জনগণের ভয় ও শঙ্কা তাড়াতে হবে

॥ শহীদ ইকবাল ॥

এখন তেমন কোনো সংবাদ নেই। আসন্ন তিন সিটির নির্বাচন নিয়ে গড়পড়তা কিছু সংবাদ চোখে পড়ছে। কিন্তু প্রচুর সংবাদ জন্ম নিচ্ছে প্রতিনিয়ত- মানুষের মনে, শহরে-বন্দরে, ঘরে-বাইরে। তুচ্ছ কিছু সংবাদ কিন্তু তা খুব আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ার মতোও বলা যায়। যেমন বড়পুকুরিয়ায় ২৩০ কোটি টাকা মূল্যের ১ লাখ ৪৪ হাজার ৬৪৪ টন কয়লা উধাও; আবার বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে সোনা থাকা না থাকা ‘গুজব’ ইত্যাদি। চলছে এখন সিটি নির্বাচনের মারমুখী হাওয়া। নিশ্চয়ই প্রাধান্য পেয়ে আছে সরকারি প্রতীক নৌকা। নির্বাচন কমিশন বলছে, এবার গাজীপুর-খুলনার চেয়েও ‘বেটার’ নির্বাচন হবে। রাজশাহীর মতো এলাকায় নির্বাচন তারিখ ও প্রতীক বরাদ্দের মধ্যেই সর্বত্র ছেয়ে গেছে নৌকার প্রতীক; পোস্টারে-ব্যানারে। এমনটা কী সরকারের উন্নয়ন ঢাকের জনজোয়ারের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থনও মিলছে সর্বত্র। নির্বাচনমুখী আমেজ এখন সর্বত্র। মানুষের কাজকর্মে নির্বাচনের আলাপ, অভিব্যক্তি প্রকাশ্য প্রায়। সেটা মূল কথা নয়। কিন্তু প্রশ্নটি অন্য জায়গায়। বাস্তবে থাকলে এবং বাস্তবত ঘটলে আমার মতো চালচুলোহীন একজন কর্মী-সমর্থক যারপরনাই তো খুশিই হবে। কিন্তু খুশিটার পেছনে ঠিক শঙ্কা ও ভয় যেন অদৃশ্যমান নয়। এত অধিক সমর্থন, একই দলের (দাবি করা) একাধিক কমিশনার প্রার্থী, ম্রিয়মাণ অপজিশন, মনে মনে ক্ষোভ আর আক্রোশ নিয়ে নিজের স্বার্থপরতার কোণে আশ্রয় করে আছেন যেন অনেকেই। কেউ বলেন, ভোট আবার কী, নৌকা তো হয়েই আছে। কেউ বলে ও তো জিতেই গেছে। এগুলো কানকথা নয়। ভোটের বাজারে চোখে পড়ছে এমন অনেক কিছু। পুলিশের লোক, বিভিন্ন সংস্থার লোকজন ভোট নিয়ে নানারকম কাজ করছেন। তারা এজেন্ট, পোলিং অফিসার, প্রিসাইডিং অফিসার দেবেন। তাদের আমলনামাও গোনা হচ্ছে। এ সব করতে গিয়ে অনেকেই বিরক্তও হচ্ছেন। কোনো ক্ষেত্রে বেশি মাত্রার বাড়াবাড়ি শোনা যায়। নির্বাচনটাকে ছেড়ে দেয়ার কোনো প্রশ্ন নেই যেন। কিন্তু কাজটা দলীয় হোক। তরতাজা হোক। গণতন্ত্রমাফিক হোক। মানুষের কাঙ্খিত ইচ্ছার বাস্তবায়ন হোক। স্বপ্নের ও ফলের প্রতিফলন ঘটুক- সেটা সবাই চায়। কিন্তু এর বিপরীতে বাড়াবাড়ি রকমের কিছু হলে- দায় তো অস্বীকার করা যায় না। সেই ভয়টা যেন গড়িয়ে কোনো সার্বিক কিছু ক্ষতি না করে। সে আশঙ্কাটাই করি। কারণ এই মুহূর্তে সরকারে অতি উৎসাহী লোকের সংখ্যা বেশ বেড়ে গেছে। সরকারের দল, নিষ্ঠাবান-ত্যাগী কর্মী, অভ্যন্তরে ভিশনারি বুদ্ধিশীল মেধাবী মানুষের অভাব অকুণ্ঠভাবে পরিলক্ষিত। অনেক বাজে, ‘হাইব্রিড’ ক্যারিকেচার চলছে যেন। তার বহিঃপ্রকাশ নানাভাবে চোখেও পড়ছে। হোক তা ভোটের মাঠে কিংবা বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে।

