অংশগ্রহণমূলক না হওয়ার দায় কার?

৫ জানুয়ারির নির্বাচন
॥ মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী ॥

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচন নিয়ে মিডিয়ায় এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে অনেকেই নানা কথা বলেন, ১৫৩ জন সাংসদ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়া নিয়ে তীর্যক মন্তব্য ছোড়েন, বিনা ভোটের নির্বাচন বলে অভিহিত করেন, জনগণের ভোটাধিকার হরণের অভিযোগও করে থাকেন, কেউ কেউ অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হয়নি বলে আর একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত না করার অভিযোগ করে থাকেন কেউ কেউ। মূল কথা, ২০১৪-এর ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে যেসব কথাবার্তা এখনো উচ্চারিত হয় তা শুনে যে বিষয়টি নির্দ্বিধায় বলে দেয়া যায় তা হচ্ছে, যারা এই নির্বাচন নিয়ে সুযোগ পেলেই কথা বলেন তারা কাটিং-পেস্টিং মনোবৃত্তির সীমাবদ্ধতায় চরমভাবে আবদ্ধ, তারা নিজেরা জ্ঞান চর্চায় এমন মনোবৃত্তিকেই উদার বলার বা ভাবার প্রশ্নই আসে না, বরং এটি খন্ডিত বিকৃত, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ ছাড়া আর কিছু নয়। অন্যদিকে যাদের লক্ষ্য করে এমন মন্তব্য করা হয় তারা এর ব্যাখ্যাদানে প্রায়ই অস্বস্তিবোধ করেন, অযোগ্যতার পরিচয় দেন, রাজনীতির ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ দিতে পারেন না। আমাদের দেশে রাজনীতিতে একদিকে কাটিং-পেস্টিং অর্থাৎ নিজের সুবিধা মতো তথ্য-উপাত্ত জোড়াতালি দিয়ে কথা বলা, লেখালেখি করার প্রবণতা একচ্ছত্রভাবে বিরাজ করছে, বিপরীত দিকে প্রকৃত রাজনৈতিক ঘটনাবলির কার্যকরণ, লক্ষ্য, উদ্দেশ্য এবং ব্যবহারকারীদের হীন স্বার্থকে উন্মোচিত করার মতো জ্ঞানচর্চা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের অভাব, আশান্বিত বাস্তবতা, দুর্বলতা ইত্যাদি অতিক্রম করতে না পারা। এর ফলে দেশের রাজনীতির খুব নিকট-ইতিহাস নিয়ে নানা বিভ্রান্তি, দিকভ্রান্তি, বিকৃতির ছড়াছড়ি বিরাজ করছে। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে রাজনীতিতে জ্ঞানভিত্তিক মতাদর্শ প্রতিষ্ঠার ধারা, দখল নিচ্ছে অজ্ঞতা, প্রতিক্রিয়াশীলতা, উগ্রতা, হঠকারিতা, সুবিধাবাদিতাসহ স্থূ’ল, অন্ধ বিশ্বাস যা মোটেও গণতন্ত্রের পথকে স্বাভাবিক ধারায় বিকশিত হতে ভূমিকা রাখে না।

একটু পেছনে ফিরে তাকিয়ে আমরা যদি রাজনৈতিক নানা ঘটনার অধ্যায়ে আমাদের দলগুলোর ভূমিকা, নেতাদের কথাবার্তা ও ভূমিকাকে খোলা মন, দৃষ্টি ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করি তাহলে যে প্রবণতাসমূহ সহজেই ধরা পড়ার কথা তা হচ্ছে বাস্তব বোধ, ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণের বিশাল ঘাটতি, শূন্যতা, আবেগ, অন্ধ বিশ্বাস, হঠকারিতার কাছে আত্মসমর্পণের প্রাবল্য। আমরা তখন বা এখনো কাটিং এবং পেস্টিং করে কথা বলার খারাপ, হীন অভ্যাস থেকে মুক্ত হতে পারিনি। ফলে আমাদের রাজনৈতিক কথাবার্তা, অবস্থা গ্রহণ এবং নেতৃত্ব  দেয়ার মধ্যে বুদ্ধিবৃত্তিক গভীরতা খুব একটা তৈরি হয়নি, বালুচরে ঢাকা পড়ার সুযোগ অবারিত থেকেছে। আমাদের রাজনীতির খুব নিকট-সময়ের ঘটনাবলি নিয়েও সৃষ্ট চোরাবালিতে আটকে পড়তে বা সলিল সমাধি হতে বাধ্য হয়েছে প্রকৃত রাজনীতির ইতিহাস, সেটির ওপর স্থান করে নিয়েছে ময়লা, ঘোলা জল- যেখানে ম্লান করে সবারই দেহ ও মন পরিচ্ছন্ন না হয়ে কর্দমাক্ত হয়।

