খালেদা জিয়ার চিকিসার যাবতীয় ব্যয় বহন করতে চায় বিএনপি

ঢাকা অফিস ॥ রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসার জন্য আবারও দাবি জানিয়েছে বিএনপি। একইসঙ্গে দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, খালেদা জিয়ার চিকিৎসার সকল ব্যয় বহন করা হবে। দলটি বলছে, বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার খালেদা জিয়ার চিকিৎসার বিষয়টিকে রাজনৈতিক বিষয়ে পরিণত করেছে। তার জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে। গোটা দেশের মানুষ খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা নিয়ে চরমভাবে উদ্বিগ্ন।যদি তার সুচিকিৎসার বিষয়ে রাজনৈতিক কারণে অবহেলা কিংবা বিলম্ব করা হয়। তার পরিণাম সরকারের জন্য শুভ হবে না।

গতকাল মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টায় নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলের সিনিয়র নেতাদের নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এসব কথা বলেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আবদুল মঈন খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী প্রমুখ। ড. মোশাররফ হোসেন বলেন, গতকাল থেকে বেগম জিয়ার স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য বিএসএমএমইউতে নেয়ার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু এর আগে সেখানে নেয়া হলে সেখানকার ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ এবং চিকিৎসা সেবার বিষয়ে তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। দেশবাসী বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন। তারা সরকারের অমানবিক আচরণে ক্ষুদ্ধ। সরকার বেগম জিয়ার জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে। মোশাররফ বলেন, বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরে আর্থাইটিস, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। তাঁর দুই হাঁটু এবং দুই চোখেই অপারেশন করতে হয়েছে। ফলে তাঁকে সবসময়ই যোগ্য চিকিৎসকের নিয়মিত পর্যবেক্ষণে থাকতে হয়। অথচ নির্জন এই কারাগারে তাঁকে দেখার জন্য জুনিয়র ডাক্তার ও ডিপ্লোমা নার্স নিয়োগ করে সরকার দাবি করছে যে, বেগম খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তিনবারের নির্বাচিত এই সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রীর স্বাস্থ্যের যে অবস্থা তাতে তাঁকে সর্বক্ষণ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণে এবং জরুরী পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা প্রদানের ব্যবস্থা রাখা একান্ত জরুরী বলে মতামত দিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও সার্জনগণ। মোশাররফ বলেন, আমাদের দলের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে দুইবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এসব বিষয় উল্লেখ করে তাঁকে অনতিবিলম্বে ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসা এবং এমআরআইসহ প্রয়োজনীয় অন্যান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানোর দাবি করা হলে স্বরাষ্টমন্ত্রী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিলেও বাস্তবে কিছুই করা হয়নি। বিএনপির এই সিনিয়র নেতা বলেন, ইতিমধ্যে তার অসুস্থতা চরম আকারে বৃদ্ধি পেয়েছে। আর্থ্রাইটিসের ব্যথা বৃদ্ধির ফলে তিনি চলৎশক্তিহীন হয়ে পড়ছেন। পাশাপাশি তাঁর অপারেশন করা চোখ লাল হয়ে আছে। এই পরিস্থিতিতে দ্রুত তাঁর উপযুক্ত চিকিৎসা না হলে তাঁর শারীরিক অবস্থার গুরুতর অবনতি হতে পারে। আমরা এটাও সরকারকে জানিয়েছি, কিন্তু তাঁর সুচিকিৎসার কোন ব্যবস্থাই নেয়া হয়নি। তিনি আরো বলেন, এই পরিস্থিতিতে গত ৫ জুন তিনি হঠাৎ করে অচেতন হয়ে পড়েন। কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটি জেল কর্তৃপক্ষ তাঁর পরিবারের কোন সদস্যকে জানায়নি এবং কেন তিনি অচেতন হয়ে পড়লেন তা পরীক্ষার জন্য কোন ব্যবস্থা নেয়নি। পাঁচ দফা আবেদনের পর গত ৯ জুন কারা কর্তৃপক্ষের অনুমতিক্রমে চিকিৎসা করতেন এমন চার জন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ও ঢাকা সিভিল সার্জনের উপস্থিতিতে তাঁকে দেখতে গিয়ে এই ঘটনার কথা জানতে পারেন। ৫ জুন দুপুর ১টার দিকে তার ৫/৭ মিনিট আনকনশাস থাকা এবং সে সময়ের কোন কিছু মনে করতে না পারার বিষয়টিকে চিকিৎসকগণ মারাত্মক বলে মনে করেন। তাদের মতে এটা ছিল ট্রানজিয়েন্ট ইসকেমিক এ্যাটাক-টিআইএ। