ঘরের পরিবেশ রক্ষায় ইনডোর প্ল্যান্ট

কৃষি প্রতিবেদক ॥ আধুনিক মানুষের বেশির ভাগ সময় কাটে অফিসে, বাসায়, শপিংমলে কিংবা অন্য কোনো বিল্ডিংয়ের ঘেরাটোপে। অর্থাৎ দিনের অধিকাংশ সময় পার করতে হয় ইনডোরে। নাগরিক জীবনে চোখেমুখে ঢুকে পড়া ধুলোবালি আর ধোঁয়ার অত্যাচারে আমাদের মনে হয় বাইরে দূষণ বেশি, ঘরেই নিরাপদ। আসলে ইনডোর বা ঘরের দূষণ যে কতটা মারাত্মক হতে পারে তা চাক্ষুস নয় বলে আমরা তা অনুমান করতে পারি না। এনভায়রনমেন্টাল প্রটেকশন এজেন্সি ও আন্তর্জাতিক পরিবেশ সংস্থার মতে, অভ্যন্তরীণ দূষণের পরিমাণ স্থানভেদে বাইরের তুলনায় ২ থেকে ৫ গুণ বেশি হতে পারে। মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাসে নিঃসৃত কার্বন ডাইঅক্সাইড বা ঘরের অভ্যন্তরীণ দূষণ সৃষ্টিকারী অধিকাংশই উদ্বায়ী গ্যাসই আমাদের পরিচিত নয়। সাধারণত আমরা ঘরের জানালা খোলা রাখলেও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অফিস আদালত ও শপিংমলে দরজা-জানালা বন্ধ রাখার কারণে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল বা ভেন্টিলেশন থাকে না। আধুনিক শহরে ব্যবহার করা হয় ডাক্টসহ ফার্নেস যাতে অনেক ক্ষেত্রে ভেন্টিলেশন সিস্টেম থাকলেও দূষিত গ্যাস বায়ু কিংবা ধোঁয়া চিমনি দিয়ে বাইরে বেরোয় ঠিকই কিন্তু ঘরের ভিতরে বিশুদ্ধ বাতাস ঢোকে সামান্য পরিমাণ। বিল্ডিংয়ের ফাঁক-ফোকর দিয়ে যতটুকু বাতাস অভ্যন্তরে ঢোকে তাতে জীবন রক্ষা হলেও স্বাস্থ্যরক্ষা হয় না। আমাদের শহুরে বাসা-বাড়িতে জানালা খুললেই ভিতরে যে বাতাস ঢোকে তাও বিশুদ্ধ নয়। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে গরম বাতাস তাড়াতে ইলেক্ট্রিক বিল বেড়ে যায়, অতএব, এই চিন্তাকে দূরে ঠেলে ঘরের মধ্যকার নানারকম উদ্বায়ী গ্যাস প্রবেশ এড়িয়ে দূষণের মাত্রা কমাতে ইনডোর গাছের বিকল্প নেই। বর্তমানে পৃথিবীর নানাদেশে পরিবেশবিদ ও বিজ্ঞানীরা ঘরের ভেতর সৃষ্ট বিভিন্ন দূষণকারী গ্যাস দূরীকরণে এগিয়ে এসেছেন এবং ইতোমধ্যে নানা ধরনের যন্ত্রপাতিও উদ্ভাবন করেছেন কিন্তু আমাদের দেশে এখনো সে সব যন্ত্রপাতির প্রচলন চোখে পড়ে না। তবে আশার কথা হলো- ব্যয়বহুল এসব যান্ত্রিক প্রযুক্তির পাশাপাশি খুঁজে বের করা হয়েছে কিছু প্রাকৃতিক উদ্ভিদ যা স্বল্প খরচে অভ্যন্তরীণ দূষণ বা মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাসে নিঃসৃত কার্বন ডাইঅক্সাইডকে স্বাস্থ্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ বা প্রশমন করতে পারে। এর পেছনে বড় রকমের অবদান রেখেছে ন্যাশনাল অ্যারোনটিকস্? অ্যান্ড স্পেস এজেন্সি, নাসা, এনভায়রনমেন্টাল প্রটেকশন এজেন্সি ইত্যাদি সংস্থা। প্রেসিডেন্ট নিক্সনের প্রস্তাবে আমেরিকায় ১৯৭০ সালে এনভায়রনমেন্টাল প্রটেকশন এজেন্সির জন্ম হয় যার হেডকোয়ার্টার ওয়াশিংটনে। এদের কাজ, পরিবেশকে মূল্যায়ন করা, গবেষণা ও শিক্ষার প্রসার ঘটানো। মহাকাশের স্পেস-স্টেশনগুলোয় এখন কৃষিকাজ করার চেষ্টা হচ্ছে যাতে আমেরিকার অ্যাস্ট্রোনট এবং রাশিয়ার কসমোনটদের সমুদয়
খাবার পৃথিবী থেকে সংগ্রহ করার ঝক্কি পোহাতে না হয়। ঘরের অভ্যন্তরে গাছ লালন করার আরও সুবিধা হলো, কার্বন ডাইঅক্সাইড শোষণ ও অক্সিজেন সরবরাহ। আবদ্ধ স্পেস- স্টেশনের অভ্যন্তরভাগ থেকে অপরাপর কিছু উদ্বায়ী গ্যাস নির্গত হতে থাকে যেগুলো প্রশমন ও নিষ্ক্রি করণের জন্য প্রাথমিক চিন্তা করে নাসা। নাসার সঙ্গে কাজ করেছে অ্যাসোসিয়েটেড ল্যান্ডস্কেপ কন্ট্রাকটরস? অব আমেরিকা। আজ এদের মিলিত গবেষণার ফসল পৌঁছে গেছে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে এ পর্যন্ত পৃথিবীতে ৮০ হাজার রাসায়নিক পদার্থ ও উদ্বায়ী গ্যাস প্রবর্তিত হয়েছে যার অধিকাংশই মানুষের জন্য ক্ষতিকর। তবে এই ক্ষতিকর দিকগুলো খতিয়ে দেখার মানসিকতা এসেছে অনেক পরে। উদ্বায়ী গ্যাস বা ভোলাটাইল অরগ্যানিক কম্পাউন্ড আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য ভয়ানক ক্ষতিকর। গৃহের অভ্যন্তরে প্রধান ৫টি ক্ষতিকারী উদ্বায়ী গ্যাসের মধ্যে রয়েছে ফরমাল্ডিহাইড, বেঞ্জিন, ট্রাইক্লোরোইথিলিন, জাইলিন ও এমোনিয়া। এসব গ্যাসের সঙ্গে আমাদের পরিচিতি কম থাকলেও যেসব বস্তু থেকে এদের নির্গমন হয় তা আমাদের জানা। এদের স্বল্পকালীন প্রভাবে চোখ, নাক ও গলায় অস্বস্তিকর প্রদাহ, চুলকানি, শ্বাসকষ্ট, গা-বমি, মাথাঘোরা ও মাথাব্যথা হতে দেখা যায়। দীর্ঘকালীন প্রভাবে লিভার কিডনি নষ্ট, ক্যান্সার ও কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের রোগ হতে পারে। একটি গৃহে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে নির্গত উদ্বায়ী গ্যাস সম্ভবত ফরমাল্ডিহাইড। বর্তমান জগতে ঘরের ভিতর প্লাইউড ও পার্টিকেল বোর্ড নির্মিত প্রচুর আসবাব থাকে, যেমন কেবিনেট, কিচেন প্যানেল, টেবিল-চেয়ার ইত্যাদি। এই গ্যাস বের হয় আসবাব নির্মাণের জন্য ব্যবহৃত আঠা থেকে যা দুই ধরনের, ফেনল-ফরমাল্ডিহাইড