খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায় জিঙ্ক ধান

কৃষি প্রতিবেদক ॥ বাঙালি হিসেবে ভাত আমাদের প্রধান খাদ্য। অন্য পুষ্টিকর খাবার জোগাড় করতে না পারলেও দুই বা তিন বেলা ভাতের সংস্থান প্রায় সবারই সামথ্যের মধ্যে। এটি বিবেচনায় নিয়ে বিজ্ঞানীরা ভাবলেন ভাতে কীভাবে শরীরের অত্যাবশ্যকীয় খাদ্যোপাদানগুলো  দেহের প্রয়োজন অনুসারে সংযোজন, সরবরাহ বা পরিমাণে বৃদ্ধি করা যায়। এই সংযোজন, সরবরাহ বা পরিমাণে বৃদ্ধি করার যে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি  সেটির নাম হচ্ছে বায়োফর্টিফিকেশন। বায়োফর্টিফিকেশনের মাধ্যমেই বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. পার্থ সারথী বিশ্বাসের নেতৃতে ব্রির বিজ্ঞানীরা বিশ্বের সর্বপ্রথম জিঙ্কসমৃদ্ধ ধানের জাত ব্্ির ধান৬২ উদ্ভাবন করেন। আর এই উদ্ভাবনে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করে হার্ভেস্ট প্লাস বাংলাদেশ। টাঙ্গাইলের মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজের শিক্ষার্থীরা কিছুদিন আগে ব্রি পরিদর্শনে এসেছিলেন। ব্রির পরিচিতি উপস্থাপনের একপর্যায়ে পরিদর্শনে আসা এক ক্যাডেটের প্রশ্ন- আচ্ছা ধান ঠিক আছে, কিন্তু পুষ্টিকর ধান সেটা আবার কি! শিক্ষা সফরের অংশ হিসেবে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা প্রায়ই বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) পরিদর্শনে আসেন। পরিদর্শন গাইড বা ব্রির পরিচিতি উপস্থাপনকারী হিসেবে প্রায়ই তাদের এমন শত সহস্র প্রশ্নের সম্মুখীন হই। শিক্ষক বা শিক্ষার্থীদের এই জিজ্ঞাসার উত্তর দিতে গিয়ে আমি নিজেও তাদের প্রায় সবাইকে একটি সহজ প্রশ্ন করে থাকি সেটি হলো- প্রতিদিন আমরা দুই বা তিন বেলা যে ভাত খাই, সেটার পুষ্টিগুণ সম্পর্কে আমরা কতটুকু জানি বা কতটা জানতে চাই? প্রশ্নটি করার উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থীদের মনে খাদ্যের পুষ্টিবিষয়ক সচেতনতা সৃষ্টি করা। উত্তরে তাদের অনেকেই শুধু বলে থাকেন কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা এবং শক্তি পাই। প্রকৃত পক্ষে ভাত থেকে আমরা শুধু শর্করা এবং শক্তি পাই না, পাই আরও অনেক শরীরের অত্যাবশ্যকীয় মুখ্য ও  গৌণ খাদ্যোপাদান। সুনির্দিষ্ট করে বলতে গেলে, প্রতি ১০০ গ্রাম চাল থেকে আমরা মোটামুটি ১২৯ কিলোক্যালরি শক্তি, ২৭.০৯ গ্রাম শর্করা, ৭.১২ গ্রাম প্রোটিন, ০.২৮ গ্রাম চর্বি, ১.৩০ গ্রাম আশ ০.০৭ মি.গ্রাম থায়ামিন, ০.০১৫ মি. গ্রাম রিভোপ্লাবিন, ১.০৯ মি. গ্রাম জিঙ্ক, ২৮ মি. গ্রাম ক্যালসিয়াম, ০.