এখনো মানুষের চোখ ভেজে শেয়ার বাজারে কোটি কোটি টাকা লোপাটের ঘটনায়। অনেকের শ্রম-ঘাম কষ্টের টাকা ওতে ছিল। এরপর ব্যাংক কেলেঙ্কারির ঘটনা। খেলাপি ঋণের অপতৎপরতা। ঋণখোররা ঋণের টাকা ফেরত দেন না। ডেসটিনি কেলেঙ্কারি তৃণমূল মানুষের মন থেকে এখনো যায়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রা পাচারের ঘটনা ইত্যাদি ব্যাপার ছাপিয়ে এখন কয়লা কেলেঙ্কারি আর ব্যাংক ভল্টের সোনার নয়ছয় করার বিষয় বেশ আলোচিত হচ্ছে। এগুলো অর্থনীতির বড় জটিল হিসাব-নিকাশ। কিন্তু জনতা যাবে কোথায়! সরকারের ব্যাংক পলিসি যেমনই হোক কিন্তু সুদের হার থেকে আরম্ভ করে ব্যাংক ব্যবস্থাপনার নানা বিষয়ে বেশ অদক্ষতার কথা প্রায়ই শোনা যায়। এ নিয়ে সরকার পরিষ্কার করে কিছু বলেও না। ব্যাংক নীতি নিয়ে অর্থমন্ত্রী প্রেস-মিডিয়ায় কিছু হৈ  চৈ করে থেমে যান, তারপর আবারো আর একটি ঘটনা ঘটে। এই চলছে। এখন ভল্টের সোনা বিষয়ক ব্যাপার বেশ মুখরোচক হয়ে চলছে। সবকিছু মিলে একটা ঘোলাটে ব্যাপার মনে হয়। সরকার টানা দশ বছর পার করছে, এবার নির্বাচনের বছর- এ নিয়ে দলে নবীন-প্রবীণ দ্বন্দ্বও কম নয়। বস্তুত সব ক্ষেত্রেই হস্তক্ষেপ প্রত্যাশিত হয়ে উঠছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর। এটা কোনো ব্যবস্থাপনার সমাধানের কৌশলও নয়, পথও নয়। সবকিছুতে একজন প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ করতে হলে, বিষয়টি সুখকর নয়। নইলে যে সমাধানও হয় না, কারো কথা কেউ শোনে না! ছাত্রলীগ সামলানো নিয়ে দলের সাধারণ সম্পাদক নিয়ন্ত্রণ ও দায়ের কথা বলেছেন। কে নিয়ন্ত্রণ করবে? এর দায় কার? কেন ছাত্রলীগ কারো কথা কথা শুনছে না? এখানেও কী নেত্রীর হস্তক্ষেপ লাগবে? এভাবে কয়লা চুরির ঘটনার তদন্তেরও নির্দেশ দিতে হয় প্রধানমন্ত্রীকে। তখন প্রশ্ন আসে, পেট্রোবাংলা কী করে! জ্বালানিমন্ত্রীর কাজ কী? বিষয়গুলো এভাবে এককেন্দ্রিক ও এক ব্যবস্থামুখী ক্রনিক কৌশলে পরিণত হয়েছে এখন। এভাবে কী রাষ্ট্রের সমস্যার সমাধার করা সম্ভব! রাষ্ট্র কী এভাবে চলতে সক্ষম। রাষ্ট্র তো ব্যক্তি নয়। যে কাঠামো ও ছকে সরকার পরিচালনা হয়, সেখানে অথরিটিশিপ থাকাটা জরুরি। তা থাকার কথাও। সেটি এতদিনে হয়নি। দক্ষ ও নৈপুণ্যতা তো দূরের কথা। কিছুতেই কোথাও তা পরিলক্ষিত হচ্ছে না। না দলে, না প্রশাসনে, না সরকারের অভ্যন্তর কাঠামোয়। একজন সভানেত্রী, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী- তার তো চিন্তা-কাঠামো অনেক সুদূরপ্রসারী এবং সেটি হওয়ার জন্য তো তাকে চিন্তার সময় দিতে হবে।

