জামায়াত-বিএনপিকে নিয়ে ঐক্যফ্রন্টের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দিবাস্বপ্ন!

॥ মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী ॥

৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই নির্বাচন উপলক্ষে গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন, জাসদ, নাগরিক ঐক্য এবং কৃষক-শ্রমিক-জনতা লীগের সমন্বয়ে গঠিত ঐক্যফ্রন্ট, বিএনপি, জামায়াত এবং ২০ দলের সঙ্গে যে জোট গঠিত হয়েছে তা নিয়ে দেশের অভ্যন্তরে এবং দেশের বাইরের বিভিন্ন দেশে বেশ আলোচনা-সমালোচনা চলছে।

দেশের অভ্যন্তরে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে রাজনৈতিক, সামাজিক এবং নাগরিক সমাজের সচেতন মহল বেশ আগেই ড. কামাল হোসেন এবং তার ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনীয় ঐক্য গঠনের তীব্র সমালোচনা করেছেন। বিশেষত বিএনপি এবং জামায়াতের সাম্প্রদায়িক, রাজনৈতিক মতাদর্শের বিষয়টি গত প্রায় চার দশক ধরে বাংলাদেশে সবারই জানা রয়েছে।

সাম্প্রদায়িক কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শ অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সহায়ক রাজনীতি ও দর্শন হতে পারে না। এটি রাজনীতির সাধারণ পাঠ নেয়া যে কোনো সচেতন মানুষই জানেন। বাংলাদেশে বিএনপি এবং জামায়াতের রাজনৈতিক ঐক্য সাম্প্রদায়িক ভাবাদর্শের উত্থানকে বাংলাদেশ রাষ্ট্র ব্যবস্থার সঙ্গে মিশিয়ে ফেলা হয়েছে।

ফলে বাংলাদেশে বিএনপির যে কোনো শাসনামলে অসাম্প্রদায়িক শক্তিকে দুর্বল করা হয়েছে কিংবা কখনো কখনো নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা করা হয়েছে। এর ফলে মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি স্বাভাবিকভাবে বিকশিত হতে পারেনি, পদে পদে বাধার সম্মুখীন হয়েছে।

বিশেষত বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতাকে উসকে দিয়ে বিএনপি-জামায়াত সাধারণ ধর্মীয় বিশ্বাসী মানুষকে রাজনীতিতে বিভ্রান্ত ও বিভক্ত করেছে, গণতন্ত্র সম্পর্কে সঠিক ধারণা ও চেতনা লাভের সময়ে ধর্মীয় ও জাতিগত বিভাজনের রাজনীতি আমাদের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে পশ্চাৎপদ রাজনৈতিক চিন্তায় আবদ্ধ করেছে। একই সঙ্গে  দেশের মহান মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে বিএনপি ও জামায়াত যে বিকৃত ইতিহাস শিক্ষা ব্যবস্থায় ও রাজনীতিতে প্রচার করেছে তার ফলে মুক্তিযুদ্ধের মহান আদর্শের মূল চেতনা থেকে নতুন প্রজন্মের বিস্মৃত হওয়ার সুযোগ ঘটেছে।

জাতীয়তাবাদ নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরির মাধ্যমে গোটা জাতিসত্তাকে বিভক্ত করা হয়েছে, নাগরিকতাকে জাতীয়তাবাদের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়েছে। একই সঙ্গে ধর্ম নিরপেক্ষতাকে ধর্মহীনতার মতাদর্শ হিসেবে প্রচার করে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয়েছে। অর্থনীতিতে শোষণহীন সমাজ ব্যবস্থার ধারণাকে তুলে দেয়া হয়েছে। রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনা হয়েছে সাম্প্রদায়িকতা, বিকৃত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং জাতিগত সংকীর্ণ ভাবাদর্শ।

