কৃষি এখন অভিজাত পেশা

কৃষি প্রতিবেদক ॥ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। ঘোষণা মোতাবেক, ২০৩০ সালের মধ্যেই সরকার এসডিজি অর্জন করতে চায়। সবার জন্য খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে বাড়াতে হবে খাদ্য উৎপাদন। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে কৃষিতে উৎপাদন বৃদ্ধি ও খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করে বিশ্ববাসীর নজর  কেড়েছে। চলতি বোরো মৌসুমে সরকার রেকর্ড পরিমাণে বোরো ধানের উৎপাদন করতে চায়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) কৃষির সরাসরি অবদান এখনো ১৪ দশমিক ২৩ শতাংশ। তবে কর্মসংস্থানের দিক থেকে কৃষি খাত এখনো প্রথম। প্রায় ৪০ দশমিক ৬ শতাংশ কর্মসংস্থান এসেছে কৃষি খাত থেকে। ২  কোটি ৪৭ লাখ লোক সরাসরি কৃষিকে পেশা হিসেবে নিয়েছে। সরকারের কৃষিবান্ধব নীতি, ভর্তুকি ও প্রযুক্তি সহায়তা, কৃষি সম্প্রসারণের আওতায় সনাতন কৃষি এখন বাণিজ্যিক কৃষিতে রূপান্তরিত হচ্ছে। কৃষি ধীরে ধীরে একটি লাভজনক ও অভিজাত  পেশা হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। ফলে কৃষিতে গ্রামীণ শিক্ষিত যুবক-যুবতী ও নারী উদ্যোক্তারা আকৃষ্ট হচ্ছে। তবে ফসলের ন্যায্য দাম নিয়ে কৃষকের অসন্তুষ্টি রয়েছে। সূত্র বলছে, উৎপাদনে রেকর্ড করতে চলতি সেচ মৌসুমে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে কার্যক্রম হাতে নিয়েছে সরকার। চলতি সেচ মৌসুমে বিদ্যুতের অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হয়। বিদ্যুৎ বিভাগ হিসাব করেছে, এবারের  মৌসুমে বিদ্যুৎচালিত সেচ পাম্পগুলোর জন্য গড়ে চাহিদা আড়াই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। আর এজন্য অতিরিক্ত গ্যাসের চাহিদা তৈরি হয়েছে এক হাজার ৪০০ এমএমসিএফডি। সারা দেশে বর্তমানে ৪ লাখ ১৬ হাজার ২৩১টি সেচ চালিত বিদ্যুৎ পাম্প রয়েছে। তবে এর বাইরে সারা দেশে বেশ কিছু অবৈধ সেচ পাম্প রয়েছে। এর জন্য প্রয়োজনীয় লোডের পরিমাণ ২ হাজার ৪০৬ মেগাওয়াট। এই চাহিদা ধরে  সেচ মৌসুমে বিদ্যুতের মোট চাহিদা দাঁড়াবে ১৩ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট। গত সেচ  মৌসুমে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১০ হাজার ৯৫৮ মেগাওয়াট। এবার চাহিদা বেড়েছে ২ হাজার ৫৪২ মেগাওয়াট। বর্তমানে মাথাপিছু বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ ৪৬৪ কিলোওয়াট। ২০০৮ সালে ছিল ২২৮ কিলোওয়াট। অর্থাৎ অর্ধেকেরও কম। এখন বিদ্যুৎ সুবিধার আওতাভুক্ত মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ, যা ২০০৮ সালে ছিল ৪৭ শতাংশ। বর্তমানে সরকারের বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষমতা ২০ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। যার মধ্যে নিজস্ব উৎপাদন ক্ষমতা ১৯ হাজার ২৪০ মেগাওয়াট এবং ভারত থেকে আমাদের চেয়ে কম মূল্যে আমদানিকৃত বিদ্যুৎ ১ হাজার ১৬০  মেগাওয়াট। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে ৩ হাজার ২৬৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে। বর্তমানে ১৩ হাজার ৬৫৪ মেগাওয়াট ক্ষমতার ৫৫টি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণাধীন রয়েছে। ২০২৩ সালের মধ্যে ২৮ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং প্রায় ২৩ হাজার সার্কিট কিলোমিটার সঞ্চালন লাইন নির্মাণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়েছে। ২০২০ সালের মধ্যে সবার জন্য বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা হবে। প্রতিবছরের ফেব্র“য়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত সেচ মৌসুম হিসেবে শনাক্ত করা হয়ে থাকে। সম্প্রতি সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো সেচ মৌসুমে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে বৈঠক করেছে। সেখানে কোনোভাবেই যাতে বোরো মৌসুমে কৃষকরা সেচের জন্য পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ পান সেটি নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। আর বিদ্যুতের পর্যাপ্ত উৎপাদন বাড়াতে সরকারি সংস্থা পেট্রোবাংলাকে অগ্রাধিকারভিত্তিতে গ্যাস সরবরাহ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জানা গেছে, গত অর্থবছরে সারা  দেশে বোরো ধানের উৎপাদন দাঁড়ায় ১ কোটি ৯৫ লাখ ৭৫ হাজার ৮১৯ মেট্রিক টন। তার আগে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে উৎপাদন ছিল ১ কোটি ৮০ লাখ ১৩ হাজার ৭৪৯ মেট্রিক টন। এবার সেটি দুই কোটি মেট্রিক টন ছাড়িয়ে যাবে বলে সরকার আশা করছে সরকার। একক ফসল হিসেবে বোরো ধান সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায়  দেশে। বর্তমানে প্রায় ৪৮ লাখ ৪৯ হাজার ৩৬৭ হেক্টর জমিতে এই ধানের চাষ হচ্ছে। তবে আশার কথা হলো, বোরো ধানের উৎপাদন জমি দেশে বাড়ছে। গত কয়েক বছর ধরে বোরোর ওপর নির্ভর করে ধান উৎপাদনে রেকর্ড করছে দেশ। চাল উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে চতুর্থ স্থানে। সবজি উৎপাদনে তৃতীয়, মাছ চাষে তৃতীয়, আম উৎপাদনে সপ্তম এবং আলু উৎপাদনে অষ্টম স্থানে রয়েছে। নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে এখন অন্য দেশেও চাল রফতানি হয়েছে। জানতে চাইলে  পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. রুহুল আমিন বলেন, ধান উৎপাদনকে বিবেচনায় নিয়ে আমরা এরই মধ্যে গ্যাস সরবরাহ বাড়িয়ে দিতে সব প্রতিষ্ঠানকে দিকনির্দেশনা দিয়েছি, যাতে বিদ্যুৎ উৎপাদন কোনোভাবে ব্যাহত না হয়। টাঙ্গাইলের ঘাটাইলের কৃষক মনসুর আলী বলেন, এবার বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি ভালো। সেচ প্রকল্পে আপাতত কোনো সমস্যা হচ্ছে না। আমাদের এ ব্যাপারে আগে থেকে দিকনির্দেশনা  দেওয়া হয়েছে। সেচ পাম্পগুলো রাত ১১টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ পাচ্ছে। তা ছাড় দিনের বেলাও বিদ্যুৎ ও পর্যাপ্ত লোড পাওয়া যায়। ব্যাংকের মাধ্যমে কৃষকদের সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। কৃষক ১০ টাকা দিয়ে ব্যাংক হিসাব খুলতে পারছে। ইতোমধ্যে প্রায় ১০ লাখ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড টাঙ্গাইল জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী শাহাদাত হোসেন বলেন, এ জেলায় সব মিলিয়ে ২১৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ লাগছে এই মৌসুমে। কিন্তু কোনো ঘাটতি নেই। কৃষকের বিদ্যুৎ জোগান দেওয়া হচ্ছে পর্যাপ্ত। কৃষি খাতকে উৎসাহিত করতে চলতি অর্থবছরে ২১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা কৃষিঋণের লক্ষ্য বেঁধে দেওয়া হয়েছে ব্যাংকগুলোকে, যা আগের অর্থবছরের থেকে বেশি। এই বড় লক্ষ্য অর্জনে এরই মধ্যে বৈঠক করে ব্যাংকগুলোকে তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

আরো খবর...