এ লজ্জা আমরা কোথায় লুকোবো

॥ আহমদ রফিক ॥

মধ্যপ্রাচ্যে বাঙালি নারী, বিশেষ করে তরুণী ও গৃহবধূদের ইজ্জত লুণ্ঠিত হচ্ছে, মানসিক ও দৈহিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন তারা। এ ব্যাপারে সৌদি আরবিদের অগ্রগণ্য ভূমিকা- মহানবীর (স.) দেশ হিসেবে যে ভূখন্ডের প্রতি মুসলমান সমাজ-শ্রদ্ধা ভরে মাথা নোয়ায়, সে দেশের সমাজে এমন জঘন্য অনাচারী তৎপরতা! মনে হয় বিদেশিদের জন্য বিশেষত বাংলাদেশিদের জন্য সেখানে কোনো সুশাসন নেই, আইনি ব্যবস্থা নেই।

দু’চারটে ঘটনা নয় শত শত তরুণী ও গৃহবধূ নারীকর্মী, বিশেষ করে গৃহকর্মী হিসেবে সৌদিতে গিয়ে অবিশ্বাস্য যৌন নির্যাতনের শিকার যেন ফাঁদে আবদ্ধ হরিণী। পরিস্থিতি এমনই যে কোনোভাবেই ওই ফাঁদ থেকে উদ্ধার পাওয়া বা মুক্তির কোনো সুযোগ নেই, সুবিধা নেই। সরকারি বা বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিবারের আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য বাড়াতে অল্পশিক্ষিত এসব নারী মধ্যপ্রাচ্যে (সৌদি আরবে) গৃহকর্মে নিযুক্ত অবস্থায় মহাবিপদের সম্মুখীন।

সংখ্যাটি বেশ বড়। যৌন নির্যাতনও সেই মাপের। বিদেশিদের জন্য ওদের আইন-কানুন হয়তো এমনই বা পরিস্থিতি এমনই যে অত্যাচারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা বা সুবিচার পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত নিরুপায় বাংলাদেশি তরুণী যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন, কিন্তু ঘটনাবলে, তারা এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারছে না।

বেশ কিছুদিন থেকে এ জাতীয় ঘটনা ফাঁস হচ্ছে, মাঝেমধ্যে প্রকাশ পাচ্ছে বাংলাদেশের সংবাদপত্রে। কিন্তু অনাচারের মূলোচ্ছেদে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। খবরের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিবাদী লেখালেখিও হচ্ছে, তা সত্ত্বেও সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। মাসখানেক আগে অনেক খবর একসঙ্গে সংবাদপত্রে প্রকাশ পেয়েছিল বলেই ওইসব লেখা।

আমরা জানতে চাই, সেসব জঘন্য ঘটনার কী ব্যবস্থা নিয়েছেন সরকার বা সংশ্লিষ্ট মহল। এসব নির্যাতনের কি কোনো ক্ষতিপূরণ হয়, না হতে পারে? কিন্তু দেশের সংবিধান মাফিক দেশের নাগরিকদের নিরাপত্তার দায়িত্ব তো রাষ্ট্রযন্ত্রের তা দেশে হোক বা বিদেশেই হোক।

এ সমস্যা কিন্তু যৌন নির্যাতনেই সীমাবদ্ধ নেই, এ সমস্যা যেমন তাদের মুক্তি ও নিরাপদে দেশে ফেরা নিয়ে, তেমনি স্বদেশে তাদের পারিবারিক পুনর্বাসন নিয়ে, সর্বোপরি অপরাধীর যথাযথ শাস্তি বিধান নিয়ে। একমাত্র দেশে ফেরার ব্যবস্থা ছাড়া আর কোনো সমস্যারই সমাধান হচ্ছে বলে মনে হয় না।

দুই.

