬০ ভাগ আমিষের চাহিদা পূরণ হয় মৎস্য খাত থেকে। পাশাপাশি মাছ রফতানি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সঙ্গে সঙ্গে বহু লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে। আশাবাদের খবর হচ্ছে ফিশ অ্যাকুয়াকালচার বা চাষকৃত মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে পঞ্চম। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ‘দ্য গ্লোবাল অ্যাকুয়াকালচার প্রডাকশন স্ট্যাটিস্টিকস ফর দ্য ইয়ার-২০১৫’ প্রতিবেদনের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে চাষ করা মাছের বার্ষিক উৎপাদন ১৬ লাখ টন। তাদের জরিপে ফিশ অ্যাকুয়াকালচার বা চাষ করা মাছ উৎপাদনে বিশ্বে চীন, ভারত, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার পরই পঞ্চম স্থানটি বাংলাদেশের। শীর্ষস্থানে থাকা চীনের বার্ষিক উৎপাদন ৩৮ লাখ ৬২ হাজার টন, ভারত ৩৫ লাখ ৭৩ হাজার, ভিয়েতনাম ২৮ লাখ ৪৫ হাজার ও ইন্দোনেশিয়া প্রতি বছর গড়ে ২৭ লাখ ১৮ হাজার টন। এই আশার খবরের প্রতিফলন হচ্ছে মাছ  থেকে দেশে আমিষের চাহিদার ৬০ শতাংশের জোগানই আসছে। আমরা জানি, বর্তমানে মোট দেশজ উৎপাদনে মৎস্য খাতের অবদান ৪ দশমিক ৪৩ শতাংশ।  দেশের মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় সাড়ে ১০ শতাংশ বা দেড় কোটির  বেশি মানুষ বা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মৎস্য খাতের ওপর নির্ভরশীল।

চাষ করা মাছ উৎপাদনে নীরব বিপ্লব

বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দেশে চাষ করা মাছ উৎপাদনের  ক্ষেত্রে নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছে দেশের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বেসরকারি উদ্যোগ। যদিও এই উৎপাদন বাড়ার পেছনে সরকারি ও বেসরকারি উভয়েরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। মৎস্য খাতের অবদানের পেছনে বিশেষত সরকারের মাছের অভয়াশ্রম ও প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণ এবং মৎস্য  আইন বাস্তবায়নও  বেশ কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। এছাড়া পোনা অবমুক্তি, বিল ও নার্সারি স্থাপন,  পোনা সংরক্ষণ কর্মসূচি, পরিবেশবান্ধব চিংড়ি চাষ সম্প্রসারণ, বদ্ধ জলাশয়ে নিবিড় মৎস্য চাষ, সামাজিক মৎস্য ব্যবস্থাপনা গ্রহণ ও মৎস্যচাষিদের সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার কারণে মাছ উৎপাদন বাড়ছে। এছাড়া মৎস্য জেলা হিসেবে ময়মনসিংহে  রেণু ও পোনা উৎপাদনে হ্যাচারি শিল্প গড়ে উঠেছে, যা দেশের প্রায় সব জেলায়ই মৎস্য চাষ সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখছে। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে জেলেদের পরিচয়পত্র বা আইডি কার্ড দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার, যার মাধ্যমে জেলেরা নিরবচ্ছিন্নভাবে সরকারি সুযোগ-সুবিধা নিতে পারবেন। বহুবিদ সম্ভাবনা আর অবারিত সুযোগের কারণেই এখন কৃষকদের মধ্যেও মৎস্য চাষে আগ্রহ বাড়ছে। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশে পোনা উৎপাদনকারী জেলাগুলোর মধ্যে শীর্ষস্থানে রয়েছে যশোর, ময়মনসিংহ, বগুড়া, কুমিল্লা ও নরসিংদী। তবে মৎস্য  চাষের এলাকা এখন বগুড়া, নওগাঁ, রাজশাহী, পাবনা, দিনাজপুর, লক্ষ্মীপুর, বরিশাল, নেত্রকোনা ও টাঙ্গাইল  জেলায়ও বিস্তৃতি লাভ করেছে। নানামুখী উদ্যোগের পাশাপাশি অন্যান্য  জেলায়ও ব্যক্তি পর্যায়ে পুকুরে মাছ চাষের ক্ষেত্রে আশাব্যঞ্জক সাফল্য আসতে শুরু করেছে। তারচেয়েও বড় আশাবাদের খবরটি হলো প্রকৃতপক্ষে সারা  দেশে পুকুরে মাছ চাষে বিপ্লবের লক্ষণ পরিলক্ষিত হচ্ছে।