এভাবেই বাংলাদেশে ১৯৭৫-এর পর থেকে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের রাষ্ট্র ব্যবস্থা গঠনের রাজনৈতিক সংগ্রামকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা হয়েছে, আমাদের সমাজ, রাষ্ট্র, সংস্কৃতি, প্রশাসনসহ সর্বত্র মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগত শক্তিদের প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, সুবিধাবাদকে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির নৈকট্য আদর্শগতভাবে দৃশ্যমান থেকেছে শুরু থেকেই, এমনকি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে জোটগতভাবে তাদের অবস্থান একত্রে ছিল, ১৯৯১ সালের নির্বাচনে গোপন আঁতাতের মাধ্যমে উভয় দল আসন ভাগাভাগি করেছে। ঘাতক, গোলাম আযমের বিচারের দাবিতে আন্দোলন ও গণআদালত প্রতিষ্ঠিত হলে বিএনপি গোলাম আযমের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দিয়েছে। মধ্যখানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন নিয়ে জামায়াত এবং বিএনপির সম্পর্কে চিড় ধরলেও ১৯৯৬-এর নির্বাচনের পর জামায়াত এবং বিএনপি পুনরায় কাছাকাছি অবস্থান নেয়।

এর ফলে ১৯৯৯ সালে গঠিত হয় চার দলীয় আদর্শিক জোট। এই জোট গঠনের মূল উদ্দেশ্যই ছিল বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় যাতে অসাম্প্রদায়িক ধারার রাজনৈতিক দল নির্বাচিত হয়ে না আসতে পারে, চার দলীয় ঐক্যজোটের ঘোষণাপত্রে তেমন অঙ্গীকার ব্যক্ত করা ছিল।

২০০১ সালে নির্বাচনের আগে জামায়াত এবং বিএনপি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন অপশক্তির সহযোগিতা নিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচারণায় অংশ নিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনৈতিক, শিক্ষা, সাংস্কৃতিক, প্রশাসনিক এবং প্রচার মাধ্যমসমূহ বিএনপি জামায়াতের রাজনৈতিক প্রস্তুতি, লক্ষ্য, উদ্দেশ্য সম্পর্কে আগাম কোনো সুস্পষ্ট ধারণা নিতে পারেনি, তারা বরং বিষয়টিকে গণতন্ত্রে পরস্পরবিরোধী দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দলের ভোট লড়াই হিসেবে দেখেছে। আওয়ামী লীগের চাইতে চার দলীয় জোটকে অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়েছিল। কিন্তু চারদলীয় জোটের আদর্শগত অবস্থানকে তলিয়ে দেখেনি।

বিষয়টি পরিষ্কার হলো ২০০১ সালের ১ অক্টোবরের নির্বাচনের পর মুহূর্ত থেকেই- যখন গোটা দেশব্যাপী জামায়াত ও বিএনপি হিন্দু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে হত্যা, নির্যাতন ও ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটিয়ে আওয়ামী লীগকে ভোট দেয়ার প্রতিশোধ নেয়।

একইভাবে পরাজিত আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করার নীলনকশা বাস্তবায়ন করতে থাকে, দেশে সন্ত্রাসী ও জঙ্গিবাদী গোষ্ঠীকে সরকার পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করে। দেশে অসংখ্য রাজনৈতিক-সামাজিক ব্যক্তিকে হামলা, মামলায় জড়িয়ে এক ভীতিকর অবস্থা তৈরি করে, আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের গ্রেনেড হামলায় হত্যা করার নজির স্থাপন করতে থাকে, আদালত পর্যন্ত এ সব মামলা গড়ায়, ২১ আগস্টের ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার পৃষ্ঠপোষকতা করা হয়, ১৭ আগস্টের দেশব্যাপী ৫০০-এর অধিক স্থানে একসঙ্গে বোমা হামলা করা হয়। একইসঙ্গে  দেশে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও গণতন্ত্রের চর্চাকে সম্পূর্ণরূপে সঙ্কুচিত করা হয়। বিএনপি এবং জামায়াতের ঐক্য বাংলাদেশ রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে কতটা সাম্প্রদায়িক, জঙ্গিবাদী, ভারত বিরোধী এবং পাকিস্তানপন্থি করতে পারে তার নজির সেই সময়ের পাঁচ বছরের শাসনামলে রয়েছে।

