উন্নয়ন চাইলে গ্যাসের বর্ধিত দাম মেনে নিতে হবে – প্রধানমন্ত্রী

ঢাকা অফিস ॥ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি চাইলে আন্দোলন না করে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির বিষয়টি মেনে নিতে হবে। আর কেন গ্যাসের দাম বাড়ানো জরুরি- সে বিষয়ে সরকারের যুক্তিগুলোও তুলে ধরেন তিনি। সরকার গত ৩০ জুন সব পর্যায়ে গ্যাসের দাম গড়ে ৩২.৮ শতাংশ বাড়ানোর ঘোষণা দিলে তার প্রতিবাদে রোববার সারা দেশে আধাবেলা হরতাল করে বাম গণতান্ত্রিক জোট। বিএনপি ও তাদের কয়েকটি শরিক দলও সেই হরতালে সমর্থন দেয়। সাম্প্রতিক চীন সফরের অভিজ্ঞতা জানাতে প্রধানমন্ত্রী গতকাল সোমবার গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে এলে একজন সাংবাদিক গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি এবং এর প্রতিবাদে আন্দোলনের বিষয়ে প্রশ্ন করেন। জবাব দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের মানুষের আগে ঠিক করতে হবে, তাদের গ্যাসের প্রয়োজন আছে কি না। আমরা যদি দেশের উন্নতি করতে চাই, এই এনার্জি একটা বিষয়। আপনারা যদি লক্ষ্য করেন, ২০০৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের জিডিপি কতটুকু বেড়েছে? আর আমরা এখন জিডিপি ৮.১ শতাংশ পর্যন্ত অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি। এর কারণ আমরা এনার্জির ক্ষেত্রে যথেষ্ট মনোযোগ দিয়েছি, বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি করতে পেরেছি।” শেখ হাসিনা বলেন, বিদ্যুৎ আমদানি বাড়াতে পারলেও বাংলাদেশকে গ্যাস আমদানি করতে হচ্ছে। আর এলএনজি আমদানির জন্য খরচও বেশি পড়ছে। এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু সেখানে দাম যেটুকু বাড়ানো হয়েছে, এটা যদি না বাড়ানো হয়, তাহলে আপনাদের কাছে দুটো পথ আছে। হয় আমরা এলএনজি আমদানি কমিয়ে দিয়ে এনার্জির ক্ষেত্র সংকুচিত করে ফেলব, তাতে উন্নতি হবে না। আর যদি সত্যিই অর্থনৈতিক উন্নতি চান, …তো এটা তো মেনে নিতেই হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিল্পায়ন করতে হলে, বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে হলে, সার উৎপাদন করতে হলে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন করতে হলে, ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ হতে হলে সরকারকে এলএনজি আমদানি করতেই হবে। এলএনজি আমদানি করতে আমার কত টাকা খরচ হয়, সেই হিসাবটাতো আগে জানতে হবে। প্রতি ঘনমিটার এলএনজি আমদানিতে আমাদের খরচ পড়ে ৬১.১২ টাকা। সেটা আমি দিচ্ছি ৯.৮০ টাকায়। গ্যাসের দাম বৃদ্ধির সমালোচনা করতে গিয়ে যারা ভারতে দাম কমানোর প্রসঙ্গ তোলেন- তাদের উদ্দেশে দুই দেশের গ্যাসের দামের পরিসংখ্যান তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ভারতে প্রতি ঘণমিটার গ্যাসের দাম গৃহস্থালীতে স্থানভেদে ৩০ থেকে ৩৭ টাকা, শিল্পে ৪০ থেকে ৪২ টাকা, সিএনজি ৪৪ টাকা আর বাণিজ্যিকে ৫৮ থেকে ৬৫ টাকা। আর বাংলাদেশে  প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম গৃহস্থালীতে ১২.৬০ টাকা, শিল্পে ১০.৭০ টাকা সিএনজি ৪৩ টাকা এবং বাণিজ্যিকে ২৩ টাকা। শেখ হাসিনা বলেন, “আমরা এলএনজি নিয়ে এসে যেটা ৬১.১২ টাকা, সেটা আমরা দিচ্ছি ৯.৮০ টাকায়। তারপরেও আন্দোলন! আন্দোলনে একটা মজার বিষয় আছে, বাম আর ডান মিলে গেছে এক সুরে, এই তো? ভালো। চলতি অর্থবছরে ৮.২ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “সেখান থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ১০ শতাংশে এ নিয়ে যাব। আমার এনার্জি লাগবে। ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ লাগবে। এখন লোডশেডিং নেই, সবাই বেশ আরাম আয়েশে আছে বলেই ভুলে গেছে অতীতের কথা। দশ বছর আগে কী অবস্থা ছিল?” আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা এ অনুষ্ঠানেও বলেন, গ্যাস বিক্রির প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন বলে তিনি ২০০১ সালে ক্ষমতায় আসতে পারেননি। তার ভাষায়, বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া সেবার ‘গ্যাস বিক্রির মুচলেকা দিয়ে’ ক্ষমতায় আসেন। সেই বিএনপি সরকারের সময় ভারতকে পাইপ লাইন দিয়ে মিয়ানমার থেকে গ্যাস আনার সুযোগ না দেওয়াও ভুল সিদ্ধান্ত ছিল বলে মন্তব্য করেন আজকের প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, “আমি থাকলে কী করতাম? পাইপ লাইনে তো গ্যাস নিতে দিতামই, আমি আমার ভাগটা রেখে দিতামৃ যে আমাকে দিয়ে তারপর নিতে হবে। তখন যদি মিয়ানমার থেকে পাইপ লাইনে গ্যাস আনতে পারতাম, আর অর্থনৈতিক কাজে লাগাতে পারতাম, তাহলে আমাদের এখন এলএনজি আমদানি না করলেও চলত। কারণ সেখানে প্রচুর গ্যাসের রিজার্ভ আছে।” সেই গ্যাস এখন পাইপলাইনে করেই চীনে যাচ্ছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “দেশের কতগুলি বিষয়ে সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে নেতৃত্ব যদি ভুল করে, বা সরকার যদি ভুল করে, তার খেসারত জনগণকে দিতে হয়।” এখন যে পরিমাণে দাম বাড়ানো হয়েছে, তারপরও বছরে ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি ভর্তুকি দিতে হবে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আন্দোলন যেহেতু করেছি, তাহলে একটা কাজ করি, যে দামে কিনব, সেই দামে বেচব। ৯টাকার বদলে ৬১ টাকা দরে বেচব।” গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে হরতাল হওয়ায় উষ্মা প্রকাশ করে সরকার প্রধান বলেন, “সমস্ত ট্যাক্স মাফ করে দেওয়া হয়েছে। মানুষের কাছে যাতে সহজলভ্য হয়, আমি সেই ব্যবস্থাটা করেছি। তারপরও উনারা হরতাল ডাকেন, আন্দোলন করেন। খুব ভালো, বহুদিন পর হরতাল পেলাম তো, পরিবেশের জন্য ভালো, ধন্যবাদ।”

