আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টিতে নতুন আশার নাম ‘ব্ল্যাক বেঙ্গল’

কৃষি প্রতিবেদক ॥ ‘ব্ল্যাক বেঙ্গল’ ছাগল বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টিতে নতুন আশার নাম। এই ছাগল দেখতে কালো এবং বেশ বড়সড় হওয়ায় অনেকে একে ‘বাংলার কালো বাঘ’ বলে থাকেন। ব্ল্যাক বেঙ্গল গোট বা বাংলার কালো ছাগল। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ছাগলের উন্নত জাতগুলোর মধ্যে ব্ল্যাক বেঙ্গল, বারবারি, বিটাল, বোয়ের, যমুনা পাড়ি, কিকু, স্প্যানিশ, সাহেলিয়ান ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। ধারণা করা হয়, বিশ্বের হাতে গোনা যে চার-পাঁচটি ছাগলের জাতের এখনো সংকরায়ন হয়নি তার মধ্যে ব্ল্যাক বেঙ্গল অন্যতম। নিজস্ব বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন এ জাতটি টিকিয়ে রেখেছে গ্রাম-বাংলার সাধারণ মানুষ। আশার খবর হলো- বাংলাদেশের এ জাতের ছাগলের জিনগত বৈশিষ্ট্য এবং ডিএনএ পরীক্ষা নিয়ে প্রায় ১০ বছর গবেষণা করেছে। ২০০৭ সালে প্রায় ১০ বছর গবেষণার পর জাতিসংঘের আণবিক শক্তিবিষয়ক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটমিক অ্যানার্জি এজেন্সি (আইএইএ) এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) বিশ্বের ১০০টি জাতের ছাগলের ওপরে তাদের প্রতিবেদনে ব্ল্যাক বেঙ্গলকে অন্যতম  সেরা জাত হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছে। ছাগল উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ এবং মাংস উৎপাদনে বিশ্বে পঞ্চম বাংলাদেশে খবরটি যে কাউকে আশাবাদী করবে। বিশ্ববাজারে ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের চামড়া কুষ্টিয়া গ্রেড হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে এটিও একটি আশাজাগানিয়া খবর। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, দেশে কমবেশি আড়াই কোটি ছাগল আছে, যার ৯৫ শতাংশই ব্ল্যাক বেঙ্গল। দেশের প্রায় এক কোটি লোক ছাগল পালনের সঙ্গে যুক্ত যা একক কোনো প্রাণী পালনের রেকর্ড। বলা হয়ে থাকে ছাগলের দুধ হলো অনেক রোগের মহৌষধ।

বিশ্বসেরা বাংলাদেশের ব্ল্যাক বেঙ্গল ঃ বাংলাদেশের নিজস্ব জাতের ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল বিশ্বসেরা। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষিবিষয়ক সংস্থা এফএও এবং আন্তর্জাতিক আণবিক গবেষণা কেন্দ্রের (আইএইএ) সর্বশেষ মূল্যায়ন অনুযায়ী, ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল বিশ্বের অন্যতম সেরা জাত। বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রাণিবিদ্যা বিষয়ক স্বীকৃত জার্নালগুলোতে ব্ল্যাক বেঙ্গল নিয়ে শতাধিক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। ২০০৪ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত এই গবেষণার মাঝ পর্যায়ে ২০০৭ সালের ২০ মার্চ জাতিসংঘের সংবাদ সংস্থা ইউএন নিউজে ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘বাংলাদেশ বিশ্বের দরিদ্র দেশ হলেও এখানেই বিশ্বের অন্যতম সেরা প্রাণিসম্পদ ‘ব্ল্যাক বেঙ্গল’ ছাগলের বসতি।’

