জামায়াতকে নিয়ে বিএনপির খেলা

॥ শেখর দত্ত ॥

বিপদে বন্ধুর পরিচয়। এই কথাটা কে না জানে! দুই বন্ধু ও ভল্লকের উপদেশমূলক সেই ছোট্ট গল্পটা ছেলেবেলায় সবাই কমবেশি শুনেছে বা পড়েছে। তাই সেই গল্পে না গিয়ে জামায়াত নিয়ে বিএনপির খেলা প্রসঙ্গে চলে গেলাম। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের দুই দল বিএনপি ও জামায়াত বন্ধু বলে যথাক্রমে জন্মলগ্ন ও পুনর্জন্ম থেকে সুপরিচিত। দেশের মুক্তিযুদ্ধে সর্বৈব বিরোধিতা, রাজাকার-আলবদর-আলশামস বাহিনী গঠন করে পাকিস্তানের হানাদার বাহিনীকে সহযোগিতা এবং ত্রিশ লাখ নিরীহ মানুষ খুন ও দুই লাখ মা-বোনের ইজ্জত লোটা প্রভৃতি জাতি ও জনবিরোধী কাজ করার ফলে স্বাধীন বাংলার মাটিতে জামায়াতের কবর রচিত হয়েছিল। কিন্তু রতনে রতন চিনে প্রবাদটা সত্য প্রমাণিত করে সামরিক কর্তা জিয়া ক্ষমতার খায়েশ চরিতার্থ তথা নিরঙ্কুশ ও চিরস্থায়ী করতে যখন বিএনপি দলটির জন্ম দেন, তখন রাজনীতির খেলা খেলতে জামায়াতকেও কবর থেকে তুলে এনে পুনর্জন্ম দেন। এই বিচারে পঁচাত্তর-পরবর্তী হত্যা-খুন-ক্যুণ্ডপাল্টা ক্যু এবং সামরিক শাসন ও লেবাসী গণতন্ত্রের জাতক হচ্ছে এই দুই রাজনৈতিক দল। তবে শুরুর দিকে দুদলের বন্ধন ছিল আড়ালে আবডালে। সঙ্গোপনে হতো দলীয় সমঝোতা। এর কারণ হচ্ছে স্বাধীন স্বদেশ প্রতিষ্ঠার পর কিছুদিন না যেতেই অস্ত্রের জোরে ক্ষমতা দখল করায় প্রেসিডেন্ট জিয়ার তখন মুক্তিযোদ্ধা পরিচিতিটা খুবই প্রয়োজন ছিল। কিন্তু কথায় বলে ভালোবাসা ও প্রেম কখনো গোপন রাখা যায় না। তাই বিএনপি ও জামায়াতের পারস্পরিক গভীর সম্পর্ক এক সময় প্রকাশ্য হয়ে পড়ে। নানা ঘাত-প্রতিঘাতের ভেতর দিয়ে প্রীতির সম্পর্ক চূড়ান্তে পৌঁছলে প্রকাশ্যে দুই দল বুকে বুক মিলিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা উপভোগ করে। বর্তমানে রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতের নিবন্ধন না থাকা সত্ত্বেও সম্পর্ক অক্ষুণ্ণ রেখে ২০ দলীয় জোটে আছে দুই দল। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে এই সম্পর্কের নয়-ছয় হচ্ছে, টানাপড়েন চলছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, বিএনপি ও জামায়াত দুই দলই আছে এখন মহাবিপদে। বিপদ দুই দল নিজেই ডেকে এনেছে। যা ছিল জন্ম ও কর্মের পরিণতিতে নিয়তির মতোই অনিবার্য। নিজেদের ওজন বুঝে উঠতে না পেরে ক্ষমতার মোহে মাত্রাজ্ঞান হারিয়ে কর্মকা- করতে গিয়ে দুই দলই এখন পড়েছে গাড্ডায়। প্রবাদ বলে, পিপীলিকা পাখা মেলে মরিবার তরে। ক্ষমতার বাড়াবাড়ি আসলেই পতন অনিবার্য করে তোলে। দুই দল ২০০১-০৬ ক্ষমতায় থাকার সময়ে রাষ্ট্র ও সমাজ জীবনের সব ক্ষেত্রে বাড়াবাড়িকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল। সেই দিনগুলোতে একদিকে হাওয়া ও খোয়াব ভবনের