এবার মূল প্রসঙ্গের ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করা যেতে পারে। ২০১৪ সালের নির্বাচনটি সব দলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হবে না এমনটি কেউ কি ক’মাস আগেও ভাবতে পেরেছিল? দেশে বেশ ক’টি সিটি করপোরেশন নির্বাচন সব দলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। একটি করপোরেশনেও জোরজবরদস্তিমূলক নির্বাচন কি হয়েছিল? সরকার বা নির্বাচন কমিশন কি কোথাও হস্তক্ষেপ করেছিল? যদি করত তাহলে সবক’টিতেই সরকারি দলের মেয়র প্রার্থীরা এমন বিস্ময়করভাবে পরাজিত হতো কি? বিরোধী দলও তো নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করার কোনো অভিযোগ করেনি। বরং বেশ ক’টি সিটি করপোরেশনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীরা মেয়র পদে নজিরবিহীন সাফল্য নিয়ে অংশ নিয়েছিলেন, সবারই ধারণা ছিল যে বরিশাল, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট এবং গাজীপুরের মেয়ররা যার যার নগর উন্নয়নে দৃশ্যমান ভূমিকা রেখেছিলেন, তাদের কারো বিরুদ্ধেই যেহেতু সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দুর্নীতির অভিযোগ ছিল না, তাই ভোটারদের কাছ থেকে তারা ইতিবাচক মূল্যায়ন নিয়েই ফিরে আসতে পারবেন। কিন্তু নির্বাচনের ফলাফল ভিন্ন হওয়ায় অনেকেই হতাশ হন, ভোটার মানসিকতায় গণতান্ত্রিক মানসিকতার অনুপস্থিতি, আবেগ, প্রচার-প্রচারণায় আপ্লুত হওয়ার প্রবণতার প্রাধান্য বলে উল্লেখ করেন। উক্ত ফলাফল বিশ্লেষণের পর জানা গেল ৫ মে ঢাকার শাপলা চত্বরে অনুষ্ঠিত সমাবেশকে কেন্দ্র করে যে অপপ্রচারটি দেশব্যাপী ছড়ানো হয়েছিল তাতে বড় সংখ্যক ভোটার বিশ্বাস স্থাপন করে সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার বার্তা প্রদান করেন। সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জাতীয় নানা অবিশ্বাস্য বিষয় কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, ভোটের রায় হিসেবে তৈরি হয়, বের হয়ে আসে সেই অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়। এমন ফলাফলের পর পরবর্তী জাতীয় নির্বাচন কী হতে পারে- তা অনেকটাই ধরে নেয়া সম্ভব হচ্ছিল। বিএনপি-জামায়াতের নেতৃত্বে পরিচালিত ২০ দলীয় জোট এমন বাস্তবতায় থেকেও কেন দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন ও প্রতিহত করার সিদ্ধান্ত মনে মনে পোষণ করতে থাকে তা বেশ ভাবার বিষয়। ২০ দলীয় জোট তখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নানা ফর্মুলা নিয়ে ঘুরপাক খাচ্ছিল, সংবিধানের আলোতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে অংশ নেয়ার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে মোটেও রাজি ছিল না- যদিও বেশ কয়েকটি নির্বাচনে একচ্ছত্রভাবে তাদের প্রার্থীরাই বিজয়ী হয়ে এসেছিল- তারপরও জাতীয় নির্বাচনকে তারা সেভাবে বিশ্বাস করতে চায়নি, নিজেদের শক্তিকে তারা সরকারের সব বাহিনীর চাইতেও অনেক বেশি কার্যকর বলে ধরে নিয়েছিল। অথচ এ ক্ষেত্রে জনগণের গোপন ভোটের বিষয়টি তার চাইতেও অনেক বেশি কার্যকর এবং শক্তিশালী- যা ক’মাস আগে অনুষ্ঠিত নির্বাচনেই ফল দিয়েছিল। তারপরও ২০ দলীয় জোট তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন ছাড়া নির্বাচনে না যাওয়া, অনুষ্ঠিত হতে না দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। দেশব্যাপী তারা আন্দোলনের নানা কর্মসূচি দিতে থাকে। তাতে ছাত্র শিবির-জামায়াতের নারী-পুরুষের ধ্বংসাত্মক কর্মকান্ডের নানা ঘটনা দৃশ্যমান হতে থাকে। জামায়াত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ করার জন্য এসব প্রতিহিংসামূলক কর্মকান্ড দেখিয়ে সরকারকে স্তব্ধ করতে চেয়েছিল, জনজীবনকে ভীতসন্ত্রস্ত, ক্ষতিগ্রস্ত করতে মাঠে নামে। বিএনপির শীর্ষ নেতারা সরকারকে কাবু করা, উৎখাত করা, নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতে না দেয়ার পরিকল্পনা নিয়ে জামায়াত-শিবিরের ক্যাডার বাহিনীর ওপর অনেক বেশি নির্ভর করতে থাকে। সে ধরনের পরিস্থিতিতে সংসদের সরকার এবং বিরোধী দলের সমান সংখ্যক সদস্য নিয়ে নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করার জন্য সংসদ নেত্রী এবং সরকার প্রধান শেখ হাসিনা সংসদে বিরোধীদলীয় প্রধান খালেদা জিয়াকে আলোচনায় বসতে আমন্ত্রণ জানান। প্রধানমন্ত্রীর চিন্তাটি বাংলাদেশে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে বিরোধীদলীয় প্রধানের অংশগ্রহণে আলোচনা-পর্যালোচনা করে নির্বাচনকালীন সরকারের ধরন, কার্যপরিধি ইত্যাদি নির্ধারণপূর্বক চালু হলে প্রতিবার নির্বাচনের আগে দেশে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে যে ধরনের অবিশ্বাস বিরাজ করে তা থেকে হয়তো উত্তরণ ঘটানো যেত। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রস্তাবটি তখন যদি খালেদা জিয়া গুরুত্ব দিতেন তাহলে সমাধানের একটি স্থায়ী রূপ লাভ করত। কিন্তু তখন খালেদা জিয়া শেখ হাসিনার সঙ্গে আলোচনায় বসতে রাজি হননি। তিনি সরকার উৎখাতের আন্দোলনে অনেক বেশি আস্থাশীল ছিলেন। নির্বাচন নিয়ে জাতিসংঘের দূতিয়ালিও ব্যর্থ হয়। বিরোধী দল সরকারের সঙ্গে কোনো ধরনের সমঝোতায় না এসে দেশে হরতাল, অবরোধ ডেকে একটি অচলাবস্থা তৈরি করেছিল, রাজধানী ঢাকাকে গোটা দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে সড়ক, রেল ও নৌপথে পরিবহনের ওপর চোরাগোপ্তা হামলা, পেট্রল বোমার মতো দাহ্য বোমা নিরীহ মানুষের ওপর নিক্ষেপ করার মতো নৃশংসতা সংঘটিত করেছিল। এতে অসংখ্য মানুষ পুড়ে মারা যান, চিরকালের মতো পঙ্গু হয়ে যান। নির্বাচন বর্জনের ডাক সফল করতে হামলা, পোড়াপুড়ি, রাস্তাঘাট অবরোধ, যানবাহনে অগ্নিসংযোগ ইত্যাদি নির্বিচারে করেছে। বেশ কিছু এলাকার মানুষ ঘর থেকে প্রাণভয়ে বের হতে সাহস পায়নি, মানুষের রুটি রুজি অনেকটাই বন্ধ হয়ে যেতে থাকে। দেশব্যাপী অবরোধ, পেট্রল বোমা নিক্ষেপে দলের স্থানীয় নেতাকর্মীরা অংশ নেয়, সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক কাজকর্ম বন্ধ করে দেয়া হয়, নির্বাচন প্রতিহত করতে ক্যাডার বাহিনী নির্বাচনী কেন্দ্রে আগে থেকেই ভাঙচুর, পোড়াপুড়ি, নির্বাচনী কর্মকর্তাদের ওপর হামলা করে, একজন শিক্ষককে মেরে ফেলা হয়, অনেকে আহত হন, অনেকের বাড়ি আগুনে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়। নির্বাচন বানচালে শক্তি ও আগুনের ব্যবহার করা হয়, রাস্তাঘাট গাছ ফেলে বন্ধ করে দেয়া হয়।