ও ইউরিয়া-ফরমাল্ডিহাইড। ইউরিয়াযুক্ত দ্বিতীয় প্রকার আঠা থেকে ফরমাল্ডিহাইডের সঙ্গে অ্যামোনিয়াও নির্গত হয়। কাঠমিস্ত্রিরা এই আঠা সর্বদাই ব্যবহার করে যা শুকলে মাথা ঘুরতে পারে উদ্বায়ী গ্যাসের কারণে। প্লাইউড তৈরির কারখানায় কর্মচারীরা এই আঠা থেকে নির্গত উদ্বায়ী গ্যাসের কবলে পড়ে জটিল অসুখে আক্রান্ত হন। প্লাইউড তৈরিতে গাছের কান্ড কাটার পর এগুলো প্রায় ফুটন্ত তাপমাত্রার পানিতে ভিজিয়ে এগুলোর নরম মন্ড তৈরি করে নেয়া হয়। তারপর মেশিনে ঢুকিয়ে ভিনিয়ার তৈরি করা হয় যা মাত্র ৩ মিলিমিটারের মতো পুরু। প্লাইউডের পুরুত্ব অনুসারে ভিনিয়ারের স্তরসংখ্যা নিরূপণ করা হয়। এরপর বিপরীতমুখী আঁশের ভিনিয়ারে আঠা লাগিয়ে রাখা হয় প্রচন্ড তাপে ও চাপে। মিডিয়াম ডেনসিটি ফাইবারবোর্ড দিয়ে আসবাব নির্মাণেও ব্যবহার করা হয় একই জাতীয় আঠা। বিভিন্ন রকম কাগজ, পেপার টাওয়েল, কৃত্রিম তন্তু ইত্যাদি তৈরিতে ফরমাল্ডিহাইডের ব্যবহার আছে। ফরমাল্ডিহাইড ও ফরমালিনের রাসায়নিক ফর্মুলা এক, প্রথমটি গ্যাস ও দ্বিতীয়টি দ্রবণ। ফরমাল্ডিহাইডকে জলে দ্রবীভূত করলে ফরমালিন তৈরি হয় যা ক্ষণস্থায়ী বলে দ্রবণে যোগ করা হয় খানিকটা মেথিল অ্যালকোহল। বিভিন্নরকম ওষুধ, কীটনাশক, আঠা, পেইন্ট, লুব্রিক্যান্ট, ডিটারজেন্ট, ফার্নিচার ওয়াক্স, প্লাস্টিক ও ফাইবার তৈরিতে বেঞ্জিনের উপস্থিতি দেখা যায়। ট্রাইক্লোরোইথিলিন ছাপার কালি, পেইন্ট, রং-বার্নিশ, পেইন্ট রিমুভার ইত্যাদিতে থাকে। জাইলিন মূলত রাবার ও লেদার প্রডাক্টে দেখা গেলেও তামাকের ধোঁয়াতেও কিছুটা বিদ্যমান থাকে। অ্যামোনিয়া থাকে উইন্ডো ক্লিনিং লিকুইডে, ফ্লোর ওয়াক্স, কয়েকরকম ফার্টিলাইজার ও ইউরো-ফরমাল্ডিহাইড গ্লুতে। ইনডোর দূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য উদ্ভিদ নিয়ে ব্যাপক গবেষণা চলছে বিজ্ঞানীদের। সেসব নির্বাচন থেকে আমাদের পরিচিত কিছু উদ্ভিদের তালিকা ও তাদের দূষণ নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা সম্পর্কে উল্লেখ করা হলো যেমন; পিস লিলি কর্তৃক নিষ্কাশিত গ্যাসগুলো হলো- ফরমাল্ডিহাইড, বেঞ্জিন, ট্রাইক্লোরোইথিলিন, জাইলিন, অ্যামোনিয়া। স্নেক প্ল্যান্টের বিচিত্র প্রজাতি আছে যারা ফরমাল্ডিহাইড, বেঞ্জিন, ট্রাইক্লোরোইথিলিন, জাইলিনকে নিষ্কাশন করে। ইংলিশ আইভি, মানিপ্ল্যান্ট, ড্রেসিনা (লাল পত্র কিনারা ওয়ালা) ও চন্দ্রমল্লিকা ফরমাল্ডিহাইড, বেঞ্জিন, ট্রাইক্লোরোইথিলিন, জাইলিনকে