কৃষির উন্নয়নে ন্যানো প্রযুক্তির উজ্জ্বল সম্ভাবনা

কৃষি প্রতিবেদক ॥ বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশে ন্যানো প্রযুক্তি যেসব ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গবেষণা এবং বাণিজ্যিক ব্যবহার করা প্রয়োজন, সেগুলো হলো : উদ্ভিদপুষ্টি, শস্য সংরক্ষণ, রোগবিস্তার সংক্রান্ত বিষয় ও আবহাওয়ার পূর্বাভাস, রোগ নির্ণয়, জীবপ্রযুক্তি, প্রাণী স্বাস্থ্য, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, পণ্য প্যাকেটজাতকরণ, পানি ব্যবহার দক্ষতা উন্নয়ন এবং নিখুঁত (প্রিসিশন) কৃষি কার্যক্রম। ন্যানোকণা ব্যবহারে আরো যেসব চ্যালেঞ্জ রয়েছে তা হলো : ১. কিছু ন্যানোকণার পেটেন্ট রয়েছে, যার জন্য অনুমতি ছাড়া ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ২. কৃষিতে ন্যানোকণা ব্যবহারের ক্ষেত্রে যথাযথ আইন ও নীতির অপ্রতুলতা রয়েছে। ৩. উন্নয়নশীল দেশগুলোয় ন্যানোকণার গবেষণায় সামর্থ্যের (মানবসম্পদ ও স্থাপনা) সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ৪. ন্যানো বিষাক্ততা- কিছু ন্যানোকণা জিন বিবর্তন (মিউটেশন) করতে সক্ষম, ডিএনএ ধ্বংস করে এবং ন্যানো নন-টার্গেটেড জীবের প্রতি বিষাক্ততা তৈরি করতে পারে। সেজন্য, কৃষিতে নতুন ন্যানোকণা সূচনার আগে এর যথাযথ নিরাপদ ব্যবহারের ওপর গবেষণার যথেষ্ট প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশে গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও শিল্পের (ইন্ডাস্ট্রির) সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা পার্টনারশিপ খুবই দুর্বল। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মৌলিক জ্ঞান সৃজনের লক্ষ্য নির্ধারণ এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগে আবিষ্কৃত নতুন জ্ঞানের বাণিজ্যিকীকরণে রোডম্যাপ তৈরি আশু প্রয়োজন। জাতীয় অভীষ্ট লক্ষ্য সামনে রেখে জ্ঞান, দক্ষতা ও সামর্থ্যের সমন্বিত এবং সর্বোচ্চ ব্যবহারে কৃষির বতর্মান ও সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলায় ন্যানো প্রযুক্তির দক্ষ প্রয়োগে উৎপাদন ব্যবস্থাকে টেকসই করা সম্ভব। কৃষি উন্নয়ন তরান্বিত করতে ন্যানো প্রযুক্তি ব্যবহারের ভবিষ্যৎ খুবই উজ্জ্বল। তা সত্ত্বেও ন্যানো প্রযুক্তির ব্যবহারে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে, যা সমাধানের জন্য গবেষণা করা প্রয়োজন। যেমন : অধিকাংশ ন্যানোকণার বাণিজ্যিক উৎপাদন কষ্টসাধ্য ও ব্যয়বহুল কৃষিতে ন্যানোকণা বাণিজ্যিকীকরণের আগে এর সম্ভাব্য ক্ষতিকারক দিকগুলোর পুঙ্খানুপুঙ্খ মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। কৃষিতে ন্যানো প্রযুক্তির সফল প্রয়োগের লক্ষ্যে জরুরিভিত্তিক কিছু কর্মসূচি গ্রহণ প্রয়োজন। এগুলো হলো : ১. জীবপ্রযুক্তির মতো দেশে ন্যানো প্রযুক্তিবিষয়ক একটি টাস্কফোর্স গঠন করা। ২. দেশে ন্যানো প্রযুক্তি বিষয়ে একটি সম্মেলন আয়োজন করা। এটা জাতীয়ভাবে ন্যানো প্রযুক্তিতে বিশেষজ্ঞ এবং কৃষি গবেষণায় অবদান রাখতে সক্ষম বিজ্ঞানীদের সামর্থ্য জানা যাবে। ৩. ন্যানো প্রযুক্তি বিষয়ে একটি স্বতন্ত্র গবেষণা প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগ গ্রহণ এবং কেন্দ্রীয়ভাবে ভৌত সুবিধাদি প্রতিষ্ঠাকরণ। এক্ষেত্রে শ্রীলঙ্কার ন্যানো