কৃষি যান্ত্রিকীকরণে আশা জাগাচ্ছেন দেশীয় উদ্যোক্তারা

কৃষি প্রতিবেদক ॥ বাংলাদেশে কৃষি যান্ত্রিকীকরণের ক্ষেত্রে বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ ও কার্যকরী অবকাঠামো না থাকায় এ সেক্টরের ক্রমবিকাশ যতটুকু গড়ে ওঠা দরকার তা হচ্ছে না। দেশীয় কারখানায় কৃষি যন্ত্রাংশ উৎপাদন শুরু হয় আশির দশকের গোড়ার দিকে। পুরনো ঢাকার জিনজিরা, ধোলাইখাল, টিপু সুলতান রোড, নারায়ণগঞ্জের ডেমরায় বিপুল পরিমাণে কৃষি যন্ত্র উৎপাদন শুরু হয়। বর্তমানে বগুড়া, টাঙ্গাইল, কুমিল্লা, ফরিদপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের ওয়ার্কশপে এখন প্রচুর পরিমাণে মানসম্মত যন্ত্রাংশ তৈরি হচ্ছে। এসব কৃষি যন্ত্রাংশের মধ্যে পাওয়ার পাম্প, পাওয়ার টিলারের টাইন, ব্লেড, লাইনার পিস্টন, পিস্টন রিং, গজপিন ও অন্যান্য ¯েপ্রয়ার পাম্প বেশি পরিমাণে উৎপাদিত হচ্ছে। এগুলোর যন্ত্রাংশ তৈরির মধ্যে শুধুমাত্র বর্তমানে বগুড়ায় ৮০-৮৫ শতাংশ যন্ত্রাংশ তৈরি হয়।
বাংলাদেশে কৃষি যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশের বাৎসরিক বাজার প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা। দেশে কৃষিকাজে যেসব যন্ত্রপাতির ব্যবহার হচ্ছে তার বেশিরভাগ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হচ্ছে। যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ আমদানির ফলে প্রতিবছর বিশাল অংকের বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশিদের দিতে হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃষি যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশের ১১ হাজার কোটি টাকার প্রায় পুরো মার্কেটটাই বিদেশিদের দখলে। যন্ত্রপাতি আমদানি বাবদ এত বড় অঙ্কের টাকা চলে যাওয়ার কারণে রিজার্ভের ওপর চাপ পড়ছে। জানা যায়, বিদেশি যন্ত্রাংশ আমদানি করতে দেশ প্রায় হাজার কোটি টাকা ব্যয় করছে। এতে দেশীয় কারখানাগুলোর উৎপাদিত পণ্যের বাজার চরমভাবে মার খাচ্ছে। অথচ দেশের বগুড়ায় তৈরি ক্ষুদ্র কৃষি যন্ত্রাংশ দেশের চাহিদা মিটিয়ে নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ ও ভারতসহ অন্যান্য দেশে রপ্তানি হচ্ছে। কৃষি যন্ত্রাংশ কারখানাগুলো বর্তমানে দেশের সম্ভাবনাময় একটি শিল্প। দেশে অবাধ আমদানি রোধ করে এ শিল্পকে আরো গতিশীল করতে প্রয়োজন সরকারি পদক্ষেপ। আশার কথা বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) ও বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) উদ্ভাবিত কৃষি যন্ত্রপাতি মাঠ পর্যায়ে প্রচুর জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। বারির এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত ১০ বছরের উদ্ভাবিত হাইস্পিড রোটারি টিলার ৪,০০০টি, বারি বীজবপন যন্ত্র ১,০০০টি, গুটি ইউরিয়া প্রয়োগ যন্ত্র ১৬,০০০টি, ধান ও গম কর্তন যন্ত্র ১০০টি, শস্য মাড়াই যন্ত্র ৪,০০,০০০টি, ভুট্টা মাড়াই যন্ত্র ৪,০০০টি, শস্য কর্তন যন্ত্র ২০০টি কৃষকের মাঠে সঠিক কর্মদক্ষতার সঙ্গে কাজ করছে। দেশে ছোট বড় প্রায় ৮০০টি কৃষি যন্ত্রপাতি তৈরি কারখানা বারি এবং ব্রির মডেলের কৃষি যন্ত্রপাতি তৈরি করছে। এ ছাড়াও ৭০টি ফাউন্ডারি সপ, ১৫০০টি ক্ষুদ্র যন্ত্রাংশ তৈরি কারখানা এবং ২,০০,০০টি মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ কারখানা এই সেক্টরের সঙ্গে জড়িত। এর ফলে দেশের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কারখানা গড়ে ওঠার পাশাপাশি আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি শক্তি ও যন্ত্র বিভাগের প্রফেসর ড. মো. মঞ্জুরুল আলমের ২০১২ সালের এক তথ্যানুযায়ী দেখা যায়, বাংলাদেশে প্রতি বছর ৭১.১৬ টাকার কৃষি যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য কৃষি যন্ত্রাংশ লেনদেন হয় তার মধ্যে শুধুমাত্র কৃষি যন্ত্রপাতি খাতে ৮০ বিলিয়ন টাকার লেনদেন হয়। এর মধ্যে দেশে তৈরি কৃষি যন্ত্রপাতি খাতে লেনদেন হয় ৩৩.৮৫ বিলিয়ন টাকা। কৃষি ক্ষেত্রে ব্যবহার্য এমন যন্ত্রপাতি যেমন জমি চাষ ও কৃষিপণ্য পরিবহনের জন্য পাওয়ার টিলার ও ট্রাক্টরের শতকরা ৯৫ ভাগ, ফসল কাটার যন্ত্র-রিপার ৯৯ ভাগ, চারা রোপন যন্ত্র ১০০ ভাগ, কম্বাইন হারভেস্টার ১০০ ভাগ ও বীজবপন যন্ত্র ৭০ ভাগ আমদানি করতে হয়। শুধু মাড়াই কাজে ব্যবহার যন্ত্র থ্রেসার মেশিন ১০০ ভাগ দেশে তৈরি হয়। এর বিপরীতে বর্তমানে দেশে কৃষি যন্ত্র প্রস্তুতকারী অনেক শিল্প কারখানা গড়ে উঠলেও এসব শিল্প কারখানায় দক্ষ জনগোষ্ঠীর অভাবে এদের উৎপাদিত যন্ত্রপাতির মানও তেমন ভালো নয়, যার ফলে মাঠে কৃষিযন্ত্রের প্রয়োজনীয় কার্যদক্ষতা পাচ্ছে না কৃষকরা।

আরো খবর...