অসম প্রতিযোগিতায় পড়েছে দেশের পোল্ট্রি খাত

কৃষি প্রতিবেদক ॥ অসম প্রতিযোগিতায় পড়েছে দেশের পোল্ট্রি খাত। কিছুদিন আগেও যে শিল্প একটি উজ্জ্বল সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে পরিচিতি অর্জন করেছিল; সে পোল্ট্রিশিল্পই আজ অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে। এ দুরবস্থার জন্য বিদেশি তথা বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর আগ্রাসী মনোভাবকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। বর্তমানে ৭টি বিদেশি কোম্পানি সরকারের অনুমতি নিয়ে বাংলাদেশে পোল্ট্রিশিল্পের ব্যবসা করছে। এসব কোম্পানিগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার মতো অর্থনৈতিক সামর্থ নেই দেশীয় প্রতিষ্ঠানের। ফলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং ব্যক্তি পর্যায়ের খামারিরা বিদেশি কোম্পানির কাছে একপ্রকার জিম্মি হয়ে পড়েছেন। তাদের মতে, এই শিল্পে বিদেশি আগ্রাসন বাড়লেও সরকারের নজর নেই। নেই বাজারের নিয়ন্ত্রণও। সংশ্লিষ্টরা জানান, বাংলাদেশের জিডিপিতে পোল্ট্রি খাতের অবদান দুই দশমিক ৬৭ শতাংশ এবং প্রবৃদ্ধির হার তিন দশমিক ৯৮ শতাংশ। বেকার যুবকরা পোল্ট্রি খামার স্থাপনে আগ্রহী হয়ে ওঠায় দিনে দিনে এই প্রবৃদ্ধির হার অনেক বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। অথচ বিদেশি কোম্পানির আগ্রাসী বিনিয়োগের ফলে অসম প্রতিযোগিতায় পড়েছে সম্ভাবনাময় এই শিল্পটি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশের পোল্ট্রি খাতে বিনিয়োগকারী বিদেশি কোম্পানির মধ্যে পাঁচটি ভারতের, একটি থাইল্যান্ডের এবং একটি চীনের। ভারতীয় কোম্পানিগুলোর মধ্যে আছে ভিএইচ গ্র“প, গোদরেজ, সগুনা, টাটা এবং অমৃত গ্র“প। তাছাড়া আছে থাইল্যান্ডের সিপি এবং চীনের নিউহোপ। এগুলো দেশের পোল্ট্রিশিল্পের শতকরা প্রায় ৪০ ভাগ পুঁজি নিয়ন্ত্রণ করছে। বিদেশি অর্থপুষ্ট খামারগুলো ঋণ নিয়ে আসছে ৩ থেকে ৪ শতাংশ সুদে। আর দেশি খামারগুলোকে ঋণ সংগ্রহ করতে হচ্ছে ১০ থেকে ১২ শতাংশ সুদে। তাই বিদেশি খামারগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে স্থানীয় বড় খামারগুলোকে অনেক হিমশিম খেতে হচ্ছে। ঝরে পড়ছে ছোট খামারগুলো। এ ছাড়া পোল্ট্রিশিল্পের এই ভারসাম্যহীনতার জন্য সরকারের কিছু ভুল নীতিও দায়ী। দীর্ঘদিন ধরে পোল্ট্রিশিল্পের আয় করমুক্ত ছিল। ২০১৫-১৬ অর্থবছর থেকে এ শিল্পের কর অব্যাহতি সুবিধা তুলে নিয়ে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ কর আরোপ করা হয়। চলতি অর্থবছরেও তা অব্যাহত আছে। ধুঁকতে থাকা পোল্ট্রি খামারিদের জন্য যা ‘বোঝার ওপর শাকের আঁটি’ হয়ে উঠেছে। খামারিরা জানান, বর্তমানে তারা সবচেয়ে বেশি সমস্যায় রয়েছেন কিছু দেশি এবং বিদেশি বড় কোম্পানির মনোপলি ব্যবসার কারণে। এসব কোম্পানির কারণেই তারা ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। মনোপলির সঙ্গে জড়িত এসব বড় কোম্পানির অধিকাংশই প্রথমে ওষুধ নিয়ে মাঠে নামলেও বর্তমানে তারা নিজেরাই বাচ্চা উৎপাদন, লেয়ার ও ব্রয়লার মুরগির খামার, পোল্ট্রি ফিড উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ এবং পোল্ট্রি ফিডের কাঁচামাল ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছে। অর্থাৎ একদিন বয়সী বাচ্চা উৎপাদন থেকে শুরু করে ব্রয়লার মুরগি পালন, ডিম উৎপাদন, ফিড তৈরি এমনকি বিদেশ থেকে ওষুধ এনে বাজারজাত পর্যন্ত করছে। এভাবে তারা বাজারে একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করছে এবং সুযোগ বুঝে অভ্যন্তরীণ বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। তথ্যমতে, খামারিদের ব্যয়ের ৭০ শতাংশই পোল্ট্রি ফিডে। যা বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এই আমদানিতে ট্যাক্স ফ্রি সুবিধা না পাওয়ায় আরো বিপাকে রয়েছে পোল্ট্রিশিল্প। অন্যদিকে লাইভ স্টোক ডিপার্টমেন্ট থেকে অনুমতি না নিয়ে বোর্ড অব ইনভেস্টমেন্ট থেকে অনুমতি নিয়ে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবসা করছে। খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, ইতোমধ্যে পোল্ট্রিশিল্পের প্রায় ৪০ শতাংশ বাজার বিদেশিরা দখল করে নিয়েছে। যা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। সারা পৃথিবী যখন নিজেদের শিল্পকে রক্ষার জন্য নানা নীতিমালা তৈরি করছে তখন আমাদের দেশে হচ্ছে এর উল্টোটা। এই সাতটি বিদেশি কোম্পানি বাংলাদেশে কি পরিমাণ বিনিয়োগ করতে পারবে কিংবা কি পরিমাণ লভ্যাংশ নিয়ে যেতে পারবে তার সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা নেই। এসব বিষয়ে নজর না দিলে বাংলাদেশের যেসব প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি এ শিল্পে জড়িত রয়েছে তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে। সম্ভাবনাময় এ শিল্প ধ্বংস হলে ৫০ লাখ মানুষ বেকার ও পরোক্ষভাবে এক থেকে দেড় কোটি মানুষ পথে বসার উপক্রম হবে। তাই এ শিল্পকে রক্ষায় সরকার ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। এ ক্ষেত্রে পোল্ট্রিশিল্পে কৃষি সেক্টরের মতো প্রান্তিক খামারিদের সরাসরি ভর্তুকি দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে, স্বল্প সুদে ঋণ দিতে হবে এবং পোল্ট্রি খাদ্যের দাম কমাতে হবে। বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ এসোসিয়েশনের মহাসচিব মঞ্জুর মোর্শেদ বলেন, পোল্ট্রিশিল্পে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য ঋণ সুবিধা থাকলেও ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিরা কোনো ঋণ সুবিধা পায় না। তাদের ঋণ সুবিধা পাওয়ার বিষয়টি খাতা-কলমেই সীমাবদ্ধ। এ বিষয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ বলেন, পোল্ট্রিশিল্পে ব্যাংক ঋণের সুবিধা আছে। কোনো খামারি এ সুবিধা পান না বলে জানা নেই। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিরা যেন ঋণ সুবিধা পান সে ব্যবস্থা করা হবে।

আরো খবর...