একাদশ সংসদ নির্বাচন জয় পরাজয় ও প্রত্যাশা

॥ এ কে এম শহীদুল হক ॥

অনেক জল্পনা, কল্পনা, উদ্বেগ ও উত্কণ্ঠার যবনিকাপাত করে ৩০ ডিসেম্বর পার্লামেন্ট নির্বাচন অনেকটা শান্তিপূর্ণভাবে সমাপ্ত হলো। নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছে। জনগণ রায় দিয়েছে মুক্তিযুদ্ধের শক্তির পক্ষে, উন্নয়ন-অগ্রগতি ও শান্তির পক্ষে। নির্বাচনের পূর্বে সর্বত্র একই আলোচনা ছিল যে, আওয়ামী সরকার পরিবর্তন হলে দেশে প্রতিহিংসার রাজনীতি শুরু হবে, প্রতিপক্ষের উপর হামলা, অরাজকতা ও আইন শৃঙ্খলার অবনতি এবং খুন খারাপি শুরু হবে। সংখ্যালঘুরা ভীতি ও অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিল। নির্বাচনে মহাজোট তথা আওয়ামী লীগের বিজয় হওয়ায় মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ও ভীতি কেটে গেছে। নিরাপত্তা বোধ সৃষ্টি হয়েছে। নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর প্রতিপক্ষের কারো উপর কোনো আঘাত হয়েছে এ ধরনের সংবাদ বিশেষ একটা পাওয়া যায়নি। আইন-শৃঙ্খলার অবনতি হয়নি, সর্বত্র শান্তিপূর্ণ পরিবেশ অব্যাহত আছে। এমনকি বিজয়ী দলের সমর্থকরা কোনো ধরনের বিজয় মিছিলও বের করেনি। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোট বিজয়ী হয়ে সারাদেশে প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও সংখ্যালঘুদের উপর হামলা, বাড়িঘর ভাঙা, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ ইত্যাদি তান্ডব করে মানুষের মাঝে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিল যা এখনো ক্ষতিগ্রস্তদের মনে হলে গা শিউরে উঠে। কিন্তু এবার তো তা হয়নি। আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়েছে। ঐ সময়ও আইন-শৃঙ্খলার অবনতি হয়নি।

৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে প্রায় ৮০ শতাংশ ভোট পড়েছে। আওয়ামী লীগ ২৫৭টি আসনে জয়ী হয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছে। পক্ষান্তরে অন্যতম বৃহত্তম দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে নির্বাচন করে ৫টি আসনে জয়লাভ করেছে। ড. কামালের গণফোরাম ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ২ টি, ঐক্য প্রক্রিয়া (ধানের শীষ) ১ টি আসনে জয়লাভ করেছে। মাহমুদুর রহমান মান্নার নাগরিক ঐক্য ধানের শীষ নিয়ে কোনো আসনেই জয়লাভ করতে পারেনি। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট ২৮৮ আসনে জয়লাভ করেছে। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয় প্রত্যাশার থেকে বেশি। বিভিন্ন দেশি-বিদেশি জরিপ এবং প্রচারণা দেখে অনুমান করা হয়েছিল যে, মহাজোট জয়ী হবে। কিন্তু অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করে এত অধিক সংখ্যক আসন আওয়ামী লীগ পাবে তা অনেকেই প্রত্যাশা করেনি। জনগণ রায় দিয়েছে উন্নয়ন ও অগ্রগতির পক্ষে, স্বাধীনতা বিরোধী সাম্প্রদায়িক শক্তির বিপক্ষে।

ড. কামালের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের মাধ্যমে যে রাজনৈতিক মেরুকরণ হয়েছিল তা দেখে অনেকেই মনে করেছিল, তারা নির্বাচনে বিশেষ একটা অবস্থান তৈরি করতে পারবে। কিন্তু যতই দিন গিয়েছে, জনমনে তাদের সম্বন্ধে ততই নেতিবাচক ধারণা জন্মেছে। ঐক্যফ্রন্টের পরাজয়ের কারণ বহুবিধ। ড. কামাল আন্তর্জাতিক খ্যাতিসমপন্ন আইনজ্ঞ হতে পারেন, কিন্তু তিনি কোনো সফল রাজনীতিবিদ নন। রাজনৈতিক জীবনে তিনি একবার বঙ্গবন্ধুর ছেড়ে দেওয়া আসন থেকে উপ-নির্বাচনে জয়লাভ করেছিলেন। তিনি কোনো বৃহত্ রাজনৈতিক দলের কিংবা কোনো আন্দোলন সংগ্রামে নেতৃত্ব দেন নাই। শুধু মিডিয়াতেই তার তাত্ত্বিক কথাবার্তাই দেশবাসী শুনেছেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও গণতন্ত্রের কথা বলেন। কিন্তু ধানের শীষের পতাকা তলে জামায়াতের সঙ্গে এক হয়ে নির্বাচন করায় তার আদর্শ ও নীতি-নৈতিকতা প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছে। সচেতন নাগরিকরা তার ভূমিকা ভালোভাবে দেখেনি। তার ভাবমূর্তি কিছুটা হলেও ক্ষন্ন হয়েছে। স্বাধীনতা বিরোধী এবং ২১ শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের রাজনৈতিক প্লাটফর্মের সঙ্গে  জোট বেঁধে নির্বাচন করায় জনগণের কাছে ড. কামালের গ্রহণযোগ্যতা কমেছে। তাছাড়া তার নেতৃত্বের যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন আছে।

