ঐতিহ্যে ফিরছে দেশীয় মাছ

কৃষি প্রতিবেদক ॥ কথায় বলে মাছে-ভাতে বাঙালি; কিন্তু সে প্রবাদ আজ হারাতে বসেছে কালের গহ্বরে। কেননা জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মাছচাষ ও মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। এরই  প্রেক্ষিতে মৎস্যচাষে   দেশের জনগণের মধ্যে ব্যাপক গণসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে মৎস্য অধিদপ্তর প্রতিবছরের মতো এবছরও জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ উদযাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করে। উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক সময়ে কোনো মহাপরিকল্পনা ছাড়াই দেশে মাছচাষে ব্যাপক সাফল্য এসেছে। মূলত মাছচাষিদের সাহস ও সৃজনশীলতা এ  ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা  রেখেছে। বাজারের চাহিদা মাথায় রেখে চাষিরা উৎপাদনে যান। ফলে তা টেকসই হয়েছে। এফএও পূর্বাভাস দিয়েছে, ২০২২ সাল নাগাদ বিশ্বের যে চারটি  দেশ মাছচাষে বিপুল সাফল্য অর্জন করবে, তার মধ্যে প্রথম দেশটি হচ্ছে বাংলাদেশ এরপর থাইল্যান্ড, ভারত ও চীন। এফএওর হিসাবে সমুদ্রে মাছ আহরণের দিক থেকে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ২৫তম। তবে ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্র জয়ের পর বঙ্গোপসাগর থেকে বাংলাদেশের মৎস্য আহরণ কয়েক গুণ বাড়বে বলে সংস্থাটি মনে করছে।

নদীমাতৃক দেশ বাংলাদেশে পুকুর ভরা মাছ, গোয়াল ভরা গরু আর গোলা ভরা ধান প্রবচনটি ছিল ঐতিহ্যের প্রতীক। আশির দশকে বাংলাদেশের মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত উন্নত জাতের পাঙ্গাশ, রুই, কাতলা, তেলাপিয়াচাষ তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। চাহিদার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উন্নত জাতের কই, শিং, মাগুর, শোলমাছের চাষ ব্যাপক হারে বেড়েছে। কয়েক বছর ধরে দেশীয় প্রজাতির মাছ শোল, মাগুর, শিং, কৈ, পুঁটি, সরপুঁটি, বাইন, টাকি, পাবদা, ফলি, মলা, গোলসা, টেংরা, ভেদা, বোয়াল, কালো বাউশ চাষ করা হচ্ছে। সারা বছরই এসব মাছ বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। মৎস্য অধিদপ্তরও ৫৪ প্রজাতির মাছকে ঝুঁকিপূর্ণ, ২৮ প্রজাতির মাছ বিপন্ন ও ১২ প্রজাতির মাছকে মহাবিপন্ন হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তবে ভালো খবর হলোথ সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় ফিরে আসছে শিং, বাটা, সরপুঁটি, ভাঙ্গনা, কালিবাউশ, গনিয়া, মহাশোল, পাবদা, মাগুর, চিতল ও ফলি বিলুপ্তপ্রায় দেশীয় মাছ। মৎস্য অধিদপ্তরের পরিচালনায় বিলুপ্তপ্রায় এসব মাছ সংরক্ষণ ও উৎপাদন বাড়াতে জলাশয় ভরাট ও দূষণ রোধের পাশাপাশি মাছের অতি আহরণ ও প্রাকৃতিক উৎস থেকে পোনা সংগ্রহ বন্ধ করা, উন্মুক্ত জলাশয়ে পোনা অবমুক্তি ও বিল নার্সারি কার্যক্রমও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। জানা গেছে, দেশি প্রজাতির ছোট মাছের সংরক্ষণ, প্রজনন ও বংশ বৃদ্ধির জন্য ৩৮টি  জেলার ৭৫টি উপজেলার ১৩৬টি প্রাকৃতিক জলাশয় পুনর্খনন করা হয়েছে। এসব জলাশয়ে পোনা অবমুক্ত করা হয়েছে। ৫৭টি সরকারি মৎস্যবীজ উৎপাদন খামারে দেশি প্রজাতির  ছোট মাছের কৃত্রিম প্রজননের ব্যবস্থা করা হয়েছে। দেশি প্রজাতির মাছচাষ ও ব্যবস্থাপনায় প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে ৬ হাজার ৪৬৬ জন চাষিকে। মাছের উৎপাদন-সাফল্য উৎসাহজনক হলেও উৎপাদন সম্ভাবনা রয়েছে এর চেয়ে বহুগুণ। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এক দশকে মাছের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৫৫ শতাংশ। মৎস্য উৎপাদন বাড়ায় বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয় থেকে মৎস্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে বিশ্বে চতুর্থ এবং অভ্যন্তরীণ বদ্ধ জলাশয়ে মৎস্য উৎপাদনে পঞ্চম স্থান লাভ করেছে।

