অসাধারণ মানুষদের সাধারণ চাওয়া পূর্ণ হবে কি?

॥ অজয় দাশগুপ্ত ॥

নির্বাচন শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা যে দুয়েকটা খারাপ ঘটনার খবর পাচ্ছি তাতে উদ্বেগের কারণ আছে। সবাই জানেন ঐক্যফ্রন্টের পরাজয়ের মূল কারণ মানুষের ভীতি। মানুষ বলতে আমরা যদি সাধারণ বিবেকবোধসম্পন্ন মানুষদের বুঝি তাহলে সবাই ছিল ভয়ে ভয়ে। আমার পরিচিত কট্টর বিএনপি সমর্থকদের মনেও সে ভয় ছিল।

তাদের ভোট ধানের শীষে গেলেও তারা নিশ্চিত ছিল না, কি হতে পারে? দুটো কারণে এই ভয় অমূলক কিছু না। প্রথম কারণ নেতৃত্বের গভীর সংকট। কে হবেন প্রধানমন্ত্রী বা কারা আসবেন সামনে তা নিয়ে ছিল গভীর সংশয়। পরের কারণ লন্ডনের যুবরাজ বা তারেক জিয়া।

এখন অবধি সবাই বলছেন তারেক জিয়ার গোঁয়ার্তুমি আর জেদের কারণেই সর্বনাশ। পলাতক তারেক সেখানে থেকে যা করছে তার নাম প্রতিহিংসা। হিংসা ও প্রতিহিংসার রাজনীতি মানুষ আর চায় না। তাদের সমানে যে নতুন ভবিষ্যতের হাতছানি সেখান থেকে সরে আসতে না চাওয়াই ছিল মূল ভীতি।

আওয়ামী লীগের কারণে যতটা তারচেয়ে বেশি শেখ হাসিনার কারণেই এই বিজয়। দেশে-বিদেশে বাঙালির আস্থা ও ভরসার প্রতীক তিনি। কষ্ট ত্যাগ আর পরিশ্রমে উঠে আসা জননেত্রীকে মানুষ ভোট দিয়েছে। দেশের তাবৎ বুদ্ধিজীবী সাংস্কৃতিক কর্মী নায়ক গায়ক অভিনেতা খেলোয়াড় কেউ বাদ যায়নি। তাদের মনেও ভয় ছিল।

বিএনপি যদি আবার আসতে পারত তবে কত মানুষ জান হারাত, কত নারী ধর্ষিত হতো আর কত মানুষ দেশান্তরী হতো বলা মুশকিল। এই ভয় তাড়াতে যে ভোট বা সমর্থন তার মানুষরাই যদি ধর্ষণে আগ্রহী হয় ও সংখ্যালঘু নারীদের টার্গেট করে তো আমরা কি ধরে নেব? নোয়াখালীর সুবর্ণচরের ঘটনায় প্রমাণ হয়েছে সরকারি দলেও ঘাপটি মেরে আছে ঘাতক ধর্ষক আর চাটুকারের দল। যতদিন যাবে এবার তারা তত বেপরোয়া হবে।

সরকারের সামনের দিন সহজ কিছু না। মনে রাখতে হবে জনপ্রিয়তার ব্যারোমিটার যাই হোক নির্বাচন ও ফলাফল প্রশ্নহীন নয়। বরং যারা দেশের ভেতর আছেন তারা ভালো জানেন প্রবল সমর্থন বা নীরব সম্মতির পরও অতিউৎসাহীরা অনেক কাজ করে ফেলেছে যার দরকার ছিল না। তাই সাবধানতার মার নেই।

মন্ত্রিসভা থেকে সমাজ সর্বত্র এখন মানুষ জবাবদিহি চাইবে। এ জাতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা একদিকে যেমন শক্তি আরেক দিকে দায়িত্ব ও ঝুঁকি তৈরি করে। ঝুঁকি এ কারণে সুগঠিত শক্তিশালী বিরোধী দল না থাকলে গণতন্ত্র এগুতে পারে না। এটা অনেকটা এক চাকার সাইকেলের মতো। যা সার্কাসে ভালো মানায় কিন্তু রাস্তায় বা চলার পথে দুচাকার সাইকেল উত্তম।