দুর্নীতি-লুটপাট আর অন্যদিকে কিবরিয়া-আহসানউল্লাহ মাস্টার-হুমায়ুন আজাদের মতো বিশিষ্ট রাজনীতিক ও বুদ্ধিজীবীদের খুন, বাংলাভাই-মুফতিগংদের মতো জঙ্গিদের উসকানি প্রশ্রয়, দশ ট্রাক অস্ত্র চোরাচালানি করে ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের কাছে পাঠানোর উদ্যোগ, উলফা নেতা রাজখোর-অনুপ চেটিয়াদের জন্য দেশের মাটিকে অভয়ারণ্য করে দেয়া, বিরোধী দল বিশেষত আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য জনসভা ও জমায়েতে গ্রেনেড-বোমা হামলা প্রভৃতি ঘটনাপ্রবাহে একে অন্যকে সহযোগিতা করেছে। আর পরে ক্ষমতার বাইরে গিয়ে যোগসাজশ করে প্রথমে ইয়াজউদ্দিনকে শিখ-ি সাজিয়ে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ করতে গিয়েছে আর পরে সংসদ, নির্বাচন ও নিমন্ত্রণ বয়কট করে পর পর দুবার আগুন সন্ত্রাস দিয়ে দেশকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে চেয়েছে। পাপ এক সঙ্গে করেছে দুদল। তাই দুর্ভাগ্য পিছু ছাড়ছে না বরং আরো বেশি বেশি করে অক্টোপাসের মতো জালে আটকা পড়ছে। বর্তমানে দুদলের মধ্যে কে বেশি আর কে কম বিপদে পড়েছে, তার এখনই হিসাব করা কঠিন এবং সময়েই তা বলে দেবে। তবে বাস্তবতার কারণে দুদলেরই এখন প্রয়োজন ছিল, বুকে বুক মিলিয়ে বন্ধুত্বকে আরো সুদৃঢ় ও সুগাঢ় করা। কিন্তু থলের ভেতর থেকে নখদন্তহীন দুই বিড়াল যেন কামড়াকামড়ি করে প্রকাশ্যে বের হয়ে আসতে চাইছে। জামায়াত সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রার্থী দিয়েছে। কেন্দ্রে দুদলের পারস্পরিক নানা প্রচেষ্টা ও ২০ দলীয় জোটের নানামুখী তৎপরতা সত্ত্বেও প্রার্থী সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। জানা যাচ্ছে মুরব্বি পাকিস্তান চেষ্টা করেও ঝগড়া সামাল দিতে পারছে না। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল আশা প্রকাশ করছেন, জামায়াত প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে বিএনপি প্রার্থীকে সমর্থন করবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তা গুড়েবালিসম বোধ হচ্ছে। এই অবস্থায় প্রশ্ন দাঁড়াচ্ছে, জন্ম ও পুনর্জন্মের পর থেকে বিএনপি ও জামায়াতের বন্ধুত্ব আসলেই কি গলায় গলায় ছিল? বন্ধুত্ব কি ছিল সেই দুই বন্ধু ও ভল্লুকের গল্পের মতো নাকি ঠিক এর উল্টো? দুদল নিজ নিজ লক্ষ্য-উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে একে অন্যের সঙ্গে বন্ধুত্ব রেখেছে নাকি এক অপরকে ব্যবহার করতে বন্ধুভাব বজায় রেখেছে? এটা ঠিক দুদলেরই ভাবাদর্শ ও রাজনীতির মূলে আছে পবিত্র ধর্ম, যা মুসলিম লীগের দ্বিজাতিতত্ত্ব থেকে এসেছে। এতদসত্ত্বেও দুদলের পার্থক্য আকাশ-পাতাল। ঠিক যেমন ছিল পাকিস্তানি আমলে সেনাশাসক আইয়ুব খানের মুসলিম লীগ ও মওদুদীর জামায়াতের। জামায়াতকে