নিষ্কাশন করে। ডাম্বকেন, ব্যাম্বু পাম, ফ্ল্যামিঙ্গো লিলি জাইলিন নিষ্কাশন করে। ফিলোডেন্ড্রন ফরমাল্ডিহাইড ও স্পাইডার প্ল্যান্ট ফরমাল্ডিহাইড, জাইলিন নিষ্কাশন করে। এছাড়া ডেভিলস? আইভি ও ঘৃতকুমারী বেনজিন নিষ্কাশন করে। অন্দরের পরিবেশ-দূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য ‘নাসা’র গবেষণা থেকে পাওয়া যায়, প্রতি ১০০ বর্গফুট এলাকার জন্য কমপক্ষে একটি করে গাছ থাকা দরকার। দুটি বেডরুম, একটি ড্রইং-কাম-ডাইনিং রুমে স্পেসের পরিমাণ ৬০০ বর্গফুটের মতো ধরে নিলে এর জন্য ইনডোর প্ল্যান্ট রাখতে হবে কমপক্ষে ৬টি যা মাঝারি আকৃতির, ছোট নয়। ওপরের তালিকায় একটি বিষয় অনুল্লিখিত রয়ে গেছে যা উদ্বায়ী থেকে স্বতন্ত্র। গৃহাভ্যন্তরে সিআরটি মনিটর বা বক্স টিভি থেকে বিপুল পরিমাণ চার্জড? পার্টিকেল তৈরি হয়। এসব পার্টিকেল মুখে ও শরীরের খোলা জায়গায় লেগে যায়। এতে যে অস্বস্তিকর অনুভূতির সৃষ্টি হয় তা থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য যন্ত্রের দুপাশে দুটি ছোট ক্যাক্টাস রাখা ফলদায়ক। গাছপালা ঘরে রেখে পরিবেশ দূষণ অনেক কমিয়ে ফেলা যায় কিন্তু তার আগের কথা হলো, যে বস্তু থেকে অস্বাস্থ্যকর উদ্বায়ী গ্যাস নির্গত হয় তা ঘরে তোলার জন্য কদিন বাইরে রাখলে মন্দ কি, যেমন নতুন ফার্নিচার গ্যারেজে রাখা। উদ্বায়ী গ্যাস নির্গমনকারী জিনিস, যেমন কিচেন ও বাথরুমের ক্লিনিং সামগ্রী, অতিরিক্ত কিনে ঘরের কোণে জায়গা না দেয়াই ভালো। এগুলো স্টোরে রাখলেও তা আউটডোরে বা বাইরের দিকের ঘরে রাখাই শ্রেয়। অনেকে পুরনো ফার্নিচার কেনেন যা বেশ ভালো আইডিয়া কারণ দীর্ঘদিন পরে উদ্বায়ী গ্যাসের পরিমাণ নগণ্য হয়ে আসে। নতুন গাড়ি বা নতুন ফার্নিচারের গন্ধে নতুনত্ব থাকে কিন্তু তা আমাদের ক্ষতিও করে অনেক। আনকোরা, নতুন রং ও কার্পেট করা বাড়িতে বসবাস শুরু করলে ফুসফুসকে এর জন্য খেসারত দিতে হয়, বিশেষত যারা সেনসিটিভ। অতএব, দুয়েক সপ্তাহ অন্তত সময় নেয়া ভালো। শীতপ্রধান দেশে অনেকে ঘরবাড়ি রং করার সময় নির্ধারণ করেন সামার-টাইমে যখন জানালা-দরোজা খুলে ভেন্টিলেশন তৈরি করা যায়। কেউ কেউ দেরি করে ডেলিভারি নেন নতুন ফার্নিচারের। উদ্বায়ী গ্যাসকে অবজ্ঞা করে আমরা হয়তো নির্দ্বিধায় বেঁচে থাকতে পারি কিন্তু সেই বাঁচাতে যা নিই তা হলো ‘কোয়ালিটি অব লাইফ’।
লেখক ঃ কৃষিবিদ এম আব্দুল মোমিন, ঊর্ধ্বতন যোগাযোগ কর্মকর্তা, ব্রি, গাজীপুর

আরো খবর...