গবেষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার হুমকি সচিবের

দুধে অ্যান্টিবায়োটিক 

ঢাকা অফিস ॥  দেশের বিভিন্ন ব্র্যান্ডের পাস্তুরিত দুধে অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতির কথা জানিয়ে গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করায় ওই গবেষকদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন মৎস্য ও প্রাণি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিন। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর খামার বাড়িতে প্রাণি সম্পদ অধিদপ্তর মিলনায়তনে ‘নিরাপদ তরল দুধ উৎপাদন: দেশীয় দুগ্ধশিল্প রক্ষা ও বিকাশে করণীয়’ শিরোনামে এক সভায় এই হুমকি দেন তিনি। সরকারের এই কর্মকর্তার মতে, এই গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশে প্রটোকল মানা হয়নি। তিনি বলেন, “রিচার্সের ফলাফল অবশ্যই পিয়ার রিভিউড জার্নালে প্রকাশ করতে হবে। তারা দেখবে এই নমুনা সারা দেশকে কাভার করে কি না, গবেষণার পন্থা ঠিক আছে কি না এসব নিরীক্ষা করবে। স্টেক হোল্ডারদের সঙ্গে ফলাফল ব্রিফ করতে হয়। তারপর এমন গবেষণা প্রকাশ করতে হয়।” ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই গবেষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়ে তিনি বলেন, “পিয়ার রিভিউড জার্নালে যদি প্রকাশ করে থাকেন তাহলে অবশ্যই আগামী সাত দিনের মধ্যে তা মন্ত্রণালয়ে হাজির করুন। যদি না করেন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আপনাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।” ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিকেল রিচার্স সেন্টারের পরিচালক ও ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক আ ব ম ফারুক গত ২৫ জুন এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, বাজারে প্রচলিত বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সাতটি প্যাকেটজাত (পাস্তুরিত) দুধের নমুনা পরীক্ষা করে সেগুলোতে মানুষের চিকিৎসায় ব্যবহৃত শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি পেয়েছেন তারা। পাস্তুরিত দুধে অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় মন্তব্য করে তিনি বলেন, পরীক্ষায় পাস্তুরিত দুধের সাতটি নমুনার সবগুলোতেই লেভোফ্লক্সাসিন ও সিপ্রোফ্লক্সাসিন এবং ছয়টি নমুনায় এজিথ্রোমাইসিনের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এছাড়া পাস্তুরিত ও অপাস্তুরিত দুধের চারটি নমুনাতে ডিটারজেন্ট এবং অপাস্তুরিত দুধে একটি নমুনাতে ফরমালিন পাওয়া গেছে বলে জানান তিনি। তাদের এই গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশকে দেশের উদীয়মান দুগ্ধ শিল্পের বিরুদ্ধে ‘ষড়যন্ত্র’ আখ্যায়িত করা হয়েছে মঙ্গলবারের এই আলোচনা সভায়। জাতীয় ডেইরি উন্নয়ন ফোরাম আয়োজিত অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি কাজী ওয়াছি উদ্দিন বলেন, “ডেইরি শিল্প একটা পর্যায়ে পৌঁছে গেছে, একটি উদীয়মান শিল্প এটি। এই শিল্পকে যদি কোনো রকমে বাধাগ্রস্ত করে দেওয়া যায় তাহলে গুঁড়ো দুধের যেমন বাজার সৃষ্টি হয়েছে এই দেশে তেমনি তরল দুধের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন দেশের বাজার তৈরি হবে। সেজন্য দেশীয় ডেইরি শিল্পের অব্যাহত গতি থামিয়ে দেওয়ার জন্য দেশি-বিদেশি চক্রান্ত চলছে। একজন গবেষক দুগ্ধ শিল্প নিয়ে একটা গবেষণা করে ছেড়ে দিলেন মিডিয়ায়। ওনার কি এজেন্ডা আছে এর পেছনে, উনি কি এ ধরনের কাজ করার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত?“ এই আলোচনা সভায় অধ্যাপক আ ব ম ফারুককে আমন্ত্রণ জানানো হলেও তিনি আসেননি বলে জানান আয়োজকরা। তার জন্য অনুষ্ঠান এক দফা পেছানোরও তথ্য দেন তারা। আলোচনা সভায় প্রাণি সম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হীরেশ রঞ্জন ভৌমিক বলেন, “দেশে খামারিদের উৎপাদিত দুধে ভয়াবহ রকমের কিছু নেই। এটা সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং সবাই তরল দুধ ও পাস্তুরিত দুধ পান করতে পারবেন।” তবে ভূ-প্রাকৃতিক কারণে দুধে কিছু দূষণ যুক্ত হচ্ছে বলে স্বীকার করেন তিনি। “ক্যাডমিয়াম, মেটাল, শিসা এগুলো কেবল গরুর দুধেই নয়, শহর ও শিল্পাঞ্চলের শস্যের মধ্যেও পাওয়ায যাচ্ছে প্রকৃতিক কারণে।” কেন এই ধরনের গবেষণা ফলাফল সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে না জানিয়ে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে প্রকাশ করা হল সেই প্রশ্ন রাখেন তিনিও। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেইরি সায়েন্স অনুষদের শিক্ষক নূরুল ইসলাম বলেন, “মাত্র ১০টি দুধের নমুনা নিয়ে ওই গবেষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে পাস্তুরিত দুধ ৭টা এবং অপাস্তুরিত দুধ তিনটা নমুনা। “পাস্তুরিত দুধে ফ্যাট নিয়ে একটা ভুল ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে গবেষণায়। বিএসটিআই বলছে, কমপক্ষে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ ফ্যাট থাকতে হবে। গবেষণার ফলাফলে পাওয়া গেছে ৩.২ থেকে ৩.৬ শতাংশ। মন্তব্যে বলা হয়েছে ৩.৫ শতাংশের কম হলে খাওয়া যাবে না। কিন্তু ব্যাপারটি তা নয়, ফ্যাট কম হলেও দুধ খাওয়ার অযোগ্য হয় না।” একইভাবে অ্যাসিডিটির পরিমাণ নিয়েও গবেষণায় ‘ভুল ব্যাখ্যা’ দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। অধ্যাপক নূরুল ইসলাম বলেন, “পাস্তুরিত দুধে কলিফর্ম থাকতে পারবে ১০ এমএল এর বেশি। গবেষণায় পাওয়া গেছে প্রতি লিটারে ২৩-২৪ সিএফইউ/এমএল। এটি দুধের মান খারাপ হওয়ার ইঙ্গিত না দিলেও তারা বোঝাতে চেয়েছে খারাপ কিছু।” সভায় প্রাণ ডেইরির পক্ষ থেকে প্রাণ গ্রুপের ডিরেক্টর উজমা চৌধুরী বলেন, গত ১০ বছর বাংলাদেশে ডেইরি শিল্প ২৫৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। এই খাতের আরও ব্যাপক সম্ভাবনা সামনে রয়েছে। ডেইরি খাতের উন্নয়নে এই আলোচনা থেকে পাওয়া পরামর্শগুলো কাজে লাগাতে হবে। অনুষ্ঠানে খামারিদের প্রতিনিধি ইমরান হোসেন বলেন, গ্রামাঞ্চলে পর্যাপ্ত পশু চিকিৎসক পাওয়া যায় না। বাধ্য হয়ে ফার্মেসিগুলোর পরামর্শ নিয়েই গরুকে প্রয়োজনীয় ওষুধ খাওয়াতে হয়। কিছু অসাধু কোম্পানি মানহীন ওষুধ বিপণন করে থাকে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হারুনুর রশিদ বলেন, দুধের মান নিয়ন্ত্রণ করতে হলে খামারি পর্যায় থেকে শুরু করতে হবে। কারণ অনেক দূষণ ওই পর্যায়ে হয়ে যেতে পারে। এছাড়া প্রতি ছয় মাস পর পর দুধের মান যাচাইয়ে পর্যবেক্ষণ চালানো উচিত। প্রভিটা কোম্পানির প্রতিনিধি ইকরামুল হক বলেন, দুধে অ্যান্টিবায়োটিকসহ অন্যান্য দুষণ নিয়ে বিশদ গবেষণা করতে হবে। যেখানে সমস্যা বিদ্যমান সেখানে অধিকতর নজর দিতে হবে।

আরো খবর...