এই ভোট হারজিতের কিছু নয়

॥ অজয় দাশগুপ্ত ॥

নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে জয়পিপাসু দলগুলো ততই আদর্শ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। আজকাল অবশ্য রাজনীতিতে আদর্শ বিষয়টাই তর্কের। সেটা আপনি ভারতে বলুন আর পাকিস্তানে বলুন আদর্শ এখন প্রায় অচল বিষয়। বাংলাদেশে শেখ হাসিনার বিকল্প নেই এখনো। কেন নেই? তার একাধিক ব্যাখ্যা দেয়া সম্ভব। সবচেয়ে বড় কথা তিনি আছেন বলে এখনো আশার আলো মিটমিট করে জ্বলছে। খেয়াল করবেন, তার ব্যাপারেই যত বিরোধিতা।

কারণ তাকে তারা সহ্য করতে পারে না। তাকে বিপদে ঠেলে দিয়ে দেশের অরাজক হাল তৈরি করে যখন না কামিয়াব তখন হেফাজতের সঙ্গে সুসম্পর্ক নিয়েও এখন বাদানুবাদ করছে এরা। প্রশ্ন রাখি আপনাদের এই অবস্থান যদি মনের অবস্থান হতো তাহলে মতিঝিল বা শাপলা চত্বরের ঘটনার সময় কেন তার পাশে এসে দাঁড়াননি? তিনি কঠোর হলে আপনারা বলেন দমন করছেন। আর সখ্য হলে বলেন, চেতনা কোথায় হারিয়ে গেল? আপনাদের বুঝতে স্বয়ং সেলুকাসও পারবেন বলে মনে হয় না।

এদিকে আওয়ামী লীগের বা চৌদ্দ দলের জোটের পরিস্থিতিও খুব একটা সুখকর কিছু না। মানুষের মনে পুঞ্জীভূত ক্রোধ আর আক্রোশ আছে। যাতে নিয়মিত ঘি ঢালছে বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্ট। আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে যাওয়া বা বহিষ্কৃত মানুষগুলো অনেক বছর পর জোট বেঁধেছে। তাদের পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে মৌলবাদী আর স্বার্থান্ধ গোষ্ঠী। এদের জনগণ খুব ভালো চেনে। তারপরও তারাই এখন মধ্যবিত্তের দোদুল্যমান চিত্তের অবলম্বন। যার মূল কারণ সরকারের কিছু মন্ত্রী আর মাঠ পর্যায়ের কিছু নেতাকর্মীর খাই খাই মনোভাব। আছে ইন্ধন আর লাগামহীন কথাবার্তা। সব মিলিয়ে নির্বাচনী পরিবেশ আর ফলাফল কি হতে পারে এখনই বলা মুশকিল।

সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য লালায়িত মানুষরা ভুলে যায় আমাদের দেশে জনমত বা মতামত কখনোই যুক্তিতর্কের ওপর নির্ভর করেনি। পঁচাত্তরের আগেও এমন পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল। তখন জাসদের আড়ালে ঘাপটি মেরে থাকা স্বাধীনতাবিরোধী আর সুবিধাবাদীরা এ দেশের হাল ধরে আমাদের দেশ ও জাতিকে ইতিহাস বিচ্যুত এক নব্য পাকিস্তানের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। যার পরিণামে বঙ্গবন্ধু ও চার নেতাসহ অনেকের করুণ মৃত্যু হয়। সেসময় থেকেই মূলত নেতৃত্বহীন হয়ে পড়ে বাংলাদেশ। আজ এত বছর পরও সে বাস্তবতা দেখে শঙ্কিত হওয়ার বিকল্প থাকে না। যারা রাজনীতির নামে অরাজকতা আর লুণ্ঠন করে উভয় দলই এখন বেপরোয়া। মাঝখানে বাংলাদেশের যাবতীয় অর্জন আর ইতিহাস পড়ে তোপের মুখে।

নির্বাচনে নানা বিষয় কাজ করবে এটাই স্বাভাবিক। যার যার মতামত বা মূল্যায়নের পেছনে থাকবে নিজস্ব বিশ্বাস আর অভিজ্ঞতা। কিন্তু একটা কথা বলতেই হবে এবার যদি দুঃশাসন আর কিছু নেতাকর্মীর দায় দলের ওপর গিয়ে পড়ে তো বাংলাদেশ আবার অনেক বছর পিছিয়ে যাবে।

একদিকে দীর্ঘ সময় না খেতে পারার লোভ আর খিদে আরেকদিকে প্রতিশোধ প্রবণতা আমাদের সমাজকে যে কোথায় নিয়ে দাঁড় করাতে পারে কে জানে।

মনে রাখা প্রয়োজন এখন বিশ্বায়নের কাল। এ যুগে মানুষ মানুষের জন্য সময় ব্যয় করে না। এ কালে কোনো দেশ কারো জন্য সবুরও করে না। বাংলাদেশ যা দিতে পারে যা দিয়ে দুনিয়ায় নাম করছে আয় রোজগার করছে তা অনেক দেশ দিতে পারে। কারো কারো দেয়া নেয়ার কৌশলও আমাদের চাইতে ভালো। ফলে অনেক কিছু হাতছাড়া হতে বাধ্য।

সেদিকে রাজনীতির খেয়াল আছে বলে মনে হয় না। যত নির্বাচন ঘনিয়ে আসে তত ভারত বিরোধিতা সাম্প্রদায়িকতা আর ইতিহাস বিকৃতি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। তারা ভুলে যায় তাদের ভাষায় হেফাজত বা মৌলবাদীবান্ধব নামে পরিচিত শেখ হাসিনাকেই আবার ভারতবান্ধব বলা হচ্ছে। অথচ একটু গভীরভাবে তাকালেই বোঝা সম্ভব এসব অভিযোগ কতটা ভিত্তিহীন।