বাংলাদেশ ঘন জনবসতির দেশ, অপরিকল্পিত জনসংখ্যা বিস্ফোরণের এমন এক ভূখন্ড যেখানে সেই সমস্যা সম্পর্কে কারো কোনো মাথাব্যথা নেই, জন্ম নিয়ন্ত্রণের যথোচিত ও পরিকল্পিত ব্যবস্থা নেয়ার দায়ও যেন কারো নেই এবং একে বলা হচ্ছে জনসম্পদ- যা আসলে সম্পদ নয়, দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে নিশ্চিত অভিশাপ। যে দেশে শিক্ষার হার অবিশ্বাস্য মাত্রায় কম, বিশেষ করে নারীশিক্ষা, গরিব পরিবারে নারীশিক্ষা, যেখানে বেকারত্ব তরুণদের বাধ্য করছে অবৈধ পথে বিদেশ যাত্রার চেষ্টায় মৃত্যুর মুখোমুখি হতে, গ্রামের বা ছোট শহরের দরিদ্র পরিবারের অভাব মেটাতে বিদেশে (বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য, সৌদি আরবে) তরুণী ও তেমনি বয়সী গৃহবধূদের গৃহকর্মী হিসেবে পাড়ি জমাতে এবং যৌন নির্যাতনের লজ্জায় মুখ ঢাকতে, সেখানে কীভাবে বলা যাবে অপরিমিত এই জনসংখ্যা আমাদের ‘সম্পদ’?

শাসনযন্ত্র আত্মতৃপ্তিতে ভুগতে পারে এই ভেবে যে এদের মাধ্যমে দেশে বৈদেশিক মুদ্রা, বিশেষ করে পেট্রোডলার অর্জন (রেমিটেন্স) বাড়ছে এবং তা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সাহায্য করছে- আমাদের প্রশ্ন তা কিসের বিনিময়ে? ওই অভিশপ্ত গৃহকর্মীদের বাধ্যতামূলক ইজ্জতদানের কান্নায়?

এ কান্না, এ যন্ত্রণা, এ দুর্দশা মুখ খুলে বলার নয়, তবু যন্ত্রণার অবসান ঘটাতে নির্যাতিতরা সব লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে তাদের নির্যাতনের কথা, তাদের কান্নার কথা বলতে বাধ্য হচ্ছেন, অনেকে বাড়িতে সংবাদ জানিয়ে তাদের ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা নিতে জানাচ্ছেন, যন্ত্রণার অসহনীয় হয়ে ওঠায় অনেকে স্থানীয়ভাবে চেষ্টা চালাচ্ছেন ওই অপমান আর লজ্জা থেকে মুক্তি পেতে, কখনো স্থানীয় বাংলাদেশ দূতাবাসে আশ্রয় নিতে চেষ্টা করছেন।

ঘটনা এমনই করুণ, রাষ্ট্রের পক্ষে এতটাই লজ্জাজনক যে বাংলাদেশ দূতাবাস ওই নির্যাতিতাদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র খুলতে বাধ্য হচ্ছে, বিশেষ করে সৌদি আরবে। তাতেও হুঁশ নেই আমাদের সংশ্লিষ্ট মহলের। দেশের মর্যাদা, দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হওয়া নিয়েও তাদের কোনো চিন্তা-ভাবনা নেই, আর ডলার এলেই তারা খুশি, বিনিময়ে নারী-নাগরিক তার সম্ভ্রমসহ সব কিছু হারাক, ক্ষতি নেই। সরকার কি একবার ভেবে দেখেছেন যৌন নির্যাতনের শিকার এসব তরুণী-নারীর ভবিষ্যৎ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? তাদের পরিবার কি সব কিছু জেনে তাদের সম্মানে পরিবারে ঠাঁই দেবে? দিলেও কী হবে তাদের মানসিক ও পারিবারিক মর্যাদার?

