জন্মগত অধিকার

মায়ের দুধে শিশুর জন্মগত অধিকার। জন্মের পর পরই নবজাতককে মায়ের দুধ পান করানো হলে শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। অপুষ্টিতে আক্রান্তের সম্ভাবনা দূরীভূত হয়। অন্যদিকে মায়ের শরীর-স্বাস্থ্যও ভাল থাকে। গত ২ আগস্ট থেকে পালিত বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ উপলক্ষে যে বার্তাটি পাওয়া গেছে, তা হলো, গত কয়েক বছরে দেশে শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়ানোর হার বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্রেস্ট ফিডিং ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে দেশে দু’বছর পর্যন্ত মায়ের বুকের দুধ পান করানো শিশুর সংখ্যা পৌঁছেছে ৮৭.৩ শতাংশে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। বিশ্বে মাতৃদুগ্ধ পানের ক্ষেত্রে প্রথম ও দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে শ্রীলঙ্কা ও কিউবা। তবে মা ও শিশুস্বাস্থ্যের অপুষ্টির বিষয়টি এখনও রয়ে গেছে। প্রসূতি মৃত্যুর হারও কমেনি। অন্যদিকে ৫ বছর বয়সী অর্ধেক শিশু ভূগে থাকে অপুষ্টিতে। দেশে প্রতিদিন প্রায় ১৬ নারী মারা যান সন্তান প্রসব করতে গিয়ে। এই হিসাবে প্রতিবছর ৫ থেকে ৭ হাজার নারীর মৃত্যু ঘটে, যাকে বলে প্রসূতিমৃত্যু। বাংলাদেশ বিশ্বে নারীর ক্ষমতায়নে অনেকটা অগ্রসর হলেও অনেকাংশে পিছিয়ে আছে এদিক থেকে, যা হতে পারে এসডিজি বা টেকসই উন্নয়নে প্রতিবন্ধক। সমাজে প্রচলিত নারীর প্রতি  নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, বাল্যবিবাহ, কুসংস্কার ও অজ্ঞানতা, ক্ষুধা ও অপুষ্টি, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার অপ্রাপ্তি সর্বোপরি সন্তান প্রসবে অপর্যাপ্ত সুযোগ ও অকারণে সিজার প্রধানত প্রসূতি নারী ও শিশুর অকালমৃত্যুর অন্যতম কারণ। তদুপরি দেশে সরকারীভাবে স্বাস্থ্যসেবার ব্যয়ও খুব কম, জিডিপির শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ মাত্র। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বাজেট বরাদ্দে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ জিডিপির ৫ শতাংশ হওয়া বাঞ্ছনীয়। মা ও শিশুস্বাস্থ্য সুরক্ষায় এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যায় জাতিসংঘ নির্দেশিত মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল (এমডিজি) অর্জনের কারণে বাংলাদেশ সারাবিশ্বে প্রশংসিত হলেও অদ্যাবধি কিছু সমস্যা রয়ে গেছে। এর অন্যতম হলো পর্যাপ্ত খাদ্যের অভাব তথা পুষ্টি সমস্যা। জাতীয় পুষ্টি কর্মপরিকল্পনা (২০১৬-২০২৫)-এর চূড়ান্ত খসড়ায় যে তথ্য উঠে এসেছে তা হলোÑ দেশের ১৮ শতাংশ গর্ভবতী মা অপুষ্টির শিকার। আর প্রধানত অপুষ্টির কারণে ২৩ শতাংশ শিশু জন্ম নিচ্ছে প্রয়োজনের চেয়ে কম ওজন নিয়ে। আরও যা উদ্বেগজনক তা হলো, শহরের বস্তি ও গ্রামাঞ্চলে মাসহ শিশু পরিচর্যাকারীর ৭৩ শতাংশই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে না। এসবের পেছনে আর্থিক দৈন্য, বাল্যবিয়েসহ নানা কুসংস্কারও বিদ্যমান। সন্তান প্রসবে অকারণে সিজারসহ হাতুড়ে চিকিৎসক তথা দাইয়ের হস্তক্ষেপও কম দায়ী নয়  কোন অংশে। ফলে প্রসূতি মৃত্যুর হার বেড়েছে। ২০৩০ সাল নাগাদ এসডিজি অর্জন করতে হলে এসবই দূর করতে হবে পর্যায়ক্রমে। প্রধানত মায়ের অপুষ্টির কারণে শিশু মাতৃদুগ্ধ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়।  সেক্ষেত্রে মা ও শিশুর পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমান সরকারের অনেক সমুজ্জ্বল সাফল্যের অন্যতম একটি  দেশব্যাপী কমিউনিটি ক্লিনিক। সম্প্রতি এটি পেয়েছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, বিশেষ করে বিশ্বব্যাংকের মতো সুবৃহৎ বহুজাতিক দাতা সংস্থার। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সার্বিক স্বাস্থ্যখাতের উন্নতিতে ‘অসাধারণ ভূমিকা’ রাখছে কমিউনিটি ক্লিনিক। স্বাস্থ্য খাতে অভাবনীয় উন্নতির উল্লেখ করে সংস্থাটি বলেছে, এটি সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করেছে। এর ফলে নবজাতক ও শিশুমৃত্যু, মাতৃমৃত্যু, প্রজনন হার নিয়ন্ত্রণসহ ১০টি সূচকে সন্তোষজনক অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন প্রতিবেদনে অবশ্য কয়েকটি চ্যালেঞ্জের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দারিদ্র্য, চিকিৎসা উপকরণের অভাব, বিভিন্ন রোগের প্রকৃতির পরিবর্তন ইত্যাদিকে চিহ্নিত করা হয়েছে। মা ও শিশুর অপুষ্টির কথাও বলা হয়েছে। তদুপরি নগরায়ণ ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির সমস্যা তো আছেই।  সে অবস্থায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোয় প্রশিক্ষিত ধাত্রীসহ সেবার মান বাড়ানো গেলে নারীর অপুষ্টিজনিত সমস্যাসহ প্রসবজনিত জটিলতা ও মাতৃমৃত্যুসহ শিশুমৃত্যুর হার আরও কমে আসবে নিঃসন্দেহে।

আরো খবর...