আসুন অপসাংবাদিকতার জঞ্জাল দূর করতে সচেষ্ট হই

॥ এস আর সেলিম ॥

সেই ১৯৯৪ সালে ছাত্রাবস্থায় স্থানীয় পত্রিকায় টুকটাক খবর লেখালেখি শুরু আমার। অর্থাৎ মফস্বল সংবাদকর্মী হিসেবে কলম ধরার বয়স দাঁড়াল ২৫ বছর। যা একেবারেই কম সময় নয়। বরং নিজ বয়সের অর্ধেকের বেশি সময়ই। শখের বসে এই পথে এসে ধীরে ধীরে নেশায় আসক্ত এবং শেষমেষ এক রকম পেশাতেই পরিণত। তবে শুরু থেকে এ পর্যন্ত কখনোই নিজের ঢোল নিজে পেটানোর প্রয়োজন মনে করিনি। কিন্তু অনিচ্ছা সত্বেও আজ একটু পেটাতে হচ্ছে। অবশ্য সে রকম কোনো অনুষঙ্গও আমার ক্ষেত্রে নেই। শুরুর দিকে খবরের পেছনে প্রচুর ওয়ার্ক করেছি। খবরের প্রয়োজনে দিন-রাত সমানে চষে বেড়িয়েছি এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায়। কিন্তু এখন আর সেই দৌড়ঝাঁপ ভাল লাগে না। ডিজিটাল যুগ ঘরে বসেই সব খবর মেলে। ছুটোছুটি না করলেও চলে। তবু বিশেষ খবরের ক্ষেত্রে ছুটতেই হয়। কিন্তু ব্যাপারটি আসলে তাও নয়। সমস্যা অন্য জায়গায়।

সে যাই হোক, সেই সময়ে দৌলতপুর অঞ্চলে চলতো পাবলিক পরীক্ষায় নকলের মচ্ছব। কুষ্টিয়া শহর ছাড়াও আশপাশের জেলা থেকে অনেকে নকলের সুযোগ নিতে এখানকার বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে এসব পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতেন। নতুন কিংবা শিক্ষানবিশ ‘সংবাদকর্মী’ হিসেবে সে সময় সাধারণের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ বিশেষ জায়গাগুলোতে বিচরণের আগ্রহটা একটু বেশিই ছিল। কৌতূহল মেটাতে সে সব জায়গায় যেতামও। এ রকম প্রবেশ নিষিদ্ধ স্থানগুলোর মধ্যে পরীক্ষা কেন্দ্র এবং ভোট কেন্দ্র ছিল মোটামুটি উল্লেখযোগ্য।

বিভিন্ন পরীক্ষা কেন্দ্র ঘুরে রাজনৈতিক নেতাদের রক্তচক্ষু ও নানা প্রতিকূল অবস্থা উপেক্ষা করে পাবলিক পরীক্ষায় নকলের বহু এক্সক্লুসিভ ছবি তুলেছি। সেই ছবিসহ স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকায় রিপোর্ট করে তোলপাড় সৃষ্টি করেছি। নকল সরবরাহ ও বেঞ্চের ওপর নকল রেখে লেখার ছবি দিয়ে ঢাকার একটি দৈনিকের পেছন পাতায় বক্স আকারে লিড করা হয়েছিল। হেডিং ছিল, ‘দৌলতপুরে এসএসসিতে নকলের হিড়িক, প্রশাসন নীরব’। কুরিয়ার সার্ভিসে পাঠানো ওটা ছিল কোনো জাতীয় দৈনিকে বাই নেমে আমার প্রথম নিউজ। যা দেখে দারুণ পুলকিত হয়েছিলাম। পরে সংশ্লিষ্ট বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা পরীক্ষা কেন্দ্র পরিদর্শনে আসেন। আলাদাভাবে আসেন জেলা প্রশাসকও। কিন্তু তারা ফিরে যাওয়ার পর আবার সেই হযবরল অবস্থা দেখা দেয়।