না, এসব নিয়ে কেউ ভাবেন না, ভাবছেন না। ভাবলে গত কয়েক বছর ধরে বিদেশে বাংলাদেশি নারীর এসব দুর্দশার পর তারা তাদের অদক্ষ নারী জনশক্তি তথা নারী গৃহকর্মীদের বিদেশে পাঠানো বন্ধ করতেন, নিষিদ্ধ করতেন এ ধরনের নারী শ্রমিকদের বিদেশযাত্রা। কারণ তাদের প্রায় সবাই পরিস্থিতির শিকার, না জেনেশুনে বিষপান তাদের।

এর দায় যেমন পরোক্ষ তাদের তেমনি তার চেয়ে বেশি দায় সরকারি নীতির এবং বিদেশে নারীকর্মী পাঠানোর লোভী এজেন্সিগুলোর, ঠক দালাল চক্রের। বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কি এসব ঘটনা অজানা? তারা কি এ ধরনের নারী পাচারকারী দালালচক্রের অন্যায় ও অবৈধ কার্যক্রম সম্বন্ধে অবহিত নন? কোনো ব্যবস্থা কি নেয়া হয় এসব অসৎ, অসাধু ব্যবসায়ীচক্রের বিরুদ্ধে? এ পর্যন্ত কি নেয়া হয়েছে?

বিস্ময়কর যে, যথেষ্ট মাত্রায় না হলেও এসব অমানবিক ঘটনা নিয়ে কিছু লেখালেখি তো পত্রপত্রিকায় দেখা যাচ্ছে, তথ্য-উপাত্ত বাস্তব ঘটনার করুণ কাহিনী সেসব লেখায় প্রকাশ পাচ্ছে। এ জাতীয় লেখা কি সংশ্লিষ্ট মহলের চোখে পড়ে না? আন্তর্জাতিক খবরাদি কি তাদের জানার বাইরে? তেমনটি তো হওয়ার কথা নয়, তবু তারা নীরব, নিশ্চেষ্ট। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে সব খবরই তো ভেসে বেড়াচ্ছে, যা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অজানা থাকার কথা নয়। তাদের জানা মোট কত লাখ বাংলাদেশি বিদেশে কর্মরত এবং তা কোথায়, কোন কোন দেশে। দেশ বিচারে এসব কর্মীর সংখ্যা ও অবস্থানও তাদের নখদর্পণে থাকার কথা। আছেও। তা ছাড়া এসব তথ্য আমাদের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত।

তা ছাড়া আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার হিসাবের খাতায় সব তথ্যের খুঁটিনাটি ধরা রয়েছে। একাধিক সূত্রের তথ্য মতে মধ্যপ্রাচ্যে গৃহকর্মীর সংখ্যা ২০ লাখেরও কিছুটা বেশি। এর মধ্যে ১০ লাখের বেশি নারী গৃহকর্মীর অবস্থান সৌদি আরবে। এ দিক থেকে সৌদি আরব সবার থেকে এগিয়ে। তাদের হাতে পেট্রোডলারও সবার চেয়ে বেশি, আর নারী গৃহকর্মীর প্রয়োজনে তাদের সবচেয়ে বেশি।

আমরা আমাদের নিম্নস্তরের নারীদের শ্রম বিক্রিতে বোধহয় অনেক দেশেরই ওপরে। এবং তা অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করে। আমাদের দেশের গরিব পরিবারগুলোও তাদের মেয়েদের বিদেশে ডলার অর্জনের জন্য পাঠাতে ব্যাকুল। আমাদের নিজস্ব হিসাবমতেই প্রায় ৭ লাখ বাংলাদেশি নারী গৃহকর্মী অদক্ষ নারী শ্রমিক একাধিক দেশে কর্মরত; তার মধ্যে আড়াই লাখই সৌদি আরবে।

সংবাদপত্রে প্রকাশিত সংবাদ তথ্যাদি থেকে দেখা যায় এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক নারী গৃহকর্মী সৌদি আরবে যৌন নির্যাতনের শিকার। তাই গত কয়েক বছর ধরে তাদের ঘরে ফেরার আর্তিও প্রবল এবং তা যে কোনো মূল্যে। অর্থাৎ শ্রমের মূল্য না পেয়েও তারা ঘরে ফিরতে ব্যাকুল, মূলত যৌন নির্যাতনের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে। তাদের যন্ত্রণার কাহিনী সংবাদপত্রে মাঝেমধ্যে প্রকাশ পায়, পায় ঘরে ফেরার মর্মন্তুদ কাহিনী।