‘ব্ল্যাক বেঙ্গল’ পালনে দিনবদল ঃ ছাগল পালন বাংলাদেশের দারিদ্র্য জনগোষ্ঠীর আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। দেশের প্রায় সব জেলাতেই কমবেশি ছাগল পালিত হয়। তবে চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া ও মেহেরপুর  জেলায় ব্ল্যাক বেঙ্গল পালনের সাফল্যে উজ্জীবিত হচ্ছেন আশপাশের অন্যান্য এলাকার জনগণ। চুয়াডাঙ্গা সদর থেকে প্রধান সড়ক ধরে আলমডাঙ্গা উপজেলার দিকে অগ্রসর হতেই প্রায় সব বাড়ির উঠানেই চোখে পড়বে ছাগলের ছোটাছুটি। অনেক বাড়িতে আলাদা ঘর করে মাচায় ছাগল পালতেও  দেখা যায়। ব্ল্যাক বেঙ্গল গ্রামাঞ্চলে বিশেষ করে নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থা থেকে প্রশিক্ষণ ও ঋণ দিয়ে গ্রামীণ যুবসমাজকে এ জাতের ছাগল প্রতিপালনের জন্য উৎসাহিত করা হচ্ছে। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান ও অন্যতম আয়বর্ধনমূলক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে গ্রামীণ অর্থনীতিতে ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল পালন সহায়ক ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে। ব্যবসার জন্য ছাগল পুষতে হলে ব্ল্যাক বেঙ্গল সবচেয়ে লাভজনক। এই জাতের ছাগলের মাংসের চাহিদা দেশে ও বিদেশে ব্যাপক। উন্নত পদ্ধতিতে ব্ল্যাক বেঙ্গল পালন করে অনেক খামারি লাভের মুখ দেখেছেন। পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) সহায়তায় ২০০৮ সালে মাচায় ছাগল পালনের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন এবং ছাগলের মৃত্যুহার কমানোর জন্য ‘লিফট’ নামে একটি প্রকল্পের মাধ্যমে বেসরকারি সংস্থা ওয়েব ফাউন্ডেশন সফলতা  পেয়েছে। ‘ব্ল্যাক বেঙ্গল’ পালনের উল্লেখযোগ্য সুবিধাগুলো হচ্ছে- খাবার তুলনামূলকভাবে কম লাগে, পালনের জন্য অল্প জায়গা হলেই চলে, মূলধনও সামর্থ্যরে মধ্যে থাকে, রোগবালাই তুলনামূলক কম। এটি পালন করতে বড় চারণভূমি লাগে না। বাড়ির উঠান বা রান্নাঘরের পাশের ছোট্ট স্থানেও পালন করা যায়। বছরে দুইবার দুয়ের অধিক সংখ্যক বাচ্চা পাওয়া যায়। সঠিক পরিচর্যা, চিকিৎসা ও লালন-পালনে প্রশিক্ষিত হলে কোনো খামারিই ব্ল্যাক বেঙ্গল খামার করে লোকসানের কবলে পড়বেন না। ব্ল্যাক বেঙ্গল থেকে পাওয়া যায় উন্নত মানের চামড়া, যা পৃথিবীর যে কোনো জাতের ছাগলের চামড়া থেকে গুণগত মানসম্পন্ন। খাসির মাংস খেতে খুবই সুস্বাদু। ছাগলের  লোম  থেকে তৈরি হয় উন্নতমানের পশম। ব্ল্যাক বেঙ্গল জাতের এ ছাগল খুবই রোগ প্রতিরোধী এবং সহজে রোগবালাই হয় না, আর হলেও এর চিকিৎসা ব্যবস্থা অত্যন্ত সহজ। তাই এখন আর শুধু চুয়াডাঙ্গা নয় কুষ্টিয়া, যশোর ইত্যাদি জায়গায় নয় বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতি গ্রামে মানুষ ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের খামার গড়ে তুলেছেন। উটকে যেমন বলা হয়ে থাকে মরুভূমির জাহাজ তেমনি ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলকে বলা হয়ে থাকে ‘গরিবের গাভী।’