তবে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই ২০০১ সালে চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করার পর শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী এহসানুল হক মিলন আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে নকল প্রবণতার লাগাম টেনে ধরতে সক্ষম হন। প্রতিমন্ত্রী অনেকটা আকস্মিকভাবে দেশের বিভিন্ন কেন্দ্রে নকল বিরোধী অভিযান চালাতেন। একদিন ইউএনও নজরুল ইসলামের কাছে খবর এলো, প্রতিমন্ত্রী এহসানুল হক মিলন মথুরাপুর কেন্দ্রে এসেছেন। আমি তখন ইউএনওর সাথে দৌলতপুর কেন্দ্রে ছিলাম। তিনি প্রতিমন্ত্রীর আসার কথা তাৎক্ষণিক না জানিয়ে কিছুটা মজা করেই বললেন, ‘চলেন মথুরাপুর কেন্দ্রে। আজ আপনার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ খবর আছে।’ চললাম ইউএনওর সাথে তার তখনকার সবুজ রঙের জিপ গাড়িতে মথুরাপুরের উদ্দেশে। কিন্তু বিধিবাম। সেখানে পৌঁছনোর কিছুক্ষণ আগেই মন্ত্রীর হেলিকপ্টার উড়াল দেয় অন্য কোনো কেন্দ্রে।

পরে ইউএনও নজরুল ইসলাম (বর্তমানে যুগ্ম সচিব) কেন্দ্র সচিবের কাছ থেকে মন্ত্রী কতক্ষণ অবস্থান করেছেন, কী বলেছেন, কজনকে বহিস্কার করেছেন ইত্যাদি বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছিলেন। আমিও নোটডাউন করছিলাম। ওইদিন পরীক্ষার শেষ পর্যন্ত ইউএনও সেখান থেকে আর নড়লেন না। ততক্ষণে আমি ওখানে একপাশে বসেই ‘প্রতিমন্ত্রী মিলনের আকস্মিক মথুরাপুর কেন্দ্র পরিদর্শন, তল্লাশি করলেন বাথরুমও’ শিরোনামে বিশদ একটি নিউজ রেডি করলাম। কিন্তু উপস্থিত কাউকে বুঝতে দিলাম না। পরের দিন দৈনিক আন্দোলনের বাজার পত্রিকায় গুরুত্ব দিয়ে সেটি প্রকাশিত হয়। নিউজটি দেখে ইউএনও নজরুল ইসলাম বেজায় খুশি হলেন। আমাকে বাহবা দিলেন। তবে কারো বাহবা পেতে কিংবা কাউকে তেল মারার জন্য নয়। কর্তব্যের জায়গা থেকেই গতানুগতিক ধারার বাইরে কিছুটা ভিন্ন আঙ্গিকে সেই নিউজটি করেছিলাম।

অত্যন্ত সাহসি উপজেলা প্রশাসনের শীর্ষ এই কর্মকর্তা প্রতিদিন রাত ১১টা থেকে সাড়ে ১১টা পর্যন্ত উপজেলা ক্যাম্পাসের বাইরে প্রধান সড়কে নিয়মিত হাঁটতে বেরোতেন। বাজারের পাশেই বাড়ি হওয়ায় আমাকে ডেকে নিতেন। দুর্গা পূজার সময় এশার নামাজ পড়ে বিভিন্ন পূজামন্ডপ পরিদর্শনে আমাকে সঙ্গে নিতেন। ব্যক্তিগত কাজ না থাকলে যেতাম। একদিন সবচে’ বড় পূজামন্ডপ আল্লারদর্গায় যাওয়ার সময় ওই বাজারের ঠিক মাঝখানে ইট হাতে একজন মদ্যপ ব্যক্তি আচমকা ইউএনওর গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ইট মারতে উদ্যোত হন। জিন্স প্যান্ট, টিশার্ট ও কেডস পরা দাপুটে ইউএনও নজরুল সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি থেকে নেমে ওই মদ্যপ ব্যক্তিকে চড় থাপ্পর মেরে থানায় নেয়ার জন্য পুলিশকে নির্দেশ দেন। সে সময় বাজার কমিটির লোকজনের বিশেষ অনুরোধে তাকে ছেড়ে দেন তিনি। ‘ইট হাতে ইউএনওর গাড়ির সামনে মদ্যপ ব্যক্তি’ শিরোনামে এটাও আমার কাছে একটি নিউজের আইটেম হলো। পরে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, ইউএনওর গাড়ি যাওয়ার কিছুক্ষণ আগে সেখানে একটি সড়ক দুর্ঘটনা হয়েছিল। এ কারণে ওই ব্যক্তি গাড়ি ভাঙতে উদ্যোত হয়েছিলেন।

