অসাধু খামারির কারণে পোল্ট্রি শিল্প হুমকিতে

কৃষি প্রতিবেদক ॥ প্লাস্টিকের ডিম বলে কিছু নেই, এসব অপপ্রচার বলে অভিহিত করে প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের মহাপরিচালক ডাঃ হীরন রঞ্জন  ভৌমিক বলেছেন, যেখানে আমরা ৬/৭ টাকায় পোল্ট্রি মুরগির ডিম পাচ্ছি,  সেখানে এর  চেয়ে কম দামে কখনই প্লাস্টিকের ডিম তৈরি করা সম্ভব না। এছাড়াও প্লাস্টিকের ডিম ১০০ সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় সিদ্ধ করাও সম্ভব নয়। আমিষের চাহিদা মেটাতে ডিমের কোন বিকল্প নেই, কম দামে একমাত্র আমিষের চাহিদা মেটাতে ডিমের কোন বিকল্প নেই বলে জানিয়েছেন মহাপরিচালক। সোমবার রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে পোল্ট্রি ফর হেলথি লিভিং শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় ডাঃ হীরন রঞ্জন ভৌমিক বলেছেন,  পোল্ট্রি শিল্পের মাধ্যমে এই দেশে ব্যাপক কর্মসংস্থানের পাশাপাশি আমিষের চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এই শিল্প ৩৫ হাজার কোটি টাকার দাফতরিক হিসাব হলেও গ্রামের নারীদের শ্রমের মূল্য যোগ করে এই শিল্পের অর্থ আরও অনেক বেশি। পোল্ট্রি মাংস এবং ডিম শরীরের জন্য অনেক উপকারী। অন্য মাংস খাওয়ার ফলে শরীরে যে পরিমাণ চর্বি জমে মুরগি মাংস খাওয়ার জন্য সে ধরনের কোন প্রকার চর্বি জন্মে না। তাই ডাক্তারা লাল মাংসের চেয়ে সাদা মাংস খেতে বলে সর্বদা। পোল্ট্রির মাংস এবং ডিমের সমস্যা সম্পর্কে মহাপরিচালক বলেছেন, কিছু অসাধু পোল্ট্রি খামারির জন্য এই শিল্প হুমকির মুখে পড়ছে। তারা মুরগি খাদ্য ট্যানারির বর্জ্য ব্যবহার করে। সরকার এই বিষয়ে সর্বদা সজাগ থাকার কারণে খামারিদের মুরগির খাদ্যে ট্যানারির বর্জ্য ব্যবহার হ্রাস পেয়েছে। প্রশাসন এসব বিষয়ে সর্বদা নজর রাখছেন। এসব ক্ষেত্রে সরকার কোন প্রকার ছাড় দিবে না বলে জানিয়েছেন তিনি। মুরগিতে এ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার সম্পর্কে ডাঃ ভৌমিক বলেছেন, হাতুড়েভাবে খামারিরা মুরগিতে এ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করে, এর ফলে খামারিরাও যেমন আর্থিকভাবে ক্ষতি হয় তেমন ভোক্তাদের বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা হয়ে থাকে। এ জন্য এই ব্যবহার সঠিক প্রয়োগে হতে হবে। সঠিক এ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করলে খামারিরাও আর্থিকভাবে অনেক লাভবান হবে। অযথা ড্রাগস মুরগিতে ব্যবহার এক প্রকার অপরাধ। তাই খামারিদের সচেতন করতে এই দেশের গ্রামে-গঞ্জে ব্যাপকহারে সরকার প্রচার করবে। এই সরকার পোল্ট্রি শিল্পকে নিরাপদ করতে সব সময় কাজ করে যাচ্ছে। আশির দশকে এই দেশে পোল্ট্রি শিল্পের বিস্তার ঘটে। তখন এই শিল্পে বিনিয়োগ ছিল ১৫শ’ কোটি টাকা। আর তিন যুগ পরে বর্তমানে এই শিল্পে বিনিয়োগ ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এছাড়াও এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত ৬০ লাখ মানুষ। জাতীয় অর্থনীতিতে পোল্ট্রি শিল্পের অবদান ১ দশমিক ৬ শতাংশ। এই শিল্পে শতকরা ৪০ ভাগ নারী রয়েছে। ২০২১ সালে এই শিল্পের জন্য ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। বর্তমানে মুরগির মাংসের  দৈনিক উৎপাদন ৪ হাজার মেট্রিক টন এবং ৪ কোটি ডিম। আর পোল্ট্রি ফিডের বছরে উৎপাদন ৬০ লাখ মেট্রিক টন গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা এসব তথ্য উপস্থাপন করেন। বক্তারা আরও বলেছেন, আমাদের দেশে একজন মানুষ বছরে ৬ কেজি ৩০০ গ্রাম মুরগি মাংস খায়, কিন্তু উন্নত বিশ্বের মানুষ বছরে ৪০ থেকে ৪৫ কেজি মাংস খায়। এছাড়াও এদেশের মানুষ বছরে ৯০টি ডিম খায়, কিন্তু এফএও-এর মতে একজন মানুষের কমপক্ষে ১২০ ডিম বছরে খাওয়া উচিত। উন্নত বিশ্বে একজন মানুষ বছরে ৬০০টির মতো ডিম খেয়ে থাকে। কেউ যদি সপ্তাহে ৪টি ডিম খায় তাহলে তার টাইপ টু ডায়াবেটিসের ঝুঁকি ৩৭ শতাংশ কমে যায় এবং সপ্তাহে ৭টি ডিম খেলে স্তন ক্যান্সারের সম্ভাবনা শতকরা ৪০ ভাগ হ্রাস পায়। ২টি ডিম নারীর দৈনিক  প্রোটিন চাহিদার চার ভাগের এক ভাগ পূরণ করে। আমাদের দেশে মুরগির মাংস ও ডিমের চাহিদা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং ভবিষ্যতে এ হার আরও বৃদ্ধি পাবে বলে জানিয়েছেন বক্তরা। গোলটেবিল আলোচনা পর্বে ওয়ার্ল্ড’স  পোল্ট্রি সায়েন্স এ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ শাখার (ওয়াসা-বিবি) সভাপতি শামসুল আরেফিন খালেদ বলেছেন, ২০২৪ সালের ভেতর বৈজ্ঞানিকভাবে খামারিদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। শুধু ভাতে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেই হবে না, আমাদের আমিষেও স্বয়ংসম্পূর্ণ অর্জন করতে হবে। আমিষের স্বয়ংসম্পূর্ণ অর্জন করতে পারলে দেশে ঝড়ে যাওয়া শিক্ষার্থী সংখ্যা হ্রাস পাবে। এছাড়াও আমিষের মাধ্যমে এই দেশে আরও মেধাবী সৃষ্টি হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। ওয়ার্ল্ড’স পোল্ট্রি সায়েন্স এ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ শাখার (ওয়াসা-বিবি) এবং বাংলাদেশ পোল্ট্রি সেন্ট্রাল কাউন্সিলের (বিপিআইসিসি) যৌথ আয়োজনে আরও বক্তব্য রাখেন সংগঠনটির ভাইস  প্রেসিডেন্ট ইয়াসমিন রহমান, জাহিদুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব হাসান এবং গোলটেবিল অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন পশু গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানী ড. নাতু রাম সরকার।

 

আরো খবর...