একটি নির্বাচনকে প্রতিহত করতে জামায়াত-বিএনপি যে তান্ডব চালিয়েছিল তার নজির খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। ২০১৩ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর এবং ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত এভাবেই দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছিল। সেই অবস্থায় নির্বাচন স্থগিত করার অর্থ দাঁড়ায় দেশে অরাজকতাকে চরম আকার ধারণ করতে দেয়া, বিরোধী দলের সশস্ত্র পন্থায় কর্মসূচির কাছে আত্মসমর্পণ করার পরণতি দেশে সরকার পতনের অবৈধ পন্থাকেই স্বীকৃতি দেয়া- যা পরবর্তী সময়ে একটি স্বাভাবিক নিয়ম হয়ে দাঁড়াত। সে ক্ষেত্রে  দেশে নির্বাচনের আগে পেট্রল বোমার মতো প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে সরকার ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটানোর সুযোগ সৃষ্টি করে। সরকার সেই সময়ের সন্ত্রাসের সঙ্গে আপোস করেনি। নির্বাচনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী নির্বাচন অনুষ্ঠানে অনড় থেকেছে। প্রধান বিরোধী দল ও জোট নির্বাচনে অংশ নেয়ার পথ রুদ্ধ করে, ভয়ভীতি, অগ্নিসংযোগ চালানোর ফলে অনেক দলই অংশ নিতে পারেনি, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ১৫৩ জন নির্বাচিত হয়েছেন, বাকিরা স্বল্প ভোটারের ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন। নির্বাচনটি অংশগ্রহণমূলক হয়নি, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণও হয়নি, ব্যাপক ভোটারের অংশগ্রহণেও হয়নি। কিন্তু নির্বাচন সুষ্ঠু ও অবাধ না হলেও সাধারণ মানুষ ভোট বা নির্বাচন নিয়ে ভাবতে চায়নি। বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেতে ব্যাকুল হয়ে পড়ে, রুটি-রুজির সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে। ফলে বিরোধী দল ৬ জানুয়ারি থেকে মানুষকে আর ঘরে আটকে রাখতে পারেনি। মানুষ নির্বাচনের চাইতেও নিজেদের জীবন-জীবিকা নিয়ে অনেক বেশি উদ্বিগ্ন ছিল। সে কারণে মানুষ বিরোধী দলের নির্বাচন প্রতিহত বা বর্জনের সমর্থনে একটি মিছিলও করেনি, সমর্থনও জানায়নি। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে কর্মসূচি গুটিয়ে জামায়াত-বিএনপি ঘরে ঢুকে যায়। তাদের আন্দোলন ব্যর্থ হয়। দেশ সাংবিধানিক সংকট থেকে মুক্তি পায়, নতুন সরকার শপথ নিলে মানুষ হাফ ছেড়ে বাঁচে। বিরোধী দলও নতুন কোনো নির্বাচনের দাবি তোলার সাহস পায়নি। কেননা যে পেট্রল বোমার নজির তারা ক’দিন আগে স্থাপন করেছিল তার আর পুনরাবৃত্তি দেশে ঘটুক তা কেউ স্বপ্নেও দেখতে চায়নি। নির্বাচন মানেই নতুন করে পেট্রল বোমার আগুনে মানুষ পুড়ে মারার নৃত্য, রাস্তাঘাট অবরোধ করার নামে নৈরাজ্য কেউ দেখতে চায়নি।

