কৃষিতে কৃত্রিম উপগ্রহের ব্যবহার

কৃষি প্রতিবেদক ॥ খ্রিস্টপূর্ব দশ হাজার বছর আগে মানুষ কাঠি দিয়ে মাটি গর্ত করে কৃষির সূচনা করে। এরপর- খুরপি, হস্তচালিত যন্ত্রপাতি, মানুষ, ঘোড়া, গরু ইত্যাদি দিয়ে ফসল চাষাবাদ করে আসছে। এখন কৃষিতে কৃত্রিম উপগ্রহ বা স্যাটেলাইট ব্যবহৃত হচ্ছে। কৃত্রিম উপগ্রহ কৃষির ধারা পাল্টে দিয়েছে। গড়ে তুলেছে আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা। কৃষিপ্রযুক্তি পৌঁছে গেছে উন্নতির চরম শিখরে। তবু আমাদের কৃষি প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। অনেক দেশেই প্রকৃতিকে বশ মানিয়ে কৃষি উৎপাদন করছে। মানুষ যতই কৃষি উৎপাদনের নিত্য-নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করছে ততই প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেন সবসময় তাদের উপহাস করছে। তবু মানুষ থেমে থাকেনি। দুর্দম্য প্রতিকূলতার মধ্যেও মানুষ উদ্ভাবন করেছে কৃষিভিত্তিক উপগ্রহ। মহাকাশে স্থাপিত কৃত্রিম উপগ্রহ আর কম্পিউটারের সমন্বয়ে বিজ্ঞানীরা গড়ে তুলেছে একটি অত্যাধুনিক কৃষি আবহাওয়া নেটওয়ার্ক। এর মাধ্যমে কৃষির বর্তমান ও ভবিষ্যৎ অবস্থা জানা যায়। ‘মেটিওস্যাট’ একটি আবহাওয়া উপগ্রহের নাম। এটাকে বলে আফ্রিকার অতন্দ্রপ্রহরী। ১৯৮১ সালে ঊঁৎড়ঢ়ব ঝঢ়ধপব অমবহপু (ঊঝঅ) এটি মহাকাশে উৎক্ষেপণ করে। বিষুবরেখা এবং আফ্রিকা মহাদেশ থেকে ২৩০০ মাইল ওপরে মহাকাশে স্থির বিন্দুতে অবস্থান করে মেটিওস্যাট পৃথিবী প্রদক্ষিণ করে চলছে। মেটিওস্যাট ইতোমধ্যেই আফ্রিকা মহাদেশের কৃষি জরিপ সম্পন্ন করেছে। এটি প্রতি ৩০ মিনিট পর পর আফ্রিকা মহাদেশের কৃষি আবহাওয়ার খবর পাঠায়। পৃথিবীতে অবস্থিত ভূকেন্দ্রে নিয়মিত জমির বিকিরণ, বাষ্পীভবনের হার, ভূমির বন্ধুরতা ইত্যাদি তথ্য নির্ভুলভাবে পাঠাচ্ছে। এই কেন্দ্রে অত্যাধুনিক কম্পিউটারের সাহায্যে তৈরি কম্পিউটারের মাধ্যমে। প্রত্যেক ইউনিটের ফসল কেমন হবে, তার সর্বশেষ খবর সংগ্রহ করে বলেই এর নাম ‘ক্রপকাস্ট’। যুক্তরাষ্ট্রের আইস্যাট ঈৎড়ঢ় ফরধষ ঁঢ় নামে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি চালু করেছে। এই নতুন প্রযুক্তি উপগ্রহের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করে কম্পিউটার নেটওয়ার্কের মাধ্যমে গ্রাহকদের কৃষি সম্পর্কে সর্বশেষ তথ্য জানিয়ে দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে যে কোনো টার্মিনাল ব্যবহার করে ঈৎড়ঢ় ফরধষ ঁঢ় এর সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা জানিয়ে দেয় আবহাওয়ার প্রতিদিনের খবর, শস্যের অবস্থা, মাটির আর্দ্রতা, বৃষ্টিপাত ইত্যাদি। ফলে কৃষকরা বা খামার ব্যবস্থাপক আগাম তথ্য জেনে আগাম ব্যবস্থা নিতে পারে।
জাপানে কৃত্রিম উপগ্রহ প্রেরিত তথ্য কম্পিউটারের বিশ্লেষণ করে ফসলের রোগ, পোকামাকড়ের আক্রমণ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্বাভাস দেয়। একই ভাবে ফসল কাটার সময়ও আগেই জানিয়ে দেয়। এতে ঘরে বসেই শত শত মাইল দূরে অবস্থিত জমির ফসলের খবর নেয়া যায়।
বাংলাদেশেও কৃষির কিছু কিছু ক্ষেত্রে কৃত্রিম উপগ্রহের ব্যবহার হচ্ছে। ঢাকার আগারগাঁওর স্পেস রিসার্চ অ্যান্ড রিমোট সেনসিং অর্গানাইজেশন স্পারসোতে ব্যবহৃত কৃত্রিম উপগ্রহের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে আবহাওয়া প্রজেকশন। এ ছাড়া স্যাটেলাইটভিত্তিক ভূমি জরিপ কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে ল্যান্ডস্যাট নামের একটি কৃত্রিম উপগ্রহ। স্পারসোতে বর্তমানে কৃত্রিম উপগ্রহের মাধ্যমে খরা ও বন্যার ক্ষতির পরিমাপ, বৃষ্টিপাত, টর্নেডো, ঝড়, সাইক্লোন, জলোচ্ছ্বাস, বন্যার পূর্বাভাস, ভূমি জরিপ, ভূমিক্ষয়, মাটির লবণাক্ততা ও জমির পরিমাণ নির্ণয় করা হচ্ছে। বনের শ্রেণি, সমুদ্রের পানির উচ্চতা, পুকুরের সংখ্যা নির্ণয়, বোরো ধান চাষাবাদের এলাকা পরিমাপ, চিংড়ি চাষ এলাকা, ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল, বঙ্গোপসাগরে ক্লোরোফিলপূর্ণ এলাকা পরিমাপ ইত্যাদি করা হয়। এগুলো কৃত্রিম উপগ্রহের ইমেজের মাধ্যমে করা হয়। এ ছাড়া জাপান, কানাডা ও ফ্রান্স থেকে আমাদের দেশের কৃষি ও আবহাওয়া ইমেজ ক্রয় করা হয়। ওই দেশগুলোর কৃত্রিম উপগ্রহ সবসময় আমাদের দেশের ইমেজ (ছবি) নিচ্ছে। বর্তমানে ঢাকায় আছে ‘জিও স্টেশনারি মেট্রোলজিক্যাল স্যাটেলাইট’। এটি দুই ঘণ্টা পর পর ঝড়, সাইক্লোন, মেঘ, বৃষ্টি ইত্যাদি আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেয় এবং প্রয়োজনীয় ছবিসহ ছবির সাহায্যে ঝড়ের অবস্থান, ঝড়ের আকার-বেগ, মেঘের ঘনত্ব, দূরত্ব, বায়ুপ্রবাহ, ঝড়ের সম্ভাব্য আঘাতের স্থান সম্পর্কে পূর্বাভাস, মেঘমালার অবস্থান এবং বরফ আচ্ছাদিত স্থানগুলো তিন হাজার মাইলব্যাপী নির্ণয় করা যায়। মহাকাশে স্থাপিত কৃত্রিম উপগ্রহের মাধ্যমে ভূপৃষ্ঠের সুগম ও দুর্গম স্থানের তথ্য এবং উপাত্ত সংগ্রহ সাম্প্রতিককালের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উন্নয়নের এক বিস্ময়কর অগ্রগতি। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদ অনুসন্ধান করা সম্ভব কৃত্রিম উপগ্রহের মাধ্যমে। যেসব দুর্গম স্থানে মানুষের পদচারণা সম্ভব নয়, সেখানকার তথ্য সংগ্রহে কৃত্রিম উপগ্রহ বিশেষ ভূমিকা রাখছে।

আরো খবর...