আমাদের সর্বস্তরে নৈরাজ্য ও নিয়ন্ত্রণহীনতা, লা-জওয়াব কৃষ্টির কারণেই এমনটা হচ্ছে। এখন সেটি আরো ভয়ানক রূপ নিচ্ছে বলে মনে হয়। সেজন্য ভয় ও আশঙ্কা বাড়ছে। এখন ক্ষমতায় থাকা না থাকায় মনোযোগী হওয়ার চেয়ে সামগ্রিক সাংগঠনিক কাঠামোর অগ্রগতির বিষয়টি যাতে ঝুঁকিতে না পড়ে সেটাতেই অধিক মনোযোগী হওয়া জরুরি। কারণ সাংগঠনিক ব্যবস্থাপনা কঠোর ও স্বচ্ছ হলে অনেক কিছুই টিকে থাকা সহজ। এক্ষুনি সরকারকে সে বিষয়ে আরো সতর্ক হতে হবে। কোনো গভীর খাদে যাতে আমরা পড়ে না যাই। এটা আশঙ্কার যে, শুধু মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নয়, আমাদের প্রগতিপন্থার সবটুকু যদি খসে পড়ে তবে তার পরিণতিতে আমরা কেউই রেহাই পাব না। প্রসঙ্গত, আজকে আফগানিস্তান, পাকিস্তান এমনকি মধ্যপ্রাচ্যে সিরিয়া ইরাকের কিংবা মিসর-লিবিয়ার কী পরিণতি- কল্পনা করা যায়! আমাদের সুন্দর বাংলাদেশকে আমরা সেদিকে ঠেলে দিতে চাই না। মুষ্টিমেয় মানুষের স্বার্থে বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থকে কিছুতেই জলাঞ্জলি দেয়া যাবে না। এখনই তা রুখতে হবে। দুর্নীতির বোঝা নামাতে হবে। পার্টির নামে, ক্ষমতার নামে, সরকারের নামে কোনো অন্যায় বদাস্ত করা ঠিক হবে না। অতি-উৎসাহীদের আস্থায় নেয়া যাবে না। এখন কোথাও বিরোধীদের দেখা যায় না! বঙ্গবন্ধু হত্যার একুশ বছর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। দেশে দশটি সংসদ নির্বাচন হয়ে গেছে। আওয়ামী লীগের বাইরে একটি অংশের সমর্থকগোষ্ঠী আছে- তারা এখন কোথায়! যারা ধর্মানুসারী দল, উগ্র ডানপন্থি দল, আটের দশকের রাজনীতিতে  স্বৈরশাসনের পৃষ্ঠপোষণার যারা সক্রিয় ছিল তারা এখন কোথায়! সব কী নৌকার গণজোয়ারে বশীভূত হয়ে গেল? এই প্রশ্নটি করি। এই গণজোয়ার কী প্রকৃত মতাদর্শদের বা আনন্দ ও সাফল্যের? সেটি চিহ্নিত করাটাও এখন জরুরি। বাংলাদেশের দীর্ঘ সময়ের ইতিহাসে অনেক পরিবর্তন চোখে পড়েছে। অনেক স্মৃতিও আছে। যারা অভিজ্ঞ, দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তাদের এসব স্মৃতি নিরপেক্ষতার আয়নায় যাচাই করা প্রয়োজন। নইলে দুঃসময় তৈরি হলে কাউকেই কিন্তু পাওয়া যাবে না। নিশ্চয়ই আমরা কেউই চাইব না উন্নয়নের ধারা বেপথু হোক। অন্য কোনো অন্ধকার পরিণতি আমাদের নেমে আসুক। কিন্তু আবেগ ও অতিশয় আস্থায় তার মূল্য গুনলে কিন্তু চলবে না। বাস্তব অবস্থাটা বিচার করতে হবে। বাস্তবতার চোখে কঠোর সিদ্ধান্তটি নেয়া চাই। কারণ আওয়ামী লীগ পুরনো দল, সে দলের সমর্থক এবং নির্বাচনী অভিজ্ঞতা বেশি থাকবে, সমর্থকও বেশি কিন্তু সেটি যেন উল্টে না যায়! সত্যিকার অর্থে, যখন দেখা যায়, কোথাও বিরোধী দল নেই, বিরোধীরা তৎপর নয়, বিপরীতে ক্ষমতাসীনরা অধিক উন্মত্ততায় উল্লসিত, তখন কে আপন আর কে পর তাও চিহ্নিত করা মুশকিল হয়ে যায়- তখন ভয় আর আশঙ্কা চেপে বসে। ‘অর্থ’ ও ‘নীতি’ কিন্তু এক নয়। অর্থ দিয়ে নীতি-আদর্শ কেনা যায় না। অর্থই অনর্থের মূল। সুতরাং সতর্কতাটা ওখানেই যে, দল কারা চালায়, সাংসদ কারা, তৃণমূলের নেতৃত্ব কে পাচ্ছে, প্রকৃত শিক্ষিত ও আস্থাশীল ব্যক্তি দলের প্রতীকটি বহন করছেন কিনা; তিনি কী ধরনের সংগঠক- সেটি বাছাই করাটাই সংগঠনের কাজ। সংগঠক সেটিই করবেন। আওয়ামী লীগ সেই সংগঠনের ধারায় সচল ও প্রবহমান একটি দল। সেটি ভূলে গেলে চলবে না। যে কোনো মূল্যে তা রক্ষা করতে হবে। আর সহজ পথই সবকিছু রক্ষার সহজ উপায়।

