জাতীয় শোক দিবস

আজ বাঙালির শোকের দিন ১৫ আগস্ট। ১৯৭৫ সালের এই দিনে ইতিহাসের নৃশংসতম হত্যাকান্ডে সপরিবারে প্রাণ হারান জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। গভীর শোক ও শ্রদ্ধার সঙ্গে আমরা আজ তাঁদের স্মরণ করছি। মর্মস্পর্শী এ হত্যাকান্ডের আজ ৪২ বছর পূর্ণ হলো। এ হত্যাকান্ডের বিচারের বাণী নীরবে-নিভৃতে কেঁদে ফিরেছে প্রায় তিন যুগ। ঘটনার ৩৪ বছর পর গত ২০১০ সালে প্রত্যক্ষ ঘাতকদের কয়েকজনের ফাঁসি হয়েছে। এতে কিছুটা হলেও জাতি গ্লানিমুক্ত হয়েছে। তবে এখনো মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত কয়েকজন ঘাতক বিদেশে পালিয়ে রয়েছে। অন্যদিকে এত বড় একটি হত্যাকান্ড কেবল কয়েকজন খুনির কাজ ছিল না, এর নেপথ্যে ছিল দেশীয় ও আন্তর্জাতিক গভীর চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র। সেসব চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র কিন্তু আজো উন্মোচিত হয়নি, শনাক্ত হয়নি হত্যার ষড়যন্ত্রকারীরা, নেপথ্য নায়করা। অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক স্বদেশ গড়ার যে লক্ষ্য ও আদর্শকে সামনে রেখে বাংলাদেশের অভ্যুদয়, সেই স্বপ্ন-সম্ভাবনাকে ধ্বংস করে দেশকে আবার সাম্প্রদায়িক পাকিস্তানের পথে ফিরিয়ে নেয়ার লক্ষ্য নিয়েই ঘটানো হয়েছিল ১৫ আগস্টের ট্র্যাজেডি। ঘাতকদের লক্ষ্য ছিল শুধু বঙ্গবন্ধু পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করাই নয় বরং মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের বাংলাদেশটাকেই ধ্বংস করে দেয়া। তাই তো ১৫ আগস্টের ধারাবাহিকতায় একই বছরের ৩ নভেম্বর কারা অভ্যন্তরে হত্যা করা হলো বঙ্গন্ধুর ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহচর চার জাতীয় নেতাকেও। ১৯৭১-এর পরাজিত শক্তির প্রতিশোধ গ্রহণের যে প্রক্রিয়া সে সময় অঙ্কুরিত হয়েছিল তারই একটি ভয়ঙ্কর পরিণতি ঘটে ১৫ আগস্টে। স্বাধীন বাংলার স্থপতিকে হত্যার পর ক্ষমতা দখলকারীরা খুনিদের যাতে বিচার না হয় সেজন্য ইনডেমনিটি (দায়মুক্তি) অধ্যাদেশ জারি করে। স্বঘোষিত খুনিরা পরবর্তী সময়ে নির্বিঘেœ পালিয়ে থাকার সুযোগ পায়। এদের কেউ কেউ বিদেশে মিশনে চাকরি পেয়ে পুরস্কৃত হয়। ১৯৯৬-এ আওয়ামী লীগ সরকার কর্তৃক দায়মুক্তি অধ্যাদেশ বাতিলের আগ পর্যন্ত ২১ বছর স্বঘোষিত খুনিরা বিচারের আওতা থেকে মুক্ত থাকার সুযোগ পেয়েছিল। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ই প্রথম এর বিচার কার্যক্রম শুরু হয়। ১৯৯৮-এ দায়রা জজ আদালতের দেয়া ১৫ জনের মৃত্যুদন্ডের রায় পরবর্তী সময়ে হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চে পুনর্মূল্যায়িত হয় এবং ১২ জনের মৃত্যুদন্ডাদেশ বহাল রাখা হয়। এরপর বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে আপিল বিভাগে একজন বিচারকের অভাবে দীর্ঘ ৫ বছর ঝুলে থাকে মামলাটির আপিল শুনানি। পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর হাইকোর্টে আপিল বিভাগে একজন বিচারক নিয়োগের ফলে মামলাটির শুনানির পথ উন্মুক্ত হয় এবং পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মামলাটির কার্যক্রম পুনরায় শুরু হয় এবং এর চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়। তবে এখনো সব ঘাতকের দন্ড কার্যকর হয়নি। পলাতক খুনিদের খুঁজে দেশে ফিরিয়ে এনে তাদের মৃত্যুদন্ড কার্যকরের ব্যবস্থা নিতে হবে। জাতির জনককে সপরিবারে হত্যা শুধু কিছু বিপথগামী সেনাসদস্যের কাজ নয়, এর নেপথ্যে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের কিছু তথ্য উঠে এসেছে দেশি-বিদেশি গবেষক সাংবাদিকদের লেখায়। দাবি উঠেছে একটি কমিশন গঠন করে এ ব্যাপারে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করার এবং চক্রান্তকারীদেরও বিচারাধীন করার। আমরা চাই সরকার এ লক্ষ্যে উদ্যোগ নিক। কারণ ১৫ আগস্টের হত্যাকান্ড শুধু ব্যক্তি মুজিব ও তাঁর পরিবারকে হত্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। এর ধারাবাহিকতায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক চার জাতীয় নেতাকে হত্যা করা হয় ও সংবিধান ছেঁটে দেশকে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী ধারায় ফিরিয়ে নেয়ার চেষ্টা চলে। সে ষড়যন্ত্র, সে অপচেষ্টা এখনো বলবৎ। একই লক্ষ্য ও চক্রান্তের পথ ধরে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে গেছে ২১ আগস্টসহ আরো কিছু হামলা-হত্যাকান্ড। কাজেই জাতীয় নিরাপত্তা এবং মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে সুরক্ষার জন্যই দরকার মুজিব হত্যা ষড়যন্ত্রের উন্মোচন ও তার মূলোৎপাটন।

আরো খবর...