এই জোট দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে কতটা অকার্যকর করেছিল, নির্বাচন কমিশনকে কতটা অথর্ব ও জামায়াত-বিএনপির দলীয় আজ্ঞাবহ করেছিল- সেটি সবারই স্মৃতিতে এখনো থাকার কথা। চারদলীয় জোট সরকারের মন্ত্রিপরিষদে জামায়াতের আমির ও সেক্রেটারি জেনারেল মন্ত্রী হিসেবে বাংলাদেশের পতাকাই শুধু গাড়িতে বহন করেনি, রাষ্ট্রযন্ত্রের সর্বত্র জামায়াতের ক্যাডারদের প্রতিষ্ঠিত করেছে।

সে সময়ে দেশের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে ছাত্র শিবিরের দুর্দান্ত প্রতাপ, অসাম্প্রদায়িক ছাত্র সংগঠনকে বিদ্যাপীঠ থেকে বিতাড়ন, ছাত্র-শিক্ষকদের ওপর নির্যাতন এবং প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ভাবাদর্শে গড়ে তোলা, সাম্প্রদায়িক ও জঙ্গিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থায় বিশ্বাসী করায় প্রচার-প্রচারণা ব্যাপকভাবে পরিচালনা করেছিল।

বিএনপি-জামায়াত দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার জন্য ২০০৭ সালের নির্বাচনকে সম্পূর্ণরূপে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার মূল উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশকে একটি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সময় নেয়া। তাদের লক্ষ্য ছিল ২০১৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে অসাম্প্রদায়িক সব শক্তিকে নির্মূল করা।

কিন্তু ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি তাদের পূর্ব পরিকল্পিত নির্বাচন অনুষ্ঠিত করা যায়নি, ১/১১ তাতে বাদ সেধেছিল। ড. কামাল হোসেনসহ অন্য নেতারা এই ইতিহাস জানেন না-বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই। কিন্তু দুঃখ হয় এখন, যখন ড. কামাল হোসেনের মুখ থেকে বিএনপি ও জামায়াতকে নিয়ে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথা বলতে শোনা যায়।

একইভাবে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, আ স ম আব্দুর রব ও মাহমুদুর রহমান মান্নাদের মতো নেতাদের মুখে মুক্তিযুদ্ধে ও গণতন্ত্রের জন্য বিএনপি ও জামায়াতের সঙ্গে এত গাঁটছড়াভাবে নির্বাচন করতে দেখা যায়- তখন আমাদের ভাবতে বেশ কষ্ট হয় যে এ সব নেতা আমাদের কি মনে করেন যে আমরা গণতন্ত্র এবং মুক্তিযুদ্ধের কোনো ইতিহাস জানি না কিংবা বইপুস্তক পড়েনি! এসব নেতা এক সময় মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন তাদের প্রত্যেকের অবদানকে আমরা সব সময়ই স্বীকার করি।

কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে তাদের কারো কারো ভূমিকা উগ্র হঠকারী রাজনীতিতে ছিল- যা মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের বাস্তবায়নে খুব একটা ফল দেয়নি, তারা নিজেরাই দল গড়েছেন, ভেঙেছেন, জনবিচ্ছিন্নও হয়েছেন। কিন্তু তাদের একটি অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক পরিচয় রাজনীতিতে ছিল। ড. কামাল হোসেন বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির সঙ্গে দীর্ঘদিন জড়িত ছিলেন কিন্তু শেখ হাসিনার সঙ্গে তার মতবিরোধ ঘটায় তিনি গণফোরাম নামক আলাদা রাজনৈতিক দল গড়েছেন।

অনেকেরই ধারণা ছিল ড. কামাল হোসেন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বিভিন্ন শক্তিকে নিয়ে আরেকটি অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল বা শক্তির উন্মেষ দেশে ঘটাতে সক্ষম হবেন, সেটি ঘটলে বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ রাজনীতি অনেকটা সাম্প্রদায়িকতা থেকে মুক্ত হতে পারত। বিএনপির প্রয়োজনীয়তা হয়তো ফুরিয়ে যেতে পারত, আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের আরেকটি প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিকশিত ও উন্নত হওয়ার সুযোগ পেত।

