অর্থনীতি কারো কথা শোনে না

॥ ড. আর এম দেবনাথ ॥

চালে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, ক্রমবর্ধিষ্ণু রপ্তানি এবং ক্রমবর্ধিষ্ণু রেমিটেন্স আমাদের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান শক্তি। প্রথমটা আমাদের একান্ত নিজস্ব। দ্বিতীয় ও তৃতীয়টি বহির্বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কিত। এসবের ওপর খবর সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। কয়েকদিন আগে তেমনই একটি খবর একটি দৈনিকে প্রকাশিত হয়েছে। খবরটির অনেক গুরুত্ব, তাই এর উল্লেখ করছি। এতে বলা হয়েছে, মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিকের সংখ্যা ১০ লাখ। অথচ বছরে মাত্র ১১০ কোটি ডলারের মতো রেমিটেন্স আসে মালয়েশিয়া থেকে। ২০১৬-১৭ এবং ২০১৭-১৮ অর্থবছরের মধ্যে কোনো তফাৎ নেই। প্রায় সমপরিমাণ রেমিটেন্সই এসেছে মালয়েশিয়া থেকে। কিন্তু হিসাব বলে আরও অনেক বেশি রেমিটেন্স আসার কথা ঐ দেশ থেকে। রিপোর্টটিতে বলা হয়েছে, এই মুহূর্তে মালয়েশিয়া থেকে মাত্র ২০ শতাংশ রেমিটেন্স আসে বৈধ পথে অর্থাৎ ব্যাংকিং চ্যানেলে। বাকি ৮০ শতাংশ আসে অবৈধ পথে অর্থাৎ ‘হুন্ডির’ মাধ্যমে। কী মারাত্মক কথা। সিংহভাগ রেমিটেন্স মালয়েশিয়া থেকে আসছে অবৈধ পথে। এর কারণ কী? কারণ হিসেবে রিপোর্টটিতে দুটো বিষয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একটি হচ্ছে ১০ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিকের মধ্যে মাত্র ৪ লাখ বৈধ এবং ৬ লাখ অবৈধ। দ্বিতীয় কারণটি হচ্ছে অবৈধ পথে ‘রেমিটেন্স’ পাঠালে ডলারপ্রতি বেশি টাকা পাওয়া যায়। অবৈধ বাংলাদেশি শ্রমিকদের সমস্যা অনেক। তারা বৈধ পথে দেশে টাকা পাঠাতে পারে না। কারণ বৈধ পথে দেশে টাকা পাঠাতে হলে কাগজপত্র, ডকুমেন্ট লাগে। তাদের নেই। এমতাবস্থায় বাধ্য হয়েই তারা অবৈধ পথে দেশে টাকা পাঠায়। আর হুন্ডিতে ডলারের বিপরীতে বেশি টাকা পাওয়া যায় এটি একটি পুরনো, অনেক পুরনো সমস্যা। মোদ্দাকথা এই ক্ষেত্রে কয়েকটি। প্রথমত, এত অবৈধ শ্রমিক কী করে মালয়েশিয়ায় গেল? গেলই যখন তাদেরকে বৈধ করার চেষ্টা কি সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ/মন্ত্রণালয় নিয়েছে? মনে হয় না। যদি বৈধ করার উদ্যোগ নেওয়া হতো তাহলে বিপুল পরিমাণ রেমিটেন্স থেকে সরকার বঞ্চিত হতো না। কত রেমিটেন্স থেকে সরকার বঞ্চিত হচ্ছে বছরে? ‘হিউজ’ অঙ্কের রেমিটেন্স থেকে সরকার বঞ্চিত হচ্ছে আর পাশাপাশি গড়ে উঠেছে বিশাল হুন্ডি নেটওয়ার্কÑযা দেশের অর্থনীতির শত্র“। হিসাবে দেখা যাচ্ছে, মালয়েশিয়া থেকে মাত্র ৯ হাজার কোটি টাকা আসছে বৈধ পথে ব্যাংকিং চ্যানেলে এবং ৩৬ হাজার কোটি টাকা আসছে অবৈধ পথে হুন্ডিতে। ভাবা যায় কত বিশাল অঙ্কের টাকা! অথচ এই হিসাব বাংলাদেশ ব্যাংকের। প্রশ্ন এই সমস্যা কি শুধু মালয়েশিয়ার সঙ্গে? মনে হয় না। কয়েকদিন পরপরই কাগজে রেমিটেন্সের ওপর খবর ছাপা হয়। তাতে দেখা যায়, পৃথিবীর বহু দেশেই বৈধ এবং অবৈধভাবে বহু বাংলাদেশি কাজ করছেন। এটা নানাভাবে ঘটছে, নানা কারণে ঘটছে, নানা অবস্থায় পড়ে ঘটছে। এখন মুশকিল