কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে প্রথম কিস্তির ৪০ লাখ টাকা উত্তোলন করেও কাজ করেনি পিআইসিরা

টিআর’র ১০০ প্রকল্পের অর্ধেকই অস্তিত্বহীন
দ্বিতীয় কিস্তির টাকা ভুয়া ভাউচারে উত্তোলনের চেষ্টা

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার নন্দলালপুর ইউনিয়নের শুপুকুরিয়া গ্রামের নিজামের বাড়ি হতে লবারের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা মেরামতের জন্য টেষ্ট রিলিফের (টিআর) ৭৮ হাজার ২০২ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। কাজের জন্য উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও একটি কমিটি জমা দেয়া হয়। কমিটির পিআইসি ছিলেন আকবর আলী নামের এক ব্যক্তি। জুন মাসে আকবর আলীর নামে পিআইও অফিস থেকে প্রথম কিস্তির ৩৯ হাজার টাকাও ছাড় করা হয়।

গত জুন মাসে টাকা উত্তোলন হলেও এখানো এ প্রকল্পে এক ঝুঁড়ি মাটিও পড়েনি। অথচ কাজ করে দ্বিতীয় কিস্তির অর্থ উত্তোলনের কথা থাকলেও নতুন করে বাকি অর্থ উত্তোলন করতে ভুয়া কাগজপত্র উপজেলায় জমা দেয়া হয়েছে। এমনকি এলাকার লোকজনও জানেন না তাদের এলাকায় এমন একটি প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দ এসেছে।

এদিকে প্রকল্পে কাজের কাছ কিছুই না হওয়ায় উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সরেজমিন কাজ পরিদর্শন করে এসে দ্বিতীয় পর্যায়ের বিল আটকে দিয়েছেন। কাজ সুষ্ঠুভাবে না হলে এ বাকি অর্থ কোন ভাবেই পরিশোধ করা হবে না বলে সংশ্লিষ্ট পিআইসিদের জানিয়ে দিয়েছেন।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর থেকে ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষন টেষ্ট রিলিফ (টিআর) কর্মসুচীর আওতায় জেলার কুমারখালী উপজেলার ১০০টি প্রকল্পের অনুকুলে ৭৮ লক্ষ ২০ হাজার ২৬৮ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। এ প্রকল্পে সকল কাজ জুনের ৩০ তারিখের মধ্যে শেষ করার জন্য চিঠিতে নির্দেশ দেয়া হয়।

অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, জুন মাসে কুমারখালী পৌর এলাকার ইউনুস আলী নামের এক ব্যক্তি ঢাকায় বিশেষ তদ্ববির করে এমপির ডিও লেটার দিয়ে এসব প্রকল্পে বরাদ্দ নিয়ে আসেন। তিনি বিভিন্ন ইউনিয়নে যেসব প্রকল্পের অনুকুলে অর্থ বরাদ্দ নিয়ে এসেছেন তার বেশির ভাগ ভুয়া ও কাগজে-কলমে। অনেক প্রকল্পের কোন অস্তিত্ত্ব নেই। আর যেসব প্রকল্পের অস্তিত্ত্ব আছে সেসব প্রকল্পেও কোন কাজ হয়নি।

কুমারখালী পৌর এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা জানান,‘ ইউনুস জোয়ার্দ্দারের বাড়ি পৌর এলাকার ৪ নম্বর ওয়ার্ডে। তার বাবার নাম মৃত ইউসুফ আলী জোয়ার্দ্দার। কুষ্টিয়া-৪ আসনে যারায় এমপি নির্বাচিত হন তারা ইউনুসকে ব্যবহার করেন। ইউনুস পিআইও অফিস নিয়ন্ত্রণ করেন। বিএনপি আমলেও তার দাপট ছিল পিআইও অফিসে। এমপির সাথে ভাল খাতির থাকায় প্রতি বছর মন্ত্রণালয়ে বিশেষ তদ্ববির ও অর্থ দিয়ে বিশেষ বরাদ্দ নিয়ে আসেন। সব দপ্তরকে ম্যানেজ করে তিনি অর্থ হাতিয়ে আসছেন। এক সময় ইউনুসের কিছু না থাকলেও এখন পৌর এলাকায় বিলাসবহুল দোতলা বাড়িসহ অনেক সম্পদের মালিক বনে গেছেন।

