অঙ্গ প্রত্যঙ্গের রোজাই প্রকৃত রোজা

আ.ফ.ম নুরুল কাদের ॥ আমরা রমজান মাসের শেষ প্রান্তে পৌছে গেছি। আজ আমাদের আলোচনায় শরীরের অঙ্গ প্রতঙ্গের প্রকৃত রোজার বিষয় রেখেছি। মহান রাব্বুল আলামিনও চান না তাঁর কোনো প্রিয় বান্দা দোজখের আগুনে নিক্ষিপ্ত হোক। বান্দার প্রতি আল্লাহর ভালোবাসা সন্তানের প্রতি মায়ের ভালোবাসার তুলনায় অনেক অনেক গুণ বেশি। তাই গোনাহ হতে পবিত্রতা অর্জন, নিজ নিজ আমলের সংশোধন, পরকালের মুক্তি বা নাজাতের জন্যই আল্লাহ-তায়ালা মুসলিম উম্মাহকে রমজানের পবিত্র রোজা উপহার দিয়েছেন। কিন্তু মানুষকে বিপথগামী করার জন্য শয়তান মানবদেহে এমনভাবে বিচরণ করে  যেমন দেহের মধ্যে রক্ত চলাচল করে। যার জন্য মানুষ দিনরাত গোনাহে লিপ্ত থাকে এবং রমজান মাসেও এর ঝঙ্কার থেকে যায়। মানুষের অন্তর, চোখ, কান, হাত, পা, জিহ্বা কোনোটিই গোনাহমুক্ত থাকতে পারে না। সকাল  থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত উপবাস থাকার নামই রোজা নয়। মানুষের অঙ্গ প্রত্যঙ্গের রোজাই প্রকৃত রোজা। পানাহার ও ইন্দ্রিয় কামনা এবং চোখ, কান, জিহ্বা, হাত, পাকে পাপ থেকে মুক্ত রেখে অন্তরকে সব ধরনের কুচিন্তা ও বৈষয়িক লোভ- মোহ থেকে মুক্ত করে আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন হওয়াই হচ্ছে উচ্চস্তরের রোজা। এমন রোজাই ঢাল হয়ে শয়তানকে প্রতিহত করতে সক্ষম। অন্তরের রোজা: দেহের  রোজার ভিত্তি হচ্ছে অন্তরের রোজা। অন্তরের হেদায়াতই সব ইবাদতের মূল। ঈমানের রসে পাপী অন্তর যদি সিক্ত না হয় তাহলে পাপাচার ও কামাচারের মতো রিপুর নিয়ন্ত্রণ করা কখনো সম্ভব নয়। পেটের রোজা: পেটের রোজা হচ্ছে পেটকে হারাম খাদ্য ও পানীয় থেকে বাঁচিয়ে রাখা। রোজার সময় দিনের বেলায়ও পেটকে হালাল খাদ্য থেকে বিরত রাখা। সেহরি ও ইফতারে অতিরিক্ত আহার না করা এবং হারাম জিনিস বর্জন করা। মূলত  দেহের রোজার বিশুদ্ধতা নির্ভর করে পেটের  রোজার ওপর। জিহ্বার রোজা: জিহ্বাকে বেহুদা কথা ও গোনাহের কাজ থেকে সংযত ও বিরত রাখাই হচ্ছে জিহ্বার রোজা। অশ্লীল কথা, মন্দ ব্যবহার ও মিথ্যা বলার দরুন অনেকের রোজা নষ্ট হয়ে যায়। এ জন্য রোজাদারকে কম কথা বলে  বেশি বেশি কুরআন পাঠ, সৃষ্টিকে নিয়ে গবেষণা, তওবা, তাসবিহ, দাওয়াতের কাজ ও নেকের কাজে ব্যস্ত থাকা প্রয়োজন। চোখের রোজা : চোখ হলো মনের আয়না।  যে কোনো গোনাহের কাজ করার আগে চোখ প্রথমে তা দেখে এবং পরে মনকে প্রলুব্ধ করে। তাই চোখের হেফাজত করা মানেই মনের হেফাজত করা। অশ্লীল, হারাম ও নিষিদ্ধ কাজ থেকে চোখের দৃষ্টিকে ফিরিয়ে রাখা এবং নেক ও ভালো কাজের প্রতি চোখ খুলে রাখা ও দেখাই হচ্ছে চোখের রোজা। কানের রোজা: ভালো কথা, হেদায়াতের কথা, কল্যাণের কথা শোনা এবং মন্দ কথা, অশ্লীল গানবাজনা যথাসম্ভব কানে  প্রবেশ না করানোর চেষ্টা করাই হচ্ছে কানের রোজা। পায়ের রোজা: পায়ের রোজা হচ্ছে পা-কে বিপথগামী না করা। অর্থাৎ পাপাচারের পথে, খারাপ পথে পা না বাড়িয়ে শান্তি ও কল্যাণের পথে পা বাড়ানো। হাতের রোজা: হাত দিয়ে  কোনো পাপের কাজ বা মানুষের ক্ষতি হয় এমন কাজ না করাই হাতের রোজা। আল্লাহ হাত দিয়েছেন সৎ কর্ম করার জন্য, মুনাজাত করার জন্য। জিনিসপত্রে  ভেজাল মিশাতে, ওজনে কম দিতে, মারামারি, খুনাখুনি করতে, অসৎ উপায় অবলম্বন করতে বা কলমের আঁছড়ে দুর্নীতি বা জুলুম করার জন্য নয়দেহের অঙ্গ প্রত্যঙ্গই আল্লাহর পবিত্র আমানত। যার যথাযথ ব্যবহার করা প্রতিটি রোজাদারের ফরজ দায়িত্ব। তা না হলে আমাদের অন্যায় ও পাপাচারের জন্য রোজ হাশরে এসব অঙ্গ প্রত্যঙ্গই আমাদের বিরুদ্ধে স্বাক্ষী দেবে, যার পরিণতি হবে জাহান্নাম। পবিত্র রমজান মাসে আমরা যদি আমাদের মস্তিস্ক, অন্তর ও অঙ্গ প্রত্যঙ্গ সুন্দরভাবে সঠিক পথে পরিচালিত করার অভ্যাস তৈরি করি; তাহলে বছরের বাকি এগারো মাস আমরা সুন্দর ও শান্তিময় জীবনযাপন করতে সক্ষম হবো। সমাজকে উপহার দিতে পারব পাপ পঙ্কিলমুক্ত সুশৃঙ্খল ও আদর্শ সমাজ। সর্বোপরি আল্লাহর সান্নিধ্য অর্জন সম্ভব হবে।

 

আরো খবর...