হচ্ছে  বৈধরা যেমন দেশে টাকা পাঠায়, অবৈধরাও তাদের রোজগারের টাকা দেশে পাঠায়। দেখা যাচ্ছে, উভয় উত্স থেকেই যে টাকা দেশে আসে তার একটা বিরাট অংশ আসে অবৈধ পথে। হুন্ডিতে যা আইনত নিষিদ্ধ। মানি লন্ডারিং প্রিভেনশন অ্যাক্ট বলে একটা কঠিন আইন আছে। এতে হুন্ডি নিষিদ্ধ একটি কাজ এবং দন্ডনীয় একটি কাজ। অথচ এই কাজটি ঘটে চলেছে। মালয়েশিয়া থেকে যেমন বাংলাদেশে হুন্ডিতে টাকা আসছে, তেমনি আমাদের কাগজের রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশ থেকেও প্রচুর টাকা হুন্ডিতে বিদেশে চলে যাচ্ছে। পোশাক শিল্প খাতে প্রচুরসংখ্যক বিদেশি অবৈধভাবে কাজ করে। এতে চীন, ভিয়েতনাম, ভারত, পাকিস্তান এবং শ্রীলঙ্কার কর্মীরা আছে। তারা একশ্রেণির মালিকের প্রশ্রয়ে পোশাক খাতে কাজ করে প্রতি বছর। তারাও ‘হিউজ’ অঙ্কের টাকা বিদেশে নিয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ হুন্ডিতে টাকা আসছে, আবার হুন্ডিতেই বহু টাকা বিদেশে চলে যাচ্ছে। দুইয়ের যোগ-বিয়োগে আমরা কি হুন্ডিতে বেশি টাকা পাচ্ছি? এর হিসাব করা কঠিন। তবে দৃশ্যত যে ঘটনাটি ঘটছে তা বোঝা দরকার। অনেকের মনেই প্রশ্ন বাংলাদেশের একশ্রেণির লোক কীভাবে বিদেশে টাকা নেয়, কীভাবে তারা বিদেশে ঘর-বাড়ি করে, ব্যবসা করে, সহায়-সম্পদ করে? দেশ থেকে তো  বৈধভাবে বিদেশে ব্যবসা করার জন্য অবাধে টাকা নেওয়া যায় না। ভ্রমণ, চিকিৎসা, অধ্যয়ন ইত্যাদি কিছু কাজে সুনির্দিষ্ট পরিমাণ ডলার বিদেশে নিয়ে যাওয়া যায়। কিন্তু ঘরবাড়ি, বিনিয়োগ ইত্যাদি করার জন্য কোনো টাকা বিদেশে নেওয়া যায় না। তাহলে কীভাবে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাঠানো হচ্ছে? মালয়েশিয়ার বিষয়টা বিশ্লেষণ করলে একটা পথের সন্ধান পাওয়া যায়। সেখানে বাংলাদেশি অবৈধ ও বৈধ শ্রমিকের ডলারটা কী হচ্ছে? বাংলাদেশি ‘হুন্ডিওয়ালারা’ শ্রমিকদের কাছ থেকে ডলারটা নিয়ে নিচ্ছে। সেই ডলারের বিপরীতে বাংলাদেশে হুন্ডিওয়ালারা তাদের লোকের মারফত রেমিটেন্স প্রাপককে টাকাটা দিয়ে দিচ্ছে। এই পদ্ধতিটি খুব সহজ। খুবই গোপনীয় এবং দক্ষ ব্যবস্থা। অবশ্যই ব্যাংকের চেয়ে নিরাপদ ব্যবস্থা। হুন্ডিওয়ালারা ডলার রেখে দিচ্ছে মালয়েশিয়ায়। এবার বাংলাদেশিদের মধ্যে যাদের ডলার দরকার মালয়েশিয়ায় তারা ঐ হুন্ডিওয়ালার কাছ থেকে ডলার নেবে। বিপরীতে বাংলাদেশে তারা তাদের লোকের মারফত টাকা নিয়ে নেবে। মজা হচ্ছে এই টাকা দিয়েই রেমিটেন্স প্রাপককে তার পাওনা পরিশোধ করা হবে। এর চেয়ে সুন্দর ব্যবস্থা আর কী হয়? এই ব্যবস্থাই সারা দুনিয়ায় চালু আছে। অথচ তা অবৈধ, দন্ডনীয় অপরাধমূলক কাজ। চোখের সামনেই তা ঘটছে। এর নামই অর্থনীতি। অর্থনীতি কারো কথা শোনে না। যেখানে যা প্রয়োজন সেখানে তা সে করে। চলে চাহিদা এবং সরবরাহের ভিত্তিতে। দেশপ্রেমের ভিত্তিতে নয়। যদি দেশপ্রেমের ভিত্তিতে ঘটত, যদি সবাই বৈধ পথে দেশে টাকা পাঠাত, পাঠাতে পারতÑ তাহলে বাংলাদেশের অনেক উপকার হতো, অনেক সমস্যার সমাধান হতো। সরকারের অবস্থা আরও মজবুত হতো। অর্থনীতি আরও মজবুত হতো। আমার ধারণা হুন্ডিতে টাকা পাঠানো এবং হুন্ডিতে টাকা বিদেশে