প্রযুুক্তিবিষয়ক প্রতিষ্ঠানের সফলতার অভিজ্ঞতার অনুসরণ করা যেতে পারে। ৪. কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাঠক্রমে ন্যানো প্রযুক্তিরবিষয়ক কোর্স ও বিষয়বস্তু অন্তর্ভুক্তকরণ। ৫. তরুণ গবেষকদের ন্যানো প্রযুক্তিরবিষয়ক প্রশিক্ষণের আয়োজন। ৬. জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিসম্পন্ন বিজ্ঞানীদের নিয়ে ইন্টারডিসিপ্লিনারি গবেষক দল গঠন করে টাগের্ট ওরিয়েন্টেড গবেষণার জন্য গবেষণা বরাদ্দ প্রদান। ৭. সরকারি প্রতিষ্ঠান ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগে গবেষণার ফলগুলো দ্রুত ব্যবহার উপযোগী শিল্প উপাদানে রূপান্তরে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ৮. ন্যানো প্রযুক্তিবিষয়ক একটি জাতীয় পেশাজীবী সংগঠন প্রতিষ্ঠা। নতুন ন্যানোকণা যেমন : ন্যানো সার, ন্যানো বালাইনাশক, ন্যানোবাহক, ন্যানো সেন্সর, ন্যানো মোড়কীকরণ এবং ন্যানোচিপ শস্যের স্মার্ট পুষ্টি, বৃদ্ধির উন্নয়ন এবং সংরক্ষণের মাধ্যমে কৃষির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে সক্ষম। ন্যানো প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিতভাবে নিখুঁত ও স্মার্ট কৃষির প্রসার ঘটিয়ে ফসলের উৎপাদন খরচ হ্রাস এবং শস্য সংগ্রহোত্তর ক্ষতি কমাবে। তাই ভবিষ্যৎ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও টেকসই কৃষিব্যবস্থা প্রবর্তন করতে নতুন ন্যানোকণা উদ্ভাবন, কৃষি ক্ষেত্রে তাদের নিরাপদ ব্যবহারের জন্য চাহিদামাফিক রূপকল্পনির্ভর আন্তঃবিভাগীয় কোলাবোরেটিভ গবেষণা জোরদার করার এখনই শ্রেষ্ঠ সময়। কৃষির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে ন্যানো প্রযুক্তি একটি কার্যকর ও সম্ভাবনাময় কৌশল হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে। ন্যানোকণার ব্যবহার নাটকীয়ভাবে উদ্ভিদ পুষ্টি উন্নয়ন, সার ব্যবহারের দক্ষতা বৃদ্ধি, ফসলে উৎপাদন বৃদ্ধি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, পানি ব্যবস্থাপনা, রোগ নির্ণয়, বালাই দমন, খাদ্য মোড়কীকরণ, অজৈব অভিঘাত সহনশীলতা বৃদ্ধি এবং নিখুঁত (প্রিসিশন) কৃষি উন্নয়নে অবদান রাখতে সক্ষম। উদাহরণস্বরূপ, নতুন ন্যানোকণা কার্যকরভাবে শস্য সংরক্ষণের জন্য বালাইনাশকের কার্যকারিতা এবং নিরাপদ ব্যবহারে উন্নয়ন ঘটাতে পারে। অনুরূপভাবে, ন্যানোসার রিলিজ বা ধীরে ধীরে উদ্ভিদের গ্রহণ উপযোগী হওয়া ও ধীর অবক্ষয়ের মাধ্যমে কার্যকরভাবে সার ব্যবহারের দক্ষতার প্রভূত উন্নয়ন করতে পারে। ন্যানোকণার ব্যবহার অথবা ন্যানো বাহকের ভেতরে সারের উপাদান ব্যবহার শস্যের বৃদ্ধি ও উৎপাদনশীলতার উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে। টেকসই উদ্ভিদ পুষ্টি এবং ফসল উৎপাদনের জন্য ন্যানো উপাদানের দক্ষতা আজ প্রমাণিত। সম্প্রতি, ব্যাকটেরিয়াল ও ছত্রাকজনিত সংক্রামক রোগ দমনে জীবাণু প্রতিরোধী দিনের আলোতে রিচার্জেবল ন্যানোতন্তু ঝিল্লিগুলো আলোতে কার্যকর রাসায়নিক যৌগগুলো একত্র করে তৈরি করা হয়েছে। এসব ন্যানোপদার্থ দিনের আলোতে দক্ষতার সঙ্গে ক্রিয়াশীল অক্সিজেন প্রজাতি উৎপন্ন করে রোগজীবাণুকে প্রতিরোধ করতে পারে। জীবাণু প্রতিরোধী ন্যানো সূর্যালোকে চার্জেবল ন্যানো উপাদান তৈরির এ চমকপ্রদ কৌশল টেকসই কৃষিব্যবস্থায় বালাই দমনে কাযর্করভাবে