এই তো সপ্তাহখানেক আগে একটি দৈনিকে সংবাদ শিরোনাম ‘তাদের মুখে নির্যাতনের বর্ণনা’। এ প্রতিবেদনেও প্রকাশ পেয়েছে যৌন নির্যাতনের যন্ত্রণায় ঘরে ফেরা নারীদের করুণ কাহিনী। তাদের কেউ কেউ অন্তঃসত্ত্বা, পরিবারে ফেরার উপায় নেই। কোথায় যাবে তারা? কে তাদের বিশ্বাস করবে যে তাদের এ অবস্থার কারণ সৌদি পুরুষ তথা গৃহকর্তাদের যৌন লালসা যা জবরদস্তিমূলক।

কোথায় আশ্রয় মিলবে বা কোথায় শেষ অবস্থান এই হতভাগিনীদের? পরিবারের আর্থিক দুরবস্থার অবসান ঘটাতে তাদের এই সর্বনাশ। সর্বনাশ ব্যক্তিজীবনে, পারিবারিক জীবনে, আর বিবাহিতাদের সর্বনাশ তাদের দাম্পত্য জীবনের ক্ষেত্রে। আবারো বলি, এদের দুর্ভাগ্যের দায় কে নেবে? তাদের পরিবার? না, আমাদের সংশ্লিষ্ট সরকারি মহল?

ওই দৈনিকের সূত্র মতে, শুধু সৌদি আরব থেকেই যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে মাত্র গত আড়াই মাসে দেশে ফিরেছেন ৫০০ নারী গৃহকর্মী। গত তিন বছরে এই সংখ্যা ৫ হাজারেরও বেশি। কী চমৎকার সম্মানজনক একটি পরিসংখ্যান বাংলাদেশের জন্য! এক কথায় বলতে হয় রেমিটেন্স নামক এক লোভের ঘেরাটোপে বন্দি এসব নারী- এদের ভবিষ্যৎ জীবন শেষ। আর ওই ঘেরাটোপ  তৈরির দায় বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রেরও কম নয়, তাদের লোভ এবং উদ্যোগও কম নয় বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের তাড়নায় তাদের তরুণীদের বলিদানের ব্যবস্থা করতে।

নিদারুণ অপ্রিয় এ কথাগুলো বলছি এ কারণে যে এ অবৈধ ও অন্যায় কাজগুলো করা হচ্ছে সব জেনেশুনে। আর না জেনেশুনে প্রতারিত হচ্ছেন নির্যাতিত নারীরা। সর্বশেষ খবরে প্রকাশ, প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ এক কর্মকর্তা নাকি আশ্বাস দিয়ে বলেছেন, নারী গৃহকর্মীদের এরপর থেকে যাচাই-বাছাই করে তবেই পাঠানো হবে।

আশ্চর্য, তবু তারা অন্তত সৌদি আরবে নারী গৃহকর্মী পাঠানো বন্ধ করবেন না? এতই তাদের লোভ সৌদি পেট্রোডলারের। এ বিষয়ে কী বলতে পারি আমরা,  নৈতিক প্রতিবাদ ছাড়া? উচ্চ আদালত কি এ ব্যাপারে এগিয়ে আসবেন ভবিষ্যৎ হতভাগিনীদের বাঁচাতে? তারা তো অনেক ক্ষেত্রে স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে রুল জারি করেন  নৈতিকতার পক্ষে, ন্যায়ের পক্ষে। তাই আমাদের আবেদন তাদের কাছে যাতে কিছু জীবন সর্বনাশের আগুন থেকে রক্ষা করতে তারা কি এগিয়ে আসবেন না?

লেখক ঃ ভাষা সংগ্রামী, কবি ও গবেষক।

আরো খবর...