ড. কামাল হোসেন এখন বলছেন, সেদিন কেন সরকার আর একটি নির্বাচন করার উদ্যোগ নিল না। এখন তিনি এমন কথা কত সহজে বলছেন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির পর তিনিও কি আর কোনো দাবি করেছিলেন? দেশে পুনরায় পেট্রল বোমার তান্ডব নির্বাচন উপলক্ষে ঘটবে না- সেই নিশ্চয়তা কি ছিল? ২০১৫ সালে জানুয়ারি-মার্চ তিন মাস আগে সহিংসতার পুনরাবৃত্তি থেকে মানুষ বুঝতে পেরেছিল দেশে আগুন সন্ত্রাসের চাইতে বর্তমান শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সবাই কাজ করছে, জীবন-জীবিকা নিয়ে ব্যস্ত আছে- সেটিই ভালো, সেটিই নিরাপদ। ২০১৫ সালে দ্বিতীয়বার পেট্রল বোমার সন্ত্রাস এবং নৈরাজ্য সৃষ্টি থেকে জামায়াত-বিএনপি রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। নেতাকর্মীরা এসব নৈরাজ্য সৃষ্টির অপরাধে মামলায় জড়িয়ে পড়ে, অনেকে পালিয়ে বেড়ায়। কোনো সভ্য দেশেই ২০১৩-২০১৪ ও ২০১৫ সালের মতো অপরাধ সংঘটিত করে কোনো রাজনৈতিক দল বা জোট আশা করতে পারে না যে তারা কোনো মামলার আসামি হবে না, বিচারের সম্মুখীন হবে না।