সরেজমিন কয়েকটি ইউনিয়ন ঘুরে বেশির ভাগ প্রকল্পেই কাজের কোন প্রমাণ মেলেনি। ওইসব ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এমনকি সাধারন মানুষ কাজের বিষয়ে কিছু বলতে পারেননি। কয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জিয়াউল ইসলাম স্বপন বলেন,‘ আমার ইউনিয়নেও এ ধরনের ১০ থেকে ২০টি প্রকল্প এসেছিল। আমি চ্যালেঞ্জ করেছিলাম এসব প্রকল্পে কোন কাজই হয়নি। অথচ টাকা তুলে নেয়া হয়েছে। যেসব প্রকল্প দেয়া হযেছে তার বেশির ভাগই ভুয়া বলে মনে হয়েছে।

শিবরামপুর গ্রামের মান্নানের বাড়ি থেকে উসমানের বাড়ির পর্যন্ত রাস্তা মেরামতেও বরাদ্দ দেয় সমপরিমান অর্থ। এখানে গিয়েও কাজের কোন নমুনা পাওয়া যায়নি। আশেপাশের বান্দিসারাও জানান, এখানে প্রকল্প এসেছে কিনা তা তারা জানেন না। কাজতো দুরে থাক। আর এ সড়কতো ভাল। এখানে কাজ করার কিছু নেই।’

প্রকল্পের পিআইসি কমিটির সভাপতি মিজানুর রহমান বলেন, আমি তেমন কিছু জানি না। সব ইউনুস নিয়ন্ত্রণ করেন। তার নামে টাকা উত্তোলন হলেও ইউনুস সব নিয়ে গেছেন। কাজের ব্যাপারে তিনি বলতে পারবেন না।

একই অবস্থা কয়া ইউনিয়নের পশ্চিম কয়া গ্রামের নাজিরের বাড়ি থেকে মিজানুরের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা মেরামত ও জগন্নাথপুর ইউনিয়নের দয়রামপুর গনি মেম্বারের বাড়ি থেকে শ্মশান পর্যন্ত রাস্তা মেরামতের নামে টাকা তুলে কোন কাজ করা হয়নি। প্রকল্পের পিআইসি মাজেদ আলীও সব দায় চাপান ইউনুসের ওপর।

পিআইও অফিসের একাধিক সুত্র জানিয়েছে, প্রথম দফায় অর্ধেক অর্থ লোকজনের মাধ্যমে উত্তোলন করেছেন ইউনুস। কোন কাজই করেননি তিনি। দু’একটি প্রকল্পে ৫ থেকে ২০ ভাগ কাজ হলেও অর্ধেক প্রকল্পে কোন কাজই হয়নি। এমনকি অনেক প্রকল্প শুধুমাত্র কাগজে-কলমে। তাই দ্বিতীয় দফায় তাদের বিল আটকে দেয়া হয়েছে। ওপরের নির্দেশনা আছে কাজ না করলে বিল দেয়া যাবে না।

এদিকে বিল ছাড়ের জন্য প্রতিনিয়ত চাপ দিচ্ছেন ইউনুস। প্রভাবশালীদের দিয়েও নানাভাবে চাপ দিচ্ছেন ইউএনও ও পিআইওকে।

কুমারখালী উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মাহমুদুল ইসলাম বলেন,‘ আমাদের লোকজন কাজ পরিদর্শনে গিয়ে অনেক অনিয়ম পেয়েছে। কিছু প্রকল্পে সামান্য কাজ পাওয়া গেলেও বাকি অনেক প্রকল্পে কোন কাজ হয়নি। অথচ কাজ না করেই বিল তোলার জন্য কাগজপত্র জমা দিয়েছেন। তবে দ্বিতীয় কিস্তির কোন অর্থ দেয়া হয়নি।

এসব প্রকল্পে বিষয়ে জানতে চাইলে ইউনুস জোয়ার্দ্দার বলেন, ‘ওপরে অনেক টাকা পয়সা দিয়ে প্রকল্প পাশ করে আনতে হয়। নিচের লেবেলেও অর্থ দেয়া লাগে। সব জায়গায় অর্থ খরচ করে তেমন লাভ থাকে না। অনেক প্রকল্পে এখনো কাজ শুরু হয়নি বলে স্বীকার করেন তিনি।

 

আরো খবর...