এমন ভাবনাটি নব্বইয়ের দশকে অনেকের মধ্যেই ছিল। কিন্তু কামাল হোসেন তেমন কোনো প¬্যাটফর্ম তৈরি করতে সক্ষম হননি। ফলে তার রাজনৈতিক জীবনের অবস্থান খুব নিভৃতেই ছিল, তিনি ব্যক্তিগতভাবে দেশে অসাম্প্রদায়িক একজন রাজনীতিবিদ এবং প্রাজ্ঞ আইনজ্ঞ হিসেবে সব মহলের কাছে শ্রদ্ধার আসন নিয়ে জীবনযাপন করছিলেন।

কিন্তু সম্প্রতি ড. কামাল হোসেন ঐক্যফ্রন্ট গঠনের মাধ্যমে যে রাজনৈতিক ঐক্যের নেতৃত্ব দিয়েছেন তার সঙ্গে এতদিনের রাজনীতি ও বিশ্বাসের কোনো মিল সচেতন কোনো মানুষ খুঁজে পায়নি। তিনি বরং বিএনপি ও জামায়াতকে নিয়ে যে ঐক্যফ্রন্ট গঠন করেছেন, নির্বাচনী ঐক্য প্রতিষ্ঠা করেছেন। সেটি মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের বিরুদ্ধের রাজনৈতিক শক্তিকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার একটি পরিকল্পনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বাংলাদেশে কোনো বিবেকবান মানুষ বিশ্বাস করেন না যে বিএনপি ও জামায়াতকে নিয়ে ড. কামাল হোসেন এবং তার বর্তমান মিত্র নেতারা দেশে অসাম্প্রদায়িক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় সামান্যতম সফল হবেন, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ বাস্তবায়নে একবিন্দু সফল হবেন। কেননা এই জোটের সবচাইতে বড় রাজনৈতিক দল বিএনপি এবং দ্বিতীয় বড় দল হচ্ছে জামায়াতে ইসলাম- যারা গণতন্ত্র, মুক্তিযুদ্ধ অসাম্প্রদায়িকতা নিয়ে যে রাজনীতি বাংলাদেশে গত ৪০ বছর চর্চা করেছে তার সঙ্গে  কোনোভাবেই মেলানো যায় না।

জামায়াত আন্তর্জাতিকভাবেই একটি জঙ্গিবাদী স্বীকৃত দল, বিএনপি সেই জামায়াতের দীর্ঘদিনের মিত্র দল, বিএনপির অভ্যন্তরেও জামায়াত ঘেঁষা নেতাকর্মীর সংখ্যা রয়েছে, এছাড়া রয়েছে অতি ডান, অতি বাম, ভারত বিদ্বেষী, সাম্প্রদায়িকতা ও মুক্তিযুদ্ধের বিকৃত ইতিহাসে বিশ্বাসী নেতাকর্মী। যারা বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠনে কোনোভাবেই অসাম্প্রদায়িকতার ভাবাদর্শকে প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করবে না। এমন শক্তিসমূহকে নিয়ে ড. কামাল হোসেন নির্বাচনে খুব চমৎকার ভালো কথায় ভরপুর ইশতেহার দিতে পারেন, গণতন্ত্রের প্রতিশ্র“তি শোনাতে পারেন, সংবিধান মানবাধিকার ইত্যাদি নিয়েও অনেক আকর্ষণীয় বক্তব্য দিতে পারেন।

কিন্তু সাম্প্রদায়িকতার প্রভাবিত রাজনৈতিক জোট দিয়ে কোনোভাবেই মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়, ১৯৭২-এর সংবিধান মোতাবেক রাষ্ট্র পরিচালনা করা সম্ভব নয়। কেননা এসব ভালো কাজ করার জন্য যে রাজনৈতিক শক্তির প্রয়োজন তা জামায়াত-বিএনপি দিয়ে সংঘটিত করা দিবাস্বপ্নের চাইতেও অকল্পনীয় বিষয়।

