আধুনিক পদ্ধতিতে পান চাষে আয় চারগুন পর্যন্ত বাড়তে পারে

কৃষি প্রতিবেদক ॥ এককালে বরিশাল অঞ্চলে প্রধানত ধানের আবাদ হতো। কালের পরিক্রমায় এখন বরিশালেও পৌছে গেছে পান চাষ। পান এখন সারা দেশেই হয়। জাত ভেদে খাসিয়া, রাজশাই, মহেশখালীর পানের সুনাম রয়েছে। এছাড়া প্রাচীনকাল থেকে এ অঞ্চলে আবাদ হচ্ছে ভারতীয় বাংলা পান প্রজাতির ভবানী ও ভাবনা। বেনারসী, রাজনগর, গাছপান ইত্যাদি জাতেরও চাষাবাদ চালু আছে।
বর্তমানে কৃষি গবেষণা ইনষ্টিটিউট উদ্ভাবিত বরিশাল-১, বরিশাল-২ ও বরিশাল-৩ জাতের পানের ফলন ও গুণমান ভালো। তবে বিগত কয়েকবছর থেকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পান চাষ পড়েছে ঝুঁকির মধ্যে। বিশেষ করে পান গাছের গোড়া পঁচা ও পাতার দাগ রোগ, পাতায় মাছি পোকার আক্রমণ তো রয়েছেই এর ওপর পুষ্টি ঘাটতি, সেচ ব্যয়, ও কিটনাশক প্রয়োগের কারণে রপ্তানি সমস্যা পান চাষকে অবক্ষয়ের মধ্যে ফেলছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য উপযুক্ত সরকারি পদক্ষেপ না নিলে পানেও ধান-পাটের অবস্থা সৃষ্টি হবে। দানা খাদ্য ও অর্থকরি ফসলের চাষ এখন তথ্য সন্ত্রাসের কবলে পড়েছে। এসব ফসল চাষে কৃষকের অব্যাহত উৎসাহ-হীনতার ব্যাপারে যথার্থ ব্যাবস্থা নেয়া হচ্ছে না। পানের ব্যাপারেও উপযুক্ত ব্যবস্থা না নিয়ে উৎপাদন বাড়ানোর নামে, তথ্য-রহস্য সৃষ্টি করলে পানের উৎপাদন আসলেই কমে যাবে। এভাবেই কমে গেছে। বর্তমানে ঢাকায় পানের মূল্য ২-৩ টাকা থেকে ৫-১০ টাকা কোন কোন ক্ষেত্রে ৫০ টাকা পর্যন্ত, কিন্তু কৃষক বিক্রি করে আট আনারও কম দামে। ভারত পান উৎপাদনে ধাপে ধাপে আধূনিকায়ন করে অনেক দুর এগিয়ে গেছে। তারা পান রপ্তানি করে যুক্তরাষ্ট্রে। ৫টি পানের একটি প্যাকেটের মুল্য প্রায় ২ ডলার বা ১৭০ টাকা। আমরাও এখানে সেসব আধুনিক প্রযুক্তি অবলম্বন করে এগিয়ে যেতে পারি। যা অর্থকরি কৃষি উৎপাদন হিসেবে গণ্য হতে পারে কৃষকের কাছে। আধুনিক পদ্ধতিতে পান চাষের একটি অন্যতম প্রযুক্তি হল শেডনেট পদ্ধতিতে পান চাষ। এতে পান চাষের আয় চারগুন পর্যন্ত বাড়তে পারে। ভারতীয় কেন্দ্রিয় সরকারের জাতীয় উদ্যান ‘পান মিশন প্রকল্প’ সেচ্ছাসেবি জাতীয় সংগঠনের তত্বাবধানে শেডনেট পদ্ধতির চাষে সারাবছর শতকরা ৫০ ভাগ ভর্তুকি দেয়। একটি শেডনেট স্থাপনে স্ক্রিংকলার সেচ ব্যবস্থাসহ প্রায় ১৫ লক্ষ টাকা ব্যয় হয়। ১ হাজার বর্গমিটার বা ১৫ কাঠা জায়গার