অথচ নির্বাচনে তারা অংশগ্রহণ করলে সরকার যদি কোনো ধরনের ভোট জালিয়াতির আশ্রয় নিত তাহলে সাধারণ মানুষই সরকার পতনে ঘর থেকে বের হয়ে আসত। কিন্তু জামায়াত-বিএনপি আগেই মানুষকে জিম্মি করে যে নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছিল তা কোনো অবস্থাতেই আন্দোলন হতে পারে না। জামায়াত-বিএনপির কারণেই সেই নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হতে পারেনি। মানুষ ভোটদানে সুযোগ পায়নি। সরকার হস্তক্ষেপ করতে চাইলে পরিস্থিতি সরকারের জন্য ভয়ানক হতো। সেই ঝুঁকি মনে হয় না শেখ হাসিনা তখন নিতেন। তিনি যে রাজনীতি করেন- সেখানে জনগণকে বাদ দিয়ে নির্বাচন প্রতিহত করার হিসাব মেলানো যাবে না। অথচ খালেদা জিয়া ২০১৩ এবং ২০১৫ সালে জামায়াতের ওপর ভর করার কারণে দেশে যে অবস্থা সৃষ্টি করেছিলেন- তা কোনো অবস্থাতেই নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির সংজ্ঞায় পড়ে না। চরম পন্থায় বিশ্বাসীদের মতো বিএনপি-জামায়াত নির্বাচন প্রতিহত করতে দেশব্যাপী তান্ডব চালিয়েছিল। নির্বাচনটি মূলত সন্ত্রাসবাদী রাজনীতির শিকারে পরিণত হয়। এর দায় এখন সরকারের ওপর চাপানো কিংবা অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হয়নি বলে জোড়াতালি দিয়ে কথা বলার অর্থ দাঁড়ায় প্রকৃত সত্যকে মানুষের দৃষ্টি কেড়ে নেয়া, অতীত থেকে প্রকৃত শিক্ষা না নেয়া।

লেখক ঃ অধ্যাপক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যলয়।

আরো খবর...