৮০ মি. গ্রাম আয়রন, ২৫ মি. গ্রাম ম্যাগনেসিয়াম ইত্যাদি অত্যাবশ্যকীয় খাদ্যোপাদান থাকে (ইউএসএইড পুষ্টি ডেটাবেজ)। বাংলাদেশে মাথাপিছু চালের গ্রহণ হার দৈনিক প্রায় ৪০০ গ্রাম হিসেবে মোটামুটি দৈনিক এই পরিমাণের চারগুণ পুষ্টি আমরা চাল বা ভাত থকে পাই যা কোনোভাবেই আমাদের চাহিদার সমান নয়। এ কারণে খাদ্যের চাহিদা মিটলেও পুষ্টির চাহিদা পূরণে আমরা এখনো অনেক পিছিয়ে। বাংলাদেশে ৫ বছরের কমবয়সী শিশুর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই কোনো না কোনো মাত্রার অপুষ্টিতে ভুগছে, এর মধ্যে শতকরা ১৪ ভাগ শিশু ভুগছে মারাত্মক অপুষ্টিতে। এর কারণ পুষ্টি সচেতনতার অভাব অথবা পুষ্টিকর খাবার ক্রয় করার অসামর্থতা। অপুষ্টি হলো শরীরের স্বাভাবিক বৃদ্ধি, বিকাশ ও সুস্থতার জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি। খাদ্যে এক বা একাধিক অত্যাবশ্যকীয় খাদ্য উপাদানের অভাব বা সুষম খাদ্যের দীর্ঘ অভাবই অপুষ্টির অন্যতম কারণ। খাদ্যোপাদানের শ্রেণিবিভাগ করলে আমরা অত্যাবশ্যকীয় খাদ্য উপাদানকে ছয়টি ভাগে ভাগ করতে পারি। এগুলোও আবার বিভক্ত মুখ্য ও গৌণ উপাদানে। খাদ্যের মুখ্য উপাদানথ শ্বেতসার বা শর্করা (উৎস-চাল, গম, ভুট্টা, চিড়া, মুড়ি, চিনি, আলু, মূল জাতীয় খাদ্য), আমিষ (উৎস-মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, ডাল, শিমের বীচি, কাঁঠালের বীচি, বাদাম ইত্যাদি), স্নেহজাতীয় খাদ্য (উৎস-তেল, ঘি, মাখন, চর্বি ইত্যাদি) এবং খাদ্যের গৌণ উপাদান খাদ্যপ্রাণ বা ভিটামিন (উৎস-রঙিন শাক-সবজি, ফল, ডিম, দুধ, কলিজা ইত্যাদি), খনিজ উপাদান (উৎস- ছোট মাছ, চিংড়ি, ঢেঁড়স, কচুশাক ইত্যাদি) ও নিরাপদ পানি। যে খাদ্যের মধ্যে মানবদেহের জন্য প্রয়োজনীয় সব খাদ্যোপাদান পরিমাণমতো থাকে, তাকেই এক কথায় সুষম খাদ্য বলা হয়। অর্থাৎ মানবদেহের প্রয়োজনীয় ও পরিমাণমতো ছয়টি উপাদানযুক্ত খাবারকেই সুষম খাদ্য হিসেবে ধরা হয়। সুষম খাদ্যের মাধ্যমে  দেহের ক্ষয়পূরণ, বুদ্ধিসাধন, শক্তি উৎপাদনসহ রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জিত হয়ে থাকে। কিন্তু আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষই সুষম খাদ্যের সংস্থান করতে পারে না ফলে বিভিন্ন ধরনের অপুষ্টিতে ভোগেন। বাঙালি হিসেবে ভাত আমাদের প্রধান খাদ্য। অন্য পুষ্টিকর খাবার জোগাড় করতে না পারলেও দুই বা তিন বেলা ভাতের সংস্থান প্রায় সবারই সামর্থ্যের মধ্যে। এটি বিবেচনায় নিয়ে বিজ্ঞানীরা ভাবলেন ভাতে কীভাবে শরীরের অত্যাবশ্যকীয় খাদ্যোপাদানগুলো দেহের প্রয়োজন অনুসারে সংযোজন, সরবরাহ বা পরিমাণে বৃদ্ধি করা যায়। এই সংযোজন, সরবরাহ বা পরিমাণে বৃদ্ধি করার যে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি সেটির নাম হচ্ছে বায়োফর্টিফিকেশন। বায়োফর্টিফিকেশনের মাধ্যমেই বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. পার্থ সারথী বিশ্বাসের নেতৃতে ব্রির বিজ্ঞানীরা বিশ্বের সর্বপ্রথম জিঙ্কসমৃদ্ধ ধানের জাত ব্রি ধান৬২ উদ্ভাবন করেন। আর এই উদ্ভাবনে আর্থিক ও কারিগরী সহায়তা প্রদান করে হার্ভেস্ট প্লাস বাংলাদেশ। মানুষের শরীরে জিঙ্কের রয পরিমাণ চাহিদা রয়েছে তার পুরোটাই মেটাতে পারে এই ব্রি-৬২ জাতের চালের ভাতের মাধ্যমে। প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষের জিঙ্কের দৈনিক চাহিদা ১৫ মিলিগ্রাম এবং প্রাপ্ত বয়স্ক