বিএনপি ২০০৮ সালে পার্লামেন্ট নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। এ নির্বাচন সেনা সমর্থিত কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়। বিএনপি সব সময়ই সেনাবাহিনীকে মাঠে রেখে কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে নির্বাচন চায়। ২০০৮-এর নির্বাচনে বিএনপি ৩০ টি আসনে জয়লাভ করে। আওয়ামী লীগ করে ২৩০ টি আসনে জয়লাভ। ২০১৪ সালের নির্বাচন বিএনপি বয়কট করে এবং নির্বাচন প্রতিহত করার জন্য তথাকথিত আন্দোলনের নামে তারা বোমা, পেট্রোল বোমা হামলা করে, অগ্নিসংযোগ, সরকারি ও বেসরকারি সম্পদ ধ্বংস করে, স্কুল কলেজ মাদ্রাসা পুড়িয়ে দিয়ে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। ১৬ জন পুলিশসহ নিরীহ লোকদের হত্যা করেছিল। বিএনপি নির্বাচন প্রতিহত করতে পারেনি। কিন্তু আন্দোলনের নামে সন্ত্রাস ও নাশকতামূলক কাজ করে দলকে সন্ত্রাসী হিসেবে যে কালিমা লেপন করেছিল তার প্রায়শ্চিত্ত বিএনপি এখনো করছে।

তাছাড়া বিএনপির নেতৃত্ব সংকট বিএনপিকে সাংগঠনিকভাবে দুর্বল করে দিয়েছে। বেগম খালেদা জিয়া সক্ষমতার সঙ্গে নেতৃত্ব দিতে পারেন নাই। দুর্নীতি মামলার সাজায় তিনি জেলে যাওয়ার পর নেতৃত্বের সংকট আরও প্রকট হয়। সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি তারেক জিয়াকে দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করায় দলটি প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছে। দলের অভ্যন্তরে নেতৃবৃন্দের মধ্যে অনেক বিষয়েই মতানৈক্য ছিল। সমঝোতার অভাব ছিল। দলটি যথাসময়ে যথাযথ সিদ্ধান্ত নিতেও ব্যর্থ হয়। দেশি-বিদেশি অনেকের পরামর্শে নির্বাচনে আসার সিদ্ধান্ত নিতে অনেক বিলম্ব করেছে। ফলে মাঠ পর্যায়ে নেতা-কর্মীরা নির্বাচনমুখী হতে পারেনি। প্রাথমিক পর্যায়ে অধিকাংশ আসনে তিন/চার জন করে নমিনেশন দেওয়া হয়। কে চূড়ান্ত নমিনেশন পাবে কেউ তা না জানায় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে পারেননি। ৯ ডিসেম্বর চূড়ান্ত নমিনেশন যারা পেয়েছে তারা প্রচার-প্রচারণা ও অন্যান্য প্রস্তুতিও তেমনভাবে নিতে পারেননি। তাই ঐক্যজোটের প্রার্থীরা প্রচারণায় অনেক কম ছিল। প্রতিযোগিতায় টিকে থেকে জয়লাভ করতে পারবে এমন অনেক যোগ্য প্রার্থীকে নমিনেশন দেওয়া হয়নি। তা নিয়ে দলের মধ্যে অসন্তোষ ছিল এবং সমর্থকদের বিক্ষোভ প্রতিবাদও হয়েছে। অনেকের মতে বিএনপির ভোটারদের মনোভাব বুঝার জন্য কোনো জরিপও ছিল না। নেতারা অনেকটা মরীচিকার পিছনে ধূম্রজালের মধ্যে ছিল। জামায়াতে ইসলামের নেতাদের নমিনেশন দিয়ে ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচন করার সুযোগ করে দেওয়ায় তরুণ সমাজসহ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কোনো লোক এটা মেনে নিতে পারেনি। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ইতিহাস বিকৃতি ও বঙ্গবন্ধুকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার যে অপচেষ্টা হয়েছিল তা জানতে পেরে বর্তমান প্রজন্মের তরুণ-যুবকরা স্বাধীনতা বিরোধী ও তাদের দোসরদেরকে পছন্দ করে না, এটাও উপলব্ধি করতে পারেনি বিএনপি তথা ঐক্যজোটের নেতৃবৃন্দ।