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অধ্যাপক এফ এম সিদ্দিকী সাংবাদিকদের জানিয়েছেন যে, ‘সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হচ্ছে টিআইএ যদি কারও হয়-তাহলে সেটা ইন্ডিকেট করে যে, সামনে তার একটা বড় ধরণের স্ট্রোক হওয়ার আশংকা খুব বেশী’। এই চারজন তাদের পর্যবেক্ষণ ও মতামত লিখিতভাবে কারা কর্তৃপক্ষকে দিয়েছেন। তারা বিশেষ কিছু পরীক্ষা এবং যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নেয়ার জন্য দেশনেত্রীকে অবিলম্বে ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তির সুপারিশ করেছেন। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের প্রেস ব্রিফিংয়ের পর এ বিষয়ে সরকারের আইনমন্ত্রী, সেতুমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মুখ খোলেন। তারা এখন বলছেন যে, ৫ জুন রোজা রাখার কারণে বেগম খালেদা জিয়ার সুগার কমে যাওয়ায় তাঁর মাথা ঘুরে গিয়েছিল মাত্র। একটা চকলেট খেয়ে তিনি ভাল হয়ে যান। আইজি প্রিজনও একই কথা বলেন। তবে তিনি স্বীকার করেছেন যে, বেগম জিয়ার আর্থ্রাইটিস সমস্যা বেড়েছে। আইজি প্রিজন গণমাধ্যমে বলেছেন যে, কারাবিধি অনুযায়ী প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়ার জন্য উর্ধতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। এমন কোন সিদ্ধান্ত না থাকায় খালেদা জিয়াকে ঐ হাসপাতালেই নিতে হবে। আইজি প্রিজন আরও বলেন যে, প্রাইভেট হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানকার চিকিৎসা ব্যয় কে বহন করবে সে সম্পর্কেও সিদ্ধান্ত প্রয়োজন হবে। তার এই বক্তব্য থেকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতামত এবং আমাদের বারংবার অনুরোধ সত্বেও ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তির ব্যাপারে সরকারের অনীহার কারণ বোঝা গেল। তথাকথিত ১/১১ এর সরকারের সময়েও শেখ হাসিনাকে স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নেওয়া হয়েছিল। আর তিনবারের নির্বাচিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী, দেশের নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি এবং সাবেক সেনাবাহিনী প্রধানের স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যাপারে সরকারী অনুমোদন ও অর্থ সংস্থানের বিষয়ে এতদিনেও সিদ্ধান্ত না হওয়া রহস্যজনক, ভয়ংকর ষড়যন্ত্র এবং নিন্দনীয়। মোশাররফ বলেন, আমরা খালেদা জিয়ার উপযুক্ত চিকিৎসা চাই বলেই আপনাদের মাধ্যমে সরকারকে জানাতে চাই যে, প্রয়োজনে বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসার সমূদয় ব্যয় আমাদের দল বহন করবে। কাজেই কাল বিলম্ব না করে তাঁকে ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি করা হোক। ড. মোশাররফ হোসেন বলেন, গত ৫ জুন তারিখে সংঘটিত এমন একটি ভয়াবহ গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সম্পর্কে সরকারের মন্ত্রীবর্গ, এটর্নি জেনারেল ও আইজি প্রিজন প্রায় ১ সপ্তাহ পরে ১১ জুন তারিখে মুখ খুললেন কেন ? কেন এতদিন ঘটনাটি চেপে যাওয়ার চেষ্টা করা হলো ? কেন ইতোমধ্যে তাঁর হঠাৎ এত বেশী অসুস্থ হয়ে পড়ার কারণ অনুসন্ধানের জন্য ব্যবস্থা নেয়া হয়নি ? এটর্নি জেনারেল বলেছেন যে, ৯ জুন তারিখে ডাক্তারগণ বেগম খালেদা জিয়ার অজ্ঞান হওয়ার কথা বলে নাকি আদালতের সহানুভুতি লাভের চেষ্টা করেছেন। অথচ তিনি অবশ্যই জানেন যে, ডাক্তারদের সাক্ষাতের দিন ক্ষণ স্থির করে সরকার। তারা ৯ তারিখে সাক্ষাতের দিন স্থির করেছে বলেই ঐ দিন ডাক্তারগণ প্রেস ব্রিফিং করেছেন। মামলার দিন তারিখ সরকার ও কারা কর্তৃপক্ষের জানার কথা-ডাক্তারদের নয়। আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে মরিয়া এই দলবাজ এটর্নি জেনারেল একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর অসুস্থতা নিয়েও অশোভন ও অযৌক্তিক মন্তব্য করার আমরা তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই।

আরো খবর...