রোল মডেল হবে বাংলাদেশ

স্বাদু পানির মৎস্য চাষের জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে উপযুক্ত প্রতিবেশ ব্যবস্থা বাংলাদেশের। দ্য স্টেট অব ফিশ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার-২০১৮ শীর্ষক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, চাষের ও প্রাকৃতিক উৎসের মাছ মিলিয়ে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ।  দৃঢ়তার সঙ্গে চার বছর ধরে বাংলাদেশ এই অবস্থান ধরে রেখেছে। আবার বিশে মোট মাছ উৎপাদনের দিক দিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম। এখানকার আড়াই লাখ হেক্টর উন্মুক্ত জলাশয় ও গ্রামীণ উদ্যোগে গড়ে ওঠা লাখ লাখ পুকুরে মৎস্য চাষের যে সম্ভাবনা রয়েছে, তা এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়নি। সরকার যদি এ বিষয়ে আরো মনোযোগী হয়, চাষিদের সহায়তা করে, তাহলে বৈশ্বিক মৎস্য উৎপাদনে শীর্ষস্থানে উঠে আসতে পারে বাংলাদেশ।

ঘরের ভেতর মাছের চাষ

বাংলাদেশে একেবারে নতুন হলেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইতোমধ্যেই এ পদ্ধতি খুব জনপ্রিয়। দেরিতে হলেও আমাদের দেশে ময়মনসিংহের মৎস্যচাষি ফিশ হ্যাচারি ও কালচার ফার্ম অ্যাগ্রো থ্রি-দর স্বত্বাধিকারী এ বি এম শামছুল আলম বাদল ব্যক্তিগত উদ্যোগে আরএএস প্রযুক্তিতে প্রথম মাছ চাষ শুরু করেন। গবেষণা প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে ঘরের ভেতর মাছ চাষ করে পুকুরের চেয়েও প্রায় ৩০ গুণ বেশি উৎপাদন সম্ভব। রিসার্কুলেটিং অ্যাকুয়াকালচার পদ্ধতিতে এক ঘনমিটার পুকুরে দুই কেজি মাছ হলে পদ্ধতিতে ৫০ থেকে ৬০ কেজি মাছ উৎপাদন করা সম্ভব। উদ্যোক্তা এ প্রযুক্তিতে ময়মনসিংহ শহরের বিসিক শিল্পনগরীর একটি টিনশেড প্লটে ১০ টন ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন ৮টি ট্যাংক স্থাপন করেন। প্রতিটি ট্যাংকে পাইপ দিয়ে মেকানিক্যাল ফিল্টার সংযুক্ত করা হযেছে।  মেকানিক্যাল ফিল্টারের কাজ প্রতিটি ট্যাংকের মাছ ও মৎস্য খাদ্যের বর্জ্য পরিষ্কার করা। পরে এ পরিষ্কার পানি পাম্প দিয়ে বায়োফিল্টারে উত্তোলন করা হয়। এ প্রযুক্তিতে উৎপাদিত মাছের গুণগতমান অনেক উন্নত ও স্বাস্থ্যসম্মত। উদ্যোক্তার মতানুযায়ী এ পদ্ধতিতে মূলত ক্যাটফিশ জাতীয় মাছ (পাবদা, গোলসা, শিং, মাগুর) চাষ করা হয়। বর্তমানে ৮টি ট্যাংকে তিনি পাবদা ও গোলসা মাছ চাষ করছেন। তিনি জানান, এ ধরনের চাষ-পদ্ধতিতে মাছের খাদ্য কম লাগে। উৎপাদিত মাছ স্বাভাবিক মাছের তুলনায় আকারে বড় হয়। রোগবালাই ও মড়কের আশঙ্কা নেই।

কাজে লাগাতে হবে সুযোগ-সম্ভাবনা

মৎস্য পরিবহনের জন্য ফ্রিজিং পিকআপ ব্যবস্থা করা দরকার। এসব বিষয় নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মনযোগ দেয়া খুবই জরুরি। মৎস্য উৎপাদনে শীর্ষ দেশের তুলনায় বাংলাদেশের এ খাতের সম্প্রসারণ হার বেশি হলেও অপচয়ের কারণে মাছের ঘাটতি বেড়ে যাচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মাছের উচ্ছিষ্টাংশ থেকে বিভিন্ন ধরনের প্রয়োজনীয় দ্রব্য ও খাদ্যপণ্য উৎপাদন হলেও এদেশে তেমন কোনো সুযোগ নেই। অথচ মাছের এ ধরনের উচ্ছিষ্টাংশ দিয়ে তেল, অয়েল কেক ও খাবার তৈরি এবং শিল্প উৎপাদনের কাঁচামাল তৈরি করে বছরে বিপুল অর্থ আয় করা সম্ভব।  সরকার দেশের মাছ উৎপাদন বাড়াতে যতটা নজর দিচ্ছে, ঠিক ততটাই অবহেলা করা হচ্ছে এর সংরক্ষণ কিংবা পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন ও প্রক্রিয়াজাতকরণে। তাছাড়া মাছ উৎপাদনে জড়িত এবং বিপণন প্রক্রিয়ায় যারা নিয়োজিত, তাদেরও দক্ষতা ও সঠিক জ্ঞানের অভাব রয়েছে। তাজা মাছ বিপণন করতে এখনো দেশে উন্নত অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। খামারি বা জেলেরা এখনো বরং পুরনো পদ্ধতিতে মাছ বিপণন করেন। পরিবহন ব্যবস্থারও দুর্বলতা রয়েছে।

লেখক ঃ এস এম মুকুল, অর্থনীতি বিশ্লেষক।

আরো খবর...