নিয়ে যাওয়ার ফলে ইদানীং আমাদের একটা সমস্যা হচ্ছে। সমস্যাটা আমাদের জানা অর্থনীতির বাইরে। অর্থাত্ লোকচক্ষুর অন্তরালে রয়ে গেছে সমস্যাটা। কী সেই সমস্যা? সমস্যাটা হচ্ছে রেমিটেন্সের অবদান-সম্পর্কিত। আমরা জানি রেমিটেন্স আমাদের অর্থনীতির অন্যতম ‘লাইফলাইন’। এটা আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতিকে উজ্জীবিত রেখেছে। আমাদের ‘ভোগস্তর’ ঠিক রেখেছে। গ্রামে ‘ক্যাশ’ সরবরাহ করছে। কোটি কোটি মানুষ খেয়ে পরে আছে। দারিদ্র্যসীমার ওপরে আছে মানুষ রেমিটেন্সের কারণে। এই রেমিটেন্সের অবদান তিনভাবে হিসাব করা যায়। আমাদের মোট জিডিপিতে (গ্রস ডমেসটিক প্রডাকশন) রেমিটেন্সের অবদান কত? অথবা প্রশ্নটা করা যায় অন্যভাবে। রেমিটেন্স ‘জিডিপির’ কত শতাংশ? একইভাবে রেমিটেন্স মোট আমদানি বা রপ্তানির কত শতাংশ? এইভাবে শতাংশের নিরিখে বিচার করলে দেখা যাবে রেমিটেন্সের অবদান ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। এটা শুভ লক্ষণ নয়। আমার মনে হয় সমস্যাটা আমাদের গোচরে আনা হচ্ছে না। দেখা যাচ্ছে ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ‘জিডিপি’র প্রায় ১০ শতাংশের সমপরিমাণ ডলার দেশে রেমিটেন্স হিসেবে এসেছে। অথচ ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল মাত্র সাড়ে পাঁচ শতাংশ। একইভাবে দেখা যাচ্ছে ২০০৮-০৯ অর্থবছরে মোট রপ্তানির ৬২ শতাংশ ছিল রেমিটেন্সের পরিমাণ। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তার পরিমাণ ছিল মাত্র ৪০ শতাংশ। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে আমদানির ৪৭ শতাংশ পরিশোধিত হয়েছে রেমিটেন্সের ডলার দ্বারা। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৭ শতাংশ। এই তথ্য দ্বারা কী বোঝা যায়? বোঝা যাচ্ছে বৈধ পথে আমাদেরকে রেমিটেন্স আরও বাড়াতে হবে। অবৈধ পথে রেমিটেন্স আসা যাতে বন্ধ হয়, তার সমুদয় ব্যবস্থা করতে হবে। ‘অবৈধ’ শ্রমিকদেরকে বৈধ করার ব্যবস্থা করে বৈধপথে দেশে রেমিটেন্স পাঠানো নিশ্চিত করতে হবে। ডলারপ্রতি বিদেশে কর্মরত শ্রমিকরা যাতে ‘উচিত’ মূল্য পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। এর পাশাপাশি রপ্তানি এবং আমদানি ক্ষেত্রেও আমাদের অনেক পদক্ষেপ নিতে হবে। বহু বছর যাবত্ আমরা বলে আসছি আমাদের রপ্তানিকে বহুমুখী করতে হবে। অথচ বাস্তবে ঘটছে উল্টোটি। আমরা পোশাক শিল্পনির্ভর রপ্তানি খাত করে ফেলেছি। এর থেকে মুক্তি দরকার। দ্বিতীয়ত, আমদানির পরিমাণ অনেক বেড়ে গেছে। অনেকের মতে, আমদানির পরিমাণের সঙ্গে ‘জিডিপি’ প্রবৃদ্ধির হারের কোনো সম্পর্ক নেই। আমদানি যেভাবে বাড়ছে, সেভাবে শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়ছে না। আমদানির মাধ্যমে বহু টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। ‘আন্ডার ইনভয়েসিং’, ‘ওভার ইনয়েসিং’ হচ্ছে। এসব বন্ধ হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। অথচ এসব বন্ধ না হলে অর্থনীতি প্রকৃত অর্থে উপকৃত হবে না।

লেখক : অর্থনীতিবিদ ও সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরো খবর...