শুধু তাই নয়, যে বি চৌধুরী এসব বলতেন টিভিতে মিডিয়ায় এসে মানুষকে এমন সব ভয় লাগাতেন তিনি এখন কোথায়? এ লেখা যখন লিখছি তখন খবরে আছে তিনি শেখ হাসিনার সঙ্গে গণভবনে  বৈঠক শেষে ফিরেছেন। তাদের চাওয়া কিছু আসন দিলেই তারা বশ মেনে যাবে।

আমি হলফ করে বলতে পারি আ স ম রব বা মান্নাও গুরুত্বহীন বলেই এমন করছেন। তা না হলে আজ অবধি এমন কোনো কাজ বা কথা দেখিনি যাতে মনে হতে পারে তারা সত্যিকার অর্থে জনগণের শাসন বা ভবিষ্যৎ বিষয়ে কৌতূহলী। বাংলাদেশকে কীভাবে এগিয়ে নিয়ে যাবেন সে ব্যাপারে তাদের কোনো দৃষ্টিভঙ্গি আছে? থাকলে সেসব না বলে খামোখা শেখ হাসিনার নিন্দা বা সমালোচনা করতেন না। করে আবার গণভবনে গিয়ে উদরপূর্তিও করতেন না। ড. কামাল হোসেনের যা বয়স তাতে তার কাছ থেকে বলিষ্ঠতা বা নেতৃত্ব আশা করা বৃথা। যে কারণে মুখে বললেও বাস্তবে তিনিও তারেক জিয়ার নজরবন্দি। তারেক জিয়া আর যাই হোক ক্লিন কোনো মানুষ না। তার মায়ের মতো ইমেজ বা ক্যারিশমা কিছুই নেই তার। সে তিনি যখন ভিডিওতে স্কাইপে ইন্টারভিউ নিয়ে মনোনয়ন চূড়ান্ত করেন আমরা ভীত হবো এটাই স্বাভাবিক। দলীয় বিবেচনার বাইরেও শেখ হাসিনার বিকল্প নেই। সম্প্রতি তিনি কি দেখালেন?

আর যাই থাক, নিন্দুক আর সমালোচকের অভাব নেই আমাদের। তারা বলছেন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটা করা তার দায়িত্ব। জ্বি। আপনাদের পেয়ারী প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব কি ছিল? শামসুর রাহমানের মতো কবির কান টেনে দিতে বলা। বুকে হাত দিয়ে বলুনতো তিনি গদিতে থাকলে আওয়ামী লীগ দূরে থাকুক, প্রগতিশীল কাউকে এমন সহযোগিতা করতেন?

বিশেষত যিনি জীবন থেকে নেয়ার মতো ছবিতে পাকবাহিনীর গুলি খেয়ে মরা মধুর চরিত্রে অভিনয়ের পর আজীবন বিষ খেয়ে গেছেন। নিঃসন্দেহে গুণী মানুষ। হুমায়ূন আহমেদের আগে ঈদের নাটক ও বিনোদনের একমাত্র ভরসাস্থল। মোটা দাগের হলেও টাকা দেন দুবাই যামু এখনো মনে গেঁথে আছে। জাসাস নামের জয় বাংলা ও মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনাবিরোধী সংগঠনের পুরোধা ছিলেন। পুত্ররা গিয়েছিল প্রধানমন্ত্রীর কাছে। যাদের একজন পিতাকে বেসুমার অপমান করেছিল টিভি শোতে। লাইভ দেখে আমি লজ্জায় মুখ লুকিয়েছিলাম। তারপরও গুণী পরিচালক। একাধিক হিট ছবি গান ও নানা বিষয়ে তার অবদান অনস্বীকার্য। আজ শেষ বয়সে ঘোর বিপদের দিনে তিনি যাদের আদর্শ বা নীতির বিপরীতে ছিলেন তাদের নেত্রী পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা গুণীর কদর জানেন। তার বিরোধিতাকারীদেরও তিনি সহায়তা করে নিজেকে বড় করে তুলতে পারেন।

আমরা অবশ্য প্রতিদানে বলবো, নৌকায় ভোট দেয়ার আগে ভাবতে হবে।

শেখ হাসিনা যাদের চক্ষুশূল তারাও তার কাছেই ফিরে যায়। যেতে বাধ্য হয়। ইতিহাসে এমন নজির ভূরি ভূরি। তাই সময় থাকতেই আপনাকে মতামত তৈরি করে ভেতরে প্রস্তুত হতে হবে। বিএনপি যদি প্রতিশোধহীন ইতিহাস নির্ভর ও উন্নয়নমুখী নির্বাচন সংকল্পের কথা বলে তবে আলাদা।

আর যদি আগের মতো কথিত প্রিয়তা আর জনস্রোতের মধ্যদিয়ে দেশকে পিছিয়ে নিতে চায় এদেশ ও জাতির কপালে বড় দুর্ভোগ আছে।

সময় থাকতে আমাদের যার যার কাজ ও ভূমিকাই হোক প্রতিক্রিয়াশীলতার বিরুদ্ধে উত্তর। অবহেলায় তরী ডুবলে এবার মাঝি মাল¬াদেরও খবর থাকবে না। তারপরও বাংলাদেশ চায় গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন। মুখ কান চোখ খোলা রাখার সমাজ আর সুন্দর এক ভবিষ্যৎ। সে আশাই যেন কথা বলে ভোটে।

লেখক ঃ কলাম লেখক।

 

আরো খবর...