কুষ্টিয়ায় নদ-নদী,খালে তিন হাজার দখলদার

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়া জেলার নদ-নদী ও খালের বিভিন্ন জায়গায় অন্তত তিন হাজার দখলদার রয়েছে। ফলে নদ-নদী ও খালের প্রবাহ স্বাভাবিক নেই। পানি উন্নয়নবোর্ড ও জেলা প্রশাসন পৃথকভাবে এসব দখলদারদের চিহিৃত করেছে। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে জেলার ছয়টি উপজেলার সহকারি কমিশনার (ভূমি) কার্যালয় ও পানি উন্নয়ন বোর্ড কুষ্টিয়া কার্যালয় সরেজমিন পরিদর্শন করে এতালিকা তৈরি করেছে।

ভূমি কার্যালয় ও পাউবোর করা দখলদারদের তালিকাগুলো জেলা প্রশাসকের কাছে দেওয়া হয়েছে। গত শনিবার কুষ্টিয়া শহরের জিকে ঘাট এলাকায় গড়াই নদীর ধারে দখলদার উচ্ছেদ অভিযানও শুরু হয়েছে।

জানতে চাইলে কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসক আসলাম হোসেন বলেন,‘নদ-নদী ও খাল বেদখল রয়েছে। তার তালিকা আমাদের কাছে আছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনীতিবিদ, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যদের নিয়ে যৌথ বৈঠক করে অভিযানে নামা হয়েছে। যেকোন উপায়ে নদ-নদী ও খালের প্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে সব রকম ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) কার্যালয় সূত্র জানায়, মার্চ মাসে প্রত্যেক উপজেলা সহকারি কমিশনার ( ভূমি) কর্মকর্তাকে লিখিত ও মৌখিকভাবে দখলদারদের তালিকা চাওয়া হয়। তবে কেউই তেমন সাড়া দেয় না। পরে কঠোর ভাষায় চিঠি পাঠানো হয়। তাতে বলা হয়, তালিকা না পাঠালে পরবর্তিতে যদি দখলদার পাওয়া যায় তবে তার দায় তাকেই (কমিশনার) নিতে হবে। এরপর ছয়টি উপজেলা থেকে দখলদার তালিকা আসতে থাকে।

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ওবাইদুল হক বলেন, ছয়টি উপজেলা থেকে প্রথমে দুটি উপজেলার তালিকা পাওয়া যায়। সেটা খুবই সামান্য। সন্তুষ্ট না হয়ে আবার তাগিদ দেওয়া হয়। তালিকার বাইরে আরও অনেক দখলদার রয়েছে। পরবর্তীতে এপ্রিল মাসের প্রথম দিকে ছয়টি উপজেলা ও পাউবোর পূর্নাঙ্গ তালিকা হাতে পান।

জেলা প্রশাসকের রাজস্ব কার্যালয় থেকে পাওয়া দখলদারদের তালিকায় রয়েছে পদ্ম নদী, গড়াই নদী ও কয়েকটি বিল। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তালিকায় এসব নদ-নদীর বাইরেও বেশি দখল করে আছে গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্পের ছোট বড় খালগুলো। জেলার ছয় উপজেলার ভূমি কর্মকর্তাদের পাঠানো তালিকায় প্রায় ৪০০ জন দখলদারের নাম উঠে এসেছে। সবচেয়ে বেশি দখল রয়েছে ভেড়ামারায় অন্তত ২০০জন। সেখানে হিসনা নদী দখল করে পাকা দালানও করা হয়েছে। বাকি দুই’শ জন পাঁচ উপজেলার দখলদার।

সরেজমিন হিসনা নদী এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, নদীর উভয় পাড়ে বাড়ি ও দোকান নির্মাণ করা হয়েছে। নদীর বুকে পানি না থাকায় কোন কোন জায়গায় ধান চাষ করা হয়েছে। দেখে বোঝার উপায় নেই এটা একটা নদী। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এক সময় হিসনা নদীতে বড় বড় ট্রলার চলেছে।  নদীর বর্তমান অবস্থা দেখে সেই কথা কেউ বিশ^াস করবে না। ভেড়ামারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সোহেল মারুফ বলেন, ভেড়ামারাতে হিসনা নদীতে অন্তত ২ শতাধিক দখলদারের নামের তালিকা জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো হয়েছে। এর সংখ্যা আরও হবে। বিভিন্ন সময়ে দখল হয়ে গেছে নদীটি। নদীতে পানি প্রবাহ কম। কোন কোন জায়গায় বাধও দেওয়া হয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তালিকায় পদ্মা নদী, গড়াই নদী ও সেচ প্রকল্পের ছোট বড় খাল দখল করে আছে অন্তত ২ হাজার ৯২১ জন দখলদার। বেশির ভাগই পাকা ও আধাপাকা টিনের বসত ঘর। কোন কোন জায়গায় টিনের দোকান রয়েছে। বছরের পর বছর ধরে অবৈধভাবে দখল করে বাস ও ব্যবসা করে আসছে তাঁরা।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী পীযুষ কৃষ্ণ কুন্ডু বলেন, জেলার বেশ কয়েকটি খাল সংকুচিত হয়ে গেছে। সেগুলো খনন কাজ শুরু হয়েছে। খালের জায়গা যারা দখল করে আছে তাদের নোটিশ করা হয়েছে। খাল খননের সময় উচ্ছেদ অভিযান চালানো হচ্ছে।

