আর্থিক খাত নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে

॥ ড. আর এম দেবনাথ ॥

‘ব্যাংকের কার্যক্রমে মানুষের মনে অবিশ্বাস সৃষ্টি হয়েছে।’ এই কথাগুলো কার? স্বয়ং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের। জুলাই মাসের ১৫ তারিখে খবরের কাগজে এ সম্পর্কিত সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এমনিতেই মানুষ ব্যাংক ও ব্যাংকিং ব্যবস্থা সম্পর্কে নানা প্রশ্ন করছে, এর ওপর যদি গভর্নর বলেন, ‘অবিশ্বাসের’ কথা- তাহলে সমস্যাটা গভীরতর হয় না কি? হবে না কেন? অনেক দিন যাবৎ ব্যাংকগুলোর নানা কার্যক্রম নানা প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। এসব প্রশ্নের কোনো জবাব পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ দেশের প্রায় ৬০টি ব্যাংকে জনগণের হাজার হাজার কোটি টাকা আমানত হিসাবে গচ্ছিত আছে।

হাজার হাজার বলছি কী, এক হিসাবে দেখা যাচ্ছে- দেশের ব্যাংকগুলোতে কমপক্ষে ১০ লাখ কোটি টাকার আমানত (ডিপোজিট) গচ্ছিত আছে। এর মধ্যে সরকারের আমানত হবে বড়জোর ১৫-২০ শতাংশ। বাকি আমানতের টাকা জনসাধারণের। এ সব টাকা কোটি কোটি আমানতকারী ব্যাংকে রেখেছে। এই টাকা ৪৬-৪৭ বছরে সঞ্চিত টাকা। অর্থাৎ স্বাধীনতার পরবর্তীকালে মানুষের সঞ্চয়ের টাকা। তিলে তিলে জমা করা টাকা। এই টাকার ওপর ভিত্তি করেই ব্যাংকগুলো ঋণগ্রহীতাদের ঋণ দিয়েছে।

এখন প্রশ্ন উঠছে- এ সব টাকার নিরাপত্তা কী? মানুষ তাদের টাকা ‘চাহিবামাত্র’ (অন ডিমান্ড) পাবে কী না? চাহিবা মাত্রই পাওয়ার কথা। এটাই নিয়ম-বিধান। ‘ডিপোজিটের’ সংজ্ঞাও তাই। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিয়ম মেনে আমানতের টাকা ফেরত চাইলে সেই টাকা ব্যাংক ফেরত দিতে বাধ্য। এর ব্যতিক্রম ঘটলেই বিপদ। প্রশ্ন হল, ব্যাংকে যে সব অনিয়ম হচ্ছে, যেভাবে বিভিন্ন ব্যাংকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাব দেখা দিয়েছে, তাতে কি আমানতকারীদের টাকা নিরাপদ আছে? বলা দরকার, আমানতের নিরাপত্তা বিধান করার আইনি দায়িত্ব কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। এই উদ্দেশ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নানা বিধিবিধান তৈরি করে রেখেছে।

এখন গভর্নর সাহেব ওই সব বিধিবিধানের কথা না বলে যদি নিজেই বলেন, ব্যাংকের ওপর মানুষের অবিশ্বাস সৃষ্টি হয়েছে, তাহলে মানুষ যাবে কোথায়? তাহলে তো অবিশ্বাস গভীরতর হবে এবং পুরো ব্যাংকিং খাত পড়বে গভীর খাদে। তাই নয় কি? অথচ পরিস্থিতিটা তো এমন উদ্বেগজনক নয়। সংকট আছে, সমস্যা আছে। মূল সমস্যা শ্রেণীবিন্যাসিত ঋণ (ক্লাসিফাইড লোন) নিয়ে। এটা খারাপ ঋণ। এ সব টাকা কিছু ‘দুষ্টু’ গ্রাহক মেরে দিতে চাইছে। এই টাকার পরিমাণ কত? কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে দেখা যাচ্ছে, মোট ঋণের ১০-১২ শতাংশ হচ্ছে খারাপ ঋণ। আমি তর্কের খাতিরে ধরে নিই এর পরিমাণ ২০ শতাংশ। তাহলেও ৮০ শতাংশ ঋণের টাকা ‘ভালো’ আছে। তবে ২০ শতাংশ টাকা অনেক টাকা। এটা হওয়া অনুচিত ছিল। এটা হওয়াতেই আমানতকারীদের টাকা ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