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আধুনিকায়ন, মানবিক মর্যাদাবোধ, নাগরিক অধিকার, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এক দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে ঘটানো যেতে পারে। সেটি মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী, অংশগ্রহণকারী, নতুন প্রজন্মে বিশ্বাসী মেধাবী দেশপ্রেমিক তরুণদের অংশগ্রহণে ঘটানো সম্ভব। এর জন্য চাই সেই দৃঢ় নেতা যা বঙ্গবন্ধু, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমেদসহ সেই প্রজন্মের অনেকের মধ্যেই ছিল।

কিন্তু পঁচাত্তরের হত্যাকান্ড পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমানের হাতে খন্ড-বিখন্ডিত রাজনৈতিক নেতৃত্ব, গড়ে তোলা স্বাধীনতাবিরোধীদের আশ্রয় শিবির বলে খ্যাত বিএনপি এবং এর সহায়ক শক্তির জামায়াতকে দিয়ে কোনোভাবেই বাংলাদেশে অখন্ড গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি।

তবে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গত প্রায় চার দশকের লড়াই-সংগ্রামে বাংলাদেশের রাজনীতিতে মুক্তিযুদ্ধের প্রাসঙ্গিকতা ফিরে এসেছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রভাব পড়েছে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়েছে।

মুক্তিযোদ্ধারা সম্মান ও মর্যাদায় বেঁচে থাকার সুযোগ পেয়েছেন, বাংলাদেশ আর্থসামাজিকভাবে গত দশ বছরে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ঘুরে দাঁড়ানোর চমৎকার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। বাংলাদেশ অসাম্প্রদায়িক গণতন্ত্রের ধারায় বিকশিত হওয়ার সম্ভাবনা একমাত্র শেখ হাসিনার কাছ থেকেই পেতে পারে। অন্য কোনো বিকল্প নেতা সেই প্রতিশ্র“তি ও স্বপ্ন এখনো দেখাতে পারেনি।

সুতরাং শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গঠিত রাজনৈতিক জোট নানা সীমাবদ্ধতার পরও বাংলাদেশে অসাম্প্রদায়িক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার এখনো যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। ড. কামাল হোসেন এবং তার সহযোগীরা শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে যে নির্বাচনী ঐক্যজোট গড়েছেন সেটি বিজয়ী হলে বাংলাদেশে অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক রাজনীতি টিকে থাকতে পারবে না যে তার প্রমাণ ড. কামাল হোসেনের বেশকিছু বেসামাল বক্তব্য এবং তার সঙ্গে থাকা ঐক্যফ্রন্টের কোনো কোনো নেতার ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্যে প্রচ্ছন্নভাবে পাওয়া যাচ্ছে।

যেখানে ৩০ ডিসেম্বরের পর খালেদা জিয়া মুক্ত হয়ে আসবেন, তারেক রহমান স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করবেন, নির্বাচন কমিশনসহ সব প্রতিষ্ঠান থেকে ঐক্যফ্রন্টবিরোধী শক্তিকে বিতাড়ন করা হবে, আওয়ামী লীগের হাজার হাজার নেতাকর্মী হয় দেশ ছাড়তে বাধ্য হবেন নতুবা তাদের হত্যা করা হবে বলে হুমকি দেয়া হয়েছে। এর সবই গণতন্ত্রবিরোধী শক্তির আস্ফালন মাত্র।

দেশে নির্বাচনের আগে এ ধরনের আস্ফালন ও আলামত যদি দেখতে হয় তাহলে নির্বাচনের পর ২০০১-২০০৬ সময়ের চাইতেও ভয়াবহ কিছু ঘটতে যাচ্ছে বলে অনুমান করা যাচ্ছে। দেশের মানুষ এসব বিষয় নিয়ে ভাববে এবং সিদ্ধান্ত নেবে।

লেখক ঃ অধ্যাপক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।

আরো খবর...