ইউএনও নজরুল ইসলাম গুরুত্বপূর্ণ প্রোগ্রামগুলোতে আমন্ত্রণ করতেন। সরকারি বিজ্ঞাপন বণ্টনে সমতা বজায় রাখতেন। এছাড়া প্রতিপক্ষ হয়ে ব্যাডমিন্টন খেলতেন। তিনি আমাকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়ে খেলায় স্বাচ্ছন্দবোধ করতেন। হাসি আড্ডা ছাড়াও ভীষণ মজার একজন মানুষ তিনি এবং একই সাথে অন্যরকম ব্যক্তিত্ব সম্পন্নও বটে। তার সাথে খুবই আন্তরিকতাপূর্ণ সম্পর্ক ছিল আমার। এ কারণে বিভিন্ন বিষয়ে খোলামেলা আলাপ আলোচনা করতেন। সর্বোপরি তিনি আন্দোলনের বাজারে প্রকাশিত আমার নিউজ এবং পত্রিকাটির আধুনিকায়নের প্রশংসা করতেন। তিনি আগ্রহ দেখানোয় একদিন তাকে সম্পাদক মনজুর এহসান চৌধুরীর সাথে সাক্ষাৎ করিয়েছি। সেদিন মন্ত্রী পরিষদ সচিব আকবর আলি খানের মিটিং শেষ করে ফেরার পথে মজমপুরে পত্রিকা অফিসে গিয়ে ওই সাক্ষাৎ করেন তিনি।

বর্তমানে খুব সম্ভবত বরগুনার জেলা প্রশাসক আনোয়ার হোসেন। এক সময় দৌলতপুরের এসি ল্যা- ছিলেন। নকল প্রবণ পাবলিক পরীক্ষায় তিনি ছিলেন পরীক্ষার্থীদের কাছে মূর্তিমান আতঙ্ক। একবার এইচএসসি পরীক্ষায় আনোয়ার হোসেন শতাধিক পরীক্ষার্থীকে বহিস্কার করেন। সে সময় বিশ্বকাপ ক্রিকেট খেলা চলছিল। তো সেবার ক্রিকেটের ভাষায় নিউজের হেডিং দিলাম, ‘এসি ল্যান্ড আনোয়ারের সেঞ্চুরি!’ আর নিউজের ভেতরে ছিল কীভাবে কিসের সেঞ্চুরি তার বিস্তারিত বর্ণনা।

তখন আজকের মতো অবাধ তথ্য প্রবাহের প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতা ছিল না। ১৯৯৯ সালের ১৬ ফেব্র“য়ারি সন্ধ্যা। তখনকার ইউএনও জাহাঙ্গীর মোল্লার ছোট ভাই (নাম মনে পড়ছে না) খবর দিলেন, উপজেলার কালিদাসপুরে সন্ত্রাস বিরোধী সমাবেশে দুর্বৃত্তদের ব্রাসফায়ারে জাসদ সভাপতি কাজী আরেফ আহমেদসহ পাঁচ জাসদ নেতা নিহত হওয়ার। তাৎক্ষণিক ছুটে গেলাম থানায়। সেখান থেকে নিশ্চিত হলাম কাজী আরেফের মরদেহ দৌলতপুর হাসপাতালে। সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে গিয়ে দেখি বহু মানুষ সেখানে ভিড় করেছে। ভিড় ঠেলে গেটের ভেতরে ঢুকে এসআই লোকমান হোসেনকে কাজী আরেফের সুরতহাল রিপোর্টের প্রস্তুতি নিতে দেখে পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। এসআই লোকমান কাজী আরেফের হাত থেকে সিলভার কালার ডায়ালের হাত ঘড়িটি খুলে আমাকে ধরে রাখতে বললেন। ওনার মাথায় বাঁধা রক্তাক্ত গামছা খুললেন। মাথার এক পাশ থেকে বুলেট ঢুকে অপর পাশ দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ায় মাথার ঘিলু দেখা যাচ্ছিল। রক্তে পুরো শরীর ভিজে গিয়েছিল। পরে ওনার গায়ের পাঞ্জাবি খোলার সময়, নিউজ দিতে হবে তাই এসআই লোকমানের কাছে ঘড়িটি জমা দিয়ে বাইরে বেরোলাম।