পাকিস্তানের মিলিটারি শাসকগোষ্ঠী বেআইনি করেছিল আবার উল্টোদিকে মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াত মিলিটারি শাসকদের দালালি করেছে। ওই সময়ের ঘটনা পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণে দেখা যাবে, সম্পর্কটা প্রগাঢ় বন্ধুত্বের ছিল না। ছিল পরস্পরকে ব্যবহার করে ফায়দা লোটার সংকীর্ণ ও হীনস্বার্থ চরিতার্থ করার লক্ষ্যে পরিচালিত। বাংলাদেশ আমলে উল্লিখিত প্রশ্নের এখনো মীমাংসা হয়নি। তবে অতীতের দিকে তাকিয়ে একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে, সুদীর্ঘ এই ৪২ বছরে রাজনৈতিক ডামাডোলের মধ্যে উল্লিখিত প্রশ্নগুলো বারবার উঠেছে। রাষ্ট্রপতি সেনানায়ক জিয়া জনগণের মতামতের প্রতি তোয়াক্কা না করে সামরিক ফরমান বলে জামায়াতকে পুনর্জন্ম দিয়েছিলেন। কিন্তু জিয়া নিহত হলে জামায়াত কৃতজ্ঞতার প্রতিদানে পুনর্জন্মদাতার জন্য কিছুই করেনি। পরে বিএনপির রাষ্ট্রপতি সাত্তার যখন সেনাকর্তা এরশাদের ধাক্কা খেয়ে এক কাপড়ে বঙ্গভবন থেকে বের হয়ে আসেন, তখনো জামায়াত-বিএনপির পাশে এসে দাঁড়াননি। সেই দিনগুলোতে পেট্রোডলারের বদৌলতে জামায়াত একদিকে পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেকে রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য করার আর অপরদিকে চরিত্র  বৈশিষ্ট্য বজায় রাখতে রগকাটার রাজনীতি অর্থাৎ দুই কৌশল নিয়ে অগ্রসর হয়েছে। স্বৈরাচারী এরশাদবিরোধী ৮ দল, ৭ দল ও ৫ দলের যুগপৎ আন্দোলনে জামায়াতের সুকৌশলে অংশগ্রহণের সময়কার ঘটনাপ্রবাহ স্মরণে আনলেই উল্লিখিত কথার প্রমাণ মিলবে। এই দুই কৌশলে জামায়াত সাফল্য পেয়েছে। কেন পেয়েছে তা বিবেচনায় নিতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দল দুটির সবলতা ও দুর্বলতা অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আলোচনার দাবি রাখে। আওয়ামী লীগের রাজনীতির সবলতার এমনই ধারা যে, এই দলের বামে কোনো দলই জনসমর্থন নিয়ে দাঁড়াতে পারেনি। কিন্তু বিএনপির ডানে জনসমর্থন নিয়ে দাঁড়াতে পেরেছে জামায়াত। এমনকি কখনো বা চ্যালেঞ্জ করতে পেরেছে জাতীয় পার্টি। বেশি কথায় না গিয়ে বলা যায়, জাতীয় রাজনীতির মূলধারা হওয়াই এমন সবলতা আওয়ামী লীগের। আর প্রধান দল হলেও দুর্বলতা থাকায় জাতীয় মূলধারার বিপরীতে প্রতিক্রিয়ার একমাত্র ও প্রধান ধারা কখনো হয়ে উঠতে পারেনি বিএনপি। হবে কীভাবে? বাম-ডান দলছুট সুবিধাবাদী সুযোগসন্ধানী ক্ষমতালিপ্সুদের নিয়ে যে গঠিত হয়েছে এবং চলমান রয়েছে বিএনপি। বলাই বাহুল্য থলের ভেতরে একত্রে থাকলেও সঙ্গত কারণেই একানব্বইয়ের নির্বাচনের আগে বিএনপি ও জামায়াত তেমনভাবে পরস্পর পরস্পরকে প্রকাশ্যভাবে ব্যবহার করতে পারেনি। ১৯৯১-এর নির্বাচনে জামায়াত আলাদা নির্বাচন করে ১৮টি আসন পেলে শুরু