অর্থনৈতিক উন্নয়নে মৎস্য সেক্টরের অবদান অসামান্য। আমাদের দেশজ উৎপাদনের ৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ, মোট কৃষিজ আয়ের ২২ দশমিক ৬ শতাংশ এবং রপ্তানি আয়ের ৪ শতাংশের অধিক আসে মৎস্য উপখাত থেকে। দৈনন্দিন খাদ্যে প্রাণিজ আমিষের প্রায় ৬০ শতাংশ জোগান দেয় মৎস্য খাত। আমাদের দেশে মোট বদ্ধ জলাশয়ের পরিমাণ ৪ লাখ ১২ হাজার ৩৪১ হেক্টর। তার মধ্যে ২৬ হাজা হেক্টর পুকুর, ৫ হাজার ৪৮৮ হেক্টর বাঁওড় এবং ১ লাখ ৪১ হাজার ৩৫৩ হেক্টর চিংড়ি খামার। বিভিন্ন উপাত্ত থেকে জানা যায়, দেশের প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ বা ১১ শতাংশ লোক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মৎস্য খাতে জীবিকা নির্বাহ করে। বছরে প্রায় ৬ লাখ নতুন কর্মসংস্থান হচ্ছে এই মৎস্য সেক্টরে। নদ-নদী, খাল-বিল, পুকুরসহ জলাধারের সংখ্যা হ্রা পেলেও আধুনিক পদ্ধতিতে মাছচাষের জন্য উৎপাদন বিস্ময়করভাবে বাড়ানো সম্ভব হয়েছে। রূপকল্প-২০২১ অনুযায়ী মাছের উৎপাদন ৪২ লাখ টনে উন্নীত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং মৎস্য অধিদপ্তর যৌথভাবে কাজ করছে।

২০২২ সাল নাগাদ বিশ্বে যে চারটি দেশ মাছচাষে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করবে, তার শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশের নাম। বাংলাদেশে প্রতিবেশ ব্যবস্থা মিঠাপানির মাছচাষের জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও)-এর প্রতিবেদনে মিঠাপানির মাছ উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। বাংলাদেশ সরকার ভিশন ২০২১-এ  দেশের মাছের উৎপাদন ৪৫.০ লাখ মেট্রিক টন নির্ধারণ করা হয়েছে যা বর্তমান উৎপাদনের চেয়ে ১০ লাখ মেট্রিক টন বেশি। মিঠাপানির মাছ উৎপাদনের বিপুল সম্ভাবনার পাশাপাশি সামুদ্রিক মাছ আহরণের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। সমুদ্রে মাছ আহরণের দিক থেকে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান এখন ২৫তম। বঙ্গোপসাগরে ৩৬ প্রজাতির চিংড়ি ছাড়াও প্রায় ৫০০ প্রজাতির অর্থকরী মাছ রয়েছে। এই মাছের অতি সামান্যই মাত্র আহরিত হয়। ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রজয়ে ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার এলাকায় মাছ ধরার আইনগত অধিকার পেয়েছে বাংলাদেশ। ফলে বঙ্গোপসাগর থেকে মৎস্য আহরণ পর্যায়ক্রমে বাড়বে। এক হিসাবে দেখা গেছে, প্রতিবছর অব্যবস্থাপনা ও অবহেলায় উৎপাদিত মাছের একটা বড় অংশ, প্রায় ১০ লাখ টন নষ্ট বা অপচয় হয়ে যায়। এটা রোধ করতে পারলে মাছ উৎপাদনে দেশ স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন সম্ভব হবে।

চাঁদপুর জেলার ডাকাতিয়া নদীতে থাইল্যান্ডের প্রযুক্তি অনুকরণে ২০০২ সা থেকে চাঁদপুরের ডাকাতিয়া নদী ও লক্ষ্মীপুর জেলায় মেঘনা নদীর রহমতখালী চ্যানেলে সাড়ে ৪০০ এবং ৫০০ খাঁচায় মনোসেক্স তেলাপিয়া করা হচ্ছে; যা থেকে উৎপাদিত হচ্ছে বছরে ৭০০ মে. টন রপ্তানিযোগ্য  তেলাপিয়া। আমাদের দেশের নদী পাড়ে বসবাসরত জনগণ বিশেষ করে দরিদ্র জেলেগোষ্ঠী শুধু নদী  থেকে প্রাকৃতিক মাছ আহরণ করে জীবিকা নির্বাহ করে। এসব মৎস্যজীবীকে সংগঠিত করে মাছের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব, সেই সঙ্গে বছরের নির্দিষ্ট সময়ে বিশেষ করে নদীর প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজাতিগুলোর প্রজনন মৌসুমে তাদের নিবৃত্ত করে নদীর প্রাকৃতিক মাছের মজুদ বাড়ানো ও বিভিন্ন মাছের প্রজাতি ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব।

লেখক ঃ এসএম মুকুল, কৃষি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক ও উন্নয়ন গবেষক

 

 

আরো খবর...