নারীর দৈনিক চাহিদা ১২ মিলিগ্রাম। ব্রি ধান৬২-তে জিঙ্কের পরিমাণ ১৯ মিলিগ্রাম। সাধারণত লাল মাংস, কাঠবাদাম, চিনাবাদাম, সয়া, দুগ্ধজাত খাবার, মাশরুম, যকৃত এবং সূর্যমুখির বীজ জিঙ্কের চমৎকার উৎস কিন্তু ভাতের মতো এগুলো সহজলভ্য নয়। জিঙ্ক শরীরের জন্য খুব প্রয়োজনীয় একটি খনিজ উপাদান। মানবদেহে ২০০-রও বেশি এনজাইমের নিঃসরণে অংশগ্রহণ করে যেগুলো দেহের অনেক বিপাকীয় কাজে এটি অংশ নেয়। এ ছাড়া দেহে এন্টি অক্সিডেন্ট হিসেবে রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি, শর্করার ভাঙনে, দেহ কোষের বৃদ্ধিতে এবং পলিপেটাইড, গাসটিন নিঃসরণের মাধ্যমেই স্বাদের অনুভূতি বা রুচি বাড়াতে ভূমিকা রাখে। জিঙ্ক ডিএনএ ও আরএনএ পলিমারেজ এনজাইমের একটি আবশ্যক উপাদান। কঙ্কালের বৃদ্ধির জন্য কেরাটিন  তৈরি ও তার পরিপক্বতা, ক্ষত সারানো, আবরনী কোষের রক্ষণাবেক্ষণ ইত্যাদি কাজের দ্বারা জিঙ্ক ত্বকের স্বাস্থ্য রক্ষা করে থাকে। উঠতি বয়সের কিশোর-কিশোরীদের বেড়ে ওঠার ব্যাপারে জিঙ্কের অভাব হলে শিশু-কিশোররা বেঁটে হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু এ জাতের ধানের চালে যে ভাত হবে তা খেলে শরীরে জিঙ্কের প্রয়োজনীয় চাহিদার অর্ধেকই এখানে মিটে যাবে এবং বেঁটে হওয়ার সম্ভাবনা আর থাকবে না। অনুরূপভাবে প্রোটিন বা আমিষের অভাবে দেহে সুনির্দিষ্ট অভাবজনিত লক্ষণ দেখা দেয়। শরীরের প্রতি কেজি ওজনের জন্য পূর্ণ বয়স্কদের ক্ষেত্রে ১ গ্রাম শিশুদের জন্য ২-৩ গ্রাম আমিষের প্রয়োজন। মাছ মাংস ও ডাল  প্রোটিনের অন্যতম উৎস হলেও এসব খাবার ততটা সহজলভ্য নয় যতটা সহজলভ্য ভাত। ব্রি ধান৬২- তে সেই প্রোটিনের পরিমাণ প্রায় শতকরা ৯ ভাগ। ফলে এই ধানটির ভাত মানবদেহে জিঙ্কের পাশাপাশি প্রোটিনের চাহিদা পূরণেও অনন্য ভূমিকা রাখতে পারবে। শুধু ব্রি ধান৬২ নয়- বর্তমানে ব্রি বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন মৌসুমের উপযোগী আরও তিনটি জিঙ্কসমৃদ্ধ ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে। এগুলো হচ্ছে ব্রি ধান৬৪, ব্রি ধান৭২ এবং ব্রি ধান৭৪। পাশাপাশি অন্যান্য পুষ্টি উপাদান যেমন- প্রোটিন, আয়রন, এন্টি অক্সিডেন্ট, বিটা ক্যারোটিনসমৃদ্ধ ভিটামিন-এ ধানসহ বিভিন্ন পুষ্টিকর ধান উদ্ভাবনে ইতিবাচক সাফল্য রয়েছে বিজ্ঞানীদের সম্ভারে। অদূর ভবিষ্যতে আরও নতুন নতুন পুষ্টিকর ধানের সুখবর দিতে নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছেন গবেষকরা। এই সুখবর দিতে চাই যাদের ব্রিতে পরিদর্শনে আসার সুযোগ হয় না তাদেরও। শুরু করেছিলাম ব্রিতে পরিদর্শনে আসা একজন উৎসুক ক্যাডেটের প্রশ্ন নিয়ে। শেষ করব তার প্রশ্ন দিয়েই। পরিদর্শন শেষে তার জিজ্ঞাসাথ তাহলে ভিন্ন ভিন্ন পুষ্টিসমৃদ্ধ বিভিন্ন জাত তৈরি না করে সব পুষ্টি উপাদান সমৃদ্ধ একটি জাত কেন তৈরি করছেন না বিজ্ঞানীরা? খুবই  যৌক্তিক প্রশ্ন বটে! এই প্রশ্নে বিজ্ঞানীদের জন্য আগামী দিনের ভাবনার  খোরাক ও গবেষণার ইতিবাচক ইঙ্গিত আছে।

আরো খবর...