দশ বছর প্রশাসন চালানোর ফলে স্বভাবতই অনেক ময়লা জমে যায়। এই ময়লা এখন দূর করাও জরুরি। অনেক ক্ষেত্রে সিন্ডিকেট তৈরি হয়ে গেছে। নানারকম তার আকার-আকৃতি, প্রকৃতি। রংও তার নানা রকমের। এ থেকে এক্ষুনি বেরুতে হবে। নইলে খাদের কিনারে যে ভয় ও আশঙ্কা তা দূর হবে না। এ জন্য সবাইকে ঐক্য থেকে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ও আদর্শের পক্ষে থেকে কাজ করতে হবে। অবস্থান নিতে হবে। এটিই সহজ ও সরল পথ। এবং প্রশাসনও সব দুর্নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়াবে। ন্যায়ভিত্তিক সুশাসন আসলে অনেক কিছুই সহজ করে দেয়। অনেক দিক অভিপ্রেত হতে তখন বাধ্যও হয়। জয় তো শুধু আক্ষরিক অর্থে নয়, সব মানুষের অধিকারের সপক্ষেই আমাদের সবার জয় ছিনিয়ে আনতে হবে। এই সংকল্প হোক সবার। বিরোধীরা উগ্র মতাদর্শের কারণেই পদদলিত হবে, আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হবে। কারণ দর্শানো ছাড়া দল চলে না। বিরোধের জন্য বিরোধিতা কোনো আদর্শ নয়। তাই বাংলাদেশ জন্মই আমাদের দর্শন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার শক্তিকে সেই লক্ষ্যেই ঐক্যবদ্ধ করে কাজের কাজটুকু করতে হবে। এর বাইরে কোনো বিকল্প নেই।

লেখক ঃ অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

.

আরো খবর...