এই সত্য মানতে হবে সরকারি দলকে। তাদের নেতাদের অনেকেই প্রগলভ। এই যে দেখলাম কখন মন্ত্রিসভা হবে, কখন শপথ হবে এসব নিয়ে মহাজোটের জাসদ নেতা আগ বাড়িয়ে কথা বলছেন। এটা কি তার দায়িত্বের ভেতর পড়ে? নৌকার আসল মাঝিমাল্লাদের চাইতে অন্যরা বড় হয়ে উঠলে নৌকা ভাসছে বটে কোথায় যাবে বলা দুরূহ।

আওয়ামী লীগে শুধু না দেশের কোনো দলেই আদর্শ নেই। থাকলেও তা টিমটিমে। বেশকিছু মৌলিক বিষয়ে ভোট হয় বা দিতে হয় বলে মানুষ একদিকে ঝুঁকে পড়ে। তা না হলে পার্থক্য আসলে খুব বেশি নেই। এই তফাৎ ঘুচে যাওয়ার কারণে আওয়ামী লীগের নাম ভাঙানো বা তাদের দলের সঙ্গে থাকা ধর্ষকের আসল চেহারা দেখতে পাওয়া যায়।

মনে রাখতে হবে রিজার্ভ ফান্ডের ডলারের হিসাব এখনো মেলেনি। ব্যাংকের টাকা আত্মসাৎ লুণ্ঠনের ব্যাপারেও জবাবদিহি আসেনি। যেসব নারী-পুরুষ নানা কারণে হত্যা গুম বা অপরাধের শিকার তাদের সবগুলোর বিচারও হয়নি। তবু মানুষ আশা রাখে। যে সরকার প্রধান দেশের দুশমন মাটি ও জাতিবিরোধী শক্তিকে সাইজ করতে ভয় পায় না। তাদের চূড়ান্ত শাস্তি দিয়ে ইতিহাসকে কলঙ্কমুক্ত করে তার প্রতি বিশ্বাস আছে বলেই এখনো তারা ধৈর্য ধারণ করে থাকে।

আর একটা কথা বলাই বাহুল্য, এত কিছুর পর আর কি পাওয়ার আছে সরকারি দলের? তিনবার দেশ শাসনের অধিকার পাওয়া নেতারা কত আর ব্যক্তিস্বার্থ বা ভোগবাদী হবেন? এবার তাদের দেয়ার পালা। সে দেয়াটা যেন কথার কথা না হয়। লোক দেখানো বা মনভোলানো কথায় কাজ হবে না।

দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংসের পথে। বড় বড় দালান ভাড়া নিবে বিশ্ববিদ্যালয় খুললে লেখাপড়া এগোয় না। অলিতে গলিতে ইংরেজি মিডিয়াম স্কুল বা ফলাফল বের হওয়ার পর মন্ত্রীর বিগলিত চেহারা কিংবা আঙুল উঁচানো বাচ্চাদের মুখে আনন্দ আছে আশা নেই। একেবারে গোড়া থেকে মাথা অবধি এক ভয়াবহ অসহায়ত্ব আছে এই সেক্টরে।

খোল নলচে পাল্টে দিয়ে কায়মনে দেশপ্রেমী ও আন্তর্জাতিক হওয়ার পাঠ না থাকলে আর যাই হোক সমাজের অন্ধত্ব যাবে না। শেখ হাসিনার কাছে আমাদের প্রত্যাশা তিনি এবার এই দিকটায় চোখ দেবেন। আগামী প্রজন্মে ইতিহাস বিষয়ে অজ্ঞতা দেশ ও জাতি বিষয়ে অস্বচ্ছ ধারণা আর কূপমন্ডুকতা রেখে ভালো জাতি গঠন অসম্ভব। ধর্মীয় পাঠের আধুনিকায়নসহ কারিগরি ও বিজ্ঞান পড়াশোনা কীভাবে আরো ব্যাপক করা যায় সে চ্যালেঞ্জ নিতে হবে।

