কোয়েল পালন ঃ অল্প খরচে বেশী আমিষ ও পুষ্টি

মাহমুদ শরীফ ॥ পোল্ট্রিতে এগারটি প্রজাতি রয়েছে, তন্মধ্যে কোয়েল একটি ছোট আকারের পাখি। অন্যান্য পোল্ট্রির তুলনায় কোয়েলের মাংস এবং ডিম পুষ্টি ও গুণগতভাবে উৎকৃষ্ট। আনুপাতিক হারে কোয়েলের ডিমে কোলেস্টেরল কম এবং আমিষ বেশি। একটি মুরগির পরিবর্তে ৮টি কোয়েল পালন করা সম্ভব। কাজেই বাড়ির আঙিনায় ঘরের কোণে ১০-২০টা কোয়েল অতি সহজেই পালন করা যায়। কোয়েল পাখি প্রতিপালন করে পারিবারিক পুষ্টি জোগানের সাথে সাথে অতিরিক্ত কিছু আয় করা সম্ভব। স্বল্প মূল্যে, অল্প জায়গায়, অল্প খাদ্যে কোয়েল পালন করা যায়। কোয়েল পালনের সুবিধা ঃ কোয়েল ৬-৭ সপ্তাহে ডিমপাড়া শুরু করে এবং বছরে ২৫০-২৬০ টি ডিম দেয়। ডিমে কোলেস্টেরল কম এবং প্রোটিনের ভাগ বেশি।  কোয়েলের দৈহিক ওজনের তুলনায় ডিমের শতকরা ওজনও বেশি। ৮-১০টা কোয়েল একটি মুরগির জায়গায় পালন করা যায় এবং ১৭-১৮ দিনে ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়।  রোগবালাই খুব কম এবং খাবার খুবই কম লাগে। বাংলাদেশের আবহাওয়া কোয়েল পালনের উপযোগী। অল্প পুঁজি বিনিয়োগ করে অল্প দিনে বেশি লাভ করা যায়। কোয়েলের জাত ঃ পৃথিবীতে বর্তমানে ১৭-১৮ জাতের কোয়েল আছে। অন্যান্য পোলট্রির মতো কোয়েলের মাংস এবং ডিম উৎপাদনের জন্য পৃথক পৃথক জাত আছে। পৃথিবীতে কোয়েলের বিভিন্ন জাতের মধ্যে ‘জাপানিজ কোয়েল’ অন্যতম। উল্লে¬খ্য বিভিন্ন জাতের কোয়েলের প্রকৃত উৎস্য জাপানিজ কোয়েল। প্রজনন ঃ শুধুমাত্র ডিম ফুটাতে চাইলে স্ত্রী এবং পুরুষ কোয়েল একত্রে রাখার প্রয়োজন। স্ত্রী কোয়েল প্রতিপালন অধিক লাভজনক। আশানুরূপ ডিমের উর্বরতা পেতে হলে ৩টি স্ত্রী কোয়েলের সাথে ১টি পুরুষ কোয়েল দেয়ার ৪ (চার) দিন পর থেকে বাচ্চা ফুটানোর জন্য ডিম সংগ্রহ করা উচিৎ। স্ত্রী কোয়েল থেকে পুরুষ কোয়েল আলাদা করার পর তৃতীয় দিন পর্যন্ত ফুটানোর ডিম সংগ্রহ করা যায়। বাংলাদেশের আবহাওয়ায় কোয়েল ৬-৭ সপ্তাহ বয়সে ডিম পাড়া শুরু করে এবং ৮-১২ মাস পর্যন্ত ডিম পাড়া অপরিবর্তিত থাকে। উপযুক্ত পরিবেশে প্রথম বছর গড়ে ২৫০-৩০০টি ডিম পাড়ে। দ্বিতীয় বছরের ডিমের উৎপাদন প্রথম বছরের উৎপাদনের শতকরা ৪৮ ভাগ। কোয়েল ডিমের উর্বরতা শতকরা ৮২-৮৭ ভাগ। ডিমপাড়া শুরুর প্রথম দুই সপ্তাহের ডিম ফুটাতে বসানো উচিত নয়। কোয়েলের ডিমের গড় ওজন ১০-১২ গ্রাম।

কোয়েলের বাচ্চার ব্র“ডিং এবং যতœ ঃ সদ্য ফুটন্ত কোয়েলের বাচ্চা খুবই ছোট থাকে, ওজন মাত্র ৫-৭ গ্রাম। এ সময় যে কোনো রকম ক্রটিপূর্ণ ব্যবস্থাপনার প্রভাব স্বাভাবিক দৈহিক বৃদ্ধি, ডিম উৎপাদন এবং বেঁচে থাকার ওপর পড়ে। এঅবস্থায় খাদ্যে প্রয়োজনীয় পুষ্টিমান এবং কাম্য তাপমাত্রা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে বজায় রাখতে হবে। বাচ্চাকে ব্র“ডিং বা তাপ দেয়া খাঁচায় এবং লিটারে করা যায়।