এদিকে কুষ্টিয়া শহরের বাসিন্দা ও সচেতন নাগরিক কমিটি কুষ্টিয়া শাখার সাবেক সভাপতি খলিলুর রহমান মজু বলেন, ‘আমি প্রায়ই সকালে গড়াই ও পদ্মা নদীর পাড় দিয়ে হাটতে বের হয়। কিন্তু নদীর দিকে তাকালে দখল ও দুষণ দেখে কষ্ট লাগে। দখলদারদের তালিকা যখন করা হয়েছে, তাহলে তাদের চিহিৃত করা গেছে। এখন তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। কুষ্টিয়ায় দখল ও দুষনের মাত্রা খুবই ভয়াবহ। আমি নিজে নদী কমিশনের চেয়ারম্যানের সাথে কথা বলেছি। তিনিও কুষ্টিয়ার ব্যাপারে অবগত আছেন।’

উচ্ছেদ শুরু ঃ কুষ্টিয়া সদর উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা শহর ঘেঁষে বয়ে যাওয়া গড়াই নদের তীরে জায়গা দখল করে গড়ে ওঠা অন্তত ৩০টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে অভিযান চালিয়েছে। জেলা প্রশাসক আসলাম হোসেনের নির্দেশে উচ্ছেদ অভিযানের নেতৃত্ব দেন সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জুবায়ের হোসেন চৌধুরী।

গত শনিবার সকাল আটটা থেকে বেলা এগারটা পর্যন্ত শহরের থানাপাড়া জিকে ঘাট এলাকায় কুষ্টিয়া-হরিপুর শেখ রাসেল সেতুর নিচে পশ্চিমপাশে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়। উচ্ছেদ অভিযানকালে ৩০টি ছোট বড় টিনশেডের আধাপাকা ঘর উচ্ছেদ করা হয়। উচ্ছেদ অভিযানে কুষ্টিয়া সদরের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মুহাম্মদ মুছাব্বেরুল ইসলাম, মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাসির উদ্দিনসহ বিপুল সংখ্যক পুলিশ অংশ নেন। সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জুবায়ের হোসেন চৌধুরী বলেন, দশ দিন আগে প্রত্যেক অবৈধ বাসিন্দাকে নোটিশ করা হয়েছিল। এরমধ্যে কেউ ই জমির মালিকানার বৈধ কাগজপত্র  দেখাতে আসেনি। বরং বাসিন্দারা নিজ দায়িত্বে তাদের মালামাল দুই এক দিন আগে সরিয়ে অন্যত্র চলে যায়। আইন মোতাবেক অবৈধ স্থাপনাগুলো উচ্ছেদ করা হয়। শুধু উচ্ছেদ করেই শেষ নয়, এখানে যাতে পুনরায় দখল করতে না পারে সে ব্যাপারে সর্তক নজর থাকবে। সদর উপজেলার আরও অবৈধ স্থাপনা রয়েছে সেগুলোও উচ্ছেদ করা হবে। বেলা সাড়ে দশটায় সেখানে পরিদর্শনে যান কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) আজাদ জাহান। তিনি জানান, নদ-নদী,খাল ও বিল যারা অবৈধভাবে দখল করে আছে তাদের তালিকা করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে জেলা জুড়ে অভিযান চালানো হবে। নদ-নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ঠিক রাখতে যা যা করার তার সবই করা হবে। কুষ্টিয়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাসির উদ্দিন বলেন, নদীর তীরে অবৈধ স্থাপনার কয়েকটির মধ্যে রাতের বেলায় মাদক সেবন হতো। স্থাপনাগুলো গুড়িয়ে দেওয়ায় মাদকের আড্ডাও গুড়িয়ে গেল।

আরো খবর...