পক্ষান্তরে আওয়ামী লীগ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে একটানা দশ বছর দেশ শাসন করে দেশকে উন্নয়নের মহাসড়কে নিয়ে গেছে। বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের ও উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। খাদ্যে  স্বয়ংসমপূর্ণ, বিদ্যুৎ উত্পাদন ছয়গুণ বেড়েছে। দারিদ্র্যের হার ৪২% থেকে ২২% নামিয়ে এনেছে। বৈদেশিক রিজার্ভ এগার গুণ বেড়ে ৩৪ বিলিয়নে উন্নীত হয়েছে। রাস্তা, মহাসড়ক, ব্রিজ, কালভার্ট, ফ্লাইওভার তথা অবকাঠামো উন্নয়নে বিপ্লব ঘটেছে। সমুদ্র জয়, ভারতের সঙ্গে স্থল সীমানা চুক্তির বাস্তবায়ন এবং আকাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উতক্ষেপণ করে প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁর দূরদর্শিতা ও গতিশীল নেতৃত্বেরও পরিচয় দিয়েছেন। শেখ হাসিনার ব্যক্তিত্ব, প্রজ্ঞা ও জনপ্রিয়তা তার দলের জনপ্রিয়তাকেও ছাড়িয়ে গিয়েছে। শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা এবং তার সরকারের সাফল্য ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনে বিশেষ প্রভাব ফেলেছে।

আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার পর্যালোচনা করলেও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক দল হিসেবে মুন্সিয়ানা ও প্রজ্ঞা সহজেই বুঝা যায়। আওয়ামী লীগ তাদের ঘোষিত ২০২১ ও ২০৪১ রূপকল্প এবং ২১০০ সালের ডেল্টা প্লান সামনে রেখে নির্বাচনী ইশতেহার প্রণয়ন করেছে যাতে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা আছে। এ ক্ষেত্রে বিএনপির ইশতেহার ততটা সুচিন্তিত ও সুপরিকল্পিত মনে হয়নি। বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্ট প্রথম থেকেই অনেকটা দায়সারা ভাব নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে।

অপরপক্ষে বিএনপির নেতৃত্বের সংকট, সাংগঠনিক দুর্বলতা, আন্দোলনে জনগণকে সম্পৃক্ত করতে ব্যর্থ হওয়া, সিদ্ধান্তহীনতা, জনগণের কল্যাণে কাজ করার ক্ষেত্রে জনগণের আস্থা অর্জনে সক্ষম না হওয়া, বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের সাজা হওয়া, পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-র সঙ্গে তারেক জিয়ার মিটিং করার সংবাদ, একের পর এক ফোনালাপ ফাঁস, ইত্যাদি কারণে বিএনপির নির্বাচনে জয়ের মাধ্যমে আসন সংখ্যা বৃদ্ধির কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। বিএনপিকে বাস্তবতা মেনে নিতে হবে। আত্ম বিশ্লেষণের মাধ্যমে নিজেদের ভুল ত্র“টি শনাক্ত করে সংগঠনকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিতে হবে। সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দল ছাড়া গণতন্ত্র কখনও মজবুত ভিত্তির উপর দাঁড়াতে পারে না।

আওয়ামী লীগের বড় বিজয় তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জও বটে। জনগণ আশা-ভরসা নিয়ে আওয়ামী লীগের উপর আস্থা এনেছে। জনগণের এ প্রত্যাশা পূরণ করাই এখন আওয়ামী লীগের প্রধান কাজ হবে। জনগণের প্রতি তাদের দায়িত্ব বেড়ে গেছে। আমার বিশ্বাস, বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা এ বিষয়ে সচেতন আছেন । তার প্রজ্ঞা, আত্মবিশ্বাস, দেশপ্রেম ও জাতির পিতার স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য দৃঢ় সংকল্প সব চ্যালেঞ্জকে মোকাবিলা করে আগামী পাঁচ বছরে দেশকে একটি উন্নত মর্যাদাশীল দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হবে। জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করবেন। গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার রক্ষা এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা করে বাংলাদেশকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে এটাই সকলের প্রত্যাশা।

লেখক  ঃ সাবেক ইন্সপেক্টর জেনারেল, বাংলাদেশ পুলিশ

আরো খবর...