তবে এরই মধ্যে আমানতকারীদের টাকার নিরাপত্তার জন্য অনেক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এক লাখ টাকা পর্যন্ত আমানতের জন্য আমানত বীমা (ডিপোজিট ইন্স্যুরেন্স) আছে। ব্যাংকের পুঁজি আছে আমানতের ১০ শতাংশ। খারাপ ঋণের বিপরীতে অর্থাৎ ‘ব্যাড অ্যান্ড লস’ভুক্ত ঋণের বিপরীতে শতভাগ ‘প্রভিশন’ করা আছে। এই শ্রেণীভূক্ত ঋণের প্রতিটির বিপরীতে কোর্টে মামলা আছে। সর্বোপরি রয়েছে ব্যাংকের ভালো ঋণ। এ সবই আমানতকারীদের স্বার্থে কাজে লাগানোর জন্যই।

এর পরও কথা আছে। ‘লেন্ডার অব দ্য লাস্ট রিসট’ বলে একটা ব্যবস্থা আছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি ব্যাংককে বাঁচানোর জন্য এটা করে থাকে। ১০-১৫ বছর আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (ওবামা প্রশাসন) ডুবন্ত ব্যাংকগুলোকে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার দিয়ে বাঁচিয়ে দিয়েছিল। আমাদের দেশেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক নানা ব্যবস্থায় ডুবন্ত অনেক ব্যাংককে বাঁচিয়েছে। ইস্টার্ন ব্যাংক, এনসিসিবিএল, কমার্স ব্যাংক, আইসিবি ইসলামী ব্যাংক, বিডিবিএল ইত্যাদি এর উদাহরণ। এর ফলে আমানতকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। কিছুটা সময় হয়তো লেগেছে, কিন্তু সবাই তাদের টাকা ফেরত পেয়েছে।

‘ফারমার্স ব্যাংকের’ ক্ষেত্রেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক তা-ই করেছে। সরকারি ব্যাংকগুলো আমানতকারীদের স্বার্থে এর মালিকানায় ঢুকেছে। আমানতকারীদের ‘ডিপোজিট’ রক্ষার্থেই এই ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থা প্রায় সব দেশেই গৃহীত হয়। এটা নতুন কিছু নয়। সঞ্চয় রক্ষা করা সব সরকারের দায়িত্ব। সঞ্চয় ছাড়া ব্যাংক হবে না, ব্যাংক ছাড়া অর্থনৈতিক উন্নয়ন হবে না। এ কারণেই সরকার ব্যাংকিং ব্যবস্থার ধস চাইতে পারে না। একশ্রেণীর মিডিয়ায় নানা ধরনের মুখরোচক খবর ছাপা হতে পারে তাতে কিছু আসে যায় না। আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা করতেই হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। উল্লেখ্য, এ পর্যন্ত কোনো ব্যাংক টাকা তুলতে গিয়ে কেউ টাকা পায়নি এমন উদাহরণ নেই। অতএব, আমানতকারীরা ঝুঁকিতে এই বলে আতঙ্ক তৈরি করা উচিত নয়।

আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা করার নানা ব্যবস্থার কথা এতক্ষণ বললাম। এর কারণও আছে। কারণ, আর যাই হোক কিছুসংখ্যক খারাপ ঋণগ্রহীতার শাস্তিযোগ্য অপরাধের জন্য কোটি কোটি আমানতকারীকে শাস্তি দেয়া যায় না। তবে আরও কথা আছে। বর্তমান সংকট মোকাবেলা যেমন গুরুত্বপূর্ণ কাজ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে আগামীদিনের কিছু কাজ। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, অর্থায়নের বোঝা ব্যাংকের ওপর থেকে কমানো দরকার।

দেশের শিল্পায়ন, ব্যবসা উন্নয়ন, কৃষি উন্নয়ন থেকে শুরু করে সব উন্নয়নমূলক কাজে যে ‘ফাইন্যান্স’ লাগে তার পুরোটার জন্য এখন সবাই যাচ্ছে ব্যাংকের কাছে। এই ‘ব্যাংক লেড গ্রোথ’ থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসা দরকার। বড় সহজ হয়ে গেছে ব্যাংকের লোন। যে কোনো ব্যক্তি বিশেষ করে প্রভাবশালী ব্যক্তি অর্থের দরকার হলেই চলে যায় ব্যাংকের কাছে। এর বিকল্প হিসেবে পুঁজিবাজারকে গড়ে তোলার কথা হচ্ছে অনেকদিন থেকেই। কিন্তু সেটা হচ্ছে না। দেশে অনেক প্রাইভেট কোম্পানি আছে যারা হাজার হাজার কোটি টাকার ব্যবসা করছে। তারা ব্যাংক ফিন্যান্সের ওপর নির্ভরশীল। এটা বন্ধ হওয়া দরকার। তাদের শেয়ারবাজারে যাওয়া উচিত। এতে তাদের সুদ খরচ কমবে। ব্যাংকের বোঝা লাঘব হবে, তাদের শ্রেণীবিন্যাসিত ঋণের বোঝা কমবে। আমানতকারীদের ঝুঁকিও হ্রাস পাবে।

