উদ্ভিদের বৃদ্ধি সহায়ক ব্যাকটেরিয়া

কৃষি প্রতিবেদক ॥ বিশ্বের বতর্মান জনসংখ্যা ৭০০ কোটি যা আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়াবে প্রায় সাড়ে আটশ কোটিতে। অন্যদিকে আধুনিক শিল্পায়নের ফলে সৃষ্ট পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে এত বিপুল পরিমাণ জনসংখ্যার খাদ্য জোগান দেয়া আগামী দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। আর এই প্রতিকূল পরিবেশে কৃষিকে টেকসই করতে ‘উদ্ভিদের বৃদ্ধি ত্বরান্বিতকারী ব্যাকটেরিয়ার ব্যবহার ও ট্রান্সজেনিক উদ্ভিদ উদ্ভাবন করা প্রয়োজন বলে মনে করেন বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের ঊধ্বর্তন বৈজ্ঞানিক কমর্কতার্ ড. মো. হারুন-অর রশিদ। কৃষিতে ব্যবহৃত রাসায়নিক সার, আগাছানাশক, কীটনাশক প্রভৃতি ব্যবহারের ফলে পরিবেশে অনেক ক্ষতিকর পদার্থ উৎপন্ন হচ্ছে যা মানুষ ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। তাই পরিবেশ দূষণ রোধ ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার জন্য পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি উদ্ভাবনের পাশাপাশি ‘উদ্ভিদের বৃদ্ধি সহায়ক ব্যাকটেরিয়া’ নিয়ে গবেষণা করছেন কৃষি পদক জয়ী এই বিজ্ঞানী। সাধারণভাবে উদ্ভিদের বৃদ্ধিতে সাহায্য করে এমন ব্যাকটেরিয়াকে বলা হয় ‘উদ্ভিদের বৃদ্ধি সহায়ক ব্যাকটেরিয়া’। এরা বিভিন্নভাবে উদ্ভিদের বৃদ্ধিতে সাহায্য করে থাকে। যেমন উদ্ভিদকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করা, প্রতিকূল পরিবেশে উদ্ভিদকে টিকে থাকতে সাহায্য করা, রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণুর বৃদ্ধিকে হ্রাস করা, ক্ষতিকর ভারী ধাতব পদাথের্র প্রভাব হতে রক্ষা করাসহ বিভিন্নভাবে সাহায্য করে থাকে। এমনকি এই ব্যাকটেরিয়াগুলো মানুষ ও পরিবেশে কোনো ক্ষতিও করে না। ব্যাকটেরিয়ার উল্লেখযোগ্য ব্যবহারের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেÑ নাইট্রোজেন সংবন্ধন: মাটিতে বসবাসকারী রাইজোবিয়াম জাতীয় ব্যাকটেরিয়া বাতাসের নাইট্রোজেন আবদ্ধ করে গাছকে সরবরাহ করে থাকে। জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং পদ্ধতির মাধ্যমে ব্যাকটেরিয়ার স্ট্রেইন গাছের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে নাইট্রোজেন সংবন্ধনের হার বাড়ানো সম্ভব। ফলে জমিতে ইউরিয়া সার কম প্রয়োগেই ভালো ফলন পাওয়া যাবে। আয়রন সিকোয়েস্ট্রেশন: আয়রন সীমিত মাটিতে বেঁচে থাকতে কিছু ব্যাকটেরিয়া জৈব মলিকুল তথা সিডারোফর উৎপন্ন করে। সিডারোফর উৎপাদনের মাধ্যমে ব্যাকটেরিয়া একদিকে নিজের দেহের বৃদ্ধির জন্য অধিক আয়রন গ্রহণের সুযোগ তৈরি করে অন্যদিকে উদ্ভিদকে অধিক আয়রন গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করে। তামাক উদ্ভিদ এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে অধিক পরিমাণ আয়রন সংগ্রহ করতে পারে। ফাইটোহরমোনের মাত্রার পরিবর্তন: বিভিন্ন হরমোন উদ্ভিদের বৃদ্ধি ও উন্নতি নিয়ন্ত্রণে এবং প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। বিজ্ঞানীরা গবেষণায় দেখেছেন, উদ্ভিদ যখন প্রতিকূল পরিস্থিতির শিকার হয় তখন তার ফাইটোহরমোনের মাত্রা পরিবর্তনের চেষ্টা করে। ওইসময় উদ্ভিদের মূলাঞ্চলে অবস্থিত অণুজীবগুলো তাদের ফাইটোহরমোনের মাত্রা পরিবতর্ন করে। উদ্ভিদের হরমোনের মাত্রা পরিবতের্ন সাহায্য করে যা উদ্ভিদকে প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে সাহায্য করে। ট্রিহেলোজ উৎপাদন : ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক, উদ্ভিদ, পোকা এবং অমেরুদন্ডী প্রাণীতে ট্রিহেলোজ পাওয়া যায়। উচ্চমাত্রার ট্রিহেলোজ বিভিন্ন প্রাণীকে প্রতিকূল পরিবেশে (উচ্চ তাপমাত্রা, উচ্চ লবণাক্ততা ও খরায়) টিকে থাকতে সাহায্য করে। ঠান্ডা প্রতিরোধক প্রোটিন উৎপাদন : নিম্ন তাপমাত্রা উদ্ভিদের জন্য ক্ষতিকর। কিছু কিছু ব্যাকটেরিয়া ঠান্ডা প্রতিরোধক প্রোটিন তৈরি করতে পারে যা ব্যাকটেরিয়ার আবরণের বাইরের দিকে একটি স্বচ্ছ দানাদার আবরণ তৈরি করতে পারে। দূষিত মাটি পুনরুদ্ধার : বিভিন্ন ধরনের ভারী ধাতব পদার্থ যেমনÑ লেড, ক্যাডমিয়াম, মারকারি, ক্রোমিয়াম, ইউরেনিয়াম, আর্সেনিক প্রভৃতি উদ্ভিদের ব্যবহারের জন্য উপকারী নয়। পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশে এই সব ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার করা হচ্ছে এবং এদের ব্যবহার ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। প্রতিকূল পরিবেশে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং পরিবেশ দূষণকারী বিভিন্ন উপাদান শোষণ ও ধ্বংস করার ক্ষেত্রে ব্যাকটেরিয়ার উপকারী স্ট্রেইন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেন, ড. মো. হারুন অর রশিদ।

আরো খবর...