বাচ্চার বয়স তাপমাত্রা ঃ প্রথম সপ্তাহ ৩৫০ সেন্টিগ্রেড (৯৫ ডিগ্রি  ফারেনহাইট) তৃতীয় সপ্তাহ ২৯.৫০ সেন্টিগ্রেড (৮৫ ডিগ্রি  ফারেনহাইট)। দ্বিতীয় সপ্তাহ ৩২.২০ সেন্টিগ্রেড (৯০ ডিগ্রি  ফারেনহাইট) চতুর্থ সপ্তাহ ২৭.৬০ সে. (৮০ ডিগ্রি ফারেনহাইট)। ইনকুবেটরে বাচ্চা ফুটার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ব্র“ডিং ঘরে এনে প্রথমে গ্লুকোজ এবং এমবাভিট ডলিউ এস পানির সাথে মিশিয়ে পরপর তিনদিন খেতে দেয়া ভালো এবং পরে খাদ্য দিতে হবে। প্রথম সপ্তাহ খবরের কাগজ বিছিয়ে তার ওপর খাবার ছিটিয়ে দিতে হবে এবং প্রতিদিন খবরের কাগজ পরিবর্তন করতে হবে। এক সপ্তাহ পর ছোট খাবার পাত্র বা ফ্লাট ট্রে ব্যবহার করতে হবে। পানির পাত্রে বাচ্চা যাতে পড়ে না যায় সে জন্য মার্বেল অথবা কয়েক টুকরা পাথর খন্ড পানির পাত্রে রাখতে হবে। সর্বদাই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পানি সরবরাহ করতে হবে।

খাদ্য ব্যবস্থাপনা ঃ বাচ্চা, বাড়ন্ত অথবা প্রজনন কাজে ব্যবহৃত কোয়েলের জন্য স্ট্যান্ডার্ড রেশন বাজারে সহজলভ্য নয়। কোয়েলের রেশনকে তিনভাগে ভাগ করা যায়। স্টার্টার, বাড়ন্ত, এবং লেয়ার বা ব্রিডার। ডিম পাড়া কোয়েলের প্রতি কেজি খাবারে ২.৫-৩.০% ক্যালসিয়াম থাকতে হবে। ডিমের উৎপাদন ধরে রাখার জন্য গরমের সময় ৩.৫% ক্যালসিয়াম প্রয়োজন।

বাসস্থান ঃ বাণিজ্যিকভাবে কোয়েল পালনের জন্য লিটার পদ্ধতির চেয়ে কেইজে পালন অধিক লাভজনক। বাচ্চা অবস্থায় প্রতিটি কোয়েলের জন্য খাঁচায় ৭৫ বর্গ সেন্টিমিটার এবং মেঝেতে ১০০ বর্গ সেন্টিমিটার জায়গায় দরকার। অন্যদিকে বয়স্ক কোয়েলের বেলায় খাঁচায় প্রতিটির জন্য ১৫০ বর্গ সেন্টিমিটার এবং মেঝেতে ২৫০ বর্গ সেন্টিমিটার জায়গা প্রয়োজন। কোয়েলের ঘরে পর্যাপ্ত আলো  বাতাসের ব্যবস্থা রাখতে হবে। তাপমাত্রা ৫০-৭০ ডিগ্রি  ফারেনহাইট হওয়া ভালো। স্ত্রী কোয়েল এবং পুরুষ কোয়েল যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পৃথক পথৃকভাবে রাখতে হবে। খাঁচায় কোয়েল পালন ঃ খাঁচায় ৫০টি বয়স্ক কোয়েলের জন্য ১২০ সেমি. দৈর্ঘ্য, ৬০ সেমি. প্রস্থ এবং ৩০ সেমি. উচ্চতা বিশিষ্ট একটি খাঁচার প্রয়োজন। খাঁচার মেঝের জালিটি হবে ১৬-১৮ গেজি ৩ সপ্তাহ পর্যন্ত বাচ্চার খাচার মেঝের জালের ফাঁক হবে ৩ী৩ মিলিমিটার এবং বয়স্ক কোয়েলের খাঁচায় মেঝের জালের ফাঁক হবে ৫/৫ মিলিমিটার। খাঁচার দুই পার্শ্বে একদিকে খাবার পাত্র অন্যদিকে পানির পাত্র সংযুক্ত করে দিতে হবে। খাঁচায় ৫০টি কোয়েলের জন্য তিন সপ্তাহ বয়স পর্যন্ত ২৫ সেন্টিমিটার বা ১০ ইঞ্চি উচ্চতা বিশিষ্ট ২৮ বর্গ সেন্টিমিটার বা ৩ বর্গফুট জায়গার প্রয়োজন। লিটার পদ্ধতিতেও কোয়েল পালন করা যায়। কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে বেশ কয়েকটি কোয়েল খামার রয়েছে। শহর গড়াই নদীর ঘাট সংলগ্ন লালন বাজারে আছে “ভাই ভাই কোয়েল ও টারকী খামার“। আপনিও ইচ্ছা করলে বিভিন্ন বয়সের কোয়েল ও টারকীর জন্য ০১৯১৯৫১৫৬০০ এই নাম্বারে যোগাযোগ করতে পারেন।

 

 

আরো খবর...