ভূমিকা রাখবে অর্থনীতিতে ঃ বাংলাদেশকে বলা হয়ে থাকে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম ছাগল পালনকারী দেশ। প্রতিবছর এ জাতীয় ছাগল থেকে প্রায় সোয়া লাখ মেট্রিক টন মাংসের সরবরাহ পেয়ে থাকে। যা মোট মাংসের প্রায় ২৫ শতাংশ। এই প্রজাতির ছাগল যেমন দ্রুত বংশ বৃদ্ধি করে তেমনি দ্রুত বড় হয়। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানিমাল ব্রিডিং অ্যান্ড জেনেটিকস বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ শাখাওয়াত হোসেন ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল নিয়ে ২০ বছর ধরে গবেষণা করছেন। তার মতে, ‘তুলনা করে দেখা গেছে, অন্যান্য জাতের ছাগলের চেয়ে এর মাংসের স্বাদ ভালো। এ কারণে বিশ্ববাজারে এর চাহিদা বেশি। এর চামড়া এত উন্নতমানের যে বিশ্বের বড় কোম্পানিগুলোর চামড়াজাত পণ্য তৈরিতে ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের চামড়া ব্যবহৃত হয়। ‘ব্ল্যাক বেঙ্গল’ অর্থনৈতিক গুরুত্ব অনেক বেশি। শুধু বাংলাদেশ নয় অনেক দেশেই ব্ল্যাক বেঙ্গল জাতের ছাগলের খামার অনেক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। অন্যান্য  দেশের মানুষ যেমন- ভারত, ইরান, সৌদি আরবের অনেক কৃষক জমি চাষ করার পাশাপাশি ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের খামার করে অর্থনৈতিকভাবে যথেষ্ট সফলতা পেয়েছেন। জানা গেছে, উন্নত দেশের খামারিরা প্রায় আড়াই হাজার ব্ল্যাক বেঙ্গলের একটি খামার থেকে মাসে কম হলেও ১০ থেকে ১২ হাজার ডলার আয় করতে পারেন। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় সাত-সাড়ে সাত লাখ টাকা। আফ্রিকার মাসাই ছাগল, ভারতের যমুনাপাড়ি ছাগল এবং চীনা জাতের ছাগলের মাংস ও দুধের পরিমাণ ‘ব্ল্যাক বেঙ্গল’র চেয়ে ৪০  থেকে ৬০ শতাংশ বেশি। তবে ওই তিন জাতের ছাগলের ২০ থেকে ৩৫ শতাংশ বাচ্চা জন্মের পরই মারা যায়। অন্যদিকে ব্ল্যাক বেঙ্গলের বাচ্চার মৃত্যুর হার ৫ থেকে ১০ শতাংশ আর বংশবৃদ্ধির হার অনেক বেশি। তাই বিজ্ঞানীরা সামগ্রিক উৎপাদনশীলতার বিচারে এটিকে সেরা জাত হিসেবে নির্বাচন করেছেন।  কোনো একটি খামারে কাজ শুরু থেকে তৃতীয় বছরেই ছাগল বিক্রিযোগ্য হয়। এসব কারণে ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল পালন রীতিমতো একটি শিল্পে পরিণত হয়েছে।

খামারি, সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও গবেষকদের মতে- বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান যদি সঠিক  সেবাপ্রদানের সুযোগ যেমন- ঋণ সুবিধা, সহজশর্তে অবকাঠামো উন্নয়ন সহায়তা, যথাযথ প্রশিক্ষণ, বাজার সুবিধা সৃষ্টি ইত্যাদিতে এগিয়ে আসে তবে কোনো খামারি লোকসানের কবলে পড়বেন না। ব্ল্যাক বেঙ্গল পালনে সরকার যদি যথাযথ মনোযোগ ও গুরুত্ব দেয় তবে দেশের সব  জেলার প্রতিটি গ্রামের মানুষ অতি লাভজনকের খামার গড়ে তুলতে আরও উৎসাহী হবে। ফলে খাদ্য ও আমিষের পুষ্টি ঘাটতি পূরণ হবে। এভাবে ‘ব্ল্যাক বেঙ্গল’ পালন খুলে দিতে পারে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার।

 

 

আরো খবর...