তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ

রূপপুর বিদ্যুৎ প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ

ঢাকা অফিস ॥ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্রিন সিটি আবাসন প্রকল্পের সরঞ্জাম কেনায় দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের দুই কমিটির করা তদন্ত প্রতিবেদন হাইকোর্টে দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অবকাশকালীন ছুটি শেষে ঈদের পর কোর্ট খোলার এক সপ্তাহের মধ্যে প্রতিবেদন দুটি দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। গতকাল সোমবার বিচারপতি তারিক-উল হাকিম ও বিচারপতি মোহাম্মদ সোহরাওয়ার্দীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন। আদালতে রিটের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন ব্যারিস্টার সৈয়দ সাইয়েদুল হক সুমন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। গত রোববার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্রিন সিটি আবাসন প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগে বিচার বিভাগীয় তদন্ত চেয়ে হাইকোর্টে রিট করেন ব্যারিস্টার সৈয়দ সাইয়েদুল হক সুমন। ব্যারিস্টার সুমন বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কর্মরতদের জন্য নির্মিত গ্রিন সিটি প্রকল্পে আসবাবপত্রের দাম এবং তা ফ্ল্যাটে ওঠানোর জন্য যে ব্যয় ধরা হয়েছে, তা অস্বাভাবিক। একটা বালিশের দাম ধরা হয়েছে ছয় হাজার টাকা। একটা পানি গরম করার কেটলি নিচ থেকে ওপরে তোলার খরচ ধরা হয়েছে তিন হাজার টাকা। আমরা এখনই দুর্নীতির কথা বলছি না। এই অস্বাভাবিক দামের খবর সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। সবাই বলছে, এইটা একদম ডাকাতির মতো হয়েছে। আমরা এগুলা বলছি না। যেহেতু গণপূর্ত বিভাগের বিরুদ্ধেই অভিযোগ, ওঁদের তদন্ত কমিটি হলে হবে না। আমরা বিচার বিভাগীয় তদন্ত করার কথা বলছি। কারণ এটি না হলে এই সিস্টেমের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলবে বাংলাদেশের মানুষজন। বিভিন্ন সামাজিক ইস্যুতে সরব এই আইনজীবী বলেন, প্রধানমন্ত্রী যেহেতু দুর্নীতিতে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছেন, এইরকম যা কিছু আছে সব তদন্ত হয়ে সারা দেশবাসীর সামনে আসা উচিত। তাহলে মানুষের আস্থা বাড়বে। সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের আবাসন প্রকল্পে কেনাকাটার নামে কোটি কোটি টাকা দুর্নীতির খবর প্রকাশের পর এ নিয়ে সারা দেশে তোলপাড় চলছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের আওতায় নির্মাণাধীন গ্রিন সিটি আবাসন পল্লীর দুর্নীতি নিয়ে প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়। বিদ্যুৎকেন্দ্রে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের থাকার জন্য সেখানে ২০তলা ১১টি ও ১৬তলা আটটি ভবন করা হচ্ছে। এরইমধ্যে ২০তলা আটটি ও ১৬তলা একটি ভবন নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। প্রতিটি ২০তলা ভবনে ১১০টি ও ১৬তলা ভবনে ৮৬টি ফ্ল্যাট থাকবে। প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্মাণ সম্পন্ন হওয়া নয়টি ভবনের ৯৬৬টি ফ্ল্যাটের জন্য আসবাবপত্র কেনা শেষ হয়েছে। এর মধ্যে একটি ২০তলা ভবনের ১১০টি ফ্ল্যাটের আসবাবপত্র কেনা ও তা ভবনে ওঠাতে সব মিলে ব্যয় হয়েছে ২৫ কোটি ৬৯ লাখ ৯২ হাজার ২৯২ টাকা। ২০তলা ওই ভবনটির প্রতিটি ফ্ল্যাটের জন্য প্রতিটি বালিশ কেনা হয়েছে পাঁচ হাজার ৯৫৭ টাকা করে; ফ্ল্যাটে ওঠাতে খরচ দেখানো হয়েছে ৭৬০ টাকা। ৯৪ হাজার ২৫০ টাকা করে কেনা প্রতিটি রেফ্রিজারেটর ওপরে ওঠাতে ব্যয় দেখানো হয়েছে ১২ হাজার ৫২১ টাকা। একেকটি ওয়াশিং মেশিন কেনা হয়েছে এক লাখ পাঁচ হাজার টাকা দরে, ফ্ল্যাটে ওঠাতে খরচ দেখানো হয়েছে ৩০ হাজার ৪১৯ টাকা করে। পাঁচ হাজার ৩১৩ টাকা দরে একেকটি ইলেকট্রিক কেটলি কেনার পর তা ভবনে ওঠানো হয়েছে দুই হাজার ৯৪৫ টাকা খরচ করে। একইভাবে প্রতিটি আয়রন কিনতে খরচ দেখানো হয়েছে চার হাজার ১৫৪ টাকা, আর তা ভবনে ওঠানোর খরচ দেখানো হয়েছে দুই হাজার ৯৪৫ টাকা। এ ছাড়া রুম পরিষ্কার করার মেশিন কিনতে ব্যয় দেখানো হয়েছে ১২ হাজার ১৮ টাকা, ভবনে ওঠাতে খরচ দেখানো হয়েছে ছয় হাজার ৬৫০ টাকা। প্রতিটি চুলা কিনতে খরচ করেছে সাত হাজার ৭৪৭ টাকা, ভবনে ওঠাতে খরচ দেখিয়েছে ছয় হাজার ৬৫০ টাকা। এদিকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সব ধরনের স্থানীয় ঠিকাদারি বিল বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে এবং গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর নেতৃত্বে আলাদা দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের সব ধরনের লেনদেন বন্ধ থাকবে বলে গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এরইমধ্যে নির্দেশনা দিয়েছে।

আরো খবর...