দ্বিতীয়ত দেশে বড় বড় যে সব প্রাইভেট কোম্পানি ব্যবসা করছে, তাদের জনগণের কাছ থেকে সরাসরি ঋণ নেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। ঋণপত্র (ডিবেঞ্চার) আছে, বন্ড আছে। এ সব ব্যবস্থায় কোম্পানিগুলো সরাসরি মানুষের কাছ থেকে ধার নিতে পারে। নির্দিষ্ট হারে সুদ দিতে পারে। প্রতিষ্ঠিত অনেক কোম্পানি আছে জনগণ যাদের ঋণ দিতে ভয় পাবে না। এই কাজটা করা গেলে ব্যাংকের ওপর বোঝা লাঘব হবে। কোম্পানিগুলোও সতর্ক হবে। ভালোভাবে কাজ করতে উৎসাহিত হবে। এটি করার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘লার্জ লোনের’ সংজ্ঞা পরিবর্তন করতে পারে। ‘লার্জ লোনের’ সংজ্ঞার ফাঁক-ফোকর দিয়ে বড় বড় কোম্পানি মাত্রাতিরিক্ত ঋণ নিয়ে বসে আছে। অনেকেই এখন ‘ওভার বরোড কোম্পানি’। অনেকেই সহজে ব্যাংক ঋণ পেয়ে নানাদিকে ব্যবসা সম্প্রসারিত করেছে। এখন এই ‘সম্প্রসারণ’ অনেকের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আরেক সমস্যা হচ্ছে তাদের জমি নিয়ে। অনেকেই অহেতুক বাজার চাহিদা না বোঝে মাত্রাতিরিক্ত জমি কিনেছে। এ সবের বাজার নেই। টাকা আটকা পড়েছে। ব্যাংকারদের উচিত তাদের সঙ্গে বসে এই সমস্যার সমাধান করা। আরেকটা ব্যবস্থার কথা এখনই ভাবতে হবে। শুধু ভাবলেই চলবে না- আইনি কাঠামো তৈরি করা শুরু করতে হবে। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে অনেক ‘পাজি ব্যাংক’ টিকবে না। এগুলো চিহ্নিত করা দরকার। ‘মার্জার’, ‘এমালগেমেশন’, ‘টেকওভার’ ইত্যাদি বিষয়ক আইন তৈরি করা দরকার। মাথায় রাখতে হবে আমানতকারীদের স্বার্থ, তাদের টাকার নিরাপত্তা। যে সব ব্যাংকের অবস্থা ভালো নয়, যাদের আমানতকারীরা ঝুঁকিতে পড়তে পারে, তাদের হিসাব কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে আছে। এদের উৎসাহিত করা দরকার ‘একীভূত’ হতে।

ব্যাংকগুলো দেখা যাচ্ছে ধীরে ধীরে শিল্পঋণে ঢুকে পড়ছে। দীর্ঘমেয়াদি ঋণে ঢুকে পড়ছে। ট্রাস্ট রিসিটের (টিআর লোন) লোন দীর্ঘমেয়াদি ঋণে পরিণত হচ্ছে। এ সব খুবই খারাপ প্রবণতা। শিল্প ঋণের অভিজ্ঞতা আমাদের খুবই খারাপ। শিল্প ব্যাংক ও বিএসআরএস টিকেনি। শ্রেণীবিন্যাসিত ঋণের ভারে দুটোই ডুবেছে। এখন এদের নাম ‘বিডিবিএল’। আমি মনে করি, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ থেকে বিরত রাখা দরকার। এটা এখন থেকেই করা যায়। ব্যবসায়ী, নতুন উদ্যোক্তা ইত্যাদি শ্রেণীর লোক বুঝুক, ব্যাংকে গেলেই টাকা পাওয়া যাবে না। সরকারের উচিত শিল্পঋণের বিকল্প ব্যবস্থা করা। স্বল্পমেয়াদি আমানতকারীদের টাকায় দীর্ঘমেয়াদি ফিন্যান্সিং উচিত নয়। যা হওয়ার হয়েছে। যারা খুবই বড় তারা দেখা যাচ্ছে বিদেশ থেকে ঋণ করছে। করুক। একটা সীমার মধ্যে করুক। শেষ কথা হচ্ছে, পুরো আর্থিক খাত নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। কার্পেটের নিচে ধুলা আর ধুলা। এসব সাফ করতেই হবে- আজ না হোক কাল। সবশেষে একটা কথা। আমানতকারীদের টাকা যে নিরাপদ, তা বিজ্ঞাপন দিয়ে সরকারের ঘন ঘন বলা উচিত।

লেখক ঃ অর্থনীতি বিশ্লেষক, সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরো খবর...