হয় পরস্পরের দেয়া-নেয়ার খেলা। ওই নির্বাচনে ক্যান্টনমেন্টভিত্তিক দল বিএনপি নানা তাল করেও অর্ধেক আসন লাভ করতে ব্যর্থ হয়। তখন বিএনপির ক্ষমতায় বসার জন্য দুটো অপশন সৃষ্টি হয়। জামায়াতের সমর্থন অথবা ৮ দলের কয়েকটি দলের সমর্থন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে তখন ৮ দলের শরিক ৪ দল গণতন্ত্রী পার্টি, বাকশাল, ন্যাপ ও সিপিবি অবস্থান গ্রহণ করে এই বলে যে, বিএনপি সংসদীয় পদ্ধতিতে রাজি হলে তারা বিএনপিকে সমর্থন করবে। ঘটনার মধ্যে ছিলাম বলে নির্দ্বিধায় বলতে পারি, মূলত সিপিবির এমপিদের অবস্থান ও তৎপরতার কারণে এই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। সর্বোপরি নির্বাচনে সর্বাধিক আসন পেয়ে বিএনপি সুযোগ থাকতে জামায়াতকে বাদ দিয়ে ওই চার দলের সমর্থন নিতে চায়নি। জামায়াতও এক পা এগিয়েই ছিল। ওই দলের সমর্থন নিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় আসে। প্রতিদানে জামায়াত বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পায় ২টি মহিলা সংরক্ষিত আসন এবং দালাল কমিটির সক্রিয় সদস্য আব্দুর রহমান বিশ্বাস রাষ্ট্রপতি হয়। তবে জামায়াতের খাইখাই আর বিএনপি একলা খাইখাই প্রচেষ্টার বাড়বাড়ন্ত হলে পরবর্তী সময়ে বিএনপি-জামায়াত সম্পর্কের ফাটল ধরে। ১৯৯৩ সালের সেপ্টেম্বরে বিএনপি সদস্যরাও জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার দাবি তোলে সংসদে। এদিকে জামায়াতও চায় বিএনপিকে উচিত শিক্ষা দিয়ে জাতে উঠতে। প্রসঙ্গত রাজনীতির একটি স্বতঃসিদ্ধ বিষয় হচ্ছে, ভালো-মন্দ, শুভ-অশুভ, নৈতিক-অনৈতিক, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া যাই হোক না কেন, রাজনীতিতে প্রতিদ্বন্দ্বী দুপক্ষ সব সময় চাইবে একে অপরের ফাটল ব্যবহার করতে। এই কৌশলের পরিণতিতে সংসদের ভেতরে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যু নিয়ে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের মধ্যে ঐক্যের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। যা ছিল এই পর্বে দেশের রাজনীতির সবচেয়ে বিপরীতধর্মী ও দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা। তবে বৃক্ষের পরিচয় হচ্ছে ফলে। এই কৌশল কার্যকর করে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগ ১৯৯৬-এর জুনে নির্বাচন করে ২১ বছর পর ক্ষমতায় আসে। বিএনপি হয় পরাজিত আর জামায়াত-বিএনপিকে শিক্ষা দিতে গিয়ে নিজেই উচিত শিক্ষা পায়। জাতে ওঠার কৌশল নিয়ে জনসমর্থন হারিয়ে জামায়াত পায় মাত্র ৩টি আসন আর রাজাকার-আলবদর-আলশামসদের শনি আওয়ামী লীগ আসে ক্ষমতায়। ওই নির্বাচন থেকে একদিকে শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা আর অন্যদিকে দেশি-বিদেশি মুরব্বিদের পরামর্শে বিএনপি ও জামায়াত