দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ আর এক টাকাও বাড়বে না

বেসরকারি ব্যাংক মালিক ও প্রধান নির্বাহীদের সঙ্গে বৈঠকে অর্থমন্ত্রী

ঢাকা অফিস ॥ আওয়ামী লীগের নতুন সরকারে অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়া আ হ ম মুস্তফা কামাল ঘোষণা দিয়েছেন, দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ আর এক টাকাও বাড়বে না। ব্যাংকিং খাতে বর্তমানে যে বিপুল খেলাপি ঋণ জমেছে, তা ধীরে ধীরে কমিয়ে আনার পরিকল্পনার কথাও তিনি বলেছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে বেসরকারি ব্যাংক মালিক ও প্রধান নির্বাহীদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, “বৈঠকে বসার আগেই আমার শর্ত ছিল একটা। কোনো কিছু আলাপ করার আগে আমার এক দফা। আজকের পর থেকে খেলাপি ঋণ এক টাকাও বাড়তে পারবে না। আপনারা কীভাবে বন্ধ করবেন, কীভাবে টেককেয়ার করবেন, কীভাবে ম্যানেজ করবেন; আপনাদের ব্যাপার। তারা আমাকে আশ্বস্ত করেছেন; তাই বলছি, আজকের পর থেকে খেলাপি ঋণ বাড়বে না ইনশাল্লাহ।” বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৯ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। এর বাইরে দীর্ঘদিন আদায় করতে না পারা যেসব ঋণ ব্যাংকগুলো অবলোপন করেছে, তার পরিমাণ প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা। খেলাপি ঋণের সঙ্গে অবলোপন করা এ মন্দ ঋণ যুক্ত করলে প্রকৃত খেলাপি ঋণ দাঁড়ায় ১ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের গত দুই সরকারের মেয়াদে অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হলেও খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে সাড়ে ৪ গুণ। নতুন অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল বলেন, “ বৈঠকে আমরা একটি জায়গায় ঐকমত্যে পৌঁছেছি। মূল যে এলাকা, মূল যে চিন্তা, সেটি হচ্ছে ননপারফরমিং লোন (খেলাপি ঋণ)। এটি আপনাদের উৎকণ্ঠা, জাতির উৎকণ্ঠা, আমাদের উৎকণ্ঠা এবং আমার উৎকণ্ঠা। তবে আমার উৎকণ্ঠা কিছুটা কম, কেননা এরই মাঝে আমি দেখেছি, যেভাবে যে পরিমাণ পত্রপত্রিকায় লেখা হয়, ননপারফরমিং লোন সে পরিমাণ না। দেশে ননপারফরমিং লোনের হার ১১ থেকে ১২ শতাংশ। অন্যান্য দেশে এটা আরও বেশি।” গত সরকারে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব সামলে আসা মুস্তফা কামাল বলেন, খেলাপি ঋণ কমলে ব্যাংক ঋণের সুদের হারও কমে যাবে। সুতরাং এটা কোনভাবেই বাড়তে দেওয়া হবে না। “ননপারফরমিং লোন এখনো ম্যানেজেবল। আর এই ম্যানেজেবল লোন আর বাড়তে পারবে না।” অর্থমন্ত্রী বলেন, “বৈঠকে যারা এসেছেন তারা নিশ্চিত করেছেন খেলাপি ঋণ আর বাড়বে না বরং যা আছে সেটিও ধীরে ধীরে কমাবেন। কীভাবে কমাবেন সেটি পরবর্তী মিটিংয়ে বসে সিদ্ধান্ত নেব।” বেসরকারি ব্যাংকের উদ্যোক্তা ও মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়শেন অব ব্যাংকসের (বিএবি) সভাপতি এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার, আইএফআইসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান বেক্সিমকো গ্র“পের ভাইস-চেয়ারম্যান সংসদ সদস্য সালমান এফ রহমান, প্রিমিয়ার ব্যাংকের চেয়ারম্যান এইচ বি এম ইকবালসহ বিভিন্ন ব্যাংকের মালিক এবং ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অফ বাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) নেতারা  রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে (ইআরডি) এ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। মুস্তফা কামাল বলেন, ব্যাংক খাত নিয়ে যেসব তথ্য বাজারে রয়েছে, সেগুলো যাচাই ও মূল্যায়ন করার সিদ্ধান্ত হয়েছে বৈঠকে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগকে এ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এক প্রশ্নের উত্তরে মুস্তফা কামাল বলেন, “যারা ব্যবসা করে বাংলাদেশে, তারা সবাই প্রভাবশালী। পৃথিবীতে যারা ব্যবসা বাণিজ্য করেন সবাই প্রভাবশালী। প্রভাবশালী দুই রকম- যারা রাজনীতি করেন তারাও প্রভাবশালী, যারা ক্রিকেট ভালো খেলেন, তারাও প্রভাবশালী, ব্যবসা বাণিজ্য যারা করেন তারাও প্রভাবশালী। ব্যবসায়ীরা যদি প্রভাবশালী না হয় তাহলে বিনিয়োগ কীভাবে আসবে? কোথা থেকে কর্মসংস্থান হবে? কীভাবে হবে? দারিদ্র্য কীভাবে কমবে?” মন্ত্রী বলেন, “প্রভাবশালী যারা ব্যবসা বাণিজ্য করেন, তারা অর্থনীতির ৮২ শতাংশ। এদেরকে বাদ দিয়ে ১৮ শতাংশ নিয়ে অর্থনীতি সাজানো সম্ভব নয়। এটা করতে চাওয়াও একটা অবাস্তব চিন্তা। তাদেরকে ব্যবসা করতে সকল সুযোগ সুবিধা দেওয়া হবে, ব্যবসা করতে হবে ঋণ খেলাপি না হয়ে।”

আরো খবর...