ব্যবহার করা সম্ভব। ন্যানো প্রযুক্তির ডিভাইস ও যন্ত্রপাতি যেমন ন্যানো ক্যাপসুল, ন্যানোকণা, ন্যানো রোবট, এমনকি ভাইরাস ন্যানো ক্যাপসিড সুনির্দিষ্টভাবে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসায়, উদ্ভিদ পুষ্টি গ্রহণ ত্বরান্বিতকরণ, সুনির্দিষ্ট স্থানে কার্যকর উপাদান ডেলিভারি এবং পানি শোধন প্রক্রিয়ার উন্নয়নে ব্যবহার করা সম্ভব। উদ্ভিদ প্রজনন এবং জেনোমিক রূপান্তরেও ন্যানোকণার ব্যবহার হয়ে থাকে। বতর্মান সরকার আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবান্ধব। কৃষিতে ন্যানো প্রযুক্তি ব্যবহারে অন্তর্ভুক্তি জাতীয় কৃষিনীতি ২০১৮ যে যথেষ্ট ভবিষ্যৎমুখী, তা প্রমাণ করে। যদিও বর্তমানে বাণিজ্যিকভাবে ন্যানো প্রযুক্তি কৃষকের মাঠপর্যায়ে এখনো তেমন একটা শুরু হয়নি। কিন্তু শিগগির কৃষিতে নানারকম ন্যানো প্রযুক্তির প্রয়োগ শুরু হবে, তা আশা করা যায়। বাংলাদেশে কৃষিতে ন্যানো প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রসমূহ হচ্ছে রোগ নির্ণয়, রোগবালাই ব্যবস্থাপনা ন্যানোপেস্টিসাইড, ন্যানোফার্টিলাইজার, ন্যানোহার্বিসাইড, অগ্রাধিকারভিত্তিক ফুড প্যাকেজিং, ওষুধ ডেলিভারি, মৃত্তিকা দূষণ নির্ণয় ও দূরীকরণ, ফসল উন্নয়ন (জাত), উদ্ভিদে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত সহনশীলতা বৃদ্ধি, ন্যানোসেন্সর, সেচের দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণ এবং নিখুঁত (প্রিসিশন) কৃষি। কৃষিতে ন্যানো প্রযুক্তি অনেক সম্ভাবনাময়, তবে বাংলাদেশের কৃষি বিদ্যালয়গুলো ও কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রশিক্ষণ ও গবেষণায় ন্যানো প্রযুক্তি খুব একটা অন্তর্ভুক্ত নয়। ন্যানো প্রযুক্তি আন্তঃবিভাগীয় (ইন্টারডিসিপ্লিনারি) এবং সফল ন্যানো প্রযুক্তি উদ্ভাবনে রসায়নবিদ, পদার্থবিদ, বস্তু বিজ্ঞানী, কৃষি বিজ্ঞানী এবং জীববিজ্ঞানীদের যৌথ ও সমন্বিত গবেষণা প্রয়োজন। অন্যথায় এটি শুধু কাগুজে নীতি হিসেবে থেকে যাবে। এদেশে ইতোমধ্যে কৃষিতে ন্যানোটেকবিষয়ক কিছু গবেষণায় সাফল্যের নজির রয়েছে। সম্প্রতি বুয়েট ও বশেমুরকৃবির যৌথ গবেষণায় ন্যানো প্রযুক্তির মাধ্যমে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে বহুলভাবে ব্যবহৃত সেলুলোজ দ্বারা তৈরি কাগজে জীবাণুরোধী গুণাবলি আরোপ করার কৌশল উদ্ভাবন করা হয়েছে। এ উদ্ভাবন আমেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটির বিখ্যাত জার্নাল ‘এসিএস সাসটেইনেবল কেমিস্ট্রি অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং’-এ প্রকাশিত হয়েছে। জীবাণুরোধী সিলভার ন্যানোকণা কাগজের ওপর সংযোজনের জন্য বিজ্ঞানীরা সামুদ্রিক শামুক ও ঝিনুকের মধ্যে বিদ্যমান পলিডোপামিন নামক বিশেষ প্রাকৃতিক যৌগের বৈশিষ্ট্য ধার করে। পলিডোপামিনের উপস্থিতির কারণে সমুদ্রের প্রবল ঢেউ উপেক্ষা করেও পাথর ও সমুদ্রপৃষ্ঠের সঙ্গে শামুক ও ঝিনুক নিজেদের শক্তভাবে আটকে রাখতে পারে। উদ্ভাবিত ন্যানোসিলভার কণা সংযোজিত কাগজ তাই কৃষিতে গুরুত্বপূর্ণ নানারকম ব্যাকটেরিয়া ও ক্ষতিকারক ছত্রাক দমনে খুবই কার্যকর হতে পারে।
লেখক ঃ ড. তোফাজ্জল ইসলাম, অধ্যাপক, বায়োটেকনোলজি বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং স্বর্ণপদক বিজয়ী কৃষি বিজ্ঞানী

আরো খবর...