সেখানে অপেক্ষমান কালিদাসপুরের ঘটনাস্থলের কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শীর কাছ থেকে যতদূর সম্ভব জানার চেষ্টা করলাম। জয়রামপুরের জাসদ নেতা খলিল মেম্বার ঘটনা প্রত্যক্ষতার কথা জানালেন। পরে পুনরায় থানা থেকে নিহতদের নাম পরিচয় নিয়ে টিএ্যান্ডটি অফিসে গেলাম। এই প্রথম এতবড় একটি হত্যাকান্ডের ঘটনা নিয়ে নিউজ করতে প্রচন্ড এক্সাইটেড ছিলাম। সেখানে বসে তাড়াহুড়ো করে কোনোমতে একটি নিউজ রেডি করে এনালগ টেলিফোনের মাধ্যমে সেদিন রাত ১০টায় ঢাকায় ওই হত্যাকান্ডের খবর দিয়েছি। পরের দিন ফ্যাক্সে ফলোআপ দেই।

পরে রাতেই আবার থানায় গিয়েছি আপডেট খবর ও মামলা প্রসঙ্গে জানতে। ততক্ষণে নিহত পাঁচজনের মরদেহ থানায় আনা হয় এবং ব্যাডমিন্টন কোটে ভ্যানের ওপর সারিবদ্ধভাবে মৃতদেহগুলো রাখা হয়। সে সময় ওসির কক্ষে গেলাম। ভেতরে ছিলেন খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি লুৎফুল কবির। ওসি ইছাহাক আলী উঠে এসে বললেন, ‘ডিআইজি স্যার আছেন। এখন কিছু বলা যাচ্ছে না। আমি মামলার বাদী হচ্ছি। কাল সাংবাদিকদের বিস্তারিত ব্রিফিং করা হবে।’ এরপর আর দেরি না করে উপজেলায় চলে আসলাম।

গভীর রাতে প্রেসক্লাবে এসে সিনিয়র সাংবাদিক শহিদুল ভাইয়ের সাথে দেখা। সে সময় তিনি বিবিসি প্রতিনিধিকে টেলিফোনে এই হত্যাকান্ডের খবর পরিবেশন করছিলেন। খবর দেয়া শেষ হলে শহিদুল ভাইয়ের সাথে এ নিয়ে দীর্ঘ সময় আলাপ করি। দেশজুড়ে আলোচিত এই হত্যাকান্ডের পর চরমপন্থি অধ্যুষিত এ অঞ্চলে কয়েকটি পুলিশ ক্যাম্প স্থাপনের উদ্যোগ নেয় সরকার। সেই মোতাবেক ঘটনাস্থল কালিদাসপুর ও শ্যামপুর পুলিশ ক্যাম্প উদ্বোধন করেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। ওই উদ্বোধন অনুষ্ঠানের নিউজ কভার করতে গিয়ে মন্ত্রী নাসিম ও পুলিশের আইজিপি এওয়াইবি সিদ্দিককে বহনকারী কপ্টারে ওঠার অভিজ্ঞতাও হয়েছিল। (শেষ পর্ব আগামীকাল)

লেখক : এস আর সেলিম, ভোরের কাগজ প্রতিনিধি

আরো খবর...