ধর্ষণ রোধে পুরুষদের সোচ্চার হতে হবে

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংবাদ সম্মেলনে ধর্ষণ প্রতিরোধে পুরুষদের সোচ্চার হতে বললেন। তিনি বলেছেন, কেবল নারীরাই চিৎকার করে যাবে নাকি? এ ব্যাপারে পুরুষদেরও সোচ্চার হওয়া উচিত। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ধর্ষণ প্রতিরোধে যা যা করার দরকার বা আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার দরকার হলে সরকার তা-ই করবে। ধর্ষকদের শাস্তি দিতেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর বলে জানান তিনি। সম্প্রতি নারী ও শিশু ধর্ষণের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে জানতে চাওয়া হয়, সরকার ধর্ষণ রোধে আরও কোনো কঠোর পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে কি না? জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুর্ভাগ্য হচ্ছে ধর্ষণ সব সময় সব দেশে আছে। তবে এখন মেয়েরা সাহস করে কথাটা বলে। একটা সময় সামাজিক লজ্জার কারণে বলতে পারত না। সম্প্রতি রাজধানীর ওয়ারীতে ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হওয়া শিশু সায়মার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, অপরাধীকে পুলিশ সঙ্গে সঙ্গে গ্রেপ্তার করেছে এবং সে ধর্ষণের কথা স্বীকার করেছে। ধর্ষণের মতো জঘন্য কাজ যারা করে, তারা মানুষ নাÑ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার অপরাধীদের বিরুদ্ধে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিচ্ছে। ধর্ষণ রোধে পুরুষ সমাজকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘পুরুষ সমাজকেও বলব, ধর্ষণটা তো পুরুষ সমাজ করে যাচ্ছে, পুরুষ সমাজেরও একটা আওয়াজ তোলা উচিত।’ পুরুষদেরও কিছু করা উচিত জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘খালি নারীরাই চিৎকার করে যাবে নাকি? নির্যাতিত হয়ে সব চিৎকার করবে আর নির্যাতনকারীর স্বজাতি যারা আছে তাদেরও এ ব্যাপারে সোচ্চার হওয়া উচিত বলে মনে করি।’

‘আমার ছেলেদের কেউ খারাপ বলতে পারবেন না’

সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্য প্রশ্নের মধ্যে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের বিশ্বকাপ পারফরম্যান্সের প্রসঙ্গ আসে। প্রধানমন্ত্রী ক্রিকেট দলের পারফরম্যান্সের প্রশংসা করেন, অযথা সমালোচনা করতে বারণ করেন। বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দশ দলের মধ্যে শেষ পর্যন্ত হয়েছে অষ্টম। এ নিয়েই সমর্থকদের মধ্যে হতাশা। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গ্লাসের ভরাট অংশের দিকেই তাকাতে বলছেন। বাংলাদেশ দল সেমিফাইনালে যেতে না পারলেও সামগ্রিক পারফরম্যান্সে তিনি খুশি। চীন সফর নিয়ে আয়োজিত ব্রিফিংয়ে অন্যান্য প্রশ্নের মধ্যে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের বিশ্বকাপ পারফরম্যান্সের প্রসঙ্গও আসে। প্রধানমন্ত্রী ক্রিকেট ভালোবাসেন। ক্রিকেট দলের খোঁজ নিয়মিত রাখেন বলেই এক সাংবাদিক প্রসঙ্গটা তোলেন। শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আমি কিন্তু খেলা দেখেছি। অনেক রাত পর্যন্ত। অফিশিয়াল কাজ যেমন করেছি, খেলাও দেখেছি। হয়তো একবার দেখতে পেরেছি, একবার পারিনি। যতটুকু সময় পেয়েছি, খেলা দেখেছি। আমি তো আমাদের ছেলেদের ধন্যবাদ জানাব, তারা যথেষ্ট সাহসের পরিচয় দিয়েছে। তাদের মধ্যে আলাদা আত্মবিশ্বাস কিন্তু এসেছে। ধীরে ধীরে আরও উন্নতি হবে।’ প্রধানমন্ত্রী মনে করেন, সব মিলিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বকাপে ভালো করেছে, ব্যক্তিগত অর্জনের পাশাপাশি দলীয় অর্জনও আছে, ‘আমরা যে এত দূর যেতে পেরেছি, এটা অনেক বড় ব্যাপার। আমাদের কিছু খেলোয়াড়, সাকিব আল হাসান, মোস্তাফিজুর রহমান এরা বিশ্বে একটা স্থান করে নিয়েছে। আমি দোষ দেব না। খেলা এমন একটা জিনিস, অনেক সময় কিন্তু ভাগ্যও লাগে। সব সময় যে সবকিছু ঠিকমতো হবে, একই রকম হবে, সেটা নয়। ক্রিকেটাররা সাহসী মনোভাব নিয়ে মোকাবিলা করতে পেরেছে, আমি এটার প্রশংসা করি।’ সেমিফাইনালে শুধু চারটি দল খেলতে পারে, এই বাস্তবতা বোঝার আহ্বান ছিল প্রধানমন্ত্রীর কণ্ঠে, ‘এতগুলো দেশ খেলেছে। এর মধ্যে চারটা দেশ মাত্র সেমিফাইনালে উঠেছে। তাহলে কি আপনারা বলবেন বাকিরা সবাই খুব খারাপ খেলেছে? আমরা নিজেরাই নিজেদের ছোট করেন কেন? নিজেদের এত খারাপ বলি কেন? বরং আপনারা এটা বলেন, যে একেকজন জাঁদরেল জাঁদরেল খেলোয়াড়, দীর্ঘদিন যারা খেলে খেলে অভ্যস্ত, তাদের সঙ্গে মোকাবিলা করে আমাদের ছেলেরা খেলতে পেরেছে। তাদের খেলায় আত্মবিশ্বাসের কোনো অভাব তো আমি দেখি না।’ তাঁর প্রথম সরকারের সময় বাংলাদেশ আইসিসি ট্রফি জিতেছিল, বিশ্বকাপে গিয়েছিল, সেসবও মনে করিয়ে দেন প্রধানমন্ত্রী, ‘আরও একটা জিনিস খেয়াল করেন। আসলে খেলোয়াড় হিসেবে আসছে কারা, আপনি খেলোয়াড় পাচ্ছেন কোত্থেকে, কত জন পাচ্ছেন। প্রথম যখন সরকারে ছিলাম, আমাদের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ক্রীড়া মন্ত্রী ছিলেন, তখন থেকেই আমাদের মনোযোগ ছিল, আমাদের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা যেন বিভিন্ন খেলাধুলায় মনোযোগী হয়। সেই পদক্ষেপ নিয়েছিলাম। ছোট থেকে অভ্যস্ত করে করে, অনুশীলন করে করে, তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস জাগানো হয়েছে। তাদের তৈরি করা হয়েছে। ধীরে ধীরে বাংলাদেশ কিন্তু ভালো করছে। এগিয়ে যাচ্ছে।’ প্রধানমন্ত্রীর ক্রিকেট ও ক্রিকেটারদের প্রতি আবেগটাও প্রকাশ পেয়ে যায়, ‘এখানে দোষ দেওয়ার কিছু নাই। দোষ যদি দিতেই হয়, ওই চারটি দল (যারা সেমিফাইনালে গেছে) বাদ দিয়ে বাকি সব দলকেই দোষ দেন। খালি বাংলাদেশকে দোষ দেবেন না। আমি আমার ছেলেদের কখনো নিরুৎসাহিত করি না। আমি বরং ফোন করে ওদের বলি, খেলো তোমরা, তোমরা ভালো খেলেছ। ৩৮১ রান তাড়া করে (অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে) বাংলাদেশ ৩৩৩ রান করল। আপনারা চিন্তা করে দেখেন। তাহলে আপনারা খারাপ বলবেন কীভাবে? আমার ছেলেদের কেউ খারাপ বলতে পারবেন না।’

 

আরো খবর...