জন্য। এতে স্থাপনার জীবনকাল হিসাব করে বার্ষিক অপচয় আসে ৭৫ হাজার টাকা মত। আর পান চাষে খরচ হয় প্রায় দেড় লক্ষ টাকা। ১৫ কাঠা জমিতে চারা রোপন করা যায় প্রায় ৮ হাজার। প্রতি গাছ থেকে পাতা তোলা যায় ১১৫টি পর্যন্ত। এভাবে সাড়ে আট লক্ষ পর্যন্ত পাতা বিক্রি করা যায় অন্তত সাড়ে তিন লক্ষ টাকায়। তাতে লাভ আসে বার্ষিক প্রায় ২ লক্ষ টাকা। অথচ প্রথাগত বর্তমান পদ্ধতিতে একই পরিমাণ জমিতে নীট লাভ আসে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা। এই আধুনিক পদ্ধতিটি নিয়ে কয়েকটি জায়গায় প্রর্দশনী করে তার ফলাফল অনুসারে পান চাষীদের উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া যায়। শেডনেট হল সিন্থেটিক হাল ও খুঁটি, যা ঝড় ঝঞ্ঝায় ক্ষতিগ্রস্থ হয়না। শেডনেটের সাথে সেচের যে স্ক্রিংকলার থাকে তার সাহায্যে সেচ দিয়ে প্রচলিত পদ্ধতির চেয়ে ৬৫ ভাগ পর্যন্ত পানি সাশ্রয় হয়। এই পদ্ধতিতে পানের পরির্চযা কাজে প্রতি বিঘায় ২-৩ জন লোকের (মহিলাসহ) লাভজনক কর্মসংস্থান হয়। শেডে সার্বক্ষণিক জাল থাকার কারণে পোকার আক্রমণ বিশেষ করে পাতা মাছির আক্রমণ নিয়ন্ত্রিত হয়। শেডনেটের নিচে কাঠামোর ভিতরে বীজতলা সহজেই শোধন করা যায় বলে গোড়াপচা ও পাতার দাগ রোগ কম হয়। এর মধ্য দিয়ে কিটনাশকের ব্যবহার অনেকটা কমে যায়। আর সেরা অনুশীলন হিসেবে নিম খৈল ও নিম তেল এবং বিশেষ প্রয়োজনে ঘেটু পাতার নির্যাস ও স্কিনোসাড জাতীয় দ্রব্য ব্যবহার করলে তা অর্গানিক পর্যায়ে পড়ে বলে সে পান রপ্তানির উপযোগী হয়। পান চাষে আধুনিক শেডনেট পদ্ধতি ব্যবহারের জন্য সর্বনিম্ন ইউনিট হতে পারে ৮০০ বর্গমিটার। এতে প্রতি বর্গমিটারে এক হাজার টাকা ব্যয় আসলে প্রতিবেশি দেশ ভারত সরকারিভাবে আমাদের টাকায় ৫০০ টাকা ভর্তুকি দেয়। বিনিময়ে দেশ পায় অতিরিক্তি হাজার টাকার অধিক উৎপাদন। এছাড়া পরিবেশ রক্ষা ও কর্মসংস্থানও রয়েছে। তাই মনে হয় আমাদের বর্তমান অবস্থায় আধুনিক পদ্ধতি অবলম্বন করে পান চাষ করার সময় এসেছে। নয়ত পান চাষীরা পান চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারে। এসব জমি চলে যেতে পারে তামাক চাষ বা ইট ভাটায়। তাই চাষ কৌশলে আধুনিক চিন্তার কোন বিকল্প নেই। এদেশের একটি বেসরকারি সেচ্ছাসেবি সংস্থাই পান চাষে কৃষক বান্ধব প্রকল্পের সূচনা করতে পারে। এ ব্যাপারে স্থানীয় প্রযুক্তি সহায়তা দেশেই পাওয়া যেতে পারে।

আরো খবর...