গ্রীষ্মকালীন বারি মরিচ-২ এর চাষাবাদ

কৃষি প্রতিবেদক ॥ মরিচ বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী মসলা ফসল। কাঁচা ও পাকা উভয় অবস্থাতেই এ ফসলের প্রচুর চাহিদা রয়েছে। রান্নার রং, রুচি ও স্বাদে ভিন্নতা আনার জন্য মরিচ একটি অপরিহার্য উপাদান। পুষ্টির পাশাপাশি মরিচের ভেষজ গুণ রয়েছে। কাঁচা মরিচ ভিটামিন-এ ও সি-সমৃদ্ধ। প্রতি ১০০ গ্রাম কাঁচা মরিচে ২-৩ গ্রাম আমিষ, ৬ গ্রাম শ্বেতসার, ০.৬ গ্রাম তেল, ৭ গ্রাম আঁশ, ১০০ থেকে ২০০০ আইইউ ভিটামিন-সি এবং ২০ থেকে ২৮ গ্রাম অন্যান্য ভিটামিন ও পানি রয়েছে। এটি ক্ষুধাবর্ধক, বায়ুনাশক ইত্যাদি গুণাবলিসম্পন্ন। বাংলাদেশে প্রায় ১৬ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে ৩৭ হাজার ৯০০ মেট্রিক টন কাঁচা মরিচ উৎপাদিত হয়। বাংলাদেশ থেকে বিদেশে কাঁচা মরিচ রপ্তানি হয়। রবিও খরিপ-১ মৌসুমে মরিচ সহজলভ্য হলেও খরিপ-২ মৌসুমে বাজারে স্বল্পতা দেখা দেয়। তাই বর্ষা ও শীত মৌসুমের আগে মরিচের উৎপাদন অব্যাহত রাখার প্রয়াসে মসলা গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানীদের নিরলস প্রচেষ্টায় বারি মরিচ-২ নামে একটি উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন করা হয় এবং জাতীয় বীজবোর্ড কর্তৃক ২০১৩ সালে মুক্তায়িত করা হয়। জাতটি দেশে কাঁচা মরিচের মোট উৎপাদন বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে।
জাতটির বৈশিষ্ট্য ঃ এটি একটি গ্রীষ্মকালীন মরিচের জাত। গাছ বেশ লম্বা ও ঝোপালো। গাছের পাতার রং হালকা সবুজ। প্রতি গাছে ৪৫০ থেকে ৫০০টি মরিচ ধরে। কাঁচা অবস্থায় মরিচের রং হালকা সবুজ এবং পাকা অবস্থায় লাল। এ জাতের মরিচের জীবনকাল প্রায় ২৪০ দিন। উঁচু এবং মাঝারি উঁচু জমিতে এ জাতটি চাষ করা যায়। সুনিষ্কাশিত, উর্বরতাসমৃদ্ধ বেলে দোঁআশ এবং পলি দোঁআশ মাটি এ জাতের মরিচ চাষের জন্য উত্তম।
রোপণ ঃ এপ্রিল মাসে জমিতে গ্রীষ্মকালীন জাতের মরিচের চারা রোপণের উপযুক্ত সময়। মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত এ জাতের মরিচের চারা জমিতে রোপণ করা যায়। অপেক্ষাকৃত উঁচু জমি যেখানে বৃষ্টির পানি দাঁড়ায় না, যথেষ্ট আলো-বাতাস পায়, পানি সেচের উৎস আছে এরূপ জমি বীজতলার জন্য নির্বাচন করতে হবে। গ্রীষ্মকালীন মরিচের জন্য মার্চ মাসে বীজতলায় বীজ বপন করতে হবে। ভালো চারার জন্য প্রথমে বীজতলার মাটিতে প্রয়োজনীয় কম্পোস্ট সার এবং কাঠের ছাই মিশিয়ে ঝুরঝুরে করে নিতে হবে। বীজ বপনের ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা আগে প্রতি কেজি বীজে ২ গ্রাম হারে প্রোভেক্স বা ব্যাভিস্টিন মিশিয়ে শোধন করে নিতে হবে। শোধিত বীজ বীজতলায় ৪ থেকে ৫ সেন্টিমিটার দূরে সারি করে ১ সেন্টিমিটার গভীরে সরু দাগ টেনে ঘন করে বপন করতে হবে।
জমি ও বেড তৈরি ঃ গ্রীষ্মকালীন মরিচ চাষের জন্য ৪ থেকে ৫টি আড়াআড়িভাবে চাষ ও মই দিয়ে গভীরভাবে চাষ করে মাটি ঝুরঝুরে করে নিতে হবে। জমি থেকে আগাছা ও পূর্ববর্তী ফসলের আবর্জনা ইত্যাদি সরিয়ে ফেলতে হবে। চারা রোপণের জন্য ১.২ মিটার প্রস্থ বিশিষ্ট প্রয়োজন মতো লম্বা ৩০ সেন্টিমিটার উচ্চতার বেড তৈরি করতে হবে।
বীজের পরিমাণ ও রোপণ দূরত্ব ঃ বারি মরিচ-২ এর চারা তৈরি করার জন্য একরপ্রতি ২০০ থেকে ৩০০ গ্রাম বীজের প্রয়োজন হয়। সারি থেকে সারির দূরত্ব দিতে হবে ৬০ সেন্টিমিটার এবং গাছ থেকে গাছের দূরত্ব দিতে হবে ৫০ সেন্টিমিটার। এভাবে রোপণ করলে একরপ্রতি ১৩,৩৩৩টি গাছ পাওয়া যায়।
সারের পরিমাণ ও প্রয়োগ পদ্ধতি ঃ মাটির প্রকৃতি, উর্বরতা ইত্যাদির ওপর নির্ভর করে সারের মাত্রা ভিন্ন হতে পারে। বারি মরিচ-২ এর জন্য একরপ্রতি ২ টন কম্পোস্ট, ৮৪ কেজি ইউরিয়া, ১৩২ কেজি টিএসপি, ৮০ কেজি এমওপি ৪৪ কেজি জিপসাম ৬০০ গ্রাম বোরন সারের প্রয়োজন হয়। শেষ চাষের সময় কম্পোস্ট, টিএসপি, জিপসাম, বোরন ও ১/৪ অংশ এমপি সার মাটির সঙ্গে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। তারপর চারা রোপণের ২৫, ৫০ ও ৭০ দিন পর পর্যাক্রমে ১ম ২য় ও ৩য় কিস্তিতে প্রতিবার ৭০ কেজি ইউরিয়া ও ৫০ কেজি এমওপি সার উপরি প্রয়োগ করতে হবে।
ফসল ও বীজ সংগ্রহ ঃ চারা রোপণের ৭০ থেকে ৮০ দিন পর মরিচ উত্তোলন করা হয়। বারি মরিচ-২ এর জীবনকাল দীর্ঘ হওয়ায় প্রায় ৮ থেকে ১০ বার ফসল উত্তোলন করা যায়। উত্তম বীজের জন্য বড়, পুষ্ট ও সম্পূর্ণ পাকা মরিচ নির্বাচন করতে হবে। বর্ষাকালে মরিচ শুকানো বেশ কষ্টকর। এজন্য পাকা মরিচ দুই ফালি করে কেটে বীজ বের করে নিয়ে শুকাতে হবে।
লেখক ঃ কৃষিবিদ নিতাই চন্দ্র রায়।

আরো খবর...