একটা সাধুবাদ তারা ইতোমধ্যে পাওয়ার মতো কাজ করেছেন। নির্বাচনে বিজয় নিয়ে অতিউৎসাহীদের রাস্তা দখল করতে দেননি। এগুলো বন্ধ করা দরকার। জনমনে অসন্তোষ আর ধূমায়িত ক্রোধ জাগিয়ে এসব কাজ করা আত্মঘাতী। চাটুকার স্তাবক আর মোসাহেবদের সংখ্যা বাড়বেই। বিশেষত দেশের বাইরে থাকা এক শ্রেণির বাঙালি জননেত্রীর ভাষায় রাজনৈতিক দোকান খুলে শাখা খুলে কি চায় সেটা দলের নেতাদের বুঝতে হবে।

দেশের বাইরে যেমন সহাবস্থান আর ঐক্য জরুরি তেমনি দেশের ভেতরও চাই সমঝোতা। বিজয়ী ও বিজিতের ভাষা বা ব্যবহার এক হতে পারে না। বিজিতের জন্য সমবেদনার পাশপাশি ভরসাও থাকতে হবে। যা করতে পারেনি করতে চায়নি বলে এরশাদ থেকে বিএনপি আজ হয় মাজা ভাঙা নয়তো অসহায়। আওয়ামী লীগের এখনো মূলশক্তি তৃণমূল। সেখানে যারা অবহেলিত তাদের দিকে ফিরে তাকানোর রাজনীতি শুরুহোক।

এবারের নির্বাচনে জিতে আসা মাশরাফি মাহী বা তন্ময়দের মতো তরুণরা আসুক পাদপ্রদীপের আলোয়। তাদের নতুন রক্ত নতুন ভাবনা নতুন চিন্তার ঝিলিক লাগুক অচলায়তনে। বাংলাদেশের সৌভাগ্য যেমন শেখ হাসিনার নেতৃত্ব তেমনি দুর্ভাগ্য তার আশপাশের স্বার্থপর নেতাদের কর্মকান্ড। এবার তার অবসান চায় জাতি। এই সে দিনও রাজনীতির প্রতি মানুষের ছিল গভীর আস্থা। ছিল ভরসা। নেতারা ছিলেন পাঞ্জাবি পায়জামা লুঙ্গি বা সহজ পোশাকের সাধারণ মানুষ।

কোনো মাদক ব্যবসায়ী, কোনো কোটিপতি বা হঠাৎ গজানো মানুষ রাজনীতিতে আসতে পারত না। সাইকেল চেপে মৃদু মৃদু ঘণ্টা বাজিয়ে আসা সেসব নেতার ঝোলায় থলিতে থাকত বই। থাকত দল বা আদর্শের পুস্তিকা। সে দিনগুলো আজ ধূসর। চাকচিক্য আর হঠাৎ টাকার ঝাঁঝালো আলোয় ম্লান হয়ে গেছে আদর্শের আকাশ। বঙ্গবন্ধু কন্যার কাছে একটাই চাওয়া আপনি সব সময় বলেন আপনার চাওয়ার কিছু নেই। অনেক হারিয়েছেন আপনি। হারানোরও ভয় নেই আপনার।

এবার বাংলাদেশকে এমন একটি সরকার উপহার দিন যার ভেতরে-বাইরে আদর্শ আর জবাবদিহি। যার কারণে সামাজিক ঐক্য আর দেশজ ভালোবাসায় দেশ হয়ে উঠবে শান্তিময়। এর বাইরে সাধারণ মানুষের আর কি চাওয়ার আছে? তারা নামে সাধারণ হলেও আসলে অসাধারণ। তারাই এই দেশকে ধরে আছে। আপদে-বিপদে সুখে-অসুখে তাদের আস্থা আর ভালোবাসাই আপনার শক্তি। তাদের জয়েই সবার জয়।

অজয় দাশগুপ্ত : কলাম লেখক।

আরো খবর...