স্থায়ী ঐক্য গড়ে তোলে এবং ৪ দলীয় জোট গঠন করে ২০০১-০৬ ক্ষমতা ভাগাভাগি করে। আর এখনো ধরে রেখেছে সেই ঐক্য। কিন্তু অবস্থা পর্যবেক্ষণে এটা সুস্পষ্ট, মূলত ও প্রধানত বিএনপির তথাকথিত ‘জাতীয় ঐক্য’-এর অবস্থান ও তৎপরতা বিএনপি-জামায়াতের ঐক্যকে আবারো প্রশ্নের মুখোমুখি করে দিয়েছে। প্রসঙ্গত বিএনপি দলটি এখন রাজনৈতিক ও সাংগঠনিকভাবে ছাত্রখান আর তাতে রয়েছে নানা গ্র“প ও সাবগ্র“প। মোটাদাগে বিএনপি দলটি এখন দুভাগে বিভক্ত। একটি নির্বাচনপন্থি অপরটি নির্বাচন বয়কটপন্থি। নির্বাচনপন্থিদের মধ্যে রয়েছে আবার সাবগ্র“প। এক গ্র“প জামায়াতকে সঙ্গে রেখে নির্বাচনের পক্ষে আর এক গ্র“প জামায়াতকে বাদ দিয়ে সরকারবিরোধী এ টু জেড ঐক্য অর্থাৎ ‘জাতীয় ঐক্য’ করার পক্ষপাতি। এর মধ্যেও আবার রয়েছে গ্র“পিং। একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করে নির্বাচনে যাওয়ার কথা বলেন। আর মওদুদ জাতীয় ঐক্যের আওয়াজ তুলে বলেন, ‘সরকারকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে উৎখাত করা সম্ভব হবে না, তাই জাতীয় ঐক্য করে মাঠে নামতে হবে।’ অর্থাৎ জামায়াতকে বাদ দিয়ে নির্বাচনপন্থি গ্র“পে আছে নিয়মতান্ত্রিক ও অনিয়মতান্ত্রিক গ্র“প। এই দুগ্র“প জামায়াতকে দুই উদ্দেশ্য নিয়ে বোঝাতে চায়, কৌশল বাস্তবায়নের জন্য তোমরা বাইরে থাক। কৌশল সফল হলে আবার আমরা বুকে বুক মিলাব। বিএনপির এই লাইনে তৎপরতা থাকার কারণেই দেখা যাচ্ছে, গণফোরাম, বিকল্প ধারা, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, জাসদ রব নাগরিক ঐক্য ইত্যাদি দল উন্মুখ হয়ে বসে আছে কবে জামায়াত বাদ যাবে আর তারা বিএনপির সঙ্গে জাতীয় ঐক্য করবে। এমন সব রাজনৈতিক মুভ সুস্পষ্ট হলেও কোনো মহল বিএনপির কোনো গ্র“পকে কীভাবে খেলাচ্ছে, তা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে অনুধাবন করা খুবই কঠিন। তবে এ ধরনের একঘরে হয়ে যাওয়ার মতো তৎপরতা জামায়াত মানতে পারে না। মূলত ও প্রধানত এর ফলেই জামায়াত সিলেটে প্রার্থী দেয়াসহ নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে বিএনপিকে বুঝাতে চাইছে, যদি আমাকে একঘরে করতে চাও, তবে ১৯৯১-৯৬ সময়ের মতো পরিস্থিতি হবে। নির্বাচনের আগেই ভোটের যোগফলের অঙ্কে হেরে যাবে। এই অবস্থায় বিএনপি দশা হচ্ছে শ্যাম রাখি না কুল রাখির মতো। ভোটার আছে দল জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে ২০ দলীয় জোট রাখবে নাকি জামায়াত বাদে ভোটারবিহীন দলগুলোকে নিয়ে ‘জাতীয় ঐক্য’ করবে, এই নিয়ে বিএনপির নির্বাচনপন্থি অংশ আছে বিপাকে। জামায়াত নিয়ে বিএনপির এই খেলা আওয়ামী লীগ কীভাবে সামাল দিবে, তা দিয়ে নির্বাচন পর্যন্ত আগামী দিনগুলোর রাজনৈতিক গতিধারা অনেকটাই নির্ধারিত হবে। শেখর দত্ত : রাজনীতিক, কলাম লেখক।

আরো খবর...