কুষ্টিয়া সরকারি কলেজে ভুয়া ও মনগড়া খাত দেখিয়ে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নেয়া হচ্ছে লাখ লাখ টাকা

কর্মচারিদের বেতনের অর্থ শিক্ষার্থীদের কাঁধে
অতিরিক্ত ফিস প্রত্যাহারের দাবিতে সড়ক অবরোধ, বিক্ষোভ

নিজ সংবাদ ॥  অনার্স ২য় বর্ষের ফরম পূরণে ভুয়া ও মনগড়া নানা খাত দেখিয়ে কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের হাজার হাজার শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে তোলা হচ্ছে লাখ লাখ টাকা। অথচ যেসব খাত দেখিয়ে শিক্ষার্থীদের কাছ অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে তা তাদের কোন কাজে লাগছে না। এসব অর্থ ভুয়া বিল ভাউচার করে তুলে নিচ্ছে কলেজ প্রশাসন। দীর্ঘদিন ধরে এসব খাত বন্ধের দাবি জানিয়ে আসলেও তা কর্ণপাত করছে না কলেজ কর্তৃপক্ষ। এদিকে গত বছরের তুলনায় এ বছর পরীক্ষার ফিস দ্বিগুন করায় আন্দোলনে নেমেছেন শিক্ষার্থীরা। অতিরিক্ত ফিস প্রত্যাহারের দাবিতে গতকাল সোমবার সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করে তারা।

শিক্ষার্থীরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ কর্তৃপক্ষ নানা খাত  দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা অর্থ তুলে নিচ্ছে। এসব অর্থ শিক্ষার্থীদের ঘাড়ে বন্দুক রেখে তোলা হলে আমরা এর সুফল পাচ্ছি না। কর্মচারিদের বেতন বাড়ানো হয়েছে, সেই অতিরিক্ত অর্থ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করা হচ্ছে। এছাড়া বিভিন্ন অনুষ্ঠানের নামে বিল ভাউচার করে টাকা তুলে নেয়ার অভিযোগও আছে।

কলেজের অর্থ আদায়ের রশিদ ঘেঁটে দেখা গেছে, এ বছর ২১টি খাত দেখিয়ে অর্থ আদায় করা হচ্ছে। পরীক্ষার বোর্ড ফিস মাত্র ৮০০ টাকা হলেও ২১টি খাত দেখিয়ে নেয়া হচ্ছ্ ে৪ হাজার ৬০০টাকা। অথচ গত বছর নেয়া হয়েছিল মাত্র ২ হাজার ৭০০ টাকা।

এসব খাতের মধ্যে আছে কেন্দ্র ফি ৪৫০ টাকা, উন্নয়ন ফি ২০০টাকা, কর্মচারি ফি ৫০০ টাকা, পরিবহন ও যোগাযোগ ফি ৫০ টাকা, চিকিৎসা ফি ২০টাকা, বিজ্ঞান ক্লাব ফি ২০ টাকা, আইসিটি ফি ২০টাকা, সেমিনার ফি ৩০০টাকা, ব্যবস্থাপনা ফি ১০০ টাকা ও বিবিধ ১০০টাকা, মসজিদ/মন্দির ফি ৫০টাকা, রেঞ্জার ফি ২৫ টাকাসহ সব মিলিয়ে নেয়া হচ্ছে ৪ হাজার ৬০০ টাকা।

শিক্ষার্থীরা জানান, কলেজে কোন পরিবহন ব্যবস্থা নেই। এছাড়া চিকিৎসা ও মসজিদ ফান্ডেই বছরে ওঠে প্রায় ১৫ লাখ টাকা। সব খাত মিলিয়ে প্রায় অর্ধকোটির বেশি অতিরিক্ত অর্থ হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে। যা দেখার কেউ নেয়। এদিকে গত বছর ফরম পুরনের সময় ২ হাজার ৭০০টাকা নেয়া হলেও এ বছর এক লাফে বাড়ানো হয়েছে ৪ হাজার ৬০০টাকা। ২২ হাজার শিক্ষার্থীর কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ নেয়া হচ্ছে, যা দেখার কেউ নেই।

কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে পড়–য়া অনার্স ২য় বর্ষের দুই শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,‘ নতুন অধ্যক্ষ এম মনজুর কাদির যোগ দেয়ার পরই নানা নৈরাজ্য শুরু হয়েছে। তিনি এর আগে কাউকে না জানিয়ে গাছ বিক্রি করে দেয়ার চেষ্টা করে। ছাত্রদলের আন্দোলনের মুখে তিনি গাছ বিক্রির সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন। পরে কাটা গাছও বিক্রির সময় হাতে-নাতে ধরা পড়েন। এখন অর্থ হাতানোর জন্য শিক্ষার্থীদের কাছে থেকে লাখ লাখ টাকা তুলে নেয়া হচ্ছে।

কলেজের শিক্ষার্থী আনিস ও রুমকি জানান,‘ আগে গরীব শিক্ষার্থীরা কম অর্থ দিয়ে ফরম পুরনের জন্য সুযোগ পেত। এখন অধ্যক্ষ শিওর ক্যাশের মাধ্যমে অর্থ আদায় করার নিয়ম করেছেন। যাতে কেউ কম না দিতে পারে। তিনি জুলুম করছেন আমাদের ওপর।

পরীক্ষায় অতিরিক্ত ফিস প্রত্যাহারের দাবিতে সড়ক অবরোধে করে বিক্ষোভ করেছে কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের কয়েক হাজার শিক্ষার্থী। গতকাল সোমবার সকাল ১১টায় অতিরিক্ত ফি প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে সরকারি কলেজের সামনের সড়কে অবস্থান নেয়। এ সময় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। অতিরিক্ত ফিস প্রত্যাহার, ক্যান্টিন চালু, খেলার মাঠ সংস্কার, পরিবহন ব্যবস্থা চালুসহ বিভিন্ন দাবি জানানো হয় এ সময়।

শিক্ষার্থীরা জানান,‘ গত বছর অনার্সসহ সব পরীক্ষার ফি নির্ধারণ করা হয়েছিল ২ হাজার ৭০০টাকা। এবছর এক লাফেই অধ্যক্ষ তা বাড়িয়ে প্রায় ৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করেছেন। বিভিন্ন ভুয়া ও মনগড়া খাত তৈরি করে এসব অর্থ নির্ধারণ করা হয়েছে। যা আমাদের কোন কাজে আসছে না।

রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের দুই শিক্ষার্থী জানান,‘ গত বছর আমাদের ফিস ছিল ৩ হাজার টাকার নিচে। এবার সেটা বাড়িয়ে ৫ হাজার টাকা করা হয়েছে। যেখানে বোর্ড ফিস মাত্র ৮০০ টাকা সেখানে বিভিন্ন খাতওয়ারি টাকা তোলা হচ্ছে। যেসব খাত থেকে শিক্ষার্থীরা কোনভাবেই উপকৃত হচ্ছে না। এটা আমাদের ওপর জুলুম করা হচ্ছে।

তারা বলেন, আগে গরীব ছাত্ররা কমে ফরম পুরণ করতে পারত। এখন কলেজ কর্তৃপক্ষ অনলাইনে অর্থ আদায় করছে। যাতে কেউ কম দিতে না পারে। বাংলাদেশের কোন কলেজে এই ব্যবস্থা না থাকলেও দুর্নীতিবাজ অধ্যক্ষ নিজের পকেটে ভরতে এ কাজ করছে।

এদিকে ফি প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে সকাল ১১টায় রাস্তায় নামে কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের কয়েক হাজার শিক্ষার্থী। রাস্তায় বসে তারা বিক্ষোভ শুরু করে। এ সময় বিভিন্ন দাবি জানিয়ে তারা প্লাকার্ড প্রদর্শন করে। শিক্ষার্থীরা সড়কে বসে পড়ায় বন্ধ হয়ে যান চলাচল। গুরুত্বপূর্ণ এ সড়কটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দুর্ভোগে পড়েন পথচারিসহ সাধারন মানুষ।

এদিকে, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে অধ্যক্ষ এম মনজুর কাদির জরুরী একাডেমিক কাউন্সিলের সভা করেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন শিক্ষক বলেন, সভা থেকে মাত্র ২০০টাকা কমানো হয়েছে।

কলেজের অধ্যক্ষ কাজী মনজুর কাদির বলেন,‘ সভা থেকে ২০০ টাকা কমানো হয়েছে। আর একটি কমিটি করে দেয়া হয়েছে। নিয়মিত ও অনিয়মিতদের ব্যাপারে তারা একটি সিদ্ধান্ত দিবে। এছাড়া ফরম পুরনের সময় বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। কর্মচারিদের বেতন বৃদ্ধির কারনে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বেশি অর্থ নেয়ার